হায়না তো চায়নায় – আমাদের বিলেত যাত্রা

ধারাবাহিক লিখছিলাম ছুটি থেকে ফিরে এসে। রোজ অফিস থেকে বাড়ী ফেরার পথে। টানা চুয়াল্লিশখানা পর্ব লিখে এই তো শেষ করেছি মাত্র ক’দিন হল! তাই ভাবলাম, দেখি তো একবার পুরোটাকে একসাথে করলে জিনিষটা কেমনটা দাঁড়ায়! ব্যাস পুজোর ছুটিতে বসে করে দিলাম একসাথে আর দাঁড়িয়েও গেল। আরে বস, দাঁড়াবে না মানে? আলবাত দাঁড়াবে। তবে সত্যি কথা বলতে কি, এই গল্পের নাম কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার আগে থেকেই ঠিক হয়ে গেছিল। সেই গতবার দিওয়ালীতে যখন রাজস্থান বেড়াতে গেলাম, মা বাবা আর মাসিমাকে নিয়ে, তখনই ভেবেছিলাম ফিরেই রাজস্থান নিয়ে লিখে ফেলব দু-চার কলম, যা থাকে কপালে। আর গল্পটার নাম দেব “হায়না তো চায়নায়ে মশাই”। কিন্তু সে তো আর হলনা। আর জুন মাসের বিলেতভ্রমণের পর গল্পের নাম ‘হায়না তো চায়নায়ে মশাই’ দেখে যারা নাকটাক কুঁচকে ভাবছেন যে এ এক মন্দার বোস মার্কা মহা গুলবাজ লেখকের পাল্লায় পরা গেছে, তাঁদের বলি, খাঁটি সত্যি না হলেও, মোটামুটি রকমের সত্যি কিন্তু আমাদের এই গল্পটা। তামা-তুলসী ছুঁয়ে বলছি, একটা গল্প বলার খাতিরে সামান্য যেটুকু রং চড়াতে হয় অন্যান্য কাহিনীকারদের, সেটুকুই কেবল আছে এই গল্পে। তার চেয়ে কম বই বেশী নয়।

ধৈর্য ধরে গোটাটা পড়লেই বুঝতে পারবেন, আমাদের এই ইংল্যান্ড স্কটল্যান্ডের গল্পের অনেকটা জুড়ে রয়েছে আমার বড়কন্যা পালকি আর ছোটকন্যা আনন্দী। তাছাড়া সহচরী গিন্নি তো রয়েছেনই এ গল্পের ছত্রে-ছত্রে, পাতায় পাতায়। আমার পাশে পাশে! তাই আলাদা করে এই গল্পকে আর তাঁদের কাছে নিবেদন করলাম না! বরং এই বেড়াতে যাওয়ার গল্পটা উপহার দিচ্ছি আমার মাসিমা স্বর্গীয় আরতি মজুমদার’কে, আমার মা অলকানন্দা দাশগুপ্ত’কে আর আমার বাবা অরুণ দাশগুপ্ত’কে। মাসিমা পড়ে যেতে পারলেন না আমার লেখা গল্প, দেখে যেতে পারলেন না আমার তোলা ছবিগুলো, তাই এই লেখাটা আপনাকে উৎসর্গ করলাম মাসিমা! তবে এই প্রসঙ্গে আরও তিনজনের নামোল্লেখ না করে পারছিনা! এই সেই তিনজন যারা কিনা দিনরাত্তির আমার এই হাবিজাবি লেখাগুলো পড়েছেন ধারাবাহিকভাবে, মন দিয়ে পড়ে আবার দু একটা উটকো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, বারকয়েক বানান-ফানান শুধরে দিয়েছেন বা ওয়াটসঅ্যাপে অবিরত পাঠিয়েছেন হাততালির ইমোজি! তাঁদের কথা এখানে না বললে, ঠাটিয়ে কানের গোঁড়ায় একটা দিয়ে আমাকে তাঁরা হয়ত বলবেন ব্যাটা বেইমান, ব্যাটা একনম্বরের বজ্জাত! সেই ভয়ে এই গল্পখানা আমি দ্বিতীয়বারের জন্য নিবেদন করলাম আমার মাসি – অজন্তা ঘোষ, আমার প্রিয় বন্ধু বিদিশা সেন আর আমার অগ্রজপ্রতিম কৌশিক সেনগুপ্তকে।

বাকী পাঠক পাঠিকাদের বলি, সময় পেলে আমার গল্পটা একবার পড়ে দেখবেন। এই লেখাটাই আমার এখন একমাত্র পূঁজি!

অনির্বাণ দাশগুপ্ত
মহাষ্টমী ২০১৯

************************************************************************************

১ শুরুর কথা

ভ্রমণ সত্যিই মানুষের মনকে অনেক প্রসারিত করে। জম্মু থেকে শ্রীনগর অথবা সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার সময়ে বাসটা যখন ক্রমশ উপরের দিকে চড়াই ওঠে, তখন বাসের সকলের কোরাস গান অজান্তেই থেমে যায়। সকলের চোখ তখন জানালার দিকে, নিচে দেখতে পাওয়া যায় একটা নদী বা ভয়ঙ্কর সুন্দর এক উপত্যকা। আমার সে মুহূর্তে কেন জানিনা খুব ভগবানে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। আমি সংসারী মানুষ, একলা কোনদিন বেড়াতে যাইনি কোথাও। তার উপর খাঁটি ঘরকুনো বঙ্গসন্তান। কাজেকর্মে একলা বিদেশ ভ্রমনটমন করলেও, কোন না কোন অছিলায় হোটেলের ঘরেই রয়ে গিয়েছি শনি- রবিবারের বিকেলগুলো! শৈশবে বাবা – মায়ের হাত ধরে ট্রেনে চেপে বেরিয়ে পরতাম সহজেই, পুরী, দিঘা দার্জিলিং, ভুটান! কিন্তু এখন আর তা হয়ে ওঠেনা। এখন কাঁধ চওড়া হয়ে গিয়েছে অনেক, এখন মানুষের কৌতূহল বুঝি অনেক বেশী!

সে সময় আমাদের বাস পুণেতে। আর আমাদের বড় মেয়ে পালকি বুঝি সদ্য ইশকুলে যাওয়া শুরু করেছে। এমনিতেই সে, ওই তিন – সাড়ে তিন বছর বয়সেই, চুপচাপ ছিল বেশিরকমের। কথাবার্তা একেবারে বলতনা বললেই চলে। কেবলমাত্র কখনও জরুরি কিছু হলেই। আর তার উপরে তার নতুন ইশকুলের ইংরিজী-বলা আন্টি আর হিন্দী-বলা মাসি, এই দুয়ের দুরূহ সমাহারে পালকির শিশুমনে যে একটা বেমক্কা রকমের চাপ পড়েছিল, সে বোঝা গিয়েছিল বেশ। রোজকার ইশকুল থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক হতে, সময় নিত সে খানিকটা। ইশকুলের বড় গেটটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে, চেনা কাউকে দেখেই, একটা হালকা কৃশ হাসি। ওয়াটার বটলে চুমুক দিতে দিতে, যদি একটা আধো কথা বেরিয়ে পরে তার মুখ থেকে, সেই আগ্রহেই অফিস কেটে, সপ্তাহে এক-দুই দিন করে যাওয়া শুরু করেছিলাম ঠিক তার ছুটির সময়টাতে।

সেইরকমই একদিন বাড়ি ফিরে আসার সময়ে ক্লান্ত গলায় মেয়ে আমার বলে –

– “বাবা, এই জায়গাটার নাম কি?”
– জবাবে বললাম, “এই জায়গাটার নাম পুণে, সোনা। তুমি জানো না?”
– সে বলে, “হ্যাঁ, কিন্তু আমরা তো পুণেতে থাকি।” আবার খানিক নীরবতার পরে সে শুধোয় –
– “এটা পুণে, বাবা? এটা তো স্কুল। পুণে একটা খুব বড় জায়গা, বাবা? মস্ত বড়?”
– আমি বলি “তোমার কলকাতা মনে নেই?”
– গম্ভীর স্বরে সে জবাব দেয়, “না। পুণে কি কলকাতার মতন বড় জায়গা, বাবা?”

