তো হয়েছেটা কি? বলি, বিবেকানন্দ’কে বিবেকামুন্ডন নামে একবার ডাকা হয়েছে, তো হয়েছেটা কি? খুব মিষ্টিই তো নামটা! আরে দাদা, ফাল্গুন মাসের ওই চড়া রোদ্দুরের মধ্যে, ওই অমন দুচারটে স্লিপ-অফ-টঙ্গু তো হয়ে যেতেই পারে যখন-তখন। আর ওই একটা মাত্তর ওয়ার্ডে, কি এমন মহাভারতখানা অশুদ্ধ হয়ে গেলো? এখনও বাঙালী তো ডাক্তারের কাছে ছেলেকে নিয়ে গিয়ে বলে, “দ্যাখো তো ডাক্তার, ডেলি’কে ডেলি ব্যাটার সর্দি কাশি। কমেও কমেনা। ভাল মতন ভিটামিন টিটামিন দাও’তো কিছু একটা লিখে। যাতে আর কিছু হোক না হোক, ব্যাটার রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার’টা এট্টু বাড়ে”। ইদিকে রোগীর রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ শুনে’তো ডাক্তারবাবু তো নিজেই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে! সেদিন আবার শুনতে পাওয়া গেলো, “আর বলিসনা, একটার পর একটা বিয়েবাড়ি! ফুরসতই পাচ্ছিনা। আর তোর দাদা’কে তো জানিসই, রাম ভীতুর ডিম একটা, গয়না-ফয়না বাড়ীতে রাখতেই দেবেনা! বারবার ওই ব্যাঙ্কের লক-আপে দৌড়তে কার ভাল্লাগে বল তো”? সত্যিই তো, কি ঝামেলা দেখুন তো বোনটির? ভীতু স্বামীটির অবুঝপনায়, বেচারাকে বিনাদোষে রোজরোজ কিনা যেতে হচ্ছে লক-আপে?
কিন্তু তাই বলে তো এতো হল্লারও তেমন কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। ওরে পাগল, রিস্ক’কে রিক্স, ড্রিঙ্কস’কে ডিঙ্কস, এসব তো ছেড়েই দেওয়া হয়েছে কত্তকাল। বহুল ব্যবহারে, ক্লাস এইট নাইনেই বাঙালীকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, শোনো খোকা, রিসকা কথাটা চলন্তিকা’য় আদৌ না থাকলেও, রিসকা তুমি আরামসে বলতেই পারো। আদ্দিন তোমার বাবা বলেছেন, তোমার জ্যেঠু বলেছেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলে জাস্ট বলে দেবে, ওইটেকে বাংলায় বলে ধ্বনি বিপর্যয়! খোদ বামনদেবও অ্যাপ্রুভ করেছেন! অতশত বুঝিনা বাপু, এত্তকিছুর বিপর্যয় হতে পারে তোমাদের। কি একটা করোনা’র জন্যে রাতারাতি ধস নেমে যেতে পারে সেনসেক্সে, আর এতো সামান্য একটাদুটো ধ্বনির বিপর্যয়! নন্দ’কে হালকা বদলে দিয়ে করে দেওয়া হয়েছে মুণ্ডন! তাতে কি’যে এমন মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেলো বিবেকের? ন্যাকামি যত্তসব।
এদিকে এ’তো গেলো ইংরিজির দুটো খুচরো আলোচনা। কোনোদিন সুযোগ পেলে বাঙালীর বুক চিতনো রাষ্ট্রভাষা শুনে দেখবেন! বলাই বাহুল্য, সে জিনিষ খোদ স্বামীজি শুনতে পেলে, নিজের মুণ্ডনটা বোধহয় নিজেই করিয়ে ফেলতেন। বিকেল বেলা। হাসপাতালের বেডে পিছনের পাটাতনটা বেঁকিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন তেরিয়া প্রৌঢ়াটি। কোমরটাকে একটু টেনে, আরেকটু সোজা হয়ে বসলে বুঝি মাসিমার শিরদাঁড়াটাতে আরামটা হতো খানিক বেশী। অনেকক্ষণ ধরে ট্র্যান্সলেশন করলেন মাথাফাতা খাটিয়ে, তারপরে ইতিউতি চেয়ে, সিস্টারটিকে সরাসরি ধমকের সুরে হুকুম করলেন, “অ্যায় ইধার শুনো তো লেড়কি, প্রবলেম হোতা হ্যাঁয়। মেরা পিছা করো”! সিস্টার মেয়েটি নাকি প্রথমে থম মেরে গিয়েছিল পেসেন্ট আন্টির আব্দার শুনে। যাহ্ এমনটা আবার হয় নাকি? হাসপাতালের মধ্যে ভিজিটিং আওয়ার্সে নার্স নিজে চোর-পুলিস খেললে তো পুলিস নিজেই পাকড়াও করবে! তারপরেও যখন উপর্যুপরি বার চারেক পিছা করনে’কা উদ্ধত ধমক এলো আন্টির কাছ থেকে, তখন একটু রাগত স্বরেই মেয়েটি নাকি বলেছিল, “ক্যয়া আন্টি? কিউ শোর মাচাতা? আপ খুদ ভাগো’গে, তবহি না ম্যায় আপকা পিছা কর সকতি হু”!
