হাতে রইল পেনসিল • ১

কি সব্বোনাশ! টিভি’তে সুব্রমন্যম স্বামী আবারও বুক চিতিয়ে বললেন, ফাইনান্স মিনিস্টার’টা কিস্যু বোঝেনা… ওঁকে মানে স্বামীকে মিনিস্টার বানিয়ে দিলে, একটা দিনও নাকি আর অপেক্ষা নয়। সেদিন বিকেলেই পার্সোনাল ইনকাম ট্যাক্স ফ্যাক্স সব তুলে দেবেন। শপথগ্রহণ করে আপিসে ঢুকে, রেভিনিউ সেক্রেটারিকে একটা মারকাটারি অর্ডার দেবেন, যাও’তো খোকন, চট করে যাও গিয়ে, ব্যাম্বু ভিলায় একটা বৃহৎ তালা মেরে দিয়ে এসো তো দেখি! তা স্যার, আপনি তো গলার শির ফুলিয়ে বলছেন অনেকদিন থেকেই। কিছু না হলেও, বছর পাঁচ-সাত তো হেসেখেলে হবেই। আর আমাদেরকেও দেখুন, রোজই ভ্যাবলার মতন শুনছি কান খাড়া করে… অঙ্ক কষে ভাবছি, ঈশ মন্দ হয়না কিন্তু, স্বামীর কথা ফলে গেলে, মাস গেলে হাতে হয়ত বেশ কয়েকটা টাকা বাড়ে। সেই শুনে, গোঁসাই সমেত মিডিয়ার বাকী পাখোয়াজ দাদাদিদিরা ইয়াব্বড় প্যানেল ফ্যানেল বানিয়ে রইরই করে নিজেরাই চিল্লিয়ে মাত করছে। বলছে, ইনকাম ট্যাক্স ইজ আ বার্ডেন অন কমন মেন অর নট, টুনাইট দ্য নেশন ওয়ান্টস টু নো! কি না… আজকের এক্সক্লুসিভ কভারেজ…

মনে পড়ে? চোদ্দ সালের গোড়ার দিকে আচ্ছে দিনের ভরসায় দিক্বিদিকে শোনা যাচ্ছিল, স্বয়ং মোদী হাতদুটো ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সভায় সভায় বলে বেড়াচ্ছেন, ইয়ে দেশ’কা ইনকাম ট্যাক্স সিস্টেম যো হ্যাঁয়, উয়ো এক সামান্য দেশবাসী’কে উপর এক সরাসর বোঝ হ্যাঁয়! হামে উসকো সিম্পল বানানা হ্যাঁয়, বহুত সারে রিফর্ম লানা হ্যাঁয়…। সব্বাই বলতো… ভাই ঠিকই বলছে’তো রে মানুষটা। আর কি ডেঞ্জার আইন রে বাবা! বিগত পঁচিশ বছরে আইনটাকে ফলো করে দেখা গেছে… মাঝে এমন কোন একটা বছর নেই, যে যেখানে কোন মেগা অ্যামেন্ডমেন্ট নেই! প্রতিটা বছর বাজেটে ইনকাম ট্যাক্স নিয়ে কিছু না কিছু একটা চমক থাকবেই থাকবে! কোন বছরে যদি দেখা গেল, ফাইনান্স মিনিস্টার খুব জনদরদী টাইপের লোক… বাজেটে বড়লোকদের ট্যাক্স অ্যায়সা বাড়িয়ে দিয়ে, গরীবদের হালকা দুটো ছাড় দিলেন। আবার কোন একটা বছরে চুপিসারে টুক করে বসিয়ে দিলেন একটা দু পারসেন্টের এডুকেশন সেস। পরের বারে দেখা গেল, একি রে ভাই? এতো আরও ডেঞ্জার কেস! চোরাগোপ্তা একটা চার পারসেন্টের মিহি করে সারচার্জ! কোনো একটা বছরে হাসিবিহীন মুখে, স্ট্যান্ডার্ড ডিডাক্সন ব্যাপারটা বেমালুম হটিয়ে দিলেন, আবার কোনো বছরে গুরুত্ব দিলেন ফোর্সড সেভিংসের উপর! দেশবাসী তোমরা সবাই সেভিং করো, ইনভেস্ট করো, পয়সা জমাও আর ট্যাক্সে মোটা টাকার ছাড় নাও! সত্যি কথা বলতে কি, সেই বুক ভারী করা সাসপেন্সের ট্র্যাডিশন কিন্তু এখনও চলেছে।