তারপরের কথোপকথন খেয়াল পরছেনা ঠিক। মেয়ের অনুসন্ধিৎসা আর বাপের প্রত্যুত্তর, দুয়ে মিলে কে কত’টা একে অন্যকে বুঝেছিল, সে আজ মনে পরছেনা। বাবার জবাব হয়ত ন্যায্য মেনেই, ঘাড় নেড়ে সে গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখা শুরু করেছিল। হয়ত সেদিনই প্রথম সে বুঝল, পৃথিবীটা কত্ত বড়। ইশকুল, বাড়ি দুটোই নাকি তার পুণেতে। তার ছোট্ট দুটো চোখ দিয়ে সামনে যেটুকু রাস্তা দেখা যাচ্ছে, তার চাইতে ঢের বেশি বড় এই দুনিয়াটা।

শৈশবে আমার ভূগোলের ম্যাপ দেখতে বেশ লাগত। তখন সব বাঙালী বাড়িতেই, অবশ্য করেই থাকত বইমেলার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে কেনা একটা ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস। আমার দিদিরও ছিল আর পরবর্তী কালে আমার নিজেরও। সে বইটিতে শুরুর দিকের সব মানচিত্র আর শেষের দিকে অ্যালফাবেটিক্যাল অর্ডারে লেখা থাকত দেশের নাম, রাজধানী আর জনসংখ্যা গোছের অনেক কিছু ভূগোলের তথ্য। আর দেশের নামের অন্ত্যাক্ষর দিয়ে একটা জমাটি খেলা চালু ছিল বাঙালীদের মধ্যে। ট্রেনে চাপলেই সে খেলা শুরু হয়ে যেত নিয়ম করে। এখনও হয় অবশ্য। এই যেমন, কেউ ‘এ’ দিয়ে ‘আমেরিকা’ বললে, পরবর্তী জনকে ‘কে’ দিয়ে ‘কানপুর’ বা ‘কেরালা’ বলতে হবে। সে খেলায় হারতে হয়নি কোনদিনই। দিদির বন্ধুরা বা জ্যেষ্ঠ অনেকেই তো বেশ বিস্মিত হয়ে যেতেন। ‘জে’ এর ষ্টক ফুরিয়ে গিয়ে যখন সকলে ‘যাদবপুর যোধপুর পার্কে’ গিয়ে ঠেকেছে, তখন দুম করে, নাক টিপলে দুধ বেরোনো বালক যদি ‘জর্ডন’ বা ‘জামাইকা’ বলে দেয়, তখন তো সকলের অবাক হওয়ারই কথা।

আমাদের মেয়েটি কিন্তু কথাবার্তা এখনও বেশ কমই বলে। ওই কেবলমাত্র জরুরি কিছু হলেই। তবে ম্যাপ দেখতে যে তার যথেষ্ট ঝোঁক, সে তার ওই দেশের নামের খেলা দেখলেই বোঝা যায়। তবে সে এখন সাবালিকা। বাপের সহায়তা ছাড়াই এতদিনে বুঝতেও হয়ত পেরে গিয়েছে, পৃথিবীটা সত্যিই খুব বড়। মস্ত বড়। আজ তাকে এমন একটা দেশের নাম দিতে হবে, যেটার কিনা শুরু হবে ‘ই’ দিয়ে। ধরা যাক খেলাটা শুরু করে আমি বললাম, “ইংল্যান্ড”?

************************************************************************************

২ প্রস্তুতি

ভগবানের ইচ্ছেয় আজকাল জামাকাপড়ের অভাব বিশেষ কারো একটা নেই। কেবল জামাকাপড় কেন, ছাব্বিশে মে পরবর্তী, ‘আচ্ছে-দিনের’ বাজারে তো, মধ্যবিত্তেরই নাকি আগামী পাঁচ বছরেই, হাতিশালে এক্স-এল হাতি আর ঘোড়াশালে এক্স-এক্স-এল ঘোড়া। অতএব রোজগার যখন আগামী পাঁচটা বছরে হয়ে যাবে অনায়াসে, করে নাও তোমরা যেমন খুশি খরচ। নিরামিষ জীবনকে প্রকাশ্যে না এনে, ঘুরতে ফিরতে, সকাল-সন্ধ্যায়ে, করে নাও তোমরা সস্তায়ে সওদা। তাছাড়া মোটামুটি বছরভর সুলভ দামেই হালফিলের পোশাক আকছার পাওয়া যাচ্ছে শপিং-মলে। সেটাই তো একটা বিরাট মোটিভেশন, বরং নাকি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, আমাদের দেশে আগামী পাঁচ বছরে ভয়ানক রকম সমস্যা হতে চলেছে, কাপড়জামা রাখার আলমারির। আগামী পাঁচ বছরে আলমারির ডিম্যান্ড গিয়ে দাঁড়াবে আকাশছোঁয়া! আর এখন এই শপিংমলই গোটা ইন্ডিয়াকে বেঁধে রেখেছে এক ঐক্যের সুতোয়।

সবই জানি, জানি আশাপ্রদ একটা আগামীকালের আশায়ে বাজারে সবই সস্তা, সবকিছুতেই ফিফটি পারসেন্টের উপরে ছাড়… কিন্তু তাই বলে চারজনের নামে চারটে আলাদা ছাতা আর চারখানা ক্যাটক্যাটে রঙিন রেনজ্যাকেট? এ’যেন আমার কল্পনার বাইরে! শৈশবে ইশকুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে, ভারী বৃষ্টিফিস্টি হলে, ‘থ্যাঙ্ক ইয়উ কাকু’ আর ‘প্লিজ দাদা’ বলে টুক করে ঢুকে পরতাম অচেনা লোকের ছাতার তলায়ে। আর হালকা বৃষ্টি হলে তো মাথার উপরে ডাকব্যাকের খাকী ইস্কুলব্যাগ আর তাতে অতিরিক্ত সতর্কতায়ে জড়ানো থাকতো একটা প্লাস্টিক। তাছাড়া কলকাতার বর্ষা তো কোন ছার, খোদ চেরাপুঞ্জি মার্কা মুম্বইয়ের বৃষ্টিতেও ছাতার আশ্রয় পাওয়া হয়নি কোনদিন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার গিন্নিটি নাকি কোত্থেকে জেনে এসেছেন, বিলেতের বৃষ্টি নাকি মারাত্মক রকমের ন্যাকা আর অভিমানী। সেদেশে সারাদিন নাকি আকাশের মুখভার থাকে আর ক্ষণে-তুষ্ট ক্ষণে-রুষ্ট ধরনের একটা মেয়েলী ব্যবহার। অনেকটা যেন তাঁরই মতন। যতই তাঁকে বোঝানো হচ্ছে, আরে দুম করে বৃষ্টিফিস্টি কিছু এসে গেলে, সেরকম বুঝলে, নাহয় দুপাঁচ মিনিট বেকার স্ট্রীটের বা পিকাডিলির কোন পানশালায়ে ঢুকে পড়া যাবে। কিন্তু মহিলা সুরায় নারাজ, দুনিয়ার সব ঝোঁক তাঁর তখন হালফ্যাসানের ছাতার দিকে। আর সুযোগও দারুণ… অগত্যা কি আর করা যাবে?

