টানা সাত-সাত বার তুমুল ভোটে জেতা কিন্তু চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। রাজ্যের কয়েক কোটি আমজনতার একবাক্যে দেওয়া ম্যান্ডেট। তবুও সর্বহারার পার্টি হিসেবে তৎকালীন রাজ্যর কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া ঠিক কত’টা ‘কম্যুনিস্ট’ ছিল, সেই বিষয়ে আশি শতাংশের উপরের মানুষের ধারণা ছিল’না। পার্টির হত্তাকত্তারা, মানে সকাল-বিকেল বাউন্ডুলে ছেলেপিলেগুলোকে দিয়ে যারা লালকালিতে দেওয়াল লেখাতো, ক্লাসপালানো পাঁচটা যুবককে বিপ্লবের চোরাগোপ্তা সুড়সুড়ি দিয়ে প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে ঘেরাও করাতো। বিনাকারণে মালিকের দরজায় গরমাগরম স্লোগান দিয়ে, শ্রমিককে যারা রাতারাতি উসকে দিতো বা যারা নাগরিক কমিটি, শান্তি কমিটি বানিয়ে জম্পেশ দুটো মুড়ি কাঁচালঙ্কা গালে ফেলে, ভাই’য়ে ভাই’য়ে বিবাদ মেটাতো পার্টি অফিসে বসে, তারাও তাঁদের বুদ্ধি বা বদবুদ্ধি দিয়েও কোনোদিন তলিয়ে জানতে চায়নি, আরএসপিঁ, ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআই আর সিপিঁএম’এর মধ্যে ফারাকটা ঠিক কোথায়? আসলে তারাও সকলে মানুষ। নেতাকে মাথা হেঁট করে মান্য করা মানুষ। ডান, অতিবাম আর মধ্যপন্থার অত ফারাক-টারাক তারাও তেমন বুঝতেননা। সময়মতন শাসন পেলে আর শাসন করতে পেলেই বুঝি মানুষের চলে।
তবে প্রাক-সিঙ্গুর, প্রাক-নন্দীগ্রাম যুগে, ফারাকের একটা থিয়োরি স্পষ্টবাক্যে মেনে নিয়েছিল রাজ্যের ভোটার। ফারাকটা মূলত ছিল আর্থিক সুরক্ষার। রিফিউজি হলে তো সে’রম কোনো বাছাবাছির বালাই ছিলনা। আহারে! রাতারাতি সব ছেড়েছুঁড়ে বর্ডার পেরিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। পাড়ার প্রাজ্ঞ দাদা বললেন, তোমাদের জায়গা দেবনা মানে? আলবাত দেব। তোমরা হইল্যা গিয়া হোলসেল লালপার্টি। আর তোমাগো সব দায়িত্ব আজ থিক্যা পার্টির! হালার কেন্দ্রীয় সরকার আর আমাগো সরকার কখনও কি এক হইতে পারে? সেই প্রজন্মের রাজনৈতিক বাছবিচারে রিফিউজিদের কোনও মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কোনোদিনই সেইভাবে তাদের দেওয়া হয়নি। দরকারে পার্টি খাবার দিয়েছে, জমি দখলের সম্মতি দিয়েছে। উদ্বাস্তু’র বিধবা মা, কেশো বাপ দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেছে। নিজের ছেলেদের বলেছে, কুইড়্যা’র ঢিবি। বাড়ীতে বইস্যা করবি টা কি? বরং পার্টিতে নাম লিখা গিয়া।
অন্যদিকে, মূলধারার পশ্চিমবঙ্গীয় লোকেদের মধ্যে অলিখিত একটা নিয়ম দেখা যেত। সেটাও খতিয়ে দেখতে গেলে একটা বেশ আর্থ – সামাজিক গন্ধই তাতে পাওয়া যাবে। নিচুতলা থেকে শুরু করে বেতনভুক্ত মাঝারি মধ্যবিত্ত হলে তোমার নাম হবে সিপিএম। আর ধপধপে পাঞ্জাবী, সাদা চপ্পল আর সোনার একখানা ফিনফিনে চেন গলায় পয়সাওলা বড়মানুষ হলে তুমি পাক্কা কংগ্রেস। নামজাদাদের মধ্যে জেলার দিকে গনিখান। রায়গঞ্জে প্রিয়’দা। কলকাতায় চোখকান বন্ধ করে চৌরঙ্গী, বালিগঞ্জ আর সেন্ট্রাল কলকাতায় কিছু। রাজ্যে আর কয়েকটা আবছা এদিকওদিক সীট ছাড়া, যাদবপুরের পুরো নিচদিকটা, বা পাঁচমাথার মোড়ে থেকে নিয়ে অনেকটা উত্তরে, নতমস্তকে মোটামুটি সবাই তখন লালে লাল। কাঁহাতক নিজের রুটি আর নিজে জোগাড় করা যায়? ভোট দাও, রুটি খাও।
অ্যান্টি এশটাবলিশমেন্ট মার্কা কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো হলেও, নেতা কিন্তু ওপরেই। মুঠোর ছবি দেওয়া লাল পোস্টারে পশ্চিমবঙ্গীয় মডেলের রাজনীতির মারপ্যাঁচ না বুঝতে পারা রোগাভোগা মানুষগুলো একটা অবচেতন ডাঁটে বাঁচতো। ঘেমো কলারে খয়েরি রুমালখানা পেঁচিয়ে অবান্তর তর্ক জুড়তো যখন তখন। সগর্বে। টানা পাঁচটা বছর ধরে কেন্দ্রের বঞ্চনার মরাকান্না, যোজনা কমিশনের যাচ্ছেতাই বেইমানি, বাজেটের বিবেচনার বরাদ্দ, আর ইন্দিরা গান্ধী এবং তার ফ্যামিলির মুন্ডুপাত। আর মাঝে মাঝে ফোড়নের মতন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গুষ্টির তুষ্টি। ভোটের সময়ে বুক বাজিয়ে ঘোষণা করত – সত্যি বলতে কি? এই যে আমরা যারা কিনা সাচ্চা কম্যুনিস্ট, আমরা না আবার ক্যান্ডিডেট ফ্যান্ডিডেট তেমন দেখিনা। যা বোঝার ভাই, তা আমাদের পার্টি বুঝছে। আলিমুদ্দিন বুজছে, পলিটব্যুরো বুঝেছে। এবারের প্রার্থীটা ডাক্তার নাকি মোক্তার, নিরক্ষর নাকি বউকে প্যাঁদায় ওইসব হাবিজাবিতে কান দিইনা। ব্যালট পেপারটার কোণা দিয়ে, কাস্তে’র ফালিখানা বা বেলচা’র ডান্ডিটুকুন দেখলেই হল। আমাদের কাজ লোকটাকে জেতানো, বিধানসভায় বা লোকসভায় গিয়ে আমাদের মতটা যাতে জয়ী হয়! ব্যাস সেটুকুই তো যথেষ্ট। নেতা এদিকে নিজেকে নিজে রাজা না বললেও, ভোটারব্যাটা কিন্তু চিরকালই প্রজা।
ওই যে সুমন চাটুজ্জে বলেছে না, ছেলেমেয়ে গুলো যেন থাকে দুধে ভাতে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, যতই গালভরা বুলি কপচাওনা কেন, আমরা আসলে রাজার কাছে ভরসা চাওয়া পাবলিক। পুঁজিপতিই হোক বা কম্যুনিস্ট। বিপদে পরা মানুষের কাছে কে সিরাজদৌল্লা আর কেই বা লর্ড ক্লাইভ? নেতা হচ্ছে মালিকপক্ষ। বাড়িওয়ালা। আমরা কোরাসে গণসংগীত গাওয়া ভাড়াটে। লাস্ট সিনে কাজল’কে কাঁধে নিয়ে অপু হেঁটে বেরিয়ে যাবে। আমরা চোখে দু ফোঁটা জল এনে, হল থেকে ধীর পায়ে বেরুবো। বচ্চন গব্বর’কে কেলিয়ে ঠ্যাংদুটো ভেঙে দেবে। আমরা খুচরো ছুড়বো, তালি বাজাব। সরকার থেকে ঘরবন্দী করে দেবে, আমরা বিনাবাক্যব্যয়ে তা পালন করব। মহামারী থেকে উদ্ধার করতে দো-বুঁদ জিন্দেগী’কা বাড়ী-বাড়ী ঘুরে বিলি করবে, আমরা লাইন দিয়ে ঠোঁট চেটেপুটে খাব। আমাদের অতশত প্যাঁচপয়জার ভেবে কিচ্ছুটি লাভ লোকসান নেই রে বাপু। “বিশ্বজুড়ে যৌথ খামারের” দিনে সকালে দু চামচ খিচুরি হলেও, সেটা সরকার থেকে জোগাবে। রাত্তিরে মাথাপিছু দুটো করে পাউরুটি দিলেও, জোগাবে সেই সরকার।
আরে ঘাবড়ালে চলবে কেন? পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ, যাবতীয় সম্পত্তি তো পৃথিবীরই। আমার আপনার। আমাদের সক্কলের। আরে কালীদা, গড়ে সত্তরটা বছর তো মাত্তর বাঁচা। কারো কম, কারো কিঞ্চিত বেশী। তার মধ্যে নিশ্চিন্তে খাওয়া থাকার গ্যারান্টিটা তো দেবে পার্টি। আমাদের নির্বাচন করা সরকার। সেই ব্যাটা কম্যুনিস্ট না ক্যাপিটালিস্ট ভেবে ভয়টা কিসের? আমাদেরই তো জিনিষ, আমাদেরই তো প্রাপ্য। কেবলমাত্র বিলিবণ্টনের দায়িত্বটুকু কেবল দেওয়া হয়েছে সরকারি হোমরাচোমরাদের।
আর আমরা নিতান্ত ভীতু মানুষ। আমরা কুরুক্ষেত্র জানিনা, মার্ক্সবাদ জানিনা, নেপোলিয়ন জানিনা, বিসমার্ক জানিনা। রবীন্দ্রনাথ তো পদ্য আর গান লিখেই খালাস। পুঁজিবাদী হোক আর মার্ক্সবাদী, চরম দুঃসময়ে শুনেছি মানুষের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বা যীশু। হয়ত কোনোদিন মহম্মদ। বস্তির অন্ধকার গলিতে আলো দেখিয়ে হাতটা আলগোছে ধরেন গান্ধী। ক্ষমতা কাড়তে শেখান সুভাষ বোস। নাকে রুমাল বেঁধে শুশ্রূষার ভার নিজের হাতে তুলে নেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে। এমনকি, অবিলম্বে মানুষের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হোক বলে যে কম্যুনিস্ট বা অতি-কম্যুনিস্ট নেতারা দিনের পর দিন গলা ফাটিয়ে চিল্লিয়েচ্ছে, তারাও ক্ষমতায় আসার পর ঠারেঠোরে স্বীকার করে নেয়, ক্ষমতা ব্যাপারটা সত্যিকারের পাশাপাশি সমতলে যেতে পারেনা। অনেক জঞ্জালের মধ্যেও, ক্ষমতার গ্রাফটা কিন্তু খাড়া উপর দিকেই যায়।
এমন একটা তাজ্জব মহামারীর দিনে, কাঁটাতার ভেঙে, ক্যালিফোর্নিয়া অট্টালিকা বা কসবার নীল দেওয়ালের ঘর ধুয়েমুছে এক হয়ে গেলে, মানুষ তো তখন সবাই সর্বহারা। রাষ্ট্রপ্রধানের বাড়ী, বিলিয়নিয়রের ছাদ, পাড়ার ছেলেদের খেলার মাঠ, আর হাসপাতালের আইসিইউ, খিদের জ্বালায় সব সমীকরণ মুছে, সবাই তখন উদ্বাস্তু। শাসকের মধ্যে কে আরএসপিঁ, কোনটা ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআই আর কে আসল সিপিঁএম’এর ফারাকটা সেদিনও জানতে চায়নি মানুষ। আজও জানতে চাইছেনা কে কোন পক্ষের। ডারউয়িন সায়েবের তথ্য না দেখে, সব স্পর্ধা বিসর্জন দিয়ে, আজ কেবল আনুগত্যের দিন। আহারে! সাতমহলা বাড়ীতে বসে, এমন টিটকিরির দিনও দেখতে হচ্ছে বিশ্বের বাঘা বাঘা পুঁজিবাদীদের! স্বর্গে বসে ম্যানিফেস্টোর একটা নতুন খসড়া হয়ত করছিলেন মার্ক্স। ঘাতক ব্যাধিটার পাল্লায় পড়ে সমগ্র মানবজাতির ঐক্যবদ্ধ ভিখিরিপনা দেখে, আজ বুঝি সেটাকে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিলেন রাইন – দানিউবের জলে। পুরনোটাই চলবে এখনও এই বাজারে!
Leave a comment