তখন বলত শুভ দোলযাত্রা আর এখন বলছে হ্যাপি হোলি। দোলের ভোল কিন্তু বিলকুল পালটে গিয়েছে! সে সময়ে নিয়ম ছিল ছাপোষা বড়োলোক নির্বিশেষে, ট্রাঙ্কের থেকে ছেলেকে নামিয়ে দেওয়া হবে সবচাইতে পুরোনো একখানা ছেঁড়াখোড়া জামা। কোথায় যে অ্যাদ্দিন গোঁজা ছিল সে জিনিষখানা, সেটাই ভাবলে তাজ্জব হয়ে যেতে হয়! ন্যাফথলিনের কম্পালসরি গন্ধ, বোতাম-ফোতামের সে’রম বালাই নেই তাতে আর নিচে ছোট হয়ে যাওয়া একটা রঙচটা হাপপ্যান্ট। উফ খুব জোর কুটকুট করছে যে! চুপটি করে দাঁড়ানা একটু, ক্যাবলা একটা। টানা দশ সেকেন্ড ধরে নিশ্বাস বন্ধ করে তলপেট চেপে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝালে-ঝোলে-অম্বলে থাকা ছেলে আর মা অনবরত চেষ্টা চালাচ্ছে বোতামটা তার ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার। আজকে দোলের দিনে কে ভিখিরির বাচ্চা আর কেই’বা ইংলিস মিডিয়ামের ছাত্র?
গতবার তো এটা সেটা ঘেঁটে মা লাস্টে বের করে দিল ক্লাস টু’য়ের ছোট হয়ে যাওয়া ইউনিফর্মটা। ঈশ, এদিকে সাড়ে দশটা বেজে গেলো। বাবাটা কি মারাত্মক বেইমান। কালকে রাতেই সাড়ে দশটা প্রমিস করেছে, কিন্তু এখনও ইজিচেয়ারে থেবড়ে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে পেপার দেখছে। এদিকে হাঁটুর তলা থেকে পা দুটো কেমন যেন একটা শিরশির মতন করছে। কিরম একটা অস্বস্তির মতন শেষ হয়ে গেলো, শেষ হয়ে গেলো টাইপের অবুঝ ফিলিং হচ্ছে! টুক করে বারান্দা দিয়ে একবার উঁকি দিয়ে দেখা গেলো, ধুর কোথায় এখন কাতারে কাতারে মানুষ ঝপাঝপ করে রঙের ফোয়ারা ছুড়বে, তা না, রাস্তা তো এখনও একদম ফাঁকা। কেউ নামেইনি। শুধু রত্নাকর ভাঁড়িটা হেলেদুলে টিউকল পাম্প করে জল নিচ্ছে আর বিলি করছে বাড়ি-বাড়ি। এ’বাবা লোকটা ছুটি পায়নি আজকে? দোল খেলবেনা? ওই তোর যেমন বোকা বোকা কথা! আজকে ওর ছুটি নিলে হবে? আজকেই তো জলের দরকার রে বাবা ঘরে-ঘরে। খেলার পর চান করবিনা? মোড়ের মাথায় শুধু টিকলু আর টিকলু’র বেয়াড়া দিদিটা। সামনে তেমন কাউকে না পেয়ে একটা নিরপরাধ নেড়িকুত্তা’কে প্রাণপণ রঙ দিচ্ছে। এদিকটা মোটে তাকাচ্ছেইনা।
বুঢঢা’টা এইমাত্র বেরোল। মুখে একগাল হাসি। খুব সেয়ানা হয়েছে ইদানীং। কথায় কথায় আব্বে বলে। কাল বিকেলেই বলেছিল ঘড়ি মিলিয়ে ঠিক সাড়ে দশটায় বেরোবে! বুঢঢা’র হাতে একটা প্লাস্টিক। তার মধ্যে সযত্নে রাখা গোলাপি রঙের আবীর, এক প্যাকেট বেলুন আর একটা পিতলের পাম্প পিচকিরি। বুঢঢা’র পিচকিরিটা একদম ধ্বংসাত্মক টাইপের জিনিষ আর মালটা নাকি আসলে ওর কাকার! কাকা লোকটা খাস সারারারা বিহারের লোক কিনা! গতবারে বুঢঢা’র ওই পিতলের পিচকিরিখানা হেবি প্রশংসা পেয়েছিল। রঙের কি ভয়ানক স্পীড রে বাবা। গতবারেই মালুম পাওয়া গিয়েছিলো, মনে হয়েছিল পিঠফিট ফুটো হয়ে যাবে। বাকীদের পিচকিরিগুলো নেহাত সস্তার। প্লাস্টিকের। মৌলালী’র মোড় থেকে গতকাল আপিসফেরতা ছোটমাসী কিনে এনেছে। অনেক’কটা রঙও এনে দিয়েছে তার সাথে। ডিপ বেগুনী, সবুজ আর ক্যাটকেটে একটা লাল। আজকে সকালেও পড়তে বসতে হয়েছিল। দোল বলে মা কিন্তু ছাড় দেয়নি মোটেও। কালক রাত্তিরেই পইপই করে বলে রেখেছিল, খান পঁচিশেক অঙ্ক না করে নিলে বেরোতেই দেবেনা। এখন তো কেঁদেককিয়ে মোটে এগারোখানা হয়েছে। বাবা এতক্ষণে একটা ফুটোফাটা পাঞ্জাবী গলিয়ে নিলো। আর একটা ময়লা পাজামা। দড়ি ভরা ছিলোনা, মা’র শাড়ির পাড় দিয়ে পড়েছে। মা’ও একটু আগে এগারোটা অঙ্ক দেখে মহা খাপ্পা হয়েছিল, এখন হাসি হাসি মুখে তৈরি হয়ে নিচ্ছে। বোধহয় মাংসটায় আরেকটা সিটি দিয়েই বেরোবে। দাদুকে প্রণাম করবে পায়ে আবীর দিয়ে। বাবা হাঁক দিয়ে বলল, আড়াইশো তো মাংস, আর ক’টাই বা সিটি দেবে?