তা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে চারটে ছাতা আর রেনজ্যাকেট দুটোই তো হল। কিন্তু সেগুলি এবার বহন করা হবে কিভাবে? সে জিনিষগুলো সুটকেসে রেখে দেওয়ার জন্যে তো আর কেনা হয়নি। অচিরাৎ দৌড়োও তুমি আবার শপিংমলে… কিনে ফেলো, কাঁধে ঝুলোনোর আধুনিক ব্যাগপ্যাক। সেই উনিশশো উননব্বই সালের পর এই প্রথম কাঁধে ব্যাগ নিতে হবে। কালচে নীলরঙের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে আয়নার সামনে নিজেকে একবার গোপনে দেখেও নেওয়া হল। যে যাই বলুক, মন্দ লাগছেনা কিন্তু মোটেও… কেবল কেমন একটা, নিজেকে শেরপাদের মতন ঠেকল।

আর তারপর? তারপরে শুরু অন্য বিতর্ক। চারটে ছাতায় যদিবা দিব্যি সুরাহা হল বিলেতের বৃষ্টির, কিন্তু সন্ধ্যের দিকটাতে, ঝুপ করে যদি শুরু হয়ে যায় শৈত্যপ্রবাহ? যদি দুম করে সর্দিগর্মি লেগে গিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে বেঘোরে প্রাণটা যায় দুর্বলচিত্ত চাট্টি বাঙালীর? তবে কপালজোরে সেবেলায় কিন্তু নিজের জন্য খরচা হল’না বিশেষ। এক সুহৃৎ, তাঁর যাবতীয় হুগো-বস, পোলো আর গুচির সোয়েটার জ্যাকেটের ভাণ্ডার উপুড় করে দিলেন বেড়াতে যাওয়ার কথা জেনেই। আর তারপর একটা বিশ সেকেন্ড মতন দমটাকে চেপে দিয়ে, ভুঁড়িটা যথাসম্ভব সংকোচন করে, ট্রায়াল দিয়ে দিলাম। শেষে নিয়েও নিলাম তাঁর থেকে একটা বেছে। কিন্তু অন্যদিকে ছাতা ছাড়াও কেনাকাটা হয়ে চলেছে একনাগাড়ে। সে জিনিষের বিরাম নেই। মেয়ে দুজনের নতুন জামা, নতুন জুতো। মায় নতুন দুটো সুটকেস পর্যন্ত।

আর আমার গিন্নির কথা না হয় নাই বা বললাম এখানে। মোট দিন দশেক বিলেত বেড়ানোর নামে কোনো স্নেহময়ী মা যে মাত্র দু-তিন দিনেই, তিনটে ওয়েবসাইট আর চারটে শপিংমল ঘেঁটে যজ্ঞিবাড়ীর কেনাকাটা করে ফেলতে পারেন আদরের দুই আত্মজার জন্যে, তা কিন্তু না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আর কিসব তাঁর অজুহাত! তবে নাকি লোকমুখে শোনা যাচ্ছে, তাঁর নিজের সাইজও নাকি ওই মেয়েদেরই কাছাকাছি। ওই এক-দুই সুতোর হেরফের হলেও হতে পারে। মায় জুতোর মাপও নাকি তাঁদের অভিন্ন। যাক সে কথা! নিন্দুকেরা তো কত কি বলেই চলেছে অবিরত! এদিকে রওনা দেওয়ার একদিন আগেই বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে নেওয়া কমপ্লিট। আর, ভুলে যাওয়ার আগেই কিন্তু ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে, আমার জীবনের প্রথম কেনা ওই কালো ফোল্ডিং ছাতাখানা আর আদরের নীল ব্যাগপ্যাকটা। (ওটিকে কাঁধে নেওয়ার আর দুঃসাহস হলনা কিনা, বিমানবন্দরে আপিসের চেনা লোকের সাথে দৈবাৎ দেখা হয় যায় যদি!) ইতিমধ্যে পালকিকে ভিড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ট্র্যাভেল এজেন্ট কোম্পানির মেয়েটির সাথে। তবে তার ভারী কাজ কিছুই নেই। বিমানের টিকিট, ভিসা, হোটেল ভাউচার সবই মোটামুটি তৈরি এখন!

কেবল বাইরে থেকে যেন এখুনি টেনিদা ক্যাবলা হাবুল ডাকবে! কিরে প্যালা? রেডি? আর আমিও ছোটবোন আধুলির বিনুনিটা একটু টেনে দিয়েই একটা ছুট লাগিয়ে বলব, “এই’তো আসছি”।

************************************************************************************

৩ ছুটির শুরু

আমার বাবা নিজে ছবি তুলতে ভালবাসতেন খুব। আমরা কোথাও বেড়াতে গেলেই মধুপুরের ফুলের বাগানে বা পুরীর বিচে তাঁর ছেলে বউয়ের ছবি তুলে তিনি একসময়ে বেশ বিখ্যাত হয়েছিলেন। তবে বাবার সে রোগ আমার কোনদিন ছিলোনা। বেড়াতে গিয়ে দু-রিল ছবি না তুলে, বরং দু দিস্তে হাবিজাবি পদ্য লেখাই ছিল আমার একমাত্র বদভ্যাস। তবে ক্যামেরা দেওয়া মোবাইল ফোন কেনার পর থেকেই বেড়াতে যাওয়ার ছবি তোলার রীতি ও হিড়িক আমার বেড়ে গিয়েছে খুব। আজকাল কোথাও একটু একদিন দুদিনের জন্যে অবকাশ কাটাতে গেলেই, ডান-বাঁ মিলিয়ে প্রতি মুহূর্তে গোটা আটেক ছবি না তুলতে পেলে, যেন আমার তৃপ্তি হয়না পুরো। এটা’কে কিন্তু সোজা বাংলা’য়ে একধরনের ব্যামো বলে আর তার কয়েকটি মনস্তত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে দেখলাম ইন্টারনেটে। প্রথমত, আজকের দিনে মোবাইলে তোলা ছবি তোমার একেবারে ফ্রি। তোলো তুমি যত খুশি, যত চাও। আর তারপরেই দাও ঢেলে ওয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টুইটার আর ইন্সটাগ্র্যামে। আর দেখতে হবেনা, মুহূর্তে চালু হয়ে যাবে তাবৎ পাবলিকের টীকাটিপ্পনী। দ্বিতীয় কারণটি ঐতিহাসিক ও আরও নির্মম ভাবে মনস্তাত্ত্বিক। সেই নব্বইয়ের শেষাশেষি, প্রথমবার মার্কিন দেশ সফরের সময়, আমাদের সামনের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী সরকার জেঠুর থেকে ধার করে নেওয়া ইয়াশিকা ক্যামেরাটি ব্যবহার করা যায়নি, ওই ছত্রিশটি ক্লিকের পর। পুরো ফিলাডেলফিয়া শহরটা একরকম চষে ফেলেও, ও’রম কালো কৌটোয়ে ভরা কোডাক ফিল্ম কিনতে পাওয়া যায়নি কোথাও। যেমনটা কিনা পাওয়া যেতো আমাদের গোলপার্কের ফোটোফেয়ারে। সে দেশে তখন থেকেই হইহই করে চালু হয়ে গিয়েছিলো চ্যাপ্টা ডিজিট্যাল ক্যামেরা। সে কারণেই ছুটিতে বেড়িয়ে, আজকাল হাত নিশপিশ করে বুঝি দুর্লভ পারিবারিক মুহূর্তগুলিকে আটকে রাখতে? তবে যে যাই বলুক না কেন, আধুনিক দিনের স্মার্টফোন কিন্তু কিছু না হলেও, না চাইতেই একটা ক্ষিপ্ত পয়সা উশুল টাইপের সাম্যবাদের ব্যবস্থা করে দিয়েছে ভারতবর্ষে।

বেলা সাড়ে দশটায়ে দুবাইয়ের বিমান। এমিরেটস কোম্পানির। আর তার আগেই, বিমানবন্দরে ছুটির উচ্ছৃঙ্খলতা চালু হয়ে গিয়েছে কিন্তু অন্যরকম ভাবে। তবে দোষ কি তাতে? নয়ত কি প্রাতরাশে, চারটি মেদপ্রবণ মানুষের পরিবার, কেএফসি’র থেকে বিনাবাক্যব্যয়ে আটখানা ডুবো তেলে ভাজা মুরগীর মাংস কিনে নিতে পারে? যা কিনা দৈনন্দিন জীবনের নিয়মানুবর্তিতা, সংযম, অভ্যাস, সেই নিয়ম সেই শিকল ভাঙতেই তো ছুটি নেওয়া। সারাদিন একটা সচেতন হয়ে থাকতে যেন ভারী বয়েই গেছে আমাদের। এ যেন বউ দুদিনের জন্য বাপের বাড়ী গেলেই সামনের বাড়ীর বৌদির সাথে হালকা পরকীয়া করে নেওয়া!

