জানিস ভাই # ৪

জানিস ভাই # ৪

শোননা ভাই, ফেসবুক আছে নাকি রে তোর? না, এখন কাউকে বলিস না ভাই… তোকে বলেই বলছি, কালকে রাতে না, একটা নিলাম। বহুতদিন ধরে প্ল্যানে ছিলাম রে ভাই। বহুত ভেঁজেছি। কিন্তু শালা নেওয়া আর হয়ে উঠছিলনা। কিছু তেমন করিনি অবশ্য এখনও অবধি। তবে ফর্ম ফিলাপ-টিলাপ যা কিছু সব চেয়েছিল, ও সব রাতেই ফাইনাল করে দিলাম রে ভাই। ওই সেদিন ফ্যান্সি থেকে নতুন একটা টাচফোন নিলাম না? হতে পারে ভাই মালটা সস্তার। কিন্তু হেবি জিনিষ রে। ওই ফোনটাতেই তো মিতুলকে দিয়ে ফেসবুকের সবকিছু ভর্তিফত্তি করলাম। আর কি জলদি জলদি হয়ে গেলো রে ভাই। খুব বেশী হবে তো, তোর ওই দশ মিনিট। লাস্টে মিতুল কিনা বলে, নে দাদা – এবার তোর একটা সিঙ্গিল পিকচার লাগা – প্রোফাইল পিক। আরে ভাই, আমার আবার সে’রম একা’র ছবি কোথায় রে। কেউ বাপের জন্মে, কোনোদিন তুলেছে নাকি আমার একার ছবি? তারপরে, সেই রাতেই খাওয়া-দাওয়া সেরে, একটা জামা গায়ে দিয়ে, ব্ল্যাকচশমাটা চোখে লাগিয়ে, ওই ফোনের দিয়েই না, আমার একটা হেবি ছবি নিল মিতুল। তারপরে বলে কি জানিস ভাই? নে দাদা, তোরও নিজের ফেসবুক হয়ে গেলো। যা, তুই… এবার বিন্দাস অনলাইন হয়ে ওড়! তারপর ঘরে যাওয়ার সময়, চোখ টিপে বলে কি, “আর কি… ফাস্টেই এবার বুলন’দি কে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দে।” তুই’ই বল ভাই, বুলন’টা কি ভাববে আমাকে? মিতুলটা না, পাড়ায়ে আমার প্রেস্টিজ’টাও বোঝেনা।

মিতুলের মুখে না, ‘অনলাইন’ শুনে না, ভাই, খুব ভাল লাগছিল রে ভাই। বললে বিশ্বাস করবিনা ভাই, গত ক’মাস ধরে না, শুধু শুনে গেছি ক্লাবে সবার কাছে। কিন্তু কি জানিস ভাই, গরীব ঘরের ছেলে তো… সাহসটা ঠিক করে উঠতে পারিনি। তারপর গত শুক্রবার, ক্লাবে বাবুসোনা বলে কি, ও ভাইয়া’দা, তুমি একটা নাও না গো। ফেসবুক। আমি ভাই, প্রথমটা অত গা করিনি রে ভাই। তারপর বাড়ী ফিরে ভাবলাম, শালা আঁধার কার্ডটা ছাড়া, কিচ্ছুই তো তেমনি করে করলাম না রে ভাই, নিজের জন্য। শালা ফ্রী’তে ফেসবুক দিচ্ছে, একটা নিয়ে রাখলে লাভ কিছু না হোক, লোকসান তো কিছু নেই রে ভাই। আরে কিছু না হলে, টাইম তো পাস হবে রে শালা। সারাদিন আর তোদের মতন কাজ কি আমার ভাই?

শোন না ভাই, বুলন’কে সাথে একবার কথা হলে বলিস তো ছোট্ট করে। এই ভাইয়া’দা ফেসবুক নিয়েছে-ফিয়েছে, এসব কিছু বলতে হবেনা। ওই তোদের সঙ্গে তো আজকাল একসাথে কোচিং-টোচিং যায়, তাই বলছিলাম রে ভাই। জাস্ট সুযোগ বুঝে একবার কথা তুলে দেখবি ভাই! তারপরে কোন ভাল সিগন্যাল ফিগন্যাল পেলে বলিস আমায়। মিতুল কে দিয়ে, একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেব।

