Lockdown Diaries # 17

মৌলিক অধিকারে ঘটীরা বাঙালকে টিটকিরি মারবে। ইতর, অসভ্য এইসব বলবে। আর তাতে বদরাগী বাঙালগুলো ঘটীদের উলটে দেবে আরও কদাকার খিস্তি। বেচারি বিহারী মুটেটা’কে বিশ্রী গলায়, ‘অ্যাই শালা খোট্টা কোথাকার’ বলবে। উড়িষ্যার তাবৎ মানুষকে নিশ্চিত ভাবে বলবে ‘ব্যাটা উড়ে’। ফিচিক করে হেসে বলবে, ‘কিরে আজ আবার রথে চড়িকিরি কি নতুন কৌশলো করিলি’? ওদিকে হেডআপিসের ভিতরে অবাঙালী মনিবকে হাতেপায়ে ধরে গুড মর্নিং স্যার বলবে। কিঞ্চিত পরেই লাঞ্চে বেরিয়ে ডিম-পাউরুটি গিলতে গিলতে বলবে, বাঁটকুল মেড়োর বাচ্চা’টা কি বলছিল রে? মোট কথা, আমাদের টিটকিরিতেই অর্গ্যাজম। ক্ষমতায় নয়।

কিন্তু মাক্কালী। আর না। এই বাজারে সবকটা ঘেন্নার জন্তুকে মাফ করে দিয়েছে মিইয়ে যাওয়া বাঙালী। জীবনের সমগ্র ফ্রাস্ট্রেসন উগরে দেওয়ার জন্য উড়ে, মেড়ো, খোট্টা, পাইয়া, সবকে টপকে নতুন করে লাইনে এসেছে চীনেম্যান। দলাদলা থুতু জমিয়েছে টাগরায়। যদি বাইচান্স আইডি হাসপাতালের টেস্টে না লাগে, থুকে দোবো ওই বেআক্কেলে চীনেম্যানের ওপরে। আর কেবল বাঙালী কেন? গোটা ওয়ার্ল্ড, ঝাক্কাস মার্কিনী নেতৃত্বে হুড়মুড়িয়ে মাঠে নেমেছে চীনেদের একটা মোক্ষম শাস্তি দিতে! ওদের অর্গ্যাজম ক্ষমতায়, টিটকিরিতে নয়।

ক্ষমতাভোগী যারা লাই দিয়ে মাথায় তুলেছিল অ্যাদ্দিন, তারাই আমসি মুখে বলছে চীনেগুলো কিন্তু বহুত ডেঞ্জার মাল। প্রেস মীটে অধুনা অ-জনপ্রিয় রাষ্ট্রপ্রধান ন্যাশনালিষ্ট সেন্টিমেন্টে অহেতুক সুড়সুড়ি দিয়ে বলছেন, এসো হে জোয়ান হও আগুয়ান। তুমি কামান দাগো, আমি বিভিন্ন অব্যয়ের ভোকাবুলারি দিয়ে তোমাদিগকে সাহায্য করবো! মোদ্দা ব্যাপার, তুমি ওটাকে যতই করোনা বল, আমি ওইটেকে হেঁড়ে গলায় চাইনিজ ভাইরাস বলেই চিল্লোবো। অতীতে হতচ্ছাড়া ইবোলাকে ইবোলা বলেছি, জিকাকে জিকা। এটাকেই বা ছাড় দোবো ক্যানে? ওদের ল্যাংটা, কেলেদের ছোট করাতেই অর্গ্যাজম, টিটকিরিতে নয়।

অন্যদিকে আত্মপ্রত্যয়ী চীনের দাপট এই বাজারে কিন্তু দেখার মতন। খাচ্ছে কিন্তু গিলছেনা টাইপের নীরব। অনেকটা অর্জুনের মাছের চোখ দেখার মতন। নজরে কেবল দুহাজার পঞ্চাশ! আফটার-অল সুপার-পাওয়ার হতে হবে কিনা। চায়ের দোকানে ক্যাডার বাঙালী গলা খাকড়ে বলছে, ব্যাটাদের চক্করটা দ্যাখ একবার! কি ফালতু উচ্চাভিলাষ! কিছুর মধ্যে কিছু না, প্যানডেমিকের বাজারে খোদ হু’কে ব্যাটারা চিলিচিকেন খাইয়ে কব্জা করে নিয়েছে।

কিন্তু আমরা? আমরা যারা টিটকিরিতে অর্গ্যাজম পাই? আমরা যারা খোট্টা, যারা উড়ে, যারা বাঙালী? তোবড়ানো গালে হাঁ করে বসে আছি ফুটপাথের ওপর? আমরা তো মহেঞ্জোদারো দেখিনি, ডাইনোসর দেখিনি। লাইটহাউস, নিউএম্পায়ারে ক্লিন্ট ইষ্টউডের চাট্টি সিনেমা ছাড়া অ্যামেরিকা দেখিনি। আমরা তোদের নিষ্ঠুর দুহাজার পঞ্চাশও দেখতে চাইনা। আমরা ঘিঞ্জি বস্তিতে নাকেমুখে সস্তার মাস্ক পরে, নিজেরই বাষ্পীভূত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফের নিতে চাইনা ফুসফুসের মধ্যে।

বিকেল এলেই আমাদের গা গুলিয়ে ওঠে, রাত্তিরে ভয়ের স্বপ্ন দেখতে আর ইচ্ছে করেনা! আমরা আবার পুরী এক্সপ্রেসে চেপে মেজমামাদের সাথে চার রাতের জন্য বেড়িয়ে যেতে চাই। পুরী। স্বর্গদ্বারে একটা ব্যাঙ্কের হলিডে হোমে উঠবো আর হাবলা উড়ে রিকশাঅলাটাকে ক্ষণেক্ষণে পিন মেরে বলব, ধাঁইকিরিকিরি চল রে বাবা! আর ওই ক্ষমতাভোগী বিদেশের ওপরচালাক কেউ ‘একটু হাসোতো খোকা’ বললে, মুকুলের মতন ঠাণ্ডা গলায় দুহাজার পঞ্চাশের পৃথিবীটাকে বলবো, ‘আমার হাসি পাচ্ছেনা’। আমাদের ওই টিটকিরিতেই হাসি পায়। ক্ষমতায় নয়।

Leave a comment