কুরকুরে মাংস ভাজা, তার সাথে আলু ফ্রাই, আর তারই সাথে স্মার্টফোনের ক্যামেরায়ে ফ্রি’তে ছবি উঠছে মুহুর্মুহু। ছোটোকন্যাটি তো ক্যামেরার সামনে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন অঙ্গবিক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে পড়ছে, আর তার বাবার মোবাইল ফোন চলছে অবিরাম। অবশ্য তার সাথেই অনুক্ষণ চলছে তার বড় দিদিটির শাসন। বাবা আর তাঁর ছোটোবোনের অপিরিমিত হোলসেল ফটোগ্রাফিক সোল্লাস তার পছন্দ হচ্ছেনা একেবারেই। তবে ছোটকন্যা ভারী খুশ! এতো সৌভাগ্য সে কোথায় ধরে রাখবে সে বুঝে উঠতে পারছেনা!

মুম্বইয়ের বিমানবন্দর তো আমাদের মোটামুটি সকলেরই পরিচিত আর তাই বুঝি কৌতূহলটা সাড়ে দশটা অবধি ছিল বেশ কম। খানিকটা পরে বিমানে বোর্ডিং করেই, দুবাইগামী এমিরেটসের বোইং ট্রিপল সেভেন জাম্বো জেট বিমান যে কতটা বড়, কতটা আড়ম্বরপূর্ণ হতে পারে, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা ছিলোনা কন্যাদ্বয়ের। তবে এ কিন্তু তাদের গরীব বাপেরই অক্ষমতা। আগে কয়েকটা এদিক ওদিক বেড়াতে গেলেও, এই প্রথম তারা চেপেছে ইন্টারন্যাশনাল বিমানে। আর দুজনেই তখন তারা এতোটাই বিস্মিত, চমকে গিয়েছে এতোটাই, সীট বাছাবাছি নিয়েও দুজনের মধ্যে মন কষাকষি হলনা তেমন একটা কিছু। বরং চোখ ভয়ঙ্কর রকমের গোলগোল করে সামনের টিভি স্ক্রিনের ম্যাপ, টাইম জোন, আর বিভিন্ন দেশের মিউজিক আর সিনেমার সম্ভার দেখে তারা তখন এককথায়ে উত্তেজিত ও অধীর।

দুগগা-দুগগা করে বিমান ছাড়ার অব্যবহিত পরেই মেয়েরা আর তাদের মা মহিলাটি ততক্ষণে ডুবে গিয়েছে বিমানের এন্টারটেনমেন্ট সিস্টেমে। কানে গুঁজে নিয়েছেন ফ্যাশানের ইয়ারফোনটা আর আড়চোখে দেখতে পাওয়া গেলো, মহিলা একটা হালকা গোছের হলিউডি সিনেমা দেখা শুরু করলেন। মুখে এমন একটা ভাব যেন এখুনি বলবেন, “আর তোমার সাথে ফিরছিনা বাপু, এবার তুমি কেষ্টা’কে নিয়েই থাকো।” আমি তখন মনোযোগ সহকারে নজর করে চলেছি আমার বাঁদিকের আইল সীটে বসা বিদেশিনী প্রৌঢ়া মহিলাটিকে। তাঁর পাশেই যে টকটকে লাল রঙের জামা পরিহিত একমাথা ঝাঁকড়া চুলের ভদ্রলোক, উনিই কি এই বয়স্কা নারীটির স্বামী? আচ্ছা ওঁরাও কি আমাদের মতন দুবাই হয়ে লন্ডন যাচ্ছেন? আচ্ছা ওঁরা কি ব্রিটিশ? নাকি ফরাসি দেশের লোক? ওই যে সামনের সারিতে শ্যমলা মেয়েটি তাঁর পাশের লোকটির সাথে খুব হেসে কুটোপাটি হয়ে গল্প করছে, সে কি তবে তাঁর ভাই? বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল বুঝি মুম্বই’তে? আচ্ছা! সে কি ভারতীয় নাকি পাকিস্তানি? আমার পেছনের লোকটাকে দেখে হঠাৎ মনে হচ্ছিল মানুষটা বোধহয় কিউবা দেশের লোক। কেমন একটা ফিদেল ক্যাস্ট্রো ধরনের মুখ চোখ তাঁর। আর খয়েরি তামাটে দাঁড়ি। আচ্ছা লোকটা কি তবে চুরুট খায়? কি লিখছে ব্যাটা? সেও কি আমার মতন বিমানে উঠলেই হাবিজাবি পদ্য লেখে?

এইসব অর্থহীন কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত চোখ দুটো লেগে গিয়েছিলো খানিক। স্বপ্ন দেখছিলাম একটা। দেখলাম একটা ছবির দেশ। আর আমি সেই দেশের একটা বাগানে বসে, আমার নতুন কালো ছাতাটা মাথায়ে দিয়ে, চুপচাপ একের পর এক হিট পদ্য লিখে চলেছি নির্বিকারে।

চোখটা যখন খুলেছি, তখন নিচটা বেশ দেখা যাচ্ছে। অনেকটা কাছে থেকেই আর সে রং তখন নীল বদলে উজ্জ্বল হলদে। এতো পুরো সিলেবাসের বাইরের কোশ্চেন। ঢেউখেলানো মাইলের পর মাইল বালি। আর বিমানের গতি দেখলাম তখন অপেক্ষাকৃত কম। বিমানে ক্যাপ্টেন একটা দ্রিমি দ্রিমি আরব্য বিটের মিউজিক চালিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে দুজন আর তাদের মা’কে একপলক দেখে নিলাম। ক্লোজ আপে তুলে নিলাম তাঁদের একখানা ছবি আর ভাবলাম, আরে! আমাকে তো এখন আর পদ্য’র খসড়া লিখলে চলবেনা। সামনে তো আমার অনেক কাজ। ডায়েবাঁয়ে চোখ বুলোচ্ছি আর ঠিক তখনই আমাদের ক্যাপ্টেন সীটবেল্ট বেঁধে নিতে হুকুম দিলেন। আমাদের বিমানটা হেলেদুলে দুবাইয়ে অবতরণ করতে চলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর ঘড়িতে এখন বেলা সাড়ে বারোটা।

************************************************************************************

৪ দুবাই থেকে সটান বিলেতে

বিলিতি পাউন্ডের সঙ্গে পকেটে শ’তিনেক দিরহাম নিয়ে যাওয়ার কথা, বন্ধু অমিতাভ সাহা কিন্তু বারবার কান কামড়ে বলে দিয়েছিল। আর ঠিক সময়ে, তাঁর সে প্রস্তাব শুনিনি বলে, শেখেদের বিমানবন্দরে এসে পরতে হল হালকা আর্থিক ঝামেলায়। অবশ্য তার জন্যে দায়ী দুবাইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর আমার অনাবশ্যক কড়া সতর্কবাণী। যেটা কিনা আজকে ফলেনি একেবারেই। ছুটি শুরুর আগে, অ্যাদ্দিন ধরে মেয়েদের ও তাদের মা’কে বার চল্লিশেক দুবাইয়ের যাচ্ছেতাই বুক ধড়ফড় করা সিকিউরিটি চেকের গল্প শুনিয়েছিলাম উঠতে বসতে। এমনকি এ’ও বলে রেখেছিলাম, দরকারে জামাপ্যান্ট ধরে টানামানি করতেও ঘাবড়াবেনা দুবাইয়ের সাঙ্ঘাতিক পুলিস। আমাদের নাকের জলে চোখের জলে করে, টেররিস্ট প্রমাণ করে দেবে যে’কোন সময়ে। আর সে চিন্তায়, তিন নারীই যে এরোপ্লেন থেকে নামার পর, খানিকটা হলেও স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল বেশ। এই বুঝি ইমারতি পুলিসের দল মাস্তানি শুরু করে একটা জুতসই থাপ্পড় কষিয়ে দিল গিন্নির গালে! আমি হনহনিয়ে হাঁটছি আর আড়চোখে দেখতে পাচ্ছি, ছোটজন এদিকে বেশ ঘেমে নেয়ে উঠেছে। ভাবছে, অপমানিত যখন তাঁদের হতেই হবে এবার তাহলে করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে! তবে সবের মধ্যে গিন্নির হাঁপর টানা হাঁটা দেখলাম কেমন একটা শ্লথ আর অনুগত রকমের হয়ে গিয়েছে!

