সিনিয়র স্রষ্টা নিমীলিত চোখে, মুখটা বেঁকিয়ে চুকচুক শব্দ করে বিদ্রূপ করলেন, “আহারে অত ঘাবড়াইও না মানবজাতি। তোমরা অগস্ট অবধি সহিষ্ণু হও, ধৈর্য ধরো। মাঝেসাঝে তোমাদিগের সাথে এমন স্ট্যান্ড-আপ তামাশা আমরা টুকটাক করিয়াই থাকি! অতীতে তোমাদের তোল্লাই দিয়াছি, তোমরা পাত্তা প্রদর্শন না করিয়া বেয়াদপি করিয়াছো। তাহার শাস্তিস্বরূপ কলেরা কিন্তু আমরাই দিয়াছি, সাথে ফ্রী’তে প্লেগ দিয়াছি, জলবসন্ত’র মত প্যাঁচালো জিনিষ দিয়াছি। কিন্তু তোমরা একেএকে সব’কে খেদাইতে সক্ষম হইয়াছো। অতএব, এইবারে মিষ্টি করিয়া তোমাদিগের জন্যে আনয়ন করা হইয়াছে নয়া নভেলি করোনা”। কোভিড উনিশ – মেড ইন খোদ নন্দনকানন! নিন্দুকেরা এদিকে বলছেন, লে সামলা ঠ্যালা, নন্দনকাননটা তো উড়িষ্যায় শুনেছিলামনা? চীনে জানতুমনা তো! আর চীনম্যানদের বাদুড় যে চাউচাউ খাওয়ার পর, শেষপাতের মিষ্টি, সেটাই বা কেডা জানতে পেরেছিল?
এদিকে “সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়” ভক্তগুলো এক্কেবারে ক্যাবলা গরীবমানুষ! ধড়ফড়িয়ে বলছে, কি সব্বোনাশের ফরমান জারী করছেন দেবতা? ধম্মে সইবে? আমাদের দেশে, অন্তিমলগ্নে সবকটা ফরমান তো খাস সুপ্রিম কোর্ট থেকে দেয়। সেই অগস্ট অবধি টানবেন? সুপ্রিম কোর্ট থেকে অ্যালাউ করবে? ধুর ছাতা! গ্রামগঞ্জ থেকে ক্যাওম্যাও করে বেকার আন্দোলন করতে এসেছে। গেরস্থগুলো ধুঁকছে, গায়ে হালকা জ্বর, দু’একটা আবার হাঁচি মারছে অনবরত। উপেন আবার ফুঁপিয়ে বলে, আমরা তো ছোটমোটো চাকরি করি ঠাকুর। মাস গেলে মাইনে আর একটা হোমলোন আছে। চীন ইতালি দূরে থাক, দুবাই শহরে পর্যন্ত যাইনি বাপের জন্মে। সেসব গেঁয়ো নালিশ ফালিশ শুনে দেবতা অট্টহাসি করলেন, আর নিজের নাকের খাঁচার উপর এন-নাইনটিফাইভ খানা সামান্য সেট করে নিয়ে পাঁচালী পড়ে বলতে শুরু করলেন, “যখনই দেখিব রাজনীতি বাড় / গিয়াছে বড্ড বাড়িয়া / পশ্চিমী ধন শুষিতেছে পূবে / রাশিরাশি নোট কাড়িয়া / তখনই আনিব করোনা’র বারি / ফুসফুস হতে সব হাওয়া ছাড়ি / মাশুল গনিবে সব নরনারী / নাক থেকে কফ ঝাড়িয়া”।
