ভাগ্যিস ফেলুদা’কে সেদিন সিংজী ড্রাইভার উট ক’টাকে দেখাল। নতুবা মাইলের পর মাইল ল্যাঙল্যাঙ করে পোখরান পৌঁছতে হচ্ছে ফেলু মিত্তির অ্যান্ড কোম্পানিকে, এ’হেন ব্যাপার কিন্তু আদপে ম্যাড়মেড়ে ঠেকতো সেলুলয়েডে। কিন্তু ঝাঁ-ঝাঁ করা মাঝগ্রীষ্মে, দেশের প্রায় সব নিউজ চ্যানেলে প্রায় ঝোড়ো ভাইরাল হয়ে গেলো কেসটা! চওড়া নিস্তরঙ্গ হাইওয়ে দিয়ে লাখোলাখো আলুথালু নারীপুরুষ দায়িত্বজ্ঞানহীন পায়ে পোঁটলা কাঁধে হেঁটে চলেছে তাঁদের গ্রামের দিকে। তাপদগ্ধ উদ্বিগ্ন মুখ, কাঁখে বাচ্চা। তারসানাইয়ের কোন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নেই। গলায় দলাপাকানো অমন নাটকীয় দৃশ্যে খোদ পথের পাঁচালিও ফেল মেরে যাবে! দেশের বুকে সেদিন একটা চরম অন্ধকার সময়, একটা দগদগে টিপিক্যাল ভারতীয় ঘা। শান্তির লকডাউনে কে যেন ঠাস করে না বলে’কয়ে একটা চড় কষিয়ে দিলো। ফকিরবাবা সমেত কেন্দ্রের অধিকাংশ মানুষ ঘাপটি মেরে জরিপ করেছিল সেই দৃশ্য। নীরব পর্যবেক্ষণ! বললাম ব্যাটাদের বারান্দা-ব্যাল্কনি থেকে মোমবাতি জ্বালা, ড্যাংড্যাডাং করে থালাবাসন বাজা! তা না, খামোখা কোন আনন্দে বেড়িয়ে পড়লি রে উজবুকের দল? আরে, দেখলে হবে, খচ্চা আছে! এখনই খবর নে, কোন পার্টিটা এলোপাথাড়ি উস্কাচ্ছে এদের? আরে বাবা, টের পাওয়া মাত্তর কি আর হুটহাট জাজমেন্ট দিয়ে দেওয়া যায় নাকি? বহত সারা ভিচার-ভিমর্শ করনা হ্যাঁয়! বরঞ্চ ফোকাসটা এইবেলা ঠেলে দে রাজ্যেগুলোর দিকে, আর আশেপাশের ছুটকোছাটকা পার্টি অফিস, এনজিও’গুলোকে বলে দে ওদের নেমন্তন করে একবেলা বরং পাতপেড়ে খাইয়ে দিক! টুইটার বিশ্বে একপাল সম্মোহিত নেতা ক্যারদানি দেখিয়ে বলল, ক্যায়া আইডিয়া হ্যাঁয় স্যরজী! রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অপু দুর্গা’কে বলছে, দিদি আমাকে একটা রেলগাড়ি দেখাবি? সেই বুকফাটা ডায়লগ শুনে আর সর্বজয়ার আঁচল চাপা কান্না দেখে, বাই-ডিফল্ট, গুটিকয়েক রাজ্যের আবেগপ্রবণ নেতানেত্রী মুহূর্তে সরব হয়ে গেল। দিল্লীর গাম্বাট বিরোধীটা একটা বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, যাক শেষমেশ রায় ও মার্টিনের সহায়িকা পড়ে আমারও সাফল্য এলো! জাস্ট দুটো লেবার যদি এখন গ্যাঁজলা-ফ্যাজলা তুলে পটল তোলে মাঝরাস্তায়ে, তাইলে আর আমায় পায় কে? হাসতে হাসতে দুহাজার চব্বিশ দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে! অনুতাপহীন মালিকগোষ্ঠী বৈঠকখানার সেন্টার টেবিলে কিল মেরে বলল, যত্তসব ন্যাকাপনা! মধ্যবিত্তের ঘরে কিন্তু সেদিন বদলায়নি কিছুই। সোশ্যাল মিডিয়া, মোমবাতি, নিয়ম মেনে থালা বাটির বাজনা, চারুর সাথে অমলের প্রেমালাপ! সবকিছু চলেছে সবকিছুর মতন, হরেদরে ঠিকই থেকেছে। ভারত সেদিন আমূল বদলে গেলেও, আবেগহীন ইন্ডিয়া ছিল ইন্ডিয়াতেই! জাফরির আড়াল দিয়ে কাজের লোক দেখে নিচ্ছে টেলিভিশন। হয়ত খুঁজছে কোন দেশোওয়ালী ভাইয়ার মুখ! ভারতের দেড়হাজার মাইলের রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার ইন্ডিয়ায় যাঁদের বিসদৃশ ঠেকেছে, তাঁরাই আজকে দেদার তালি বাজিয়েছে আবুধাবি আর দুবাই থেকে এরোপ্লেন ল্যান্ড করার পর। বিদেশে পড়তে যাওয়া ডানপিটে ছেলেটা আমার ঘরে ফিরছে অ্যাত্তদিনের পর, কদ্দিন ভালমতন খায়নি গা! গ্রীষ্মের দুপুরে হরিহরের শ্বাস উঠেছে, কিন্তু অপুর একদম কান্না পাচ্ছেনা! অপর্ণার মৃত্যু অবধি অপেক্ষা না করে, ঠাস করে চড় কষানোর মতন একটা গাল খুঁজছে সে!
Leave a comment