তারপরে সেই বিখ্যাত চেকিং ব্যাপারটাই একদম নির্ঝঞ্ঝাটে নির্বিঘ্নে মিটে যাওয়াতে, তিন জনের মধ্যেই এখন দেখা যাচ্ছে একটা অদ্ভুত অসংশয়ী প্রত্যয়। আর তারপরেই, একটু অগোছালো নাগরিক হাঁটাচলা, আত্মপ্রত্যয়ে নিজেদের মধ্যে অকারণ হাসাহাসি আর মাঝেমধ্যেই ‘এ আবার এমন কি?” গোছের একটা মুখচোখ। পারবনা মানে? আলবাত পারব। মনে হয় এগারো সালের বিশ্বকাপটা হাতে নিয়ে সচিন তেন্ডুলকর ভারতের পতাকা জড়িয়ে ওয়ানখেড়ে স্টেডিয়ামটা একটু পায়চারি করতে বেরিয়েছেন।

ব্যস, এবারে সেই অধিক প্রত্যয়ের জন্যেই কিনা জানিনা, তিনজনেই ভরপেট বিমানের খাবার খাওয়া সত্ত্বেও, একটা কাউকে কেয়ার করিনা গোছের মুখ নিয়ে ঘোষণা করলেন, তারা এবারে নাকি শেখেদের দেশের কফি পান করবেন আর তার সাথে সামান্য কিছু স্যান্ডউইচ আর স্বাস্থ্যকর কিছু স্যালাড। লন্ডনের বিমান ছাড়তে তখনও আমাদের ঘণ্টাতিনেক বাকী। তাই তাঁদের আর দোষ দেই কিভাবে? একটু খাইখাই ব্যাপারটা তো আমাদের রক্তেই রয়েছে। সুযোগ বুঝে কনিষ্ঠাটি তো কোন একটা সাতমহলা দোকানে গিয়ে মেনু দেখেও এসেছে। ফিরে এসে চনমনে সুরে বলল বাবা, “কোন প্রবলেম নেই, সব মিলিয়ে মাত্র টু-ফিফটি থেকে থ্রী হান্ড্রেড মতন খরচ হবে আমাদের”। কিন্তু মুশকিল হল অসমঝদার বাচ্চাটি কি আর জানে, কোথায় খাপ খুলেছ বাছাধন? এ আমাদের গান্ধী ছবির দাঁত ক্যালানো রুপিয়া নয়! এ জিনিষ হল উচ্চবর্ণের দিরহাম। মেয়েটি কি আর জানে এদিকে তার বেচারা বাপের মনে যে অবিরত চলছে উনিশ ঘরের নামতা? তবে সে খেয়াল করার মতন পরিপক্বতা মেয়েদের মধ্যে দেখা গেলো রেস্তরাঁয়ে বিলটা ডেবিট কার্ডে মেটানোর সময়ে। মাত্র চারটে কফির দামই প্রায় হাজার দেড়েক ছাড়িয়ে যেতে, মহিলারা প্রত্যেকেই তখন যারপরনাই আঁতকে উঠেছেন… তারপরে আবার একশো সওয়াশো দিরহামের একটা পানসে সবজির স্যালাড। আরে বাবা, সবই তো আর তোমার স্মার্টফোনের ফটো তোলার মতন ফ্রি নয়।

ছত্রপতি শিবাজী থেকে দুবাইয়ের বিমানে ভারতীয় বা এশিয়ানদের সংখ্যাই দেখেছিলাম ছিল অধিক। লন্ডন এবারে গ্যাটউইকের বিমানে চড়তে গিয়ে দৃশ্যপট গিয়েছে আমূল পালটে। প্রায় সব যাত্রী-পর্যটকেরাই যারা গেটের বাইরে গম্ভীর মুখে অপেক্ষা করছেন, অধিকাংশই সেখানে সাদা চামড়ার সাহেব মেম। গোটা কুড়ি-পঁচিশ ব্রিটিশও রয়েছেন দেখলাম। হাতের পাসপোর্টে বাঁকা বাঁকা সোনালি অক্ষরে লেখা ইউনাইটেড কিংডম! কিন্তু তাঁদের হাবভাব আবার আমেরিকানদের চেয়েও উপর – পড়া। কেমন একটা যেন উদ্ধত বেপরোয়া হাঁটাচলা। আসলে বুঝি বাড়ী ফিরছেন তারা। ঝিমোচ্ছেন অনেকেই, কিন্তু তাঁদের দেখলাম কনফিডেন্সই আলাদা রকমের! মনে হচ্ছে যেন, দুবাইয়ের বেঞ্চিতে বসাতেই যেন সেই বিমানবন্দরের বেঞ্চিটাই ধন্য হয়ে যাচ্ছে তাঁদের নিতম্বের ছোঁয়াতে। আসলে তাঁদের জীবনে আর সমস্যাটা কোথায়? আমাদের মতন বালখিল্যের মতন অনবরত উনিশের ঘরের নামতা মুখস্থ রাখতে হয়না কিনা! যাকগে, এমনিতে হয়ত কিছু করতে পারবনা এদের, তবে ব্যাটাদের দেখে নেব ওয়ার্ল্ড কাপের মাঠে! তাই কিছুর মধ্যে কিছু না, রেগে গিয়ে বদলা নেওয়ার ব্যাপারটা সঁপে দিলাম বিরাট কোহলী’র হাতে।

তবে বিমানে উঠে খুব কাছ থেকে বিমানের ভিতরের বাকী লোকজনদের এতক্ষণ ধরে দেখলাম। আর সবচেয়ে অসংস্কৃত বিষয়টা চোখে পরল, এঁরা এঁদের বাচ্চাদের বিন্দুমাত্র শাসন করেন না। বাচ্চারা তাদের মর্জিমাফিক যেখানে খুশী সেখানে চলে যাচ্ছে, গলার শির ফুলিয়ে বেকার চেঁচাচ্ছে, মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে, জুতোর ফিতে খুলে মুখে চালান করে দিচ্ছে অনায়াসে, অন্যসীটের ঘুমন্ত মানুষকে গিয়ে বিরক্ত করে আসছে বেমালুম। কিন্তু বাপ মায়ের মধ্যে তার জন্যে কোনপ্রকারের ভ্রুক্ষেপ লক্ষ্য করলাম না। দেখলাম কথা বলেই চলেছেন অনর্গল। এদের মা’রা বুঝি তাঁদের স্বামীকে পিটিয়েই ক্লান্ত, তাই হয়ত বাচ্চা পেটানোয় আর কোন ইচ্ছে নেই। হয়ত বাড়ীতে ফিরছেন সুদূর লন্ডন বা আমেরিকায়ে। এদিকে এশিয়ান যারা আছেন, তাঁরা বিমানে ওঠার আগে শেষ মুহূর্ত অবধি সোফায়ে আধশোয়া হয়ে কথা সেরে নিচ্ছিলেন, লুধিয়ানায়ে বা লাহোরে তাঁর ভাইয়ের দিশী বউটার সঙ্গে। বুঝিয়ে বলে দিচ্ছিলেন হয়ত, উপহার দেওয়া ওই ব্যাগটা কিন্তু অরিজিনাল গুচি কোম্পানির। তোদের ওই লিঙ্কিং রোডের নকলি চিনে মাল নয়!

