ভ্রমণ সত্যিই মানুষের মনকে অনেক প্রসারিত করে। জম্মু থেকে শ্রীনগর না সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার সময়ে বাসটা যখন ক্রমশ উপরের দিকে চড়াই ওঠে, তখন বাসের সকলের কোরাস গান অজান্তেই থেমে যায়। নিচে দেখতে পাওয়া যায় একটা নদী বা ভয়ঙ্কর সুন্দর উপত্যকা, তখন আমার কেন জানিনা ভগবানে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। আমি সংসারী মানুষ, একলা কোনদিন বেড়াতে যাইনি কোথাও। অফিসের কাজে একলা বিদেশভ্রমন করলেও, কোন না কোন অছিলায় হোটেলেই থেকে গিয়েছি শনি- রবিবার! শৈশবে বাবা – মায়ের হাত ধরে ট্রেনে চেপে বেরিয়ে পরতাম সহজেই, কিন্তু এখন আর তা হয়ে ওঠেনা।
সে সময় আমাদের বাস পুণেতে। আর পালকি বুঝি সদ্য ইশকুলে যাওয়া শুরু করেছে। এমনিতেই সে, ওই তিন – সাড়ে তিন বছর বয়সেই, চুপচাপ ছিল বেশিরকমের। কথাবার্তা একেবারে বলতনা বললেই চলে। কেবলমাত্র কখনও জরুরি কিছু হলেই। আর তার উপরে তার নতুন ইশকুলের ইংরিজী-বলা আন্টি আর হিন্দী-বলা মাসি, এই দুয়ের দুরূহ সমাহারে পালকির শিশুমনে যে একটা বেমক্কা রকমের চাপ পড়েছিল, সে বোঝা গিয়েছিল বেশ। রোজকার ইশকুল থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক হতে, সময় নিতো সে খানিকটা। ইশকুলের বড় গেটটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে, চেনা কাউকে দেখেই, একটা হালকা কৃশ হাসি। ওয়াটার বটলে চুমুক দিতে দিতে, যদি একটা আধো কথা বেরিয়ে পরে তার মুখ থেকে, সেই আগ্রহেই অফিস কেটে, সপ্তাহে এক-দুই দিন যাওয়া শুরু করেছিলাম ঠিক তার ছুটির সময়টাতে।
সেইরকমই একদিন বাড়ি ফিরে আসার সময়ে ক্লান্ত গলায় মেয়ে আমার বলে –
– “বাবা, এই জায়গাটার নাম কি?”
– জবাবে বললাম, “এই জায়গাটার নাম পুণে, সোনা। তুমি জানো না?”
– সে বলে, “হ্যাঁ, কিন্তু আমরা তো পুণেতে থাকি।” আবার খানিক নীরবতার পরে সে শুধোয় –
– “এটা পুণে, বাবা? এটা তো স্কুল। পুণে একটা খুব বড় জায়গা, বাবা? মস্ত বড়?”
– আমি বলি “তোমার কলকাতা মনে নেই?”
– গম্ভীর স্বরে সে জবাব দেয়, “না। পুণে কি কলকাতার মতন বড় জায়গা, বাবা?”
তারপরের কথোপকথন খেয়াল পরছেনা ঠিক। মেয়ের অনুসন্ধিৎসা আর বাপের প্রত্যুত্তর, দুয়ে মিলে কে কত’টা একে অন্যকে বুঝেছিল, সে আজ মনে পরছেনা। বাবার জবাব হয়ত ন্যায্য মেনেই, ঘাড় নেড়ে সে গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখা শুরু করেছিল। হয়ত সেদিনই প্রথম সে বুঝল, পৃথিবীটা কত্ত বড়। ইশকুল, বাড়ি দুটোই নাকি তার পুণেতে। তার ছোট্ট দুটো চোখ দিয়ে সামনে যেটুকু রাস্তা দেখা যাচ্ছে, তার চাইতে ঢের বেশি বড় এই দুনিয়াটা।
শৈশবে আমার ম্যাপ দেখতে বেশ লাগত। তখন সব বাঙালী বাড়িতেই, অবশ্য করেই থাকত বইমেলার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে কেনা একটা ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস। আমার দিদিরও ছিল আর পরবর্তী কালে আমার নিজেরও। সে বইটিতে শুরুর দিকের সব মানচিত্র আর শেষের দিকে অ্যালফাবেটিক্যাল অর্ডারে লেখা থাকত দেশের নাম, রাজধানী আর জনসংখ্যা গোছের অনেক কিছু ভূগোলের তথ্য। আর দেশের নামের অন্ত্যাক্ষর দিয়ে একটা জমাটি খেলা চালু ছিল বাঙালীদের মধ্যে। ট্রেনে চাপলেই সে খেলা খেলা হত নিয়ম করে। এখনও আছে অবশ্য। এই যেমন, কেউ এ দিয়ে ‘আমেরিকা’ বললে, পরবর্তী জনকে ‘কে’ দিয়ে ‘কানপুর’ বা ‘কেরালা’ বলতে হবে। সে খেলায় হারতে হয়নি কোনদিনই। দিদির বন্ধুরা বা জ্যেষ্ঠ অনেকেই তো বেশ বিস্মিত হয়ে যেতেন। ‘জে’ এর ষ্টক ফুরিয়ে গিয়ে যখন সকলে ‘যাদবপুর যোধপুর পার্কে’ গিয়ে ঠেকেছে, তখন দুম করে, নাক টিপলে দুধ বেরোনো বালক যদি ‘জর্ডন’ বা ‘জামাইকা’ বলে দেয়, তখন তো সকলের অবাক হওয়ারই কথা।
আমাদের মেয়েটি কিন্তু কথাবার্তা এখনও বেশ কমই বলে। ওই কেবলমাত্র জরুরি কিছু হলেই। তবে ম্যাপ দেখতে যে তার যথেষ্ট ঝোঁক, সে তার ওই দেশের নামের খেলা দেখলেই বোঝা যায়। তবে সে এখন সাবালিকা। বাপের সহায়তা ছাড়াই এতদিনে বুঝতেও হয়ত পেরে গিয়েছে, পৃথিবীটা সত্যিই খুব বড়। মস্ত বড়। আজ তাকে এমন একটা দেশের নাম দিতে হবে, যেটার কিনা শুরু হবে ‘ই’ দিয়ে। ধরা যাক খেলাটা শুরু করে আমি বললাম, “ইংল্যান্ড”?
চলবে…
Leave a comment