তোরা যে যা বলিস ভাই, আমি আজ ঘরেই থাকতে চাই। আরে… কেয়া তুখোড় আইডিয়া হ্যাঁয় স্যারজী! তালিয়া, তালিয়া, তালিয়া! টেরিফিক রকম জমে গেছে দেশের অধুনা হুজুগ, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। আর এই বাধ্যতামূলক বাড়ী বসে কাজ করবার বিদঘুটে চক্করে, যত’না মস্তি পেয়েছে কর্মচারী, তার চেয়ে ঢের বেশী রঙ্গ হয়েছে খোদ মালিকের। আর কইয়েন না কত্তা! সারাদিন ওই অট্টালিকার মতন আপিস খুলে রাখাটা কি একটা চাট্টিখানি ব্যাপার নাকি? খরচপত্র কম? তা, এই আপিস বন্ধের মওকায়ে বেঁচে যাওয়া চা- চিনি-বিস্কুট তো আছেই, তার সাথে সাথেই বাঁচছে একগাদা বেয়ারা দরওয়ানের মাইনে, নিত্যদিন ধোয়াপোঁছার লোকগুলো, ফিনাইল, সাবান, জল আর সাথে সাথে আরও হরেক খরচা। আর সবচে বড় পাওনা, মাসান্তে বিজলী কোম্পানির বিলটা আসচে কিন্তু নামমাত্র। অতএব মালিককে আর পায় কে? আপিসপাড়া সুনসান। দুটো চিতাবাঘ ঝিমোতে ঝিমোতে রাস্তা পেরিয়ে স্টিফেন হাউজের দিকে চলে গেলো এইমাত্র। আর শহরতলীর ঘরেঘরে আপিস, সাপ মরছে তুলকালাম, লাঠি ভাঙছেনা মোটেই। বড়বড় জটিল থেকে জটিলতর মীটিং টগবগিয়ে হয়ে চলেছে হালফিলের ভিডিও কলে। এমনকি ধমাকা মাচানো শাঁসালো কোম্পানির কেনাবেচার ডিলসুদ্ধু! এমনকি খোদ সরকার বাহাদুর পর্যন্ত ছাতি চাপড়ে বলছেন, তথাস্তু! আইয়ে বারাতো কা সওয়াগত হাম পানপরাগ সে করতে হ্যাঁয়! আসুন ভাইয়ো আউর বেহেনো, দুষ্ট ভাইরাসের দমন আর শিষ্ট মালিকের পালন আমরা নিঃসন্দেহে করি, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের জাদু তরবারি দিয়ে! ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সৌজন্যে ঝাড়া চারমাস ধোপদুরস্ত জামাপ্যান্ট পরার প্রয়োজন হয়নি যে হাপগেরস্ত লোকটার, বাসেট্রামে বা উবারে চড়া আবশ্যক হয়নি এর মধ্যে একটা দিনের জন্যেও, গোরিলার মতন বিস্তার পাওয়া চুলের ঝোপঝাড় ছাঁটিয়ে নিতে হয়েছে বিরক্ত গিন্নিকে দিয়ে, সে লোকটার এতো দুঃখেও, হেবি মজা! উঠতে বসতে জাস্টিফাই করেছিল আর চাকরি না যাওয়ার প্রচণ্ড খুশীতে ডগমগ করেছিল প্রথমদিকটা! অ্যাপশ্রেষ্ঠ অ্যাপ জুম, মাইক্রোসফট কোম্পানির টিমস, গুগল মিট, একের পর এক ফোনের মধ্যে খুলছে স্মার্ট কর্মচারী আর দাপিয়ে বলছে, আরে হবেনা মানে? হওয়ালেই হবে! প্রচলিত প্রথাগত সিস্টেমকে আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ডিজিটাল বুদ্ধিতে ভাইরাসর নাকে কেমন ঝামাটা ঘষে দিলুম দেখলি? আরে দাদা, বলতেই বলে, হেথা হতে যাও পুরাতন, হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে। আর এইভাবেই আস্তেধীরে গত চারপাঁচ মাস্যা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে এই সুযোগ সুবিধা ঠাসা, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের খেলা! মালিক কর্মচারী উভয়েই উল্লাসে চিল্লিয়ে বলছে, ইয়াহু! চাহে কোই মুঝে জংলী ক্যাহে! ওদিকে মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের এই বেঢপ থিসিসে মরাকান্না জুড়ে দিয়েছে নিম্নবিত্ত সাধারণ পাবলিক! যে ফ্যাকাসে লোকটা পান সিগারেট বেচছিল আপিসের বাইরের ফুটপাথে, ট্রাফিক সিগন্যালে বেচছিল ভারতের পতাকা বা চীনেবাদাম, আপিস-টাইমের লোকাল ট্রেনে ফিরি করছিল ডটপেন আর লেবু-লজেন্স, বেজায় হাউমাউ জুড়ে দিয়েছে সে! কি সব ব্যাধি এলো রে দাদা, হে ভগবান হয় এই বাজারে দুটো খদ্দের দাও, নইলে করোনা দাও! শ্বাস উঠে মরি! গরমেন্টের লোক জুমকলে গোঁসাইকে বলল, আরে ধুর! লোকগুলো আকাট মুখ্যু! গবেট কোথাকারে! এটাও ওদের মালুম হচ্ছেনা, করোনা একটি আস্ত অ্যাক্ট অফ গড? কিন্তু ওদিকে খোদ গড হাসছেন, কারণ জানেন যে মালিক আর মধ্যবিত্ত কর্মচারীটাই আসলে আকাট মুখ্যু! নিত্যনতুন শাড়ী, জামা পেন্টুলুন কিনতে হচ্ছেনা বলে প্রাথমিক যে ঘুসিটা, সেটা দোকানদার নিজের চোয়ালে নিলেও, ক্রমেই সেই ধাক্কা গিয়ে পড়বে মালিকেরই তহবিলে! থোঁতামুখ মুখ ভোঁতা হয়ে যাবে মালিকেরই! একটা অদ্ভুত সাইকেলে পরে যাচ্ছে গোটা ব্যবস্থা! গোটা সিস্টেম! মিষ্টি ওয়ার্ক ফ্রম হোমে বাইরে বেরোনো বন্ধ। অতএব গাড়ীঘোড়া, জামাজুতোর বিলকুল দরকার নেই, তাই স্বাভাবিক কেনাকাটাও নেই! কেনাকাটা নেই, তাই দোকানদারের মুনাফা নেই! দোকানদারের মুনাফা নেই, তাই নতুন স্টক কেনা বন্ধ রেখেছে সে ব্যাটাও! লাও ঠ্যালা… বাড়ী বসে মোচ্ছব করে তাহলে নির্বোধ মালিকমশাই কি মালটা শেষে গিয়ে বেচবেন স্বয়ং গডকেই? সুমন চট্টোপাধ্যায় কি এখনও মুখ বুজে রয়ে যাবেন? একবারও গর্জে উঠে দুকলম লিখবেননা - প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা! 🤓
Leave a reply to কৌশিক সেনগুপ্ত Cancel reply