গ্যাটউইকের বিমানে বসে, যখন বড়টি ম্যাপে, কনিষ্ঠাটি নিজের মোবাইলে, আর তাঁদের মা পিঠ আর পা ব্যাথায়ে কাবু হয়ে ঝুঁকে পরেছেন আমার দিকে, আমি ভাবছি, যেন পরের জন্মে প্যানর প্যানর বাঙালী না হয়ে, একটা পুরদস্তুর সাহেব হয়ে জন্মাই। কিমবা এমন কোন একটা সচ্ছল ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার যে কিনা একদম অপরাধবোধহীন হয়ে বাপ-মা’কে কলকাতায় ফেলে রেখে এসে বাসা বাঁধবে আমেরিকায়ে। সারাদিন রগরগে সিরিয়াল না দেখে অথবা সত্তর কিমবা নব্বই ঘরের নামতা মুখস্ত করার চেয়ে, দেশে ফিরে আসব দু’তিন বছর বাদে বাদে। আর সঙ্গে করে নিয়ে আসব একগাদা সস্তার চকোলেট। তার সাথে ঘড়ি ব্যাগ টেপ রেকর্ডার ডিওডোরেন্ট আর সোয়েটার। আমার ছেলেমেয়েগুলো বাংলা ফাংলা না শিখে কেবলমাত্র নাক উঁচু ইংরিজিতে ফটর ফটর করবে। আর দেশে ফিরেই মিনারেল ওয়াটারের বোতল গলায় ঝুলিয়ে বিবৃতি দেবে, উফ কি গরম অথবা কি ন্যাসটি শহরটা গো তোমাদের!

এসব ভাবতে ভাবতেই আর পাশের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বাচ্ছাটির ক্রমাগত অসভ্যতা দেখতে দেখতে কখন যে সাড়ে ছয়ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে ঘড়িতে, টেরই পাইনি ভালোরকম। এই সাড়ে ছয় ঘণ্টায়ে বেশ কয়েকবার ইচ্ছে করেছে বাচ্চাটার চুলগুলি মুঠো করে সজোরে ঝাঁকিয়ে দেই একবার, কিন্তু তার দীর্ঘাঙ্গিনী তরুণী মা’টিকে দেখে সাহস করে উঠিনি। বাইরে দেখলাম তখনও বেশ রোদ, কিন্তু গ্রিনউইচ মিন টাইম বলছে, ঘড়িতে নাকি সন্ধ্যে সাড়ে আটটা! পালকি ক্লিষ্ট স্বরে অস্ফুটে বলল, বাবা! আর বোধহয় মিনিট কুড়ি বাদেই ল্যান্ড করব আমরা লন্ডন গ্যাটউইকে। বুঝলাম, মেয়ে আমার বড় তো ছিলই, আরও বুঝি বড় হয়ে গিয়েছে এই মাত্র একবেলাতেই। মনে মনে বাচ্চাটির মা’কে দুটি বাছাবাছা বাংলা আকথা কুকথা ঝেড়ে বেঁধে নিলাম সীটবেল্ট… নীচটা অদ্ভুত রকমের সবুজ! আর এবার তো আর উনিশ নয়, এবারে তো আমাদের শুরু হবে পুরো নব্বই দিয়ে গুন করবার পালা!

************************************************************************************

৫ বিলেতে প্রথম রাত

মুম্বইয়ের লোয়ার পারেলের মার্ক্স অ্যান্ড স্পেন্সার্সের দোকানটি কিন্তু, লন্ডনের কোন বড় দোকানের চেয়ে কোন অংশে কমতি নয়। ওই বিলিতি দোকান থেকেই বছরখানেক আগে কেনা একটা চারকোল কালারের হাতকাটা ফ্লিস জ্যাকেট আর হালকা কালো একটা নিউজবয় হ্যাট পরে গ্যাটউইক বিমানবন্দরে নামতে গিয়ে নিজের মনেই নিজেকে বলে উঠলাম, “অ্যা লন্ডনার হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ হোয়েয়ার ইয়উ আর বর্ন”। আর বিমান থেকে নামার সময়ে সামান্য ফচকেমি করে ইচ্ছে হচ্ছিল ক্যাপ্টেন ভদ্রলোককে একটু হাঁক দিয়ে বলে আসব কিনা, “ইয়উ ফ্লিউ সো ভেরি ওয়েল, চীফ। টেক কেয়ার মাইট”। কিন্তু সে অসভ্যতার সুযোগ আমার হলনা। কারণ আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোক, মিস্টার আলি তাঁর ফোন রিসিভ করছেন না। গিন্নি কয়েকজন মেমের পা মাড়িয়ে দিয়েছেন বোধহয়, তাঁর মাঝেমধ্যেই আমাকে মুখ ভেঙাচ্ছেন আর মৃদুকণ্ঠে খেঁকিয়ে উঠছেন! ইমিগ্রেসনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে অসহিষ্ণু স্বরে চোয়াল চেপে বললেন, “তুমি আর কোনদিকে মনটন না দিয়ে, ওই আলি না মালি কে তোমার ড্রাইভার আছেন, তাকে খুঁজে বের করো তো আগে, ও মালপত্তর পালকি আর আমি ঠিক বুঝে নেবো খন!”

হাঁটতে হাঁটতেই আলিকে চেষ্টা করলাম বার পাঁচেক। গ্যাটউইকের এ’গলি সে’গলি দিয়ে পিলপিল করে সাহেব মেম চিনেম্যানদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে, কাউকে না ঠ্যালা মেরে, কাউকে না গুঁতিয়ে, হেঁটে চলছে একটা বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবার! আলির ব্যাপারটা মাথায় না থাকলে ফিলিং’টা ভাল করে নেওয়া যেত। কিন্তু শনিবারের ভর সন্ধ্যে, দেশে তো এতক্ষণে মাঝরাত! ট্র্যাভেল এজেন্টের মেয়েটিও নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে কাদা। কাকে যে যোগাযোগ করব, তেমন কোন উটকো ঝামেলা হলে? আলি লোকটা কি তবে ঘুমিয়ে ফুমিয়ে পরলেন নাকি? এ সমস্ত দোনোমোনো’র মাঝখানেই চারজনে তখন বেশ ভ্যাবাচ্যাকা।

লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরটি অতি সাধারণ মানের। হিথরোর ধারে কাছেই আসেনা। লন্ডন হিথরোর মধ্যে যেমন একটা রাক্ষুসে দানবীয়, একটা অতিকায় ব্যাপার আছে, আর তারই সাথে আছে একটা জাদুমুগ্ধ চারুতা, সেটা পৃথিবীর আর কোনো বিমানবন্দরে দেখা যায়না সচরাচর। ইমিগ্রেসন লাইনে এসে সব এশিয়ানরাই দেখলাম রীতিমতন খাপ্পা। আর হবেন নাই বা কেন? গ্যাটউইকের ইমিগ্রেসন বলতে একটি বৃহৎ হলঘর মতন। আর তাতে দেখা গেল, আমেরিকা, ক্যানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন, জার্মানি ও আরও বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ ছাড়া সকলেরই এখানে আলাদা লাইন। মায় মেক্সিকোও আছে তাদের অ্যারিষ্টক্র্যাটিক দলে। অন্যদিকে আরও একটা লম্বা লাইন পরেছে, আর সেটা বোধহয় হলদে চামড়ার চীনে জাপানিদের। আর আমাদের মতন হাঘরে খয়েরি চামড়ার লাইন হলের এক্কেবারে অন্যদিকে। যাইহোক, লাইনের বর্ণবৈষম্য-টৈষম্য পেরিয়ে, মালপত্তরও আস্ত পেয়ে গিয়ে, গ্যাটউইক থেকে বাইরে বেরিয়েই কিন্তু আমাদের মনখুশ। কারণ ‘দাশগুপ্ত’ লেখা একটা আইপ্যাড হাতে দেখা পাওয়া গিয়েছে মিস্টার আলির। একগাল হাসলেন আমাদের দেখেই। কিন্তু এতক্ষণ কাস্টমারের ফোন ধরেননি বলে তাঁর মুখে কোন হেলদোলই নেই!

