কি বাড়াবাড়ি রকমের আস্পদ্দা বলুন’তো? কিছুর মধ্যে কিছু না, তোমরা কিনা ইন্ডিয়া’কে আজকের দিনে যেচে ‘প্রেম’ বিলোতে এয়েচো? ওরে হতচ্ছাড়া, আমরা লালনের দেশের মাল! তোদের অ্যালয়াউ করবো কেন? আমাদের তো হাত বাড়ালেই বন্ধু আর কলসির কানা ছুড়লেই নদীয়া-নবদ্বীপ… ভোলামনের প্রেম-ভালবাসা (আর তার সাথে ভেরিয়াস টাইপস অফ ইত্যাদি বা ইনটুমিন্টু) তো ইন্ডিয়ার মজ্জায় মজ্জায়। গাঁটে-গাঁটে। যে দেশটার রগ-রগ’মে পেয়ার, নস-নস’মে মুহব্বত, তাকে আর্চিস গ্যালারি, তুই কিনা ফি-বছর কোচিং করাবি প্রেম করার? লাভ কোনি লাভ? তা খেটেখুটে কি এমন এস্পেসালটা শেখাতে পারলি বাপ? একটা বেঢপ লাল হৃৎপিণ্ড বেলুন নিয়ে বিনা নোটিস নতজানু হয়ে বসে পড়তে হবে ভ্যালেন্টাইনের পায়ের কাছে?
ওরে হলিউড, সময় পেলে একবার দেখে যা। তোদের তো চোখে দেখার থেকে মুখে চাখার হ্যাবিটটা বেশী। ঠিক মধ্যিখানে একটা ঠুনকো দরজা, সেই দরজার একপাশে কমল হাসান একটা মাউথ অরগ্যান নিয়ে করুণ সুর তুলেছে। ওটা প্রিলুড… আর তারপরে এসপি বালা’র গানটা শুরু হল, তেরে-মেরে বীচ মে, ক্যায়সা হ্যাঁয় ইয়ে বন্ধন…আঞ্জা…আআন। আঞ্জান বলে সে কি করুণ টান রে! মাত্র দশ বছর বয়েস, পাশে দেখি দিদি’র সেকি ফ্যাচফ্যাচ কান্না। একিরে! কাঁদছিস কেন দিদি? কেউ মরে গেল? আর ধুর আপদ! এইটার হয়েছে সুদ্ধু খাওয়া আর খাওয়া… এইটাও বুঝলিনা, রতিটাও এই হোটেলেই উঠেছে রে। পপকর্নের থেকে নজর সরিয়ে দেখলুম, ব্যর্থ প্রেমের শুকনো জ্বালায় ছটফট করছে রতি, আর তদুপরি বালা’র অমন রোম্যান্টিক গানখানা শ্রবণ করে রতির ধৈর্যের বাঁধ হঠাৎ এমনই ভেঙে গেল… শেষে আর প্রেমযন্তন্না সইতে না পেরে,দিদিমণি একটা ঝিনুক না শামুক গোছের কি একটা দিয়ে হাতের চেটো থেকে গ্যালগ্যাল করে রক্ত বের করতে শুরু করে দিল। দেখাতে পারবে এমনতর প্রেম তোদের হলিউড?