মাঙ্কি ক্যাপ পরা ছাপোষা ভদ্রলোক কিনবেন মাঝারি সাইজের একটা কাঁচা পেঁপে আর দুটো মাত্র কাঁচকলা। কিছুই না, অনেকদিন বাদে প্রবাসে একটু শুক্তুনি খাওয়ার ইচ্ছে জেগেছে প্রাণে! আর দ্যাখো এই বাজারের যত পাজীর পাঝাড়া দোকানীগুলোকে। পেঁপেগুলোকে বেমক্কা পাকিয়ে পাকিয়ে ইয়াব্বড়ো করে এনেছে। তারপরে ষাট সত্তর টাকা করে বেচছে এক একটা পিস। লাস্টে, নিরুপায় হয়ে একটা কিশোরবয়েসী দোকানীর কাছে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে মিহি গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “অ্যায় বাছা! তুমহারা পাস গ্রিন কালার পপায়া হ্যাঁয়? বা গ্রিন কালার কা ব্যানানা”? কিশোর দোকানদারটি কি বুঝেছিল তা জানা যায়নি শেষ অবধি! তবে অদূরে দাঁড়ানো অন্য আরেক বাজারু ভদ্রলোক কিঞ্চিত শিউরে উঠেছিলেন। হায় আমার পোড়া কপাল! যেমন এখন আচমকা শিউরোচ্ছে গোটা ইন্ডিয়া বিবেকামুণ্ডন শুনে!
বালাই ষাট! এতো হাঁউমাউ, এতো মেলোড্রামাটিক কান্নাকাটির কি আছে? কান্না চাপুন। ভুল তো সকলেরই হয়। মানুষ মাত্রেই হয়। মেরামত করে নিলেই হবে। মন্দার বোসও তো অন্য মুকুলকে বলেছিল, মিস্টেক মিস্টেক! লেগসাইডের বলটাকে ফালতু অফের দিকে ঠেলতে গিয়ে, ফসকে এক দুই বার লোপ্পা ক্যাচ দিলেও তেন্ডুলকর তবুও তেন্ডুলকরই থেকে যায়! আরে ভাই, এঁরা জাত সেলিব্রিটি। সচেতন ভাবে, টাইমলি মেরামতটা করতে জানে যে! ধুর অতো নাকফাক না কুঁচকে সেকেন্ড ইনিংসে একটা শোধবোধ করে নিলেই হল! আর আমরাও তো তাই করলাম। কৌশলো করিয়া, সেকেন্ড ইনিংস অবধি ওয়েটও করিনি। ঢিলে তো দেইনি একটা ফোঁটাও। ইটের জবাব তুড়ি মেরে তুখোড় পাটকেলে দিয়ে দিয়েছি! মোক্ষম টাইমে আমরাও তো ঠোঁটকাটার মতন ব্যাটাচ্ছেলেকে সাততাড়াতাড়ি বলেই দিলাম – “হ্যালো ডোলান”। এবারে দ্যাখ কেমন লাগে? তোকেও একটা জুতসই মিষ্টি নাম দিলাম। নাও অনেক হয়েছে। এবারে বোতলটা খোলো… ঐতিহাসিক ভুল তো একটা হয়েছিল, একটা ঐতিহাসিক ঠিক না হয় করেই দ্যাখালাম আমরা টুয়েন্টি টুয়েন্টিতে।
Leave a comment