মাথায় উসকো-খুশকো সোনালি চুল, চোখে একটা আঁতেল চশমা থাকলেও, বেশ রাশভারী একটা চেহারা কিন্তু ভদ্রলোকের। নামটা শোনা থেকেই অনেকক্ষণ ধরে মতলব ভাঁজছিলাম, আলিকে আমাদের মুম্বইয়া হিন্দি একটু শুনিয়ে ছাড়ব। কিন্তু তাঁকে দেখে, এখন কেবল একটা মৃদু হ্যালো ছাড়া আর কিছুই বলে উঠতে পারলাম না। কারণ আলিবাবু দেখলাম বিলিতি সাহেবেরও বাড়া। ওই শনিবারের সন্ধ্যেয়, যে উনি হ্যাট-কোট-টাই পরিহিত নেই, সে নিয়ে এক দুইবার কাস্টমারের কাছে দুঃখপ্রকাশ করে নিলেন, কনিষ্ঠাটির হাত থেকে সুটকেস নেওয়ার সময়ে।

গ্যাটউইকের পার্কিং দেখলাম সামনেই, হেঁটে একশো মিটার দূরত্বও হবেনা। সেই পার্কিং অবধি আলির সাথে এসে, তাঁর সুবিশাল কালো মার্সিডিজ গাড়িটিতে মালপত্তর চড়ানোর সময়ে, আমরা তখন প্রত্যেকেই বেশ বিচলিত। একি রে? এখন এই এত্ত বড় মার্সিডিজ গাড়ীটার ভাড়া গুনতে হবে নাকি রে? গিন্নি দেখলাম বেশ আড়ষ্ট, তাঁর মুখে একটা ‘এ আবার কি নতুন গেরোয়ে পরা গেলো রে বাবা’ গোছের প্রশ্ন। ছোটটিও ফ্যাকাসে, এই মিস্টার আলি এইবারে তাঁর আলিশান মার্সিডিজ ট্যাক্সি ভাড়া বাবদ কত পাউন্ড তাঁর বাবার কাছে চেয়ে বসবেন, সেটাই তাঁর তখন একমাত্র জিজ্ঞাস্য। আর আমিও যে সামান্য জড়ভরত হয়ে পরিনি, তা নয়। ভয়াতুর হয়ে ভাবছি পার্সোনাল লোনের এজেন্ট ছেলেটিকে একটা ফোন মেরে দেখব কিনা; তখন আমাদের পালকিই তাঁর বাপ মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, চিন্তা কোরোনা, ট্র্যাভেল এজেন্ট মেয়েটা তো বলেইছিল, সব আমাদের প্রিপেড, পোস্টপেড কিচ্ছু নেই। পালকির কাছে সেই প্রতিশ্রুতি পেয়েই, তৎক্ষণাৎ আমরা কর্তা-গিন্নি শিরদাঁড়ার ব্যাথা, হাঁটুর ব্যাথা আর যত কিছু ব্যাথা ভুলে পুনরায় উদ্দীপিত হয়ে আলির সাথে খোশমেজাজে গল্প জুড়ে দিয়েছি।

আলির আদি বাড়ি রাওয়ালপিন্ডি (উনি অবশ্য ছোটো করে বললেন, পিণ্ডি)। শুনে ছোটটি একটু মুখ বেঁকিয়ে আমার দিকে চাইল। আমি ওদিকে আর নজর না করে শুনতে শুরু করলাম আলির গল্প! ষাটের দশকের মাঝামাঝি, আলির বাবা-চাচারা গোটা পরিবার মিলে পাকিস্তান ছেড়ে, ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দিয়েছিলেন লন্ডন। ইদানীং আলিরা থাকছেন হউন্সলো’তে। একদম বৈধ ব্যবস্থা। নিজের বাড়ি কিনে নিয়েছেন, আর এখন একেবারে পাকাপাকি রয়েছেন বিলেতে। পাকিস্তান তাদের যাওয়া হয়নি, তা প্রায় পনেরো ষোলো বছর হতে চলল। এদিকে তখন থেকে মিস্টার আলির মুখে পিণ্ডি কথাটা শুনেই কিনা জানিনা, আমাদের ছোটোটি আর তার মা বোধহয় একটু অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। বাবারে! জঈশ মহম্মদের বা লস্করই তইবার হয়ে এই আলিই আমাদের চারজনের উপরে বালাকোটের বদলা নেবেন কিনা, সেই সন্দেহই হয়ত তাদের মাথায় ঘুরছে।

সেই ফালতু ধাঁধাটা কাটাতেই আর আমি যে একসময়কার নিয়মিত লন্ডনার, সেই বিষয়টা বিশদে বোঝাতে, আলির সাথে আলগোছে বাতেলা দিয়ে ফেঁদে বসলাম ফেলথাম’এর পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ ‘লাহোরি কড়াই’ এর গল্প। আর একথা সেকথায়ে জানতে পাওয়া গেলো, ও হরি! সে রেস্তোরাঁটা অ্যাকচুয়ালি নাকি আলিরই চাচাতো ভাইদের। তারাই সাফল্যের সঙ্গে চালাচ্ছেন বিগত বিশ বচ্ছর ধরে। আর এখন তো নাকি সে রেস্তোরাঁর অনেক কটি টেকঅ্যাওয়ে ব্রাঞ্চ’ও খোলা হয়ে গিয়েছে। বিলেতে থাকাকালীন, সময় সুযোগ পেলে, আলিসাহেব নেমন্তন্নও জানিয়ে রাখলেন ফেলথাম এসে, একদিন তাঁদের দোকানের লাহোরি মটন রোল খেয়ে যাওয়ার।

এতক্ষণ মার্সিডিজ চলছিল প্রায় আশি মাইল বেগে। অর্থাৎ কিনা এটা একটা হাইওয়ে। ঘড়িতে এখন রাত সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছে, কিন্তু বাইরে দেখা যাচ্ছে এখনও বেশ উজ্জ্বল আলো। আর সেটাই বুঝি পালকি দেখছে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আর নিজের ফোনের উইকি থেকে জেনে নিচ্ছে, সামার সলিস্টিস জিনিসটা আবার কি বস্তু? স্পিড কমল বুঝি গাড়ীর। দোকানের সাইনবোর্ড পড়ে জানলাম, আমরা পৌঁছে গিয়েছি চেলসি। অর্থাৎ ম্যাপের হিসেবে কেন্সিংটন’এর একদম কাছেই। বেশ দুচারখানা পানশালা এখনও দেখলাম খোলা। সবকটার বাইরে ছোটখাটো জটলা। একটা ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ী থামার পর, বাঁদিকে ঠাহর করে দেখি একটা ছোট্ট সাইনবোর্ডে বাঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা রয়েছে – রয়্যাল বোরো অফ কেন্সিংটন অ্যান্ড চেলসি। আর তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ইম্পিরিয়াল কলেজ অফ লন্ডন। গিন্নির দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপলাম, বুঝিয়ে দিলাম, আমরা কিন্তু নির্বিঘ্নে আমাদের সাউথ কেন্সিংটনের হোটেলে পৌঁছে গিয়েছি। গাড়ী থেকে বাইরে নামতেই একটা কনকনে শীতল হাওয়া ছোবল দিল আমাদের নাকের ডগায়।

************************************************************************************

৬ লন্ডন প্রথম দিন (ক)