আরেব্বাস! সাক্ষাৎ দৈববাণী বলে কথা। অ্যায়সা ফরমান, তাও আবার বিশুদ্ধ পাঁচালীমার্কা ছন্দে! ঠাকুর উরু চাপড়ে বললেন, আও ভকৎ লোগ আও, হাভেলি’পে আও। বজ্জাত করোনার খপ্পরে, এক ধাক্কায়ে সেনসেক্সে যেমন সংশোধন করিচি, এই বেলা তেমনি পপুলেশনেরও হালকা ঘাটতি করিয়ে দোবো বলেই মালুম হচ্ছে। পক্বকেশ অর্থনীতিবিদ কাষ্ঠ হেসে বললেন, অ্যাদ্দিনে বুঝলি? আরে তোদের ওই সেনসেক্সটা তো ফাঁপা ছিল অনেককাল ধরেই। শূন্যস্থান পূরণ করতেই তো করোনাটা আলগোছে এসেছে! একবারও ভেবে দেখেছিস? স্টকমার্কেটের কাঁড়িকাঁড়ি টাকাগুলো রাখতিস কোথায়? অন্যদিকে ইয়দা ইয়দা হি ধর্মস্য আউড়ে, এই মওকায় পশ্চিমে জননেতা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, অনেক হয়েছে। আর না। বাদুড়ে তড়িঘড়ি বায়োলজিকাল বিষ মিশোতে গিয়ে বিলিয়ন গেলো, ট্রিলিয়ন গেলো। এইবারে হাটে হাঁড়ি ভাঙার আগে, এসো’হে স্মার্ট দেশবাসীরা, মেরে প্যাঁরে সাহেব-মেমেরা, সিকনিসিক্ত হাতে ন্যাকান্যাকা হ্যান্ডশেক না’করে, এসো আমরা সক্কলে পূবের নিয়মে একে-অন্যকে নমো করি। ইদিকে পূবের দিকে, সবাই বলছে, আয় ভাই, আর আমরা মা কালী’কে নমো না করে, চল বরং অ্যালকালি’কে গড় করি। দিনে অষ্টআশিবার কড়া কস্টিক সোডার অত্যাচারে হাতের চেটোর ছালবাকল তোরও যেমন উঠবে, আমারও উঠবে।
আহা! কি মুশকিল! আমরা তো আর অ্যাকটিভলি ছিলামই না তোদের বায়োলজিকাল ম্যানিফেস্টোয়। তোদের ক্রিয়েটিভ ট্রেডওয়ারে। এখন খামোখা এই আঁছোলা জৈব মারধর! এতো জনসংখ্যার চওড়া দেশটা টালমাটাল করে দিলি বাপ! এইসব যুক্তিতক্কো না বোঝা ন্যালাক্ষ্যাপাগুলোকে বেঁধে মারলে, যতোগুলো ধড়াম পড়বে পিঠে, ততোগুলোই তো খেয়ে নিতে হবে মুখ বুজিয়ে। তবে যে যাই বলুক, মানুষ মরুক, মিডিয়াকাকুর কিন্তু পোয়াবারো। মাথাফাতা নেড়ে ঘোষণা করল, নিকুচি করেছে জ্যোতিরাদিত্যর। আর হাঁপাতে হাঁপাতে ক্যামেরাপার্সেনকে হুকুম হচ্ছে, রুঘুনাথ গাড়ী নিকালো, বাজারমে নয়া অসুখ আয়া হ্যাঁয়। সারা দেশবাসীকে ঘটা করে ব্যাকগ্রাউন্ড মুজিক সহকারে জানকারি দিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ মোদের দেহে আছে প্রাণ। কে একটা সেদিন বললেন, রাত নটার প্রাইমটাইমের চেয়ে, এর থেকে বরং একটা জম্পেশ করে ভুতপ্রেতের বই চালিয়ে দিন’না কেন? ভয়টা একটু কম লাগলেও লাগতে পারে! তবে এই করোনা ইস্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্কলে দিনকে দিন তুখোড় ভাইরাস বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছেন। সকাল বিকেল নির্ভীক চিল চিৎকারে জানিয়ে দিচ্ছেন মুহুর্মুহু, করোনা নিয়ে আমিও জানি। স্ট্যাটাস আপডেটে হ্যাঁচকা লিখছে, আমিও কনুই পর্যন্ত হাত ধুচ্ছি দিনে অষ্টআশিবার। হুহু’বাবা যতই জবরদস্তি আনসিন প্যারাগ্রাফ লিখতে দাওনা কেন, আজকের কানেক্টেড জমানায়, করোনা হেঁয়ালির জবাব ফটাফট রেডি রয়েছে আমার মোবাইলে।
