“মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি, নিম গাছে’তে হচ্ছে শিম”। ব্যাস হয়ে গেলো! আর দেখতে হবেনা। ভারী মজা.. আগুনের মতন খবরখানা ছড়িয়ে পড়ছে দিকবিদিক। সে আপনার ফেসবুক বলুন ফেসবুক, ওয়াটসঅ্যাপ বলুন ওয়াটসঅ্যাপ। চোখ বন্ধ করে ফরওয়ার্ড বোতাম টিপলেই, পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে গ্যারান্টি দিয়ে দুটো নীল টিকচিহ্ন… আরে দাদা, অকিঞ্চিৎকর ভাবছেন কেন বলুন তো? খবরটা তো হেবি খবর, গরম খবর। নিমগাছে শিম ফলছে? আর তামাম পাবলিক হাঁউমাউ করে হামলে পড়ছে। আরে ধুর মশাই, রাখুন তো আপনাদের ছেঁদো খবরের কাগজ ফাগজ! গাড়োল একএকটা। এরম একটা তাৎপর্যপূর্ণ খবর আপনাদের আনন্দবাজারে ছাপতে ছাপতে তো সেই কালকের সকাল, আর এর মধ্যেই দেখুন, নিমগাছের খবরটা, এক্কেবারে যাকে বলে ফুলটু ভাইরাল।
ও’গো শুনছো? সীমাদি কাল রাত্তিরে গ্রুপে কি দিয়েছে দেখলে? অ্যাই সত্যি গো? অ্যাই শোনোনা, আজ তো রোববার, তুমি লক্ষ্মীটি আর গড়িমসি না করে যাও’না গো একটিবার। বুঁচকি’টা তো সকাল থেকে মাথা খেয়ে নিল নিমগাছ শিমগাছ করে। বলছে, নীলাঞ্জনা’র বাবা নাকি মেয়েকে নিয়ে অলরেডি বেরিয়ে পড়ছে। আর কি করা যাবে, অগত্যা সেই বেলেঘাটা থেকে হন্তদন্ত বাপ ক্লাস থ্রী’র মেয়েটা’র হাত ধরে সকাল সাড়ে নটার মধ্যেই স্ট্রেট নিম গাছের খোঁজে। অটো’র থেকে নেমেই পাড়ার ক্লাব আর ক্লাবের ঠিক ডানপাশ ঘেঁষে আসলামের চায়ের দোকান। নেমেই আসলামকে একটা সরল কোশ্চেন, “আচ্ছা চাচা, ওই নিমগাছটা ঠিক কোনদিকটা হবে… এদিক দিয়ে হাঁটা পথ”?
আর যাবে কোথায়? ফুসফুস নিংড়ে মার খিস্তি… মার খিস্তি। এই একটু আগেই আরেকটা গোমড়া মাল এসছিল না রে? অন্য একটা বাচ্চা মেয়ের হাত ধরে? বুঁচকিটা জুলজুল করে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। অ্যাই, খুব চুলকোয় না’রে তোদের? দুচোখে ঠুলি? নিমগাছ খুঁজতে এয়েচিস? একটা নিরীহ চা-ওলা… সকাল থেকে কিছু না হলেও গোটা তিরিশেক মানুষ তো একই সওয়াল হাঁকড়ে যাচ্ছে। হাওড়ার এনকোয়ারি কাউন্টার পেয়েচো? ধৈর্যের একটা লিমিট আছে তো না কি! আর জানেন না বুঝি? চা-ওলা’দের কঠিন কোনো কোশ্চেন করা আজকাল আইন করে নিষেধ করে দিয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হল, কি করে সামলানো যাবে এই নিমগাছের মতন অযুত নিযুত ভুয়ো খবরকে? ভয়ঙ্কর একটা জটিল প্রশ্ন কিন্তু! শুনে মুচ্ছো যাবেন’না… সাম্প্রতিক হিসেব বলছে ইন্ডিয়াতে ওয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছেন কিছু না হলেও চল্লিশ কোটি পাবলিক। গদগদ হয়ে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট এই তো সেদিন ডিক্লেয়ার করেছেন, দেশের ছাপ্পান্ন কোটি মানুষ নাকি রেগুলার ব্যবহার করছেন ইন্টারনেট। আর ইন্টারনেট মানেই সোশ্যাল মিডিয়া! ওয়াটসঅ্যাপ। আর আরও মজার বিষয়… দিনে একঘণ্টা, দুঘণ্টা না, চব্বিশ ঘণ্টা’য় গোটা দেশ অনলাইন হয়ে থাকছে মিনিমাম ষাট থেকে সত্তর শতাংশ টাইম। কি অপার মহিমা!