এদেশে আসার আগে অবধি আমাদের সকলের ধারণা হয়েছিল, লন্ডনে পৌঁছে ভয়ানক রকমের ঠাণ্ডা পেতে হতে পারে। কেন তখন যে সেই ধারণা হয়েছিল, তা এখন আমার জানা নেই! এমনকি আমাদের কনিষ্ঠা কন্যাটি তার অলীক কল্পনায়ে ভেবে রেখেছিল, যে কোনদিন হয়ত দেখা যাবে দুম করে একটু তুষারপাত হতে শুরু করেছে। কপালে মুখে বরফ নিয়ে, রুডলফের স্লেজ গাড়ী চেপে স্যাণ্টাক্লজ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আমাদের! অনেকটা সেইরকমের ভেবেই যখন ভোরের প্রথম ধূমপানটি করতে হোটেলের নিচে নেমেছি, টেনশানের মাথায় তখন আমার পরনে পুরু গরম জামা, গরম টুপি আর গলায় একটা ধুমসো মাফলার। এমন বাড়াবাড়ি সতর্ক ব্যবস্থা যে, ভেতো বঙ্গসন্তানের যেন চট করে বিলেতের ঠাণ্ডাটা না লেগে যায় কোনমতেই। হোটেলের নিচে নেমে আলাপ হল আল–মাদিদ নামের এক কাতারি ভদ্রলোকের সাথে। কাতারি হলেও, লোকটি বসবাস করেন কিন্তু ওমান দেশে। তা ধূমপান করছেন তিনিও। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও গোটা চারেক নারী পুরুষ। বাকী সকলের মতনই, মাদিদেরও পরনেও দিব্যি একটা পাতলা ছাই রঙের গোলগলা গেঞ্জি, সুতির চেক পাজামা আর পায়ে একখানা ফটফটে চপ্পল। মনে হল, সকালের সিগারেট ফুঁকে সজোরে বেগ আনবার চেষ্টা করছেন মাদিদ। নতুন জায়গার উত্তেজনায়ে কিনা জানিনা, ওই জগঝম্প গরম কাপড়ে কিন্তু প্রথমদিকটা আমার উষ্ণ লাগছিলনা তেমন। তবে আরামও যে খুব লাগছিল, সে কথা বলা যাবেনা। ঘড়িতে সকাল সওয়া-সাত, আকাশে সামান্য মেঘ থাকলেও, সূর্যোদয় কিন্তু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। মোবাইল ফোনের অ্যাপে তাপমাত্রা বলছে উনিশ, আর সেটা দেখেই প্রথম খুলে নিলাম মাফলার আর তারপরেই একে একে গরম জামা ও টুপি। বলাই বাহুল্য, সামান্য আরাম কিন্তু পাওয়া গেল ওসব ধরাচুড়োগুলি খোলার পরেই। কেন যে বাঙালী খামোখা টেনশান করে?

সারা পৃথিবীতে ইংরিজি প্রাতরাশ রীতিমতন সুবিদিত ব্যাপার। তবে কেন্সিংটনের মাঝারি মাপের হোটেলটিতে ব্রেকফাস্ট যে মামুলিই হবে, সে কিন্তু একদিক থেকে আমাদের প্রত্যাশিতই ছিল। গরু শুয়োর আমরা কেউই খাইনা বলে, আমাদের ভাগ্যে ওই রকমারি পাউরুটি, জ্যাম, মাখন, সুগন্ধি দই আর স্ক্র্যামবেল্ড ডিমভাজা। ব্রেকফাস্ট টেবিলে জানা গেল, হোটেলের কর্মচারীরা প্রত্যেকেই প্রায় ইস্ট ইউরোপীয়। জানালেন রিসেপ্সন কাউন্টারের একজন নারী। তাঁর নাম অঞ্জলি। মেয়েটার এক্কেবারে বাঙালী আদল। আঙুলে একখানা পলার আংটি পরা থাকলে আমি তো খাঁটি বাঙলাতেই বোধহয় কথা বলা শুরু করে দিতাম তাঁর সাথে। কিন্তু মেয়েটি আদতে নেপালী, আর আমি কিনা প্রথম থেকেই তাঁকে বাঙালী বলে মনে করেছি। পূর্ব ইউরোপের তথ্যটা অঞ্জলিই জানালেন আমাদের। কর্মচারীদের মধ্যে কেউ এসেছেন সুদূর এস্তোনিয়া থেকে, কেউ লাতভিয়া, কেউ বা আবার লিথুয়ানিয়ার লোক। এঁরা সকালের দিকে ব্রেকফাস্টের কাজটা সামলে দিয়েই লেগে পরেন হোটেলের হাউসকিপিং’এর কাজে। তবে অঞ্জলি জানালেন, রাতের দিকটা যারা হোটেলে থাকেন, তাদের মধ্যে একজন নাকি দক্ষিণ ভারতীয়ও আছেন। তবে সেই মহিলাটি তামিল না তেলেগু, নাকি কন্নড়, সে ব্যাপারে কোন ধারণা নেই অঞ্জলির।

শহরটা নিজের ইচ্ছেমতন, নিজের অভিরুচি অনুযায়ী ঘুরে দেখবার জন্য, বার্সিলোনা, প্যারিস, রোম, ভিয়েনা, লস এঞ্জেলেস, এমনকি খোদ নিউইয়র্কেরও হপ-অন-হপ-অফ সার্ভিস রয়েছে। তবে সকলে কিনা বলেন, পৃথিবীর সবার সেরা সার্ভিস কিন্তু এই লন্ডনের। হপ-অন-হপ-অফের হিসেবটা প্রথমেই ঠিকমতন ক্লিয়ার হচ্ছিলনা আমাদের ছোটজনের মাথায়ে। তারপরে যখন হোটেলের ব্রেকফাস্ট সেরে, হাঁটাপথে গ্লস্টার রোড আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, আর তার উলটোপিঠেই সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝকঝকে লাল রঙের হুডখোলা দোতলা বাস, তখন হপ-অন-হপ-অফের ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখে তার সহজবোধ্য হল পুরো ব্যাপারটা।

আমাদের বাস কোম্পানির নাম গোল্ডেন ট্যুরস আর সেই বাসের রং নীল। আবার আজ সকালে ছোটোটি যখন বাবার সামনে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে ছবির পোজ দিচ্ছে, পালকি আর তাঁর মা ততক্ষণে ঠিক করে নিচ্ছেন আজকের যাত্রাপথ। গ্লস্টার রোডের সামনে, প্রায় একটা ছোটখাটো বোর্ড-মীটিং গোছের সেরে নিচ্ছে দুজনেই। মীটিং’এর পরে মীমাংসা হল, প্রথমেই রেড লাইন ধরে বাকিংহ্যাম প্যালেসে গিয়ে দেখে নেওয়া হবে ‘চেঞ্জ-অফ-গার্ডস’, তারপরে হাঁটাপথে, আর নয়ত আবার কোম্পানির বাসে চেপে, বিগবেন-ওয়েস্ট-মিন্সটার দেখে টেমস নদীর উপরের ওয়াটারলু ব্রিজ পেরিয়েই ধরে নিতে হবে কোম্পানির অরেঞ্জ লাইনের কোন একটা চলতি বাস। ফের ওই অরেঞ্জ লাইন ধরেই আমাদের পৌঁছে যেতে হবে মোমের ভাস্কর্যের জাদুঘর মাদাম-তুসোতে। মধ্যেখানে সময়সুযোগ হলে রাস্তায়ে কিঞ্চিত আহার। নয়ত বলা যায়না, তুসোর জাদুঘর আবার বন্ধফন্ধ হয়ে যেতে পারে বেলা চারটের আগেই। গিন্নির কোন বন্ধু নাকি পইপই করে বোলএ রেখেছে তাঁকে! আর আরও কি? পালকি বলছে, আবার আজকেই নাকি টিকিট কাটা রয়েছে টাওয়ার অফ লন্ডন এবং টেমস নদীর উপরে নৌকাবিহারের। কি প্রবলেম রে বাবা! সে টিকিটটাও তো আবার নষ্ট হতে দেওয়া যায়না! গিন্নি মুখ ভেংচে বললেন, তোমাকে আগেই বলেছিলাম, দুদিনের বদলে অ্যাট লিস্ট চারদিন রাখো লন্ডন, আমার কথা তো আর শুনবেনা! কথা না বাড়িয়ে দেখলাম পালকি হাঁটা দিয়েছে আগে। সামনে অনেক কাজ, অনেