হাতে রইল পেনসিল • ৭ (জনতা-কার্ফু স্পেশাল)

রান্নাঘরের চালের ঝগড়াটা লাস্ট শুনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে বোধহয় জীবনানন্দ একবার। বাপরে, এদের দাপট শুধু আজকে দেখতে হয়! শালিখপাখি যে এমন জোরসে চিল্লোয়, কে জানতো? আর এই পিলে চমকানো চিৎকারকে, ঝগড়া না বলে তোলপাড় বললে একরকম ঠিক ছিল। কবিকুলের পদ্যফদ্য তো পড়েছে অনেকেই, তবে সে’রম ভাবে কোনদিন মন দিয়ে শালিখের ডাক শুনতে পায়নি কিনা! সামনের প্রায় খয়েরি হয়ে যাওয়া ন্যাড়া মাঠটা’তে, আজ সকাল থেকেই গোটা ছ’য়েক মহাসমারোহে দাপাদাপি শুরু করছে। ঈশ! দিদিটা এখানে থাকলে, দুটো আঙুল ঠোঁটের কাছে নিয়ে, ঠিক বলতো, টু-ফর জয়, তিন দুগুণে ছয়। ‘ওয়ান ফর সরো’ ছাড়া গত দশদিনে আমরা কিচ্ছু দেখতে পাইনি কিনা! এদিকে রাস্তায় একটাও গাড়ীঘোড়া নেই, আর সরকারি তৎপরতায়, টেনশনী হোমো সেপিয়েনসগুলো সব ঘরের ভিতর সেঁধিয়ে উদ্বেগ করছে আর ভগবানের ডিউটি দিচ্ছে। তাই বুঝি আজকে শালিখ ব্যাটাদের ফ্রি-ভিসার দিন। অতএব নো-হয়রানি, নো-ফালতু মাথাব্যাথা! যত পারছে এন্তার গলাবাজি করে নিচ্ছে।

সুনসান রাস্তাটা দিয়ে গর্জন করে আচমকা একটা বেপরোয়া জলের ট্যাঙ্কার গেলো। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে লোহার দরজাটা সাদরে খুলে দিলো বিহারী গার্ড’টা। মুখে একগাল হাসি। আরেব্বাস, এ পাড়ায় জলের আবার খুব চাহিদা কিনা। দেখলে হবে, খরচা আছে! জল বলে হেলাফেলা করবেন না একদম, রোগভোগ’টা মাগনাতে পাওয়া গেলেও, মুহুর্মুহু হাত ধোয়ার জলটুকুন’তো আজকাল এই বাজারে সওদা করতে হছে রেগুলার। নইলে উপায় হল, কালোবাজারে কেনা স্যানিটাইজার। যারা আদ্দিন বলতেন, জীবন মানেই জি-বাংলা, তারাও এখন রাতারাতি ভোল পালটে বলছেন, ভুল বলেছি ভাই। নাক মলছি, কান মলছি, জীবন মানেই স্যানিটাইজার!

আজ সেই কষ্টার্জিত স্যানিটাইজারে নিকোনো হাত, শাঁখ, একগাদা থালাবাটি আর কাঁসরঘণ্টা রেডি করা হচ্ছে ঘরে ঘরে। আরে বাবা আমাদের শাঁখই সই! আমাদের তো গরীব দেশ, ইতালি স্পেনের মতন ঘরে ঘরে তো বেহালা-বিউগল নেই! সরকার বাহাদুর যদিও ইতিমধ্যেই বলে রেখেছেন, পাঁচ বাজে, এমারজেন্সি সার্ভিসকা সওয়াগত পান পরাগ’সে নেহি, হাততালি আর ঘণ্টি বাজা’কে কিজিয়ে। কিন্তু এদিকে ইয়াব্বড় দাড়িওয়ালা প্রচারক আর উপাসককুল চূড়ান্ত ফরমুলায় পৌঁছে গেছেন। বুক চিতিয়ে সাফ বলছেন, দেকেচিস ক্ষুরধার ব্রেন’টা? কেমন হিসেব করে বাছল বলতো দিনখানা! আরে, আজ তো ঘোর অমাবস্যা! হাতেনাতে ফল পেয়ে যাবি রে পাগলা। একখানাও ফসকাবে না! উথালপাথাল ভাইরাসগুলোর নাকের ডগায়, অ্যায়সান শঙ্খনাদ আর ঘণ্টা বাজাবো আমরা একশো তিরিশ কোটি মিলে, যে ব্যাটারা পালিয়ে পার পাবেনা! তাপ্পরে আমাদের রাজকীয় জয় আটকাবে কে? ক্যায়া আইডিয়া হ্যাঁয় স্যারজী!

