ম্যায় নিকলা গাড্ডী লেকে ১

পিউ আজকাল অল্পেই হাঁপিয়ে যায়। বেচারি এখন হাপরের মতন শ্বাস ফেলছে আর অন্যদিকে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে কেবিন ব্যাগেজগুলো কোনোমতে ঠুসে রেখে দেখা গেল মাঝের সীটটাতে বসা লোকটার হাতে আলগোছে ধরা তিনখানা মোবাইল ফোন। উদাসীন চেহারা মানুষটার! একই লোকের হাতে দুটো করে মোবাইল ফোনের চল নিয়মিত দেখা যেত একযুগ আগে। ইদানীং তিনখানা মোবাইল হাতে নিতে বড় একটা দেখা যায়না কাউকে! আমার দিকে অবহেলার দৃষ্টিতে তাকালেন ভদ্রলোক।

শ্রমের কাজ করতে গেলে আমি আজকাল হাঁপিয়ে যাই সহজেই। তবুও অ্যাদ্দিন বাদে কত্তাগিন্নি দু’জনায় বেড়াতে বেরিয়েছি, তাই বুঝি একটা অন্যরকমের বৈচিত্র্যময় আনন্দ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাকে। বিমানে চাপলে আমি সামান্য উদ্বিগ্ন হয়ে থাকি। এটা আমার একটা সহজাত রোগ, পুরনো অসুখ আর সেই কারণে আমি চেষ্টা করি যদি কিছু অবান্তর ভাবনাচিন্তা করে সময়টা যদি টুক করে কাটিয়ে দেওয়া যায়! বিমান ছাড়ার আগে মালপত্তর নিয়ে একটা কোমল হট্টগোল তো হয়ই, কিন্তু সকল যাত্রীরাই সভ্যতা বজায় রাখতে আকুলি বিকুলি চেষ্টা করে যান। তবুও এই বাহ্য সভ্যতার প্রাথমিক শর্ত ভেঙ্গে আড়চোখে আমি দেখতে শুরু করে দেই আশেপাশের মানুষজনকে। তিনখানা মোবাইল নিয়ে লোকটার দিকেই নজর পরে বেশি করে।

তিনটে মোবাইল ফোনের মানে কি? লোকটা কি একজন গোপন প্রেমিক? বউয়ের কাছে ধমক খেয়ে তিননম্বর মোবাইলখানা ব্যবহার করেন বান্ধবীর জন্যে? সেই রহস্যময়ী স্ত্রীলোকের অস্তিত্বের কথা হয়তো লোকটি জানতে দিতে চাননা কাউকে! ঈশ! আমার মাথাটা ঘেঁটে গেছে। বিমান এখনও ওড়েনি, আর এখনই এসব খেলো ছেলেমানুষীতে ঘেঁটে যাচ্ছে মাথা। লোকটির দিকে আবার তাকালাম একবার দুবার। মাস্কের নিচে সামান্য হাসলাম। লোকটা নিশ্চয় এলেবেলে ভাবছেন আমাকে, পাত্তাই দিলেন না!

ক্যাপ্টেন রোহিত জয়সওয়াল বিমানের চাকা গড়ানোর আগেই ঘোষণা করে দিলেন অমৃতসর পৌঁছতে আমাদের সময় লাগবে ঘণ্টা দুয়েক আর যাত্রাপথের আবহাওয়া আজ ভালো নয় মোটেই। হালকা টার্বুলেন্স থাকতে চলেছে আজকের বিমানে। আমার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, বুকটা ধক করে উঠল আর একটা ছোট হেঁচকিও উঠল। পিউও শুনেছে ঘোষণা, আমার দিকে তাকিয়ে অনুচ্চ স্বরে কি যেন একটা বলল। হয়তো বলছে একটুতেই এত বিচলিত হয়ে গেলে চলে? ভর্ত্সনা করছে। আমাকে পানীয় জল চাইতে হবে এক্ষুনি।

মানুষের যত বয়স বাড়ে, তার মন তত বেশীমাত্রায় বিশ্লেষণী হয়ে যায়। বিশ্লেষণ ছাড়া আর কোন বাস্তব অস্ত্র তার হাতে বুঝি থাকেনা। টার্বুলেন্সের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এ বয়েসে পৌঁছে আমার ভালোরকম জানা আছে। তবুও বাইরে ফটফট করছে চড়া রোদ্দুর আর আকাশে উঠে ছাতারমাথা টার্বুলেন্স ব্যাপারটা কেমন যেন পরস্পরবিরোধী মনে হয়। পিউ সিট পেয়েছে অ্যাডজাসেন্ট আইলে। একদিক থেকে বাঁচোয়া, প্রতিবার বিমান টেক-অফ করার সময়ে আমার বাহু বিতিকিচ্ছিরি ভাবে খামচে ধরার বদ অভ্যেস আছে পিউয়ের। টার্বুলেন্সের কথা শুনে পিউয়ের পেছনের সারির দুজন নারী এয়ার সিকনেস ব্যাগ চেয়ে রাখল বিমানসেবিকার কাছ থেকে। তার মানে টার্বুলেন্সটা কি সাঙ্ঘাতিক বেশী হবে নাকি? ঝাঁ চকচকে উচ্চবিত্ত চেহারা এই নারীদের। তাঁরা নিশ্চয় বিমানের বিষয়ে আমার চেয়ে বেশী জানেন।

