ম্যায় নিকলা গাড্ডী লেকে ২

পার্কিং স্লটে তারসেম সিংহের সঙ্গে কয়েকটা ছেলেপুলের বচসা লেগে গিয়েছে। তারসেম মনে হয় কিপটে মানুষ, পাঁচ-দশ টাকা নিয়ে বেমালুম তর্ক জুড়ে দিয়েছে পার্কিং এর কর্মচারীদের সঙ্গে। এদিকে রবিন সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে কিন্তু গায়ে মাখছেনা এসব। সে বরং আমাদের দিকে একদৃষ্টে হাসিমুখে তাকিয়ে রয়েছে। তার আতিথেয়তায় ত্রুটি নেই। তারসেমের ওই ঝগড়ার মাঝেই সে আমাকে সামান্য লাজুক গলায় জিজ্ঞেস করল আপলোগ কে লিয়ে কুছ খানা মাঙ্গাউ?

পিউ বিমান থেকে নেমে এখনও অবধি একটাও কথা বলেনি। গাড়ীতে ওঠার আগেই এদিকসেদিক তাকিয়ে ভালোরকমের হোঁচট খেয়েছে সে। ওর কল্পনায় অমৃতসর হয়ত ছিল প্রকৃত রকমের নয়নাভিরাম এক জায়গা। তাতে অবশ্য ওর দোষ তেমন নেই। আমিই বেড়াতে আসার আগে আলতুফালতু বলে গল্পের গরুকে গাছে তুলেছিলাম। তখনই জানতাম পাঞ্জাবের সৌন্দর্য নিয়ে একটু যেন বাড়াবাড়িই করে ফেলছি আমি। ঝিলম নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ সবুজ জল থেকে রুপোলী সার্ডিন মাছ বঁড়শিতে গেঁথে বউকে ভেজে খাইয়ে দেব, ফটরফটর করে বলা সে সব আজগুবি গল্প যে সব মামুলি মিথ্যে কথা, অবাস্তব এবং মেকি, সেটা কি পিউ জানেনা? নাকি অ্যাদ্দিন ধরে আজেবাজে গপ্পো শুনেশুনে পিউ হয়তো ভেবেই রেখেছিল বিমানবন্দরে পৌঁছেই দেখতে পাওয়া যাবে দুর্লভ এক পিকচার পোস্টকার্ড। ঢালাও সর্ষের ক্ষেত, অদূরেই তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে পাঁচখানা নদী আর অপরাহ্ণের সূর্যের আলোকছটায় স্বর্ণমন্দির চকচক করছে পাশে। আকাশে মেঘ দেখা যাচ্ছে পেঁজাপেঁজা আর সর্ষেক্ষেতের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে সিমরণের বাপ অমরিশ পুরী সাদা কুর্তাপায়জামা পরে কবুতরকে দানা খাওয়াচ্ছে। আর পাশে দাঁড়িয়ে মিচকে শাহ্‌রুখ খানটা কাজলের সাথে প্রেম করার প্ল্যান ভাঁজছে। বেচারি পিউ! কোথায় ম্যাজিক? কোথায় দুর্ধর্ষ সিনেম্যাটিক সিনারি? কোথায় সর্ষের ক্ষেত? এ যেন এক অসচ্ছল শহরের এক নিস্তব্ধ অপরাহ্ন। সকাল থেকে অপেক্ষা করে বসে আছে মুম্বই থেকে আসা দুটো মানুষের কাছে তাচ্ছিল্য হবে বলে। আমি মুখ টিপে পিউয়ের দিকে চেয়ে সহসা খানিক হাসলাম। রবিনকে জানিয়ে দিলাম, না রে ভাই, ম্যাডাম কা মুড বিলকুল সহি নেহি হ্যাঁয়, তাছাড়া বিমানে আমরা সামান্য খেয়েছি। এখন সিধা সিধা হোটেল মে জায়েগা, তারপরে না হয় খাওয়ার কথা ভেবে দেখা যাবে।

বিমানবন্দর ছেড়ে অমৃতসর ঢুকে যাওয়ার পরেও পিউ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছে ঘনঘন। ভণ্ড স্বামীর গল্পের সাথে বাস্তব মিলছেনা বলে বিচ্ছিরি লাগছে আশেপাশের সবকিছু। আরে আধঘণ্টাতেই কি সবকিছু বুঝে নেওয়া যায় নাকি? তবে পিউয়েরও দোষ নেই। এখনও অবধি গাড়ীর জানালা দিয়ে যেটুকু দেখা গিয়েছে, তাতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলার প্রচুর কারণ আছে বইকি! শহরে ঢুকে যা দেখা যাচ্ছে, অমৃতসর একদম ভাঙাচোরা রংচটা একটা শহরতলী গোছের জায়গা। চিত্তাকর্ষক কিচ্ছু নেই। এর চেয়ে আসানসোলকেই হয়ত যে কোন দিন এগিয়ে রাখা যেতে পারে। পিউ পাশের সীটটায় বসে আছে কাঠের পুতুলের মতন আর একটা অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খেতে শুরু করে দিয়েছে। ঈশ! কেন যে বোকার মতন আসতে গেলাম এতগুলো টাকা খরচ করে, এই টাকায় সাউথ-ইস্ট এশিয়া – মালয়েশিয়া ব্যাংকক দুজনের হয়ে যেত আরামসে।

