বাবারে বাবা! ডাক্তারের পশার হওয়া কি চাট্টিখানি কথা? কাতারে কাতারে দেশের পাবলিক মোমবাতি জ্বালিয়ে কোরাসে গাইছে, বিশ্বপিতা তুমি হে প্রভু, আমাদের প্রার্থনা এই শুধু। সোশ্যাল মিডিয়ায় নীল হাতের নমো করার ইমোজীকে ধুপ-দীপ আর চামর বানিয়ে রেগুলার সকাল বিকেল আরতি হচ্ছে তাঁদের! কোথায় গেরুয়া, কোথায় সবুজ? মধ্যিখানের সাদা রঙটাই তো আসল! জটায়ু বললেন বুঝলেন ফেলুবাবু, একেই বলে আসল ত্যাগ! সেবাই পরম ব্রত। মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, সকলে একবাক্যে স্বীকার করছেন, আরে! এঁরাই তো দেশের আসল সেনানী। ওয়াতান’কে রাখওয়ালা। লকডাউনের ঢালাও আরাম ছেড়ে মাঠে নেমে ভাইরাসের সাথে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে তাঁরা। কিন্তু এরই মধ্যে হাসপাতালের সুনসান চত্বরে একটা ছেলে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তাঁর মড়া বাপের দিকে। আর মেলোড্রামা করে ব্রহ্মতালুতে মাঝে মাঝে ঠেকাচ্ছে লোকটার পা’দুটো। নিন্দুকেরা বলছে, বুড়োটার জাস্ট বুকের বাঁদিকে রাত্তির থেকে একটা পেইন মতন হয়েছিল। ডায়ালিসিসের পেশেন্ট। টানা আটদিন ধরে ডাক্তারবাবুটা ফোন ধরেনি, কেটে দিয়েছে। বুকে ব্যাথা ওঠার পর বাপটা’কে ছ-ছটা হাসপাতাল থেকে খেঁকিয়ে দিয়েছে। তেরিয়া সিকিউরিটি গার্ডগুলো বলেছে নিকলো, সব ট্রিটমেন্ট আভি বন্ধ হ্যাঁয়! বিবেচনাটা ভাবুন! আমিও পেশেন্ট, তুমিও পেশেন্ট। তোমার করোনা আর আমার নেহাত কিডনির ব্যামো। এই বাজারে ব্রণ হলেও, সরকারি চিকিৎসাটা বাগাবে তুমি। আর আমার বেলায় কেঁদেকঁকিয়ে হাসপাতালে পৌঁছতে পারলেও জুটবে ফক্কা। এ যেন ওয়ার্ল্ড কাপ হচ্ছে, সব স্পন্সর পড়ি কি মড়ি করে ছুটেছে ওই ওয়ার্ল্ড কাপের দরজায়! অন্যদিকে জনপ্রিয়তার চার্টে পয়লা নম্বরে থাকা সিনিয়র বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ? জেনারেল মেডিসিন বা কিডনি, হার্ট, লিভার স্পেশালিষ্টরা? যাদের ছবিতে মালা দিয়ে এলাকার পাবলিক অ্যাদ্দিন হিরো-ওয়ারশিপ করছে। জেনে রাখুন, তাঁদের মধ্যে কিছু না হলেও, সত্তর শতাংশ প্রাজ্ঞ ডাক্তার, স্রেফ বাড়ি বসে প্যানিক আর গরম জলে কুলকুচি করছে দিনে চারবার করে। ওঁদের লোহার গেট আজ বন্ধ। মোবাইল বন্ধ। ওপিডি বন্ধ। চেম্বারে ঝুলিয়ে দিয়েছে ইয়াব্বড় তালা। আর মাঝেসাঁঝে কান এঁটো করা হাসি দিয়ে নিউজ চ্যানেলে এসে চাড্ডি বেফায়দা বুলি। তাও ইন্টারনেট থেকে ঝাঁপা মাল। বলে এই মুহূর্তে আমাদের দরকার সাউথ কোরিয়া মডেলে টেস্টিং বাড়ানো। আর দরকার সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং। নির্বিকার গলায় সিনিয়র বলছে, ধুর এতো হল্লা কিসের? কেন ভাই, বেরুবোই বা কেন এই বাজারে? তোদের রোগাভোগা পেশেন্টের প্রাণটা প্রাণ? আর আমারটা কি মাগনা নাকি? যাকনা গোটা দেশ উচ্ছন্নে। টেনশন করতে করতে টেঁসে যাক কেমোথেরাপি না পাওয়া বুড়িটা! ওদেরকে বরঞ্চ একটু খকখক করে দুবার কাশতে বলুন, আরামসে ওদের দায়িত্ব নিয়ে নেবে করোনার কুটীরশিল্প। মানে আমাদের মহান জুনিয়রগুলো। হুহু বাবা, আমরা ওই স্মার্ট সেভেন্টি পার্সেন্ট, পেশেন্ট ডুবলে ডুববে, আমাদের সুনাম ডুববেনা কোনোদিন। লকডাউন উঠে গেলে, ল্যাঙল্যাঙ করে পাবলিক আবার ভিড় জমাবে আমার কাছে এসেই। অশিক্ষিত পাবলিক কিন্তু হাল ছাড়েনি। নীল নমস্কারের ইমোজি তো আর কম পড়েনি। ঢেলে দিচ্ছে নীল ইমোজী বেছেবেছে ওই তিরিশ জনকে, যারা জুনিয়র হয়েও মৃত্যুকে ভয় করেনি কোনোদিন। এনআরএসে আরজিকরে ধোলাই খেয়েও পিছিয়ে পড়েনি যুদ্ধে! আজও সেই তিরিশটা বাঘের বাচ্চাই কোমর বেঁধে দুদ্দাড় লড়ছে সামনের থেকে। 🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼
Leave a comment