একশো পঁচিশ কোটির দেশের মধ্যে ট্যাক্স দেয়, বা পার্সোনাল ট্যাক্সের আওতায় আসবে ম্যাক্সিমাম পাঁচ-ছ কোটি মানুষ, তার বেশী নয়! স্বামীর হিসেব মতন, পার্সোনাল ট্যাক্স তো পাওয়া যায় দু-আড়াই লক্ষ কোটির মতন। সেই টাকাটা যদি দেশের আয় ব্যয়ের হিসেব থেকে এক্কেবারে বাদ দেওয়া যায়, তবে সেই টাকাটাই তো থেকে যাবে মানুষের হাতে। কি মজা বলুন তো, দেশ কি তামাম নাগরিক হাসেগা, খেলেগা, আরও বেশী করে ব্যাঙ্কমে জমায়গা, ইনভেস্ট করেগা, খরচা ভি কারেগা আরও বেশি বেশী করে। রেস্টুরেন্ট মে খানা খায়গা। মোট কথা কমলকা ফুল খিলেগা… গোটা দেশের রেভিনিউ বাড়বে, আর দরকার পড়লে, অন্য রকমের কিছু এক্সপেন্স ট্যাক্স ফ্যাক্স ব্যবস্থা করে, সেটাকে ঠিক ম্যানেজ করে নিতে হবে। সেন্টার খুশ, ষ্টেট ভি খুশ, মনকাড়া প্রপোজাল। সক্কলে ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন আর ভাজপা’র মার্গ–দর্শক সিনিয়ররা চোয়াল চেপে মন্তব্য দিলেন, বিজয়ী ভব… যা করছিস কর, এটুকু শুধু খেয়াল রাখিস, এইসব যেন আবার টিপিক্যাল বড়লোকদের ধামাধরা ব্যাপার না হয়ে দাঁড়ায়! এমনিই তো আমাদের ফ্যসিস্ত ফ্যসিস্ট করে যা বদনাম, আর দেখছিসই তো নিন্দুকদের বাজার! এতগুলো মিডিয়া হাঁহাঁ করে গিলতে আসছে সারাটাদিন! গরম গরম প্রশ্ন করে পেছন ছুবলে হালকা করে দেবে।

কিন্তু পার্সোনাল ইনকাম ট্যাক্সের আচ্ছে দিন তো আর এলোনা! শুধরোনো না কিছুই… প্রতি বছরই শোনা যায়, আসছে, সে আসছে, শুনেছো কি তার পদধ্বনি! বরং সকলকে চমকে দিয়ে গতবারে আর এবারে বেশ খানিকটা কমে গেল কর্পোরেটের ট্যাক্স! কি না, ট্যাক্স টেররিজম নামফাম দিয়ে খুব লবি করেছিলেন ওঁরা… তাছাড়া এটা তো বুঝতেই হবে, ওঁদের হাতে টাকাটা বাড়িয়ে দিলে, ওঁরাই নতুন নতুন চাকরি দেবে, ইঙ্ক্রিমেন্ট দিয়ে ভরিয়ে দেবে বছরে-বছরে… সব শুনে লোকাল ট্রেনে ঘোষবাবু বোসবাবুকে বাঁকা গলায় বললেন, বোসদা আজকের আনন্দবাজারটা পড়েছেন? আমাকে আপনাকে বাদ দিয়ে, টাটা বিড়লা আম্বানি আদানিদের এসে গেল কিনা আচ্ছে দিন! ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে থেমেছে… শিয়ালদা স্টেশনের সকালের ভিড়টা একবার থমকে দাঁড়ালো। ঘোষদা বিরক্তির থুতুটা ফেলতে গিয়েও আর ফেললেননা, স্বচ্ছ ভারতের কথা ভেবে! আর কোত্থেকে যেন কুমার শানু আবার নতুন করে গেয়ে উঠলেন, তুমি এলেনা, কেন এলেনা! ভাঙা ভাঙা মন আমার কি পেল, এই শ্রাবণেরও সন্ধ্যাবেলা!

4 responses to “হাতে রইল পেনসিল • ১”

  1. খুব ভাল লাগল। এটা কি নতুন series এর সুচনা…

    Like

    1. ইয়েস কৌশিক… নতুন ধরলাম গতকাল বিকেল থেকে… আসলে একটু সর্দিগর্মি হয়েছে! বাড়ীতে বসে আছি কিনা… আজবাজে প্রশ্নের ভিড় করে মাথায়ে! অগত্যা

      Like

  2. Khub bhalo laglo. Aro chai . Aro lekho tumi . Khub bhslo lekho tumi . Tomar lekha bangla o banlar baireo choriye poruk ei kamona kori.

    Like

  3. Durdhorsho, durdanto, moner kotha ta bolle to , aro lekho

    Like

Leave a reply to Kausik Sengupta Cancel reply