হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২ – প্রস্তুতি

ভগবানের ইচ্ছেয় আজকাল জামাকাপড়ের অভাব বিশেষ কারো একটা নেই। কেবল জামাকাপড় কেন, ছাব্বিশে মে পরবর্তী, ‘আচ্ছে-দিনের’ বাজারে তো, মধ্যবিত্তেরই নাকি আগামী পাঁচ বছরেই, হাতিশালে হাতি আর ঘোড়াশালে ঘোড়া। অতএব রোজগার যখন আগামী পাঁচ বছরে হয়ে যাবে অনায়াসে, করে নাও যেমন খুশি খরচ। ঘুরতে ফিরতে, সকাল-সন্ধ্যায়ে, করে নাও সস্তায়ে সওদা। তাছাড়া মোটামুটি বছরভর সুলভ দামেই হালফিলের পোশাক আকছার পাওয়া যাচ্ছে শপিং-মলে। বরং শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, মানুষের নাকি আগামী পাঁচ বছরে ভয়ানক সমস্যা হতে চলেছে, কাপড়জামা রাখার আলমারির।

জানি আশাপ্রদ একটা আগামীকালের আশায়ে বাজারে সবই সস্তা, সবকিছুতেই ফিফটি পারসেন্টের উপরে ছাড়… কিন্তু তাই বলে চারজনের নামে চারটে পৃথক ছাতা আর চারখানা ক্যাটক্যাটে রঙিন রেনজ্যাকেট? এ’যেন কল্পনার বাইরে! ছেলেবেলায়ে ইশকুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে, ভারী বর্ষাটর্শা হলে, ‘থ্যাঙ্ক ইয়উ কাকু’ আর ‘প্লিজ দাদা’ বলে টুক করে ঢুকে পরা যেতো অচেনা লোকের ছাতার তলায়ে। আর হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হলে তো মাথায়ে উপরে ডাকব্যাকের স্কুলব্যাগ আর তাতে অতিরিক্ত সতর্কতায়ে জড়ানো থাকতো একটা প্লাস্টিক। তাছাড়া কলকাতার বর্ষা তো কোন ছার, খোদ চেরাপুঞ্জি মার্কা মুম্বইয়ের বৃষ্টিতেও ছাতার আশ্রয় পাওয়া হয়নি কোনদিন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার গিন্নিটি নাকি কোত্থেকে শুনে এসেছেন, বিলেতের বৃষ্টি নাকি মারাত্মক রকমের ন্যাকা আর অভিমানী। সেদেশে সারাদিনই নাকি আকাশের মুখভার আর ক্ষণে-তুষ্ট ক্ষণে-রুষ্ট ধরনের মেয়েলী ব্যবহার। অনেকটা যেন তাঁরই মতন। যতই তাঁকে বোঝানো হচ্ছে, আরে দুম করে বৃষ্টি এসে গেলে, সেরকম বুঝলে, নাহয় দুপাঁচ মিনিট বেকার স্ট্রীটের বা পিকাডিলির কোন পানশালায়ে ঢুকে পড়া যাবে। কিন্তু তিনি সুরায় নারাজ, দুনিয়ার ঝোঁক তখন তাঁর ছাতার দিকে। অগত্যা কি আর করা যাবে?

তা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছাতা আর রেনজ্যাকেট তো হল। কিন্তু সেগুলি এবার বহন করা হবে কিভাবে? জিনিষগুলো সুটকেসে রেখে দেওয়ার জন্যে তো আর কেনা নয়। অচিরাৎ দৌড়োও আবার শপিংমলে… কিনে ফেলো, কাঁধে ঝুলোনোর আধুনিক ব্যাগপ্যাক। সেই উনিশশো উননব্বই সালের পর এই প্রথম কাঁধে ব্যাগ নিতে হবে। কালচে নীল রঙের ফাঁকা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে আয়নার সামনে নিজেকে একবার গোপনে দেখেও নেওয়া হল। মন্দ লাগছেনা কিন্তু… কেবল কেমন একটা, নিজেকে তেঞ্জিং নোরগের মতন ঠেকল।

আর তারপর? তারপরে শুরু অন্য বিতর্ক। চারটে ছাতায়ে যদিবা দিব্যি সুরাহা হল বৃষ্টির, বিলেতে সন্ধ্যের দিকটাতে, ঝুপ করে যদি শুরু হয়ে যায় শৈত্যপ্রবাহ? যদি দুম করে সর্দিগর্মি লেগে গিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে বেঘোরে প্রাণটি যায় দুর্বলচিত্ত চাট্টি বাঙালীর? তবে কপালজোরে সেবেলায় কিন্তু নিজের জন্য খরচা হলনা বিশেষ। এক সুহৃৎ, তাঁর যাবতীয় হুগো-বস, পোলো আর গুচির সোয়েটার জ্যাকেটের ভাণ্ডার উপুড় করে দিলেন, আমার বেড়াতে যাওয়ার কথা জেনেই। আর বিশ সেকেন্ড দমবন্ধ রেখে, ভুঁড়িটা যথাসম্ভব সংকোচন করে, ট্রায়াল দিয়ে, নিয়েও নিলাম তাঁর থেকে একটা দুটো বেছে। কিন্তু অন্যদিকে ছাতা ছাড়াও কেনাকাটা হয়ে চলেছে নিরন্তর। কন্যাদ্বয়ের নতুন জামা, নতুন জুতো। মায় নতুন দুটি সুটকেস পর্যন্ত।

আর গিন্নির কথা না হয় নাই বা বললাম এখানে। মোট নয়রাত্তির দশদিন বিলেত বেড়ানোর নামে কোনো স্নেহময়ী মা, যে মাত্র দু-তিন দিনেই, তিনটি ওয়েবসাইট আর চারটি শপিংমল ঘেঁটে যজ্ঞিবাড়ীর কেনাকাটা করে ফেলতে পারেন আদরের দুই আত্মজার জন্যে, তা কিন্তু না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। তবে নাকি লোকমুখে শোনা যাচ্ছে, তাঁর নিজের বপুর সাইজও নাকি ওই মেয়েদেরই কাছাকাছি। ওই এক দুই সুতোর হেরফের হলেও হতে পারে। মায় জুতোর মাপও নাকি তাঁর অভিন্ন।

যাক সে কথা! নিন্দুকেরা তো কত কি বলেই চলেছে অবিরত! এদিকে রওনা দেওয়ার একদিন আগেই বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে নেওয়া কমপ্লিট। আর, ভুলে যাওয়ার আগেই কিন্তু ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে, আমার জীবনের প্রথম কেনা ওই কালো ফোল্ডিং ছাতাখানি আর নীল ব্যাগপ্যাকটা। (ওটিকে কাঁধে নেওয়ার আর দুঃসাহস হলনা কিনা, বিমানবন্দরে আপিসের চেনা লোকের সাথে দৈবাৎ দেখা হয় যায় যদি!) ইতিমধ্যে পালকিকে ভিড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ট্র্যাভেল এজেন্ট কোম্পানির আনাড়ি মেয়েটির সাথে। তবে টিকিট ভিসা হোটেল ভাউচার সবই মোটামুটি তৈরি এখন!

কেবল, বাইরে থেকে যেন এখুনি টেনিদা ক্যাবলা হাবুল ডাকবে! কিরে প্যালা? রেডি? আর আমিও ছোটবোন আধুলির বিনুনিটা একটু টেনে দিয়েই ছুট লাগিয়ে বলব, “এইতো আসছি”।

চলবে…

One response to “হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২ – প্রস্তুতি”

  1. Fatafati…as usual

    Like

Leave a comment