দুঃখের বারোয়ারী গ্রাফটা যেন ভাইরাসটার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ছুঃ-লাকি-ছুঃ… এলাকার স্পটলাইট খাবলে নিয়ে, আঠারো দিনের মাথায়, ভাইরাস বলে আমায় দ্যাখ, তো দুঃখু বলে আমায় দ্যাখ! জ্বলুনির একটা অলিখিত কম্পিটিশন। এই বাজারে কারুর সাথে টানা পাঁচটা মিনিট ফোন করে কথা বলার জো নেই গা। নালিশের গলায় অচিরেই বক্তৃতা শুরু হয়ে যাবে। কার বাড়ীতে শোক বেশী, কার অনটন মারাত্মক, আগামী মাসের অনিশ্চিত মাইনে, কাজের মাসি, ঘর ঝাড়পোঁছ, গ্যাস-সিলিন্ডার এই সব কাজিয়া নিয়ে তুমুল মেন্টাল অত্যাচার। পাবলিক কেঁদেকোঁকিয়ে বলছে উফ! কি পাপটাই না করেছিলাম গো, আর ফোনালাপেই গলা বুজে আসছে বারবার।
দেশের তাবৎ সোশ্যাল মিডিয়াপ্রেমী অবশ্য শুরু করেছিল সেহবাগের মতন একটা ঝোড়ো ইনিংস দিয়ে। টেটিয়া ভাইরাসটাও বেচারা সাময়িক হকচকিয়ে গিয়েছিলো। হুহু বাওয়া, সেহবাগের স্লগ তো দেখোনি চাঁদু! দিল্লীর লস্যি খাওয়া মাল। বলে, টেনশন বিলকুল লেনেকা নেহি, দেনেকা হ্যাঁয়! ফার্স্ট ওভারেই সোশ্যালমিডিয়া হাঁকড়ে দিলো পরপর দুটো পেল্লায় ছক্কা। মারকাটারি ব্যাটিং দেখে, একটা বাচ্চা ভাইরাস গেঁড়ে ভাইরাসটাকে বলে, কি সব্বোনাশ ওস্তাদ। চীন দেখলুম, কোরিয়া দেখলুম, ইরান দেখলুম, এমন’কি বুড়োহাবড়ার দেশ ইতালি পর্যন্ত ঘুরে এলুম, কিন্তু এ’দেখি তোমার অন্য দেশ! এ’তো পুরো গোদরেজের আলমারি! এখানে আমাদের সুবিধে টুবিধে হবেনা। তার চেয়ে বরঞ্চ চলো পাকিস্তান যাই।
মার্চের চব্বিশ তারিখ থেকে শুরু। যখন ইতালি অ্যামেরিকায় অলরেডি মরাকান্না আর মৌনমিছিল, ইন্ডিয়াতে ডেলিকা ডেলি সন্ধ্যেবেলা চালু জুমজুমাজুম জুম-কলিং! ফেমিনিস্ট স্টাইলে কর্পো-জগতের তাবড়-তাবড় আলুভাতে প্রেসিডেন্ট, ভিপি আর ডাইরেক্টর সায়েবরা ওয়ার্ক-ফ্রম-হোমের হাড়ভাঙা অত্যাচার সামলেসুমলে, পাউডার মেখে গদগদ হয়ে বসে গিয়েছিলেন কম্পিউটারের সামনে। নাও নাও, শুরু করো। শুরু করো, আন্তাকশারি লেকে প্রভু’কা নাম! অ্যায় এবারে আপনি মশাই একটা ধরুন’তো ‘ম’ দিয়ে। থতমত সায়েবের গান শুনে, প্রভু ইদিকে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসছেন। জুম’টা কি কিউট জিনিষ গো? বিনয়ী গিন্নির আজ কোনো টেনশন নেই, স্বামীর হাঁটুতে হাঁটু ঠেকানো, শুদ্ধু হালকা কাজলটুকুন বুলিয়ে নিয়েছে! আজ না ছোড়ুঙ্গা তুঝে ডমডমাডম! জুমে তো আর ইনটুমিন্টু তুমি কিছু করতে পারবেনা!
দিব্যি চলছিল কিন্তু! আরে ধুর মশাই! প্রতিবাদ করবেন না। মস্তি করে নিন, মস্তি! বলি, কেবলমাত্র ঘরের বাইরে যাওয়ার অধিকারটুকু তো সরকার থেকে বাজেয়াপ্ত করেছে, তো কোন মহাভারতটা অশুদ্ধ হয়েছে শুনি? হাসি-ঠাট্টা, প্রানায়ম, ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম, জামাত’কে ঘুরতে ফিরতে দুটোএকটা কটুকথা আর গিন্নির কিটি গ্রুপের সাথে অন্তাক্ষরী খেলা ফুরফুরে কয়েকটা স্বর্ণালী সন্ধ্যে! আরে জানিস! আমি আর আমার কত্তা তো গতকাল সর্বাঙ্গসন’টা ট্রাই করলাম। সকালে। ঠিক আছে গো মিঠু’দি, তোমায় ভিডিওটা পাঠিয়ে দোবো কাল।
সব মিলিয়ে, আচ্ছে দিন। সারাভারত তখন নবদ্বীপ! রাশিরাশি প্রেম পড়ছিল চুইয়েচুইয়ে। তবে সাতদিনেই খেলা ঘুরে গেছে। বিশ্বাসী সেহবাগ ক্লিনবোল্ড হয়ে প্যাভিলিয়নে আর ইন্ডিয়া টিমের যতো স্মার্টনেস ফুস। তাপ্পরে আজ দু-হপ্তা হতে চলল, ভোগবিলাস একদম মাথায় উঠেছে। অন্তাক্ষরী শুনলেই টকে যাওয়া মুখে উঠে আসছে একদলা থুতু। বাচ্চাটাকে কথায়-কথায় বেধড়ক দাবড়ানি। বাসনধোয়া নিয়ে ইতিমধ্যে দুপক্ষে একটা হাতাহাতি হয়ে গেছে। ঘুরতে ফিরতে কর্পো ডাইরেক্টর মুখ ভেংচাচ্ছে খতরনাক বউটাকে। এখন আরও দু-হপ্তা এইভাবে টানবে? এইবারে তো খোল-কত্তাল নিয়ে প্রতিবাদে নামতে হবে!
তবে অ্যাত্তঅ্যাত্ত ফ্রাস্ট্রেসনের মধ্যে একটাই ভাল খবর। সমগ্র স্ত্রীজাতি আর সিম্প্যাথি কুড়নো পুং নির্বিশেষে, চরিত্রটুকুন সকলের এখনও অটুট আছে রে ভাই।
Leave a comment