রবিন ইতিমধ্যে পিউকে কি একটা বলতে চেষ্টা করছে। লোকটা নির্ঘাত বুঝতে পেরেছে, এই মহিলা তার স্বামীর বঞ্চনা নিয়ে একটু মনমরা হয়ে পরেছেন। পরিস্থিতির সাময়িক সামাল দিতে চায় সে! আমি আর নিরাসক্ত থাকতে না পেরে, মাঝখান থেকে বাধা দিয়ে পিউকে বললাম অ্যাই তুমি খামোখা টেনশন করছ কেন বলোতো? কতও কি দেখা আছে। তুমি আকাশের রঙটা দেখেছ, কি অসাধারণ নীল। এটাকেই বলে অরিজিনাল আকাশী নীল, বুঝেছ? একবার ঝুঁকে দেখো। সামনের ফুটপাথের ওই পুঁচকে গাছটা দেখেছ, কি অজস্র কমলা রঙের মরশুমি ফুল ফুটে রয়েছে? ওইদিকে পাঁচিলের উপরে ছাই রঙের পাখিগুলো দেখেছো? জানো একটু বাদেই এরা উড়ে চলে যেতে পারে পাকিস্তান কিমবা হরিয়ানাতে? ওই দ্যাখো, একটা পাঞ্জাবী ভিখিরি। কোনদিন দেখেছো সর্দারজীরা ভিক্ষে করছে। এই তো সবে এলাম। অজানা জায়গা, অ্যাত্ত হাঁকপাঁক না করে চলো চুপটি করে দেখে যাই। অ্যাটলিস্ট হোটেলটায় তো ঢুকি!

রাস্তার ডানদিকটায় দেখা গিয়েছিল একটা উন্মুক্ত প্রান্তর। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। পিউ অমৃতসরের ধকল সামলে জিজ্ঞেস করেছিল রবিন’কে সেই মাঠের বিষয়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, রবিন একটা লোপ্পাই টপিক পেয়ে গিয়েছে। মুহূর্তে শুরু করে দিলো বকরবকর আর পিউ লক্ষ্মী মেয়ের মতন মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল রবিনের কথা। কথায় কথায় রবিন শুরু করে দিল তার অপ্রকাশিত আত্মজীবনী। গাড়ীর ব্যবসাটা নতুন, মাসপাঁচেক হয়েছে। দুটো গাড়ী কিনে এই তো মার্চে শুরু করেছিল সে। এই গাড়ীটা নতুন আর অন্যটা সেকেন্ড হ্যান্ড। তবে ওঁদের আসল ব্যবসা ফুলকারির। ড্রেস মেটিরিয়াল, ওড়না আর পাঞ্জাবি জুতি। বুঝলাম রবিন এতক্ষণে আসল সাবজেক্টে ঢুকে গেছে। আর ঢুকেই সাকসেস। যে মহিলা মাত্র পনেরো সেকেন্ড আগে অমৃতসরকে অবজ্ঞা করা শুরু করে দিয়েছিল, সে মানুষটারই হাবভাব আমূল বদলে গেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখন অনেক নবীন, অনেক তাজা! ফুলকারির কথায় একটা অদ্ভুত ধরনের উদ্দীপনা ধরা পড়ছে তার মুখে চোখে। হায় ঈশ্বর, সর্ষেক্ষেত আর শাহ্‌রুখ খান থেকে থেকে চরম বাস্তবে চলে আসতে বোধহয় নারীরাই একমাত্র পারেন। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের ফেলে আসা মাঠটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। খুব ভালো ছিল মাঠটা, অনেক শ্যামল গাছপালা। এরকম দৃশ্য ক্বচিৎ চোখে পড়ে। আমার মনে হল একটা গ্রাম ছিল বুঝি ওই দিকটায়? পিউ এদিকে রবিনের সাথে মন দেওয়া নেওয়া করে ফেলেছে। অবলীলায় একটা একশো ডেসিবেল কণ্ঠে রবিন কে জানিয়ে দিল আজই সন্ধ্যেবেলাই সে ঢুঁ মারবে রবিনদের ফুলকারির দোকানে।