আজকাল কিন্তু জমানা আমূল বদলে গেছে। মানে বসন্ত এসে গেছে! মাংস ফাংস যা আনার, আনবে ক্যাটারার! বললে হবে? দোল বদলে হোলি… দিন তিনেক আগে থেকেই অ্যামাজন থেকে নিত্যনতুন সাদা রঙের জামা কিনে রেখেছে সচ্ছল বাঙালী। নইলে কড়কড়ে ইস্তিরি করা সদ্য কেনা ফর্সা কুর্তা। অনেকটা সিলসিলার বচ্চনের মতন। মহিলারা হোলি খেলতে বেরোচ্ছেন হালকা রঙের শাড়ি কিমবা ফুল হোয়াইট সালোয়ার কামিজে। চোখে গাঢ় চশমা, হাল্কা মেকআপ! খানিকক্ষণ এদিক সেদিক কোলাকুলি করে, মাসীমাদের পায়ে একটু আবীর ফাবীর দিয়ে, অচিরেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ভদকার স্রোত। আরে ভাই, আগে একটু মৌতাতটা জমুক, তাপ্পরে না হয় ওই রঙফং খেলা যাবে। মদ্যপানের এই একটা বড় সুবিধে, হোলির দিন মালটা পেটে পড়লেই বচ্চনেরা ঠিক টাইমে খুঁজে নেবে রেখাকে আর রেখারা তাদের বচ্চনকে! সব বৈধ রে বাবা আজকে! অ্যায় তোরা ক্ষুদেগুলোকে কিন্তু নজর করিস একটু। একদম কচিকাঁচাগুলোর জন্য, গতকালই চিপস আর বার্গার–টার্গার আনিয়ে রাখা হয়েছিল, আর ধেড়েগুলো সব তো গিয়ে ঢুকেছে মোবাইলের মধ্যে। ওইগুলোর কাছে কি’ই বা দোল, কি’ই বা হোলি!
আজকে সুযোগ দারুণ। রাজ কাপুরদের মতন একটা মাঝারি চৌবাচ্চা ব্যবস্থা করা হয়েছে এইবার। বাব্বা! তোমাদের বিল্ডিঙে জলের যা ক্রাইসিস। ওই এক চৌবাচ্চাতেই সেঁধিয়ে এইবারে পুরো হোলিটা কাটাতে হবে। প্রথম প্রথম একটু আধটু আহ্লাদী চলবে, ওড়নাটা কোমরে পেঁচিয়ে রবীন্দ্রনৃত্য, উসকনো চলবে। আর তারপরে ভদকাটা একটু গুছিয়ে জমলেই, সেয়ানা দাদাগুলো আড়মোড়া ভেঙে বোস গিন্নি, ঘোষ বৌদি, দত্ত’দার বউ, সব’কে এক এক করে পাঁজাকোলা নিয়ে নিয়ে ফেলবেন ওই আদিমতার চৌবাচ্চায়ে। খিলখিল করে সমর্থনের হাসি হাসবে সবাই আর সেই ফাঁকে খ্যাংরাকাঠি দাদা নিজে টুক ঝাঁপ দেবেন, নিরীহ ডুব সাঁতারের ইচ্ছে নিয়ে। হোলি হ্যাঁয় ভাই হোলি হ্যাঁয়, বুরা না মানো হোলি হ্যাঁয়! আর বলিস না, গতবারে তো প্রথমটা টেরই পাওয়া যায়নি। নাচছি আর হঠাৎ পেছন থেকে এসে ঝটিতি আক্রমণ। সেইসব দেখে সেকেলে কিছু সেকেলে দাদাবৌদি গতবার আঁতকে উঠে কমপ্লেন করেছিলেন, “ছ্যাঃ ছ্যাঃ, এমনটা জানলে স্লিভলেস ব্লাউজ’টা পড়তামইনা”। সাড়ে দশটায় শুরু হয়েছিল, স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল দিয়ে, তারপরে সাড়ে বারোটায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে উদ্ধত হেঁড়ে গলায় রঙা বরসে আর লাস্টে আড়াইটা নাগাদ পরিত্রাহি সুরে কাঁটা লাগা! কি বীভৎস মোচ্ছব!
তবে মজার কথা, বুঢঢা’র পিতলের পিচকিরিটা এখনও সমহিমায় বেঁচেবর্তে আছে। ওইটের নাম এখন দেওয়া হয়েছে বালাম পিচকারি.. যো তুনে মুঝে মারি! ওই গাঁইয়াগুলো যারা শিহরিত হয়েও, কাছে আসতে দিচ্ছেনা, মানে যেসব ন্যাকাদের পাকাড়না মুশকিলই নেহি, না মুমকিন হ্যাঁয়, এখনও বুঢঢা’র ওই বালাম পিচকিরি দিয়েই রঙ ছোড়া হচ্ছে তাদের দিকে। পিঠ ফুটো করা স্পীডে। ওদিকে নির্লজ্জ অণু মালিক তুমুল গাইছেন, “ডু মি অ্যা ফেভার, লেটস প্লে হোলি”। আজ কোনও টেনশন নেই, প্রানায়মটা আবার কাল থেকে চালু হবে’খন। 😅
Leave a reply to Tapan Ray Cancel reply