নারী দুজন আহামরি দেখতে না হলেও, দুজনেই যথেষ্ট স্মার্ট আর তাঁদের পোশাক বিচিত্র রঙের। তবে এদের চটকদার মুখ দেখলে কেমন বেপরোয়া, অমার্জিত আর হৃদয়হীন বলে মনে হয়। বিমান ওড়ার মিনিট কুড়ি পর থেকেই বোঝা যেতে লাগল ক্যাপ্টেনের কথা ঠিক। টার্বুলেন্স কিন্তু আগাগোড়া হয়ে চলেছে মুম্বই অমৃতসর বিমানে। কি অদ্ভুত! বাইরে দিনের পরিষ্কার আলো, আর ভেতরে অনবরত ঝাঁকুনি। ঝাঁকুনির কথা ভেবে আমি আর চা-কফি চাইনি। যদি গায়ে-পায়ে ছলকে পড়ে যায় সেই গরম পানীয়? পিউ অবশ্য কাপের নুডল খেয়ে এতক্ষণে একটু ঝিমুনির দিকে। তবে দেখলাম একটা নিখুঁত মুখ বানিয়ে বসে সে ঝিমোচ্ছে। নারীদের অনেক কিছু জানতে হয়। নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পেরেছে তাঁর পেছনের সীটেই রমণীরা দারুণ স্মার্ট।

বিমানে একা যাত্রা করলে সারাটা পথ আমার গা ছমছম করে, দু আড়াই ঘণ্টা ধরে একটা সঙ্কীর্ণ জায়গায় বসে থেকে এক অনিশ্চিত সম্বলহীন ভয়ে জিভ শুকিয়ে আমার কাঠ হয়ে যায়। আজকে অবশ্য পিউ আমার সঙ্গে আছে! টার্বুলেন্সের আদ্ধেক টেনশন তাই ওকে দিয়ে দিয়েছি। এরই মধ্যে ভেবে নিতে হচ্ছে, অমৃতসরে পৌঁছে এয়ারপোর্টের থেকে বেরোবার আগেই গায়ে গরম জামা চাপিয়ে নিতে হবে। আহ! কনকনে হাওয়ার মধ্যে একটা জ্যাকেট পরে ঘুরব, একজন নারীর পাশে পাশে। কতদিন সোয়েটার জ্যাকেট গায়ে চাপাইনি! আমার ভাবতেই কেমন সারা শরীরে রোমাঞ্চ হল!

অমৃতসর পৌঁছতে এখনও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকী, মোবাইলে পুরনো মেসেজগুলো পড়তে লাগলাম আমি, কিন্তু বিমানের ঝাঁকুনিতে মনঃসংযোগ হলনা। এতো মহা মুশকিলের ব্যাপার দেখছি, আশেপাশের সবাই এমন টার্বুলেন্সে কেমন নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে আর আমিই বোধহয় একা জেগে বসে আছি গোটা বিমানে। আমার খুব লজ্জা করতে লাগল। একবার গলা খাদে নামিয়ে ডাকলাম পিউকে, কিন্তু সে দেখলাম পাত্তা দিলনা। আমি সবার দেখাদেখি চোখটা হাল্কা বন্ধ করতেই হঠাৎ বাইরের আবছা সকালটা সব আলো শুষে কেমন কালো মতন হয়ে গেল। তারপরে আবার রোহিত জয়সওয়ালের গলা আর এবারে পিউ দেখলাম আমার দিকে চেয়ে একগাল হাসছে।

আমার চোখটা বুঝি লেগে গিয়েছিল খানিকক্ষণের জন্য। আমিও পিউকে পালটা জবাব দিতে গিয়ে এবার বেশ জোরেই বলে ফেললাম, একগাদা নুডল গিলতে গেলে কেন, আজকে দুপুরে অমৃতসরী কুলচা খাওয়ার কথা আছে না আমাদের? পিউ আমার প্রশ্ন শুনেই কেমন একটা মুখ বানিয়ে ফেলল এক নিমেষে। চোখ বুজিয়ে অন্যদিকে ফিরে তাকাল সে, যেন আমার এসব তুচ্ছ কথার জবাব এখন দিতে চায়না। আরে আমি তো কুলচা বলেছি, আলুচচ্চড়ি তো বলিনি! নির্ঘাত পেছনের স্ত্রীলোক দুজনের কথা ভেবে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে রয়েছে সে আর মনে মনে আমাকে বলছে আনকালচারড! সত্যি আমি মাঝে মাঝে খুব বোকামি করে ফেলি!