তবে, তোকে যেমনটা করি, মিতুলটাকে আমি এক্কেবারে ভরসা করিনা রে ভাই। সেই গতবারে, ঠাকুর ভাসানের পর, ওই ব্যাটা মিতুলটার কথা শুনে, বুলনের পাশের চেয়ারটায়ে গিয়ে না, যেমনি বসেছি, শালা ফটাক’সে উঠে চলে গেলো রে ভাই। আপন খুড়তুতো বোন। সেই কারণে মিতুলটা’কে তেমনি করে হুল-তাল কিছু দেইনি। নয়ত দিতাম ধরে কানের গোড়ায়। দিমাগ না তখন আমার ফুল সর্ট হয়ে গেছিল রে ভাই। আর কি তোকে বলব ভাই, সেই কেএলপিডি সিন দেখে, পরের দিন থেকে না, ক্লাবে সবার আমাকে নিয়ে সেকি ফুল্টু মাজাকি! তুইও ভাই। মনে আছে? আমাকে বললি, কি গো ভাইয়া’দা, পুজোর চারদিন কি সে’রম টাইম পাচ্ছিলেনা? শেষে সেয়ানাপন্থী দেখালে কিনা ভাসানের পর! কি করব বল তো ভাই? পুজোর ওই চারটে দিন আমাকেই তো সব’টা সামলাতে হয়। বাকী তোমরা সব সেয়ানাগুলো তো সব বুলনদের গ্রুপের পেছন-পেছন পোঁ ধরেধরে ঘুরবে। আর বাকী যত কাজকম্ম, সব শালা এসে পরবে এই ভাইয়ার ঘাড়ে। সে ব্যানার্জি বাড়ি থেকে ঠাকুরের ভোগ নিয়ে আসা বল, আর সন্ধ্যেবেলা নাটকের প্রম্পটিং, সবই তো সেই নামাতে হবে আমাকেই। সেটা তো আর কেউ না জানলেও, তোদের বুলনদি’র তো সামান্য এটুকু জানা উচিত। সেই তো ছোটবেলার দিয়ে দেখছে আমায়।

আচ্ছা ভাই। আমাকে একটা ছোট্ট করে খবর দে ভাই। যদি ইন কেস, আমি ফেসবুকে, বুলনের ফ্রেন্ড হয়ে যাই, মানে যদি তুই কিছু একটা পাকা করে দিতে পারিস, তবে কি ভাই ক্লাবের কেউ ওপেন জানতে পারবে? যে আমি বুলনের ফেসবুকে আছি? মানে বুলনের ওই সব নেকী বন্ধুগুলো, মানে ওই যে কাকলি, সুমি ওরা? ওরা কি সব আমাদেরটা জেনে যাবে রে ভাই?

না রে ভাই, এমনি করে হাসিস না ভাই। আমি না, কি জানিস তো… বুলনের ব্যাপারটা না, কাউকেই তেমনি করে জানতে দিতে চাইনা। কি হবে বল বেকার? খেজুর করবে আবার সব কটা মিলে। আমার তো সবচাইতে ভয় ভাই ওই ব্যানার্জিদের ছোট ছেলেটাকে। কি যেন ভাই, শুভাশিস না কি যেন নাম মালটার! যাদবপুরে না কোথায় জানি, একটা কি পড়ে! হেবি নাকি রেসাল্ট করেছিল হাই সেকেন্ডারি তে। একদম লাল্টু মাল। ফুল ছক্কা একটা। তবে লাল্টু হলে কি হবে ভাই, আমার কিন্তু কেন জানিনা, মনে হয় তোদের বুলনদিটার ওপর না, মালটার একটা চাপা নজর আছে। আর বুলনটাও পারে মাইরি ভাই। কি দরকার তোর অমনি শুভো-শুভো করে সবার সামনে প্যান্ডেলে ন্যাকামি করার। শালা যত ফালতু ছেনালি। আমি নোট করেছিলাম রে ভাই, সেই তোদের নাটকটার রিহার্সালের টাইম থেকেই। তুমি শালা ক্লাবের মেম্বার হবেনা, পাড়ার ভালমন্দে তুমি আসবেনা, গা বাঁচিয়ে চলবে, তবু কেন নাটকে মেনপার্ট নেবে তুমি? এই’তো এই গেল-সপ্তায়েই তো, এই তোদের ভাইয়া’দা দিনরাত্তি এক করে দিলো ভাঙ্গরে। শিবুর বাবার জন্য। ব্লাড লাগল বোতল বোতল। ভবেন মিত্র’র চিঠি নিয়ে সেই আরজিকর থেকে ব্লাড নিয়ে আসা। এসেছিল শালা তোদের শুভ?

কি জানিস ভাই? খুব ভয় লাগে রে। বুলনটা’কে গিয়ে স্ট্রেট আমি তো, বলে দিতেই পারি। পাড়ার মধ্যে, সে হিম্মত’টা না, আমার আছে। কিন্তু কেসটা যদি আবার ওই সন্টা’দার মতন হয়ে যায়, তবে কিন্তু পাড়া ছাড়া হয়ে যাব রে ভাই। সে জিনিষ নেওয়া যাবেনা। দ্যাখনা শালা সন্টাদাটা’কে। কেন যে গেছিল শালা, চন্দ্রা’দিটার সাথে বেকার খিল্লি করতে। দিলো তো দেখলি, ডাক্তারবাবু আর ডাক্তারবাবু ঢ্যামনা বউটা। একদম ঠেলে দিলো’তো হুড়কো। শালা বেচারা সন্টা’দাটা। ওই শালা ভবেন’টা ডাক্তারবাবুর কাছ দিয়ে পয়সা-ফয়সা খেয়ে, সে শালা শেষমেশ পুলিশ কেস! তারপর সে ছায়াপিসির কি কান্না রে ভাই! তারপর এখন দ্যাখ শালা চন্দ্রাদি’কে। ব্যাঙ্গালোর থেকে যখন যখন আসেনা, শুনলাম তখন নাকি প্লেনে আসে রে ভাই। আর দ্যাখ, আমাদের ক্লাবের ফাস্ট বোলার, এককালের কপিল দেব – সন্টা’দাটা। পাতা খেয়ে খেয়ে শালা ভিত্তা হয়ে গেল।

