আগলাতে হয় রে ভাই, আগলাতে হয়! যার যেটুকু খুদকুঁড়ো রাখা আছে, টুনটুনির ধন, নিরাপদে তাকে কাচিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয় রে! ঐ যে পঞ্চতন্ত্র না হিতোপদেশ না বেতাল পঞ্চবিংশতি, না কি ইশপের গল্প, কোথায় যেন বেশ একটা বলেছে, শালা যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ বাঁশ (আশ নয়)! খাট আলমারি ওয়াশিং মেশিন প্রোটেক্ট করে যেতে হবে খাটিয়ায়ে চেপে বসা অবধি! তাই তো ওই মুচির গপ্পোটার মতন বড়লোকদের এই বাজারে মেলা ফ্যাচাং! জল এখন বইছে নাকের উপর দিয়ে! সোশ্যাল মিডিয়ার নব্যশাস্ত্রে তো গোটগোট অক্ষরে লিখিতই আছে, “শুনো হে পাষণ্ড নরনারী, যতদিন না পুণ্যবান পুনাওয়ালা ভ্যাকসিন বাহির করিতেছেন, ততদিন ব্যাপী মহিলাদিগের করিনা কাপুরের ন্যায় লিকলিকে রোগা হইতে হইবে, পুরুষমাত্রেই বিরাট কোহলীর মত দাড়ি বাড়াইতে হইবে এবং উহারই সমভাবে হেলদি থাকিতে হইবে। উপরন্তু সকাল সন্ধ্যে দৌড়াইয়া ঘাম ঝরাইতে হইবে মিলখা সিংহের মতন। এককথায় দাঁড়ালো গিয়ে, করোনার সাথে লড়াই লড়িতে সক্ষম হইতে হইবে, পাঁচদিন অন্তর অবৈজ্ঞানিক আর্সেনিক অ্যালবাম গিলিতে হইবে, শিখর হইতে শিখরে ছুটিতে হইবে, নয়েজ ক্যান্সেলেসন হেডফোন কানে লাগাইয়া ব্যায়াম করিয়া ভূধর হইতে ভূধরে লুটিতে হইবে, যাতে করিয়া কিনা ইমিউনিটির বাড়বাড়ন্তে, প্রগাঢ় অক্সিজেনের প্রকোপে, ফাজিল করোনা ভাইরাসটা চুপিসারে পিটটান দেয় আর খোদ সগগো থেকে কবি নেপথ্যে তালে তালে তালি বাজাইতে পারেন! যাই বলো ভাই, করোনা ভাইরাস জিন্দাবাদ! যবতক সুরজ চাঁদ রহেগা, করোনা তেরা নাম রহেগা! থুত্থুরে বুড়ো, যার কিনা এখন বানপ্রস্থে গিয়ে গুরু না ভজিলে সন্ধ্যা সকালে মন প্রাণ দিয়া রে… করার কথা, সেই ন্যুব্জ বৃদ্ধ নাকি নিজের দুই কামরার ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরে মধ্যে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন দশহাজার স্টেপস! বেচারি গত দশ বচ্ছরে ব্যাঙ্কের পাশবই আপডেট করতে যাওয়া ছাড়া হাঁটেননি একটা পা’ও, আর এই লকডাউনে কিনা চার দেওয়ালের মধ্যে পাক্কা পাঁচ কিলোমিটার? শুভবুদ্ধি হলেও, এ বয়েসে দেখে মায়া লাগে! অন্যদিকে সবজান্তা মধ্যবয়েসীগুলো আরও বেশী পুচ্ছপাকা! ভোরে ঈষদুষ্ণ জলে আপেলের ভিনিগার, মধু মেড়ে হাপডজন তুলসীর কচি পাতা, উঁচুউঁচু এক চা-চামচ চালু কোম্পানির হলুদগুঁড়ো মেশানো ল্যাকটোজবর্জিত সয়াবিনের দুধ, আর চাট্টি ভেজানো কাঠবাদাম! আর কাঁপাকাঁপা হাতে মুখে ফেলে একটা ভীতু হাসি! কারণ হলুদগুঁড়োটাতে রোজই পেটটা কেমন যেন একটু