আজকের এই বাজারে একটা পপুলার রিলিজিয়ন দেখান তো, যেখানে কামদেব নামের একটা গোটা দেবতা আছে? হ্যাঁ, সেই আপনার আদ্যিকালের গ্রিস বা মিশর-ফিশরে থেকে থাকতে পারে। তবে অধুনালুপ্ত। ভাবা যায়? একটা আস্ত প্রেমের দেবতা, আর সেই ঠাকুরটার নামে সেই ঋগ্বেদের আমল থেকে একটা সুপারডুপার বটতলার বই – কামসূত্র। তাছাড়া জানেন তো, হিন্দু দেবদেবীর হাতে ব্যাপক কিছু আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনিসন না থাকলে মানায় না, আর এদিকে দেখুন, আমাদের কামদেবের হাতে আর্মস বলতে একটা একটা নিরীহ ধনুক আর একটা ফুলের তীর! শুনলেই সেই শান্তিনিকেতনের স্টুডেন্টদের কথা মনে পরবে। বলে, অ্যাই গরু… তুই এখান থেকে ভাগ… নইলে তোকে এখুনি একটা ফুল ছুঁড়ে মারব। অবশ্য আজবাজে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কামদেব ঠাকুর করবেনই বা কি? কিসের দরকার? কোনো অসুরফসুর আক্রমণ করতে এলেই, তাঁকে দুটো ইনোভেটিভ পজিশন দেখিয়ে দিয়ে, অসুরের গালে ফ্রিতে একটা চকাস কিসি… ব্যাস সে তুমি মূর্তিমান অসুরই হও বা ওসামা-বিন-লাদেন, কামদেবের কিসির কাছে হয়ে যাবে একলহমায় জব্দ। আর এদিকে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ? ইগনোর করতে পারবেন তাঁকে? এখনও এই বয়েসেও, বউয়ের দুটো সুন্দরী বান্ধবী ফান্ধবীর সাথে একটার বেশী দুটো কথা বললেই, ভয় হয় কোত্থেকে মা বুঝি আবার দৌড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এসে বলবে, বাবু, তোমার লেখাপড়া নেই? মানসম্মান নেই? ভর সন্ধ্যেবেলায় একদম কলির কেষ্টঠাকুর সেজে এখানে বসে আছো? বুঝতেই পারছেন আমাদের কেষ্টঠাকুরের সুনামটা? সুতরাং এই হচ্ছে গিয়ে দেশের আর দশের ওভারঅল কনটেক্সট।
একটা টাইমে ছিল, প্রেম মানেই নির্ঘাত পরিবার। ফ্যামিলি কামস ফার্স্ট! আর ওই সেই পোস্ট ইন্ডিপেন্ডেন্স আমল… মানেই বুঝে নিতে হবে, ছেলেটি প্যাংলা, তার সামনের দিকের চুলটা একটা ফুলকপির সিঙ্গারার মতন, ঘুমোতে যাওয়ার সময়েও ধুতি আর ময়লা শার্ট পরে থাকে সে! কোনদিন গ্রামের ইশকুলে সেকেন্ড হয়নি… হেডমাস্টারমশায় একবার পা ধরিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন বৎস আইএএস হইয়ো। কিন্তু সেসব না করে, কলকাতার বুকে একটা সামান্য টাইপিস্টের চাকরি পাওয়ার পর কেশো দুঃস্থ মা, সারাবছর আলোয়ান গায়ে জড়ানো একপিস জ্যাঠাবাবু, একটা বিধবা পিসী, চার চারটে দিদি, তিনটে নিজের হাঁটুর বয়েসী ভাই আর দুই আইবুড়ো বোনের দেখভাল করতে গিয়ে সারাজীবন সে পেলই না হেডমাস্টারকে শ্বশুর হিসেবে… আই মিন সুচিত্রা সেন’কে। কি ভয়ানক আত্মত্যাগ মাইরি… আরে ওই ত্যাগটাই তো আসল রোম্যান্স রে পাগলা, ওটাই তো আসল ইন্ডিয়ান প্রেম!
নগণ্য থেকে নগন্যতম হয়ে যাওয়ার মধ্যেই ছিল প্রেম। আর এখনও তাই আছে। নইলে, পাড়ার টিমের ডাকসাইটে রাইট-আউট নারান’দা বইমেলায় ঢুকে, তুলি’র কাঁধ থেকে ওর কোচিং’এর ব্যাগটা নিয়ে নীরবে ঝুলিয়ে নেয় নিজের কাঁধে? উফফ! তুলিটা বড্ড ছড়বড়ে কিনা, কোথায় রাখতে যে কোথায় রাখবে পড়ার ব্যাগটা! আজ বরং একটু ফ্রী হয়ে ঘুরুক মেয়েটা, মেলার মাঠে। ওই নীরবতাতেই, ওই সংযমেই লুকিয়ে আছে নারানের প্রেম। জানেন, মল্লিকদের ছোট ছেলেটা নারানকে অফার করেছিল। তিনতিন বার – ছাড়তো নারান তোর বিকেলের প্রাকটিস, ভারী তো মোহনবাগান ডাকবে তোকে… চ’… গাড়ীটা নিয়ে একদিন ডায়মণ্ড হারবার মেরে আসি! বিকেলের আগেই কাজকম্ম সেরে ব্যাক! রাজী হয়নি নারান… বালাই ষাট, ফুটবলটাকে সত্যি ভালবাসে নারান… তবে তার চেয়েও আরও বেশী ভালবাসে তুলিকে! আরে গুরু! এমনও তো হয়ে যেতে পারে, নারানটা মোহনবাগানে চান্স পেয়ে গেল, আর তুলির মাতাল কাকাটা তুলিকে বলল, যা তুলি যা… জি’লে আপনি জিন্দেগী! গোওওওওল…।
Leave a reply to Mahua banerjee Cancel reply