এদিকে সারা বিশ্বের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইউরোপ অ্যামেরিকায়ে কিন্তু হোলসেল ভীতি। আর বোলোনা ভায়া, শুনেছ নিশ্চয়ই! বাড়ীর বউটা তো মাঝখান থেকে কোত্থেকে যেন করোনা এনেছে। কে জানে বাবা? সারাদিন টইটক্কর করে দেশ বিদেশ ঘুরছে, কোথাও চাউমিন নয়ত পিজ্জা-ফিজ্জা খেয়ে থাকবে! সেহেতু দাঁতে দাঁত চেপে, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করছেন খোদ হাল্লার প্রতিবেশী শুণ্ডির প্রধানমন্ত্রী। ইউরোপে তো আরও মহাকেলেঙ্কারি! বর্ষীয়ান রাষ্ট্রপ্রধান থেকে পঞ্চায়েতপ্রধান, করোনা’র হুজুগে বাদ যাচ্ছেনা কেউই। গুষ্টির ষষ্টিপুজো হতে বাকী নেই আর! আর গড় বয়েসটাও তো বড্ড বেশীর দিকে! যতটা নিরাপদ ভেবেছিল নিজেদের পলিটিকালি কারেক্ট দেশগুলোকে, হরবখত কাশতে কাশতে পাঁজরা বেরিয়ে যাচ্ছে তাদেরও। সুতরাং ইকনমি টিকনমি একদম ঢিস, গোটা পৃথিবী আজ করোনার দৌলতে বেকারত্বের দিকে এগিয়ে চলেছে সদর্পে।
তবে ক্ষীণ আশা একটা আছে। বলছে, ওয়ার্ক ফ্রম হোম আর কিপ সেফ সোশ্যাল ডিস্টেন্স। নো সিনেমা, নো শপিং মল। বাবা ছেলেকে বলে রাখছে, ভাল হবেনা সোনামণি। এক মিটারের মধ্যে এলে, গুলি মেরে দোবো, আগেই বলে দিলাম। কিন্তু হোমে বসে কি আর কাজ হয় কত্তা? হয় নেহাতই অকাজ… ঘি আর আগুনকে কতক্ষণই বা আলাদা করে রাখবেন? সেন-সেক্স কি আর সব সময় পড়ে রে পাগলা? কিছু দরকারি সময়ে দাঁড়িয়েও যায় বুক চিতিয়ে। অতএব ল্যাপটপ ফ্যাপটপ ‘গোলী মারো’। আজ বাংলা বনধ! লেপের তলায় সুড়ুত ঢুকে একনাগাড়ে আলিঙ্গনের ডার্ক রুম আর ইকড়ি-মিকড়ি খেলার আগে কেবল একটিবার খুশবুদার সাবান জলে হাতটাকে ধুয়ে নেওয়া। ব্যাস! তারপরেই দশমাস দশদিনের মাথায় স্রষ্টাকে কলা দেখিয়ে বলবে, রাখো ঠাকুর তোমার গরমাগরম ফরমান। নন্দনকাননের একুশে আইনে পপুলেশন কমবে বলেছিলেনা? এই দ্যাখো, করোনার ধাক্কায়ে কেমনি তুড়ি মেরে বাড়িয়ে দিলাম… সত্যি! মনুষ্যকে থামায় সাধ্যি কার? 🤓
Leave a reply to Anirban Dasgupta Cancel reply