মুচড়ে মুচড়ে ওঠে! কিন্তু কি আর করা? ফেসবুকের মতন আঁতেল জায়গায় উদারমনস্ক ফ্রেন্ডসরা সব্বাই পোস্ট দিচ্ছে যে! সঙ্গদোষে গোপনে মাল খেয়েছিলিস আর সঙ্গগুনে দুটো আয়ুর্বেদিক খেলে ন্যাকামি বলবেন? অন্যদিকে হালফ্যাশানের গিন্নিমা হালকা ব্যায়াম সেরে ব্রেকফাস্টে গ্লুটেনবহীন খয়েরি পাউরুটি আর ফ্ল্যাক্সসিড ছেটানো জৈবসারে (পড়ুন জৈবষাঁড়ে) উপজাত তেলছাড়া সেদ্ধ সবজি আর মুহুর্মুহু গ্রিন টি ‘র বদান্যতায় ভাবছেন, ভাইরাস আমার পূত, করোনা আমার ঝি, ইমিউনিটি সঙ্গে আছে, করবি আমার কি? ধুর আমার স্বামীটা না, একটা ভীতুর ডিম! গাম্বাট একটা! গিন্নির আবার ঝাড়গ্রাম মৌরিগ্রামটাম নয়, তিনি বিশেষজ্ঞা নারী! হাড়জ্বালানে ফেসবুক ছেড়ে, গিন্নির স্ট্যান্ডার্ড এখন খোদ ইন্সটাগ্রাম! সুদ্দু একটা সার্চ মেরে দিন, সারা বিশ্বের এক সে বড়কর এক হেলথ অ্যান্ড ওয়েলনেস এক্সপার্ট টিপস পেয়ে যাচ্ছে মাগনায়! ফলত যথার্থ আধুনিকতায় কিউয়ি ফ্রুট কেটে দেওয়া সত্যনারায়ণ পূজোয়, সিন্নি মাখা হচ্ছে সুগারফ্রি দিয়ে, আর তাছাড়া কুমড়োর শুকনো বীচি, প্রোটিন শেক, স্টিভিয়া চিনি, নীরস ব্রকোলি, ভিটামিন সি’র ইয়াব্বড় ট্যাবলেট, মাল্টিভিটামিন উইথ জিঙ্ক, এসব তো হরবখত লেগেই আছে! অ্যাত্ত পুণ্য ধম্মে সইবে? এ’তো বাইরের খেয়ে ঘরের মোষ তারিয়ে বেড়ানোর মতন! হেলথ আর ইমিউনিটি ইলাজের তামাশায়, করোনারই নাকি এখন বেজায় দুঃখ হচ্ছে ওঁদের দেখে! ওঁরা শেষবার দুধ দিয়ে চা খেয়েছিল বছর দুয়েক আগে! পেপসি কোকাকোলা তো মনেই পড়েনা! আর মাছের ঝোল দিয়ে অধুনা বিরল একথালা ভাত মেখে খেয়েছিল লাস্ট বোধহয় দুহাজার ষোলোর নবমীতে! মার্কিনীরা পৃথিবীকে দিয়েছিল ফাস্টফুড। ময়দার লঘূ বানরুটিতে বিশালাকার বেআব্রু মাংসের পিস, ডুবোতেলে পেল্লায় আলুভাজা আর শিথিল করে দেওয়া এক গেলাস ভর্তি কোক! সারা পৃথিবী ওঁদের দিয়েছিল বিস্তর কুর্নিশ! কি আজব জিনিষ খাওয়ালে গুরু! ক্রমান্বয়ে নেশা ধরিয়ে, সেই উদ্ধত ব্যবসায়ীরাই আজ দাপটে স্পেশাল এফেক্ট সমেত শিখিয়ে দিচ্ছে ভিগান খাবার। গ্লুটেন আর তৎসহ ল্যাকটোজের গপ্পো! মনুষ্যজাতির ত্রানার্থে ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি হুড়মুরিয়ে বেড়ে চলেছে দিনকে দিন! আর এখন তো পোয়াবারো… এসে গেছে করোনার খ্যামটা নাচ! আর সাথে সাথে তুড়ি মেরে রাতারাতি ইমিউনিটি বাড়িয়ে দেওয়ার নিরন্তর ধাস্টামো! কিন্তু যেটুকু খুদকুঁড়ো আছে, সেটুকু তো আগলাতে হবেই! হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতেই হবে, আমরা কি ওয়ার্থলেস নাকি?
Leave a comment