কোথায় গেল সিমরণ, আর কোথায় পঞ্চনদী? সব নিমেষে ভ্যানিশ! এ যেন এক ক্ষণিকের বিচিত্র যোগাযোগ। পাঞ্জাবী জুতিও দেখাবে বলছে রবিন, পাঞ্জাব কা বহুত ফেমাস আইটেম, আর পিউ দেখা গেল উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুরু করে দিয়েছে পাঞ্জাবিদের পোশাক পরিচ্ছদের। আমাকে টুক করে জিজ্ঞেস করল হ্যাঁ গো, পালকি গুম্বির পায়ের সাইজ কি তোমার মনে আছে?

আমার মুখটা ভ্যাবলার মতন হয়ে গেছে, হৃৎপিণ্ডে কেমন একটা দুমদুম শব্দ হতে শুরু করেছে। আজ সন্ধ্যেতে তো গোল্ডেন টেম্পল দেখতে যাওয়ার কথা আমাদের! রবিন পিউকে বোঝাচ্ছে মেশিনে বানানো ফুলকারি আর সত্যিকারের হাতের কাজের ফুলকারির কথা, পিউ দেখলাম তছনছ হয়ে যাচ্ছে! রবিন বুঝে নিয়েছে এই বাঙালী মধ্যবয়স্কা নারী আর কিছু না হলেও, ফুলকারির কারণে আত্মঘাতিনী হবেনই হবেন। আর যেহেতু রবিন এখন ঢেলে সময় দিচ্ছে পিউকে, আমি মুখ বন্ধ রাখলাম। ভগ্নহৃদয় প্রেমিকের মতন সামান্য অভদ্র হয়ে এবারে দেখতে লাগলাম বাইরেটা। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা জায়গাটা চলে গেছে পিছনে। আমি ব্যগ্রভাবে গাড়ী থেকেই ছবি তুলতে লাগলাম অভিজ্ঞ টুরিস্টদের মতন।

নতুন কোন শহরে এলেই আমার মনে হয় শহরটা খুব ছোট। আমার চোখ দিয়ে যেটুকু দেখা যায়, শহরটার যেন সাহস নেই সেই আয়তনের চেয়ে বড় হয়ে যাওয়ার। মাত্র পৌনে একটা বাজে, এখনই রাস্তায় লোক কমে এসেছে। লো ভোল্টেজ অলস দুপুরে দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে পাঞ্জাবের দোকানদারেরা। আর দুপুরবেলার অমৃতসর ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে জুরাসিক যুগে! আচমকা দেখলাম তারসেম একটা তাড়া খাওয়া বেড়ালের মতন আমাদের গাড়ীটা বাঁদিকে একটা ফলের দোকানের ঘাড়ের ওপরে গোঁত মেরে তুলে দিল। রাস্তাটা সঙ্কীর্ণ, ডানপাশে দেখা গেল কালো পোষাকে মাথা নিচু করে মারকাটারি ভঙ্গিতে ছুটে আসছে একপাল ব্ল্যাক-ক্যাট কমান্ডো। চতুর্দিকের গাড়ীগুলোর আর মানুষগুলোর মধ্যে একটা অযথা ব্যস্ততা, হঠাৎ সবকটা গাড়ীর হর্ন বাজতে শুরু করে দিলো মুহুর্মুহু।

তারসেম বেশ নার্ভাস হয়ে গেছে, তবে রবিনকে দেখলাম সাহসী এবং অটল। পিউ ঘাবড়ে গিয়ে আমায় বলল, কি হল গো? রবিনের একমাত্র কাজ আজ খদ্দেরের সুরক্ষা, পিউয়ের দিকে চেয়ে বলল কোই নেই ম্যাডামজী, পিছে সিদ্ধু আতা হ্যাঁয়। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম নভজ্যোত সিদ্ধুর কনভয়। স্পষ্ট দেখে পাওয়া যাচ্ছে, আইনের শাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে দেখাতে ছুটন্ত ধূমকেতু আসছেন তুচ্ছাপিতুচ্ছ নাগরিকদের দুরমুশ করে দিয়ে। যেন মেসি ডজ করতে করতে এগোচ্ছেন গোলের দিকে। রাস্তায় অনেক তারসেমকে তার স্পিড আর ক্ষমতার ভোজবাজি দেখিয়ে সিদ্ধু ভেলকি দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন আমাদের ঠিক ডানপাশ দিয়ে। আমি একটা দ্রুত নমো ঠুকে মনে মনে বললাম দুগগা দুগগা!

Leave a comment