বাইরে সাত ডিগ্রী ঠাণ্ডা বলেই হয়ত এত অস্পষ্ট অমৃতসরের সূর্য। নতুন জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে একটা খাসা ফিলিং হচ্ছে। বিমানে সামান্য ঘুমিয়ে নেওয়ার জন্যে আমাদের দুজনের শরীর এখন বেশ ঝরঝরে। অবসাদ নেই একফোঁটা। বিমান ল্যান্ড করে যাওয়ার পর, প্রথম কাজ পড়িমরি করে মা’কে ফোন করে পৌঁছসংবাদ জানানো। মা হয়ত এতক্ষণে উদ্বেগ করা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু মোবাইল ফোন চালু করতেই দেখা যাচ্ছে ইতিমধ্যেই আমার ফোনে ছ’টা মিসড কল। কলগুলো রবিনের। বাপরে, রবিন লোকটা খুব ভয়ানক অধীর ধরনের মানুষ দেখছি! মাত্র পাঁচ সাত মিনিটেই ছ’খানা ফোনকল? ভাগ্যিস মালপত্র পেতে বেশী একটা দাঁড়াতে হলনা, আর লাগেজ বলতে আমাদের দুটো মাঝারি স্যুটকেস আর পিউয়ের একটা নীল হ্যান্ডব্যাগ। কিছুটা হেঁটে কারপার্কিং পৌঁছে গাড়ীর দেখা পাওয়া গেল। নম্বর তো দেওয়াই ছিল রবিনের মেসেজে। ধপধপে একটা সাদা গাড়ী, পঁচিশ বারো। কিন্তু রবিন লোকটা কোথায়?

মুম্বই বিমানবন্দরে সারাক্ষণ গিসগিস করে মানুষ। আর অমৃতসরে নেমে দেখা গেল মন্থরতা কাকে বলে। নিরিবিলি শুনশান জায়গা। একমাত্র আমাদেরই বিমান ল্যান্ড করেছে আর আমাদের সহযাত্রীরা একেএকে তাদের গাড়ীতে চেপে রওনা হয়ে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। তবে এদের দেখে কাউকেই টুরিস্ট বলে মনে হয়না। চাপা কুয়াশার মধ্যে সুন্দর হাল্কা রোদ উঠেছে। এমন রোদে বাঙালীরা কয়েৎবেল মাখা খেয়ে মাদুরে বসে লুডো খেলে। ট্রলি থেকে মালপত্তর নামাচ্ছি দেখে কোত্থেকে হুড়মুড় করে দৌড়ে উপস্থিত হল রবিন, সঙ্গে আরেকটা লোক, আর এসেই রবিন বলল, আরেহ! কোই নেই সাব, কোই নেই! সহাস্যে অভ্যর্থনা করে হাত ঝাঁকাল আমার সাথে। আমি বেশ চমকে উঠলাম। কোই নেই কথাটার মানে আবার কি? মানে কেউ নেই? শুনে আমি ইতস্তত করলাম, সামনের গাড়ীটা পঁচিশ বারোই তো? নাকি ভুল করে অন্য কোন গাড়ীর সামনে মাল নামিয়ে ফেলছি? দেখলাম অন্য লোকটা সুটকেসদুটো গাড়ীতে তুলে ফেলেছে নিমেষের মধ্যে।

রবিনের বেশ তেল চুকচুকে রঈস চেহারা। তবে কথাবার্তায় একটা নাটুকে টোন আছে। প্রথমেই সে বুঝিয়ে দিয়েছে সে আমাদের ড্রাইভার নয়, খোদ পঁচিশ বারোর মালিক। গাড়ী চালাবে অন্য লোকটা, তার বয়স বেশী নয়, আর কেমন একটা নীরস ধরনের চেহারা, তবে সরল চাষাভুষো মুখ। ড্রাইভার তারসেম সিংহ। একটা গোলাপি রঙের ইয়াব্বড় পাগড়ি তারসেমের মাথায়। আর খয়েরী ডোরাকাটা সাফারি স্যুট। সামনের সীটে বসেছে রবিন, পাগড়ি তার মাথাতেও। কালচে লাল রঙের। আমরা গুছিয়ে বসে যাওয়ার পড় সে পেছন দিকে মুখ ফিরিয়ে একগাল হাসি নিয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। বোধহয় কিছু একটা জানাতে চায় সে।

অমৃতসর দেখছি শান্ত শহর, কোন ডেসিবেল মার্কা হৈহল্লা নজরে আসছেনা। বিমানবন্দরটাও কেমন একটা নিথর জায়গা। চোখ ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার মতন কিছু নেই। এরই মধ্যে পিউ মুখ বেঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, এই নাকি তোমার অমৃতসর? এ’তো শ্রীরামপুর, নইলে ম্যাক্সিমাম আসানসোল।

One response to “ম্যায় নিকলা গাড্ডী লেকে ১”

  1. ভাল travelogue. তাড়াতাড়ি পরের গুলো দাও।

    Like

Leave a reply to Kausik Cancel reply