আর অনলাইন থাকবেনাই কেন? আনন্দ জোগানের খরচা তো নামমাত্র! তিনমাস আগে যে পেঁয়াজ বিকোচ্ছিল আশি একশো টাকার দরে, মহামহিম আম্বানি সায়েব এক জিবি করে ডেটা সেই বাজারে বেচছেন কুড়ি টাকারও কমে। দেশটাকে এককথায় চুবিয়ে রেখেছেন ডেটায়। মোটকথা গরীব, বড়লোক, নির্বোধ, সুবোধ, বাচ্চা, বড়, সাধু, মৌলবি, সব মিলিয়ে ডেটা জিনিষটা এখন সক্কলের হাতে। দাঁড়ি চুমরে রাজা বলছেন, ‘তা হ্যাঁরে? বজ্জাত পাখিটা কি বলছে রে?’ মন্ত্রী হাতজোড় করে বললে, মহারাজ পাখিটা কিন্তু মহা ধড়িবাজ। বলে কিনা, নীলাঞ্জনার বাপের ফোনে যে ধন আছে, শুধু বুঁচকির বাপ কেন রে? সারা দেশের যে কোন হাভাতে টুনির ঘরেও সে ধন আছে! বলেছিলাম না তোদের, ডেমোক্র্যসি এনে দেব! সুতরাং আর কি? চালাও পানসি বেলঘরিয়া। একটা ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ পাও, চোখ গোল্লা গোল্লা করে সিকিভাগ বা আদ্ধেকটা পড়ো, আর সোল্লাসে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে, চারটে ফাউ ইমোজি মেরে ফরওয়ার্ড করে দাও আর পাঁচটা গ্রুপে। কোন ছুতো ছাড়াই, স্রোতের পাবলিক সেই ভুয়ো খবরে কে কি বুঝলো, কে কি ভাবলো, সে সব গৌণ।
এই যে দেশের নতুন আইন সিএএ। ভাল খারাপ সে ব্যাপারে বলছিনা। সিএএ’র নিহিতার্থ প্রসঙ্গে যা’যা সংবাদ আজ অবধি ওয়াটসঅ্যাপ মারফত এসেছে, জানা যাচ্ছে তার অধিকাংশই নাকি জালি। মানে ভুয়ো! ইংরিজিতে বিবিসি কোম্পানি বলছে ফেক নিউজ। ইন্টারনেটের সূত্র অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, হতচ্ছাড়া পাকিস্তানটা নাকি কিছু না হলেও, হাজার পাঁচেক সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ব্যবহার করেছে সিএএ সম্বন্ধে ভুয়ো খবরের প্রচারে। অন্যদিকে পোস্তা গিয়ে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, উলটে পাকিস্তানের পাবলিক ইমেজ নষ্ট করতে আড়াইশোর উপর ওয়েবসাইট নাকি ভুয়ো খবর পয়দা করছে ভারত সমেত মোট ষাট পঁয়ষট্টি’টা দেশ। ভাবা যায়?
এইতো সেদিন ওয়াটসঅ্যাপে এসেছে, বিলকুল ভয় পাবেননা। কেবলমাত্র চারপাঁচ কোয়া রসুন ফুটিয়ে জলটা ঢকঢক করে সকালবেলা মেরে দিন, করোনা ভাইরাসের গুষ্টির ষষ্টীপুজো হয়ে যাবে! ঈশ চীনটা কি বোকা দেশরে বাবা! আমরা কেমন নিখরচায় টুক করে জেনে নিলাম, আর চীনেগুলো রসুন সেদ্ধ জলের টোটকাটাই জানেনা? কে আবার সেদিন ফরওয়ার্ড পাঠাল, পারলে টাটা কোম্পানির নুনটা একটু অ্যাভয়েড করে চলুন। ভুলেও ওই নুনটা খাবেননা, টাটার নুনে মারাত্মক রকমের বিষ মেশানো হচ্ছে। স্লো পয়জনিং। অন্যদিকে এক মহিলাকণ্ঠ সেদিন শান্ত ভাবে বলে দিলেন, খবরদার! স্মার্টফোনের মধ্যে গুগল’পে-ফে ব্যবহার করা এক্কেবারে বন্ধ রাখুন। আপনার কষ্টার্জিত সব টাকাপয়সা মেরে, পথে বসিয়ে দেবে আপনাকে গুগল কোম্পানি! আর সবচাইতে মজা হয়েছিল এই মাস দুয়েক আগে! খাস মুম্বই’য়ের মতন আধুনিক জায়গায়, বাপ মায়েরা তাঁদের বাচ্চাকে ইশকুলে পাঠানো বন্ধ রেখেছিল দুতিন দিন! কি না? ইশকুলে গেলেই নাকি আদরের বাচ্চাগুলোকে ধরে বেঁধে কি একটা গণ্ডগোলের টীকা দিয়ে দিচ্ছে ইশকুল থেকে। সিরিয়াল দেখা ছেড়ে ঠাকুমা পুত্রবধূকে ফোনে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “আর দুটো দিন যেতে দাও বৌমা! একটা খারাপ কিছু ইনজেকশন ঠুকে দিলে তো মারাত্মক গণ্ডগোল হয়ে যাবে”! আর ওই এক জায়গাতেই শাশুড়ির সাথে মুহূর্তে একমত হয়ে গেলো বাচ্চার মা’টি!
এখনই বোঝা যাচ্ছেনা এই উদ্ভট সমস্যার ভবিষ্যৎটা কি। ইঙ্গিতটা কোন দিকে আঙুল দেখাচ্ছে বা কি ঠিক হতে চলেছে? যুদ্ধ হবে নাকি রায়ট? লোকঠকানো ওয়েবসাইট গুলো চলবে আর কদ্দিন? কিভাবে? নাকি আদৌ এর শেষ নেই? কবজ মাদুলি হোম শান্তিস্বস্ত্যয়নের মতন চলবে আদিঅনন্তকাল ধরে। হয়ত ডেটার দাম বাড়লে অথবা সোশ্যাল মিডিয়া’র দাপাদাপি একটু হ্রাস পেলে, ক্লাবের ছেলেরা ওয়াটসঅ্যাপ ছেড়ে আবার নতুন করে ক্যারমে মন দেবে। কিমবা সেই আদিম সল্যুশনটাই হয়ত ঠিক! সময়। সময় যাবে, আর বুঁচকির বয়সটা আরেকটু বাড়লে, হয়ত সেই মেয়েটাই তার মাকে’ই নিমগাছের ভুয়ো গপ্পোটা শুনে বলবে, “ধ্যাত”।
Leave a comment