ভাই, আমি যদি ওই শুভটা’র মতন হতাম! কেমনি ভাল হত বল? সুন্দর দাড়িফাড়ি কামিয়ে, ভাল ড্রেসফেস পড়ে, ভাল কলেজে… এখন না, মনে হয়না ভাই, ভালভাবে যদি লেখাপড়াটা করতাম না, কম্পুটার ফম্পুটার শিখে একটা ব্যাঙ্গালোর বম্বেতে একটা হেবি চাকরি নিয়ে নিতাম। তখন তো ভাই, বুলন’কে তুলতে না, কোন ডানদিক বাঁদিক কেস ছিলনা। কোন বাবা, কোন মাই-কা-লাল, আটকাতে পারতোনা রে ভাই। আরাম’সে বিন্দাস সব হয়ে যেত।

কিন্তু তারই সাথে এও ভাবি রে ভাই। আমি, ছোট বাপন, বাবুসোনা… সবাই যদি বাঙ্গালোর আর ম্যাদ্রাস আর কম্পুটার মাড়াই… আমাদের ক্লাবের রেগুলার কাজটা কে সামলাবে বলত ভাই? করবে তোদের শুভ? মাঝরাত্তিরে সেদিন অংশু’র বাবার যেদিন শ্বাসকষ্ট হল রে ভাই, সেই তো তখন ক্লাবের ছেলেগুলোই যা ভরসা। সেই তো বাবুসোনা, একটা ট্যাক্সির কলার ফলার ধরে, ডেয়ারিং বাওয়াল করে থামাল ট্যাক্সিটাকে। ভোরবেলার প্লেন নেবে তোদের ন্যাকা চন্দ্রাদি… তা’সে ব্যাবস্থাও তো করে দিলাম আমরা। ভাই, আমাদের এই ফুল পাড়াটা না, একটা বিশাল বৃদ্ধাশ্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে রে। কোনো শালা তো দেখবেনা বাবা মাদের। তাই এই বুড়ো কাকু জেঠুগুলোকে নিয়ে তাই বেকার আমরা পড়ে আছি রে ভাই। মাগনা কেয়ারটেকার হয়ে। তাই তোকে বলছি রে ভাই… তুই তো পড়াশুনায়ে যথেষ্ট ভাল। পাশফাস করে ভাল চাকরিবাকরি তো পেয়েই যাবি বম্বে দিল্লী। কথাটা ভাব ভাই, হুট করে চলে যাসনা ভাই। একটু বাবা-মা’ টাকে দেখবি ভাই। একটু পাড়াটা’কে দেখবি ভাই। তোরা সবকে-সব বাইরের দেশে চলে গেলে, বেকার চাপ হয়ে যাবে রে ভাই। বৃদ্ধাশ্রম কি? এই পাড়াটা তো গোটাটা শ্মশান হয়ে যাবে রে।

যা সে সব কথা। আমার বলার কথা, আমি ছোটমুখে তোকে বললাম ভাই… তোর শোনার হলে শুনবি। তবে ভাই, যা বললাম। ফাস্টে তো, ওই ফেসবুকের ব্যাপারটা কাউকে কিন্তু কিছু বলবিনা এখন। আর সময় পেলে, বুলনটা একটু দ্যাখ। শুধু এই ক্লাবের সেবা করে গেলে, মালটা তো উঠবে বলে তো মনে হয়না। ওই তোদের ফেসবুকই যা ভরসা রে ভাই…

মুম্বই
জুন ২৪, ২০১৮

3 responses to “জানিস ভাই # ৪”

  1. Wowwww…..jus daroon…

    Like

  2. Chiradeep Mitra Avatar
    Chiradeep Mitra

    Khati kotha….ekdom shotti kotha…everything is luck…fate…destiny….we are all various shades of grey….given an opportunity….there’s a hero in each one of us!!!!!!

    Like

  3. Kakali Banerjee Avatar
    Kakali Banerjee

    এই সময়ের জরুরী কথা গুলো এতো হালকা ছন্দে বলা হচ্ছে**** অসাধারণ।আমি আসলে ঠোঙা পড়েও কাঁদি। ফলে আমার কান্না হয়তো ততো গুরুত্বপূর্ণ নয়।তা হলেও আমি জানি যা আমাকে কাঁদায় সেটা অন্যদের ও ছুঁয়ে যাবেই।

    Liked by 1 person

Leave a reply to Rumi Sinha Cancel reply