মিশ্রাজীর মতন হাজার হাজার জ্যোতিষকুল ইতিমধ্যে নিদেন দিয়ে দিয়েছেন, আরে ভাইয়া থোড়াসা সবুর তো করো। মারক ঘরে বসে আছে গোঁয়ার রাহুটা। আর সাথে গিয়ে খুচরো পাপের মতন জুটেছে হতচ্ছাড়া কেতুটাও। অ্যাডিং ইন্সাল্ট টু ইঞ্জুরি! গোদের উপর বিষফোঁড়া টাইপের! আর বলবেন না দাদা, দুটোই নাকি বিপজ্জনক রকমের অশুভ! তবে আচ্ছে দিন আসছে। শুদ্দু বেস্পতি’টাকে জাস্ট একবার নিজের ঘরে ঢুকতে দিন, আর দেখতে হবেনা! কেঁদেককিয়ে পালাতে কুল পাবেনা। উত্তমকুমারের সিনেমার মতন ভবানীপুরে তখন চাদ্দিকে ‘গুরু গুরু’ করে হুঙ্কার। তাছাড়া এর মারাত্মক উদাহরণ তো ফণীতেই ছিল। আর কেবল ফণী কেন? বঙ্গোপসাগরের যেকোনো সাইক্লোন যেমন একদম লাস্ট মুহূর্তে গিয়ে খোদ সরকারি মন্ত্রচ্চারণে বাংলাদেশের দিকে বাঁক নেয়, এই ভাইরাসটাও নাকি গুটিগুটি পায়ে অ্যারাবিয়ান-সি টপকে পৌঁছে যাবে উত্তর পশ্চিমে। কাসভ’রা যে রাস্তায় এসছিল! আর আমরা যদ্দিনে স্যানিটাইজারে হাতফাত ধুয়ে খালাস, তদ্দিনে ঝাঁকেঝাঁকে ভাইরাস গিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দেবে উত্তর পশ্চিমের দেশখানাকে। মানে যেটুকু বাকী আছে, সেটুকুও বেস্পতির উদ্গারে ধুয়ে মুছে সাফ! দ্যাখ জামাত দ্যাখ, দ্যাখ লস্কর দ্যাখ, টেররিস্টকুল এইবারে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’! কাম অন ইন্ডিয়া, দে ঘুমাকে!

তবে এই অভিনব আস্তিক প্ল্যানের মধ্যে এটুকু তো বোঝাই যাচ্ছে, আজ বিকেল পাঁচটার সময়ে একঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। দিদি বলল, আর বেকার পাহাড়ী সান্যালের মত ভ্যাবাচ্যাকা মুখ করে আদিখ্যেতা করিসনা তো। দেবতার গ্রাস পড়িসনি? এইবেলা ইন্ডিয়াকে বাঁচাতে দু’খানা শালিখ গেলে যাক। ছ’টার থেকে দুটো বিয়োগ হয়ে, চারখানা তো তোর হাতেই থাকল! আর তোকে শিখিয়েছিনা, ‘ফোর ফর টয়’। আর ভেবে দ্যাখ, কাঁড়িকাঁড়ি শালিখ নিয়ে করবই বা কি আমরা? মুরগীটুরগি হলে তাও ছবি বিশ্বাসের মতন রোস্ট করে ডিনারে খাওয়া যেত। ব্যাটারা বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে রে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে। বেশী পাত্তা দিসনা, এখন মাঠে চেঁচাচ্ছে, এইবারে তোর বেডরুমে এসে হুল্লাট করবে… হুহু বাবা, আপনি বাঁচলে বাপের নাম! চিলতে মাঠটায় উঁকি মেরে দেখা গেলো, শালিখ ছটা এখনও প্রচুর মস্তিসে খেলছে। একটা ফুসফুস খালি করা শ্বাস ছেড়ে ভাবলাম চিল্লিয়ে বলি, পাঁচটার আগেই তড়িঘড়ি আজ ঘুমিয়ে পরিস তোরা। মানুষ’কে কিচ্ছু বিশ্বাস নেই।

~ • ~ • ~ • ~ • ~ • ~ • ~ • ~

পুনশ্চঃ সামান্য রম্যরচনা মাত্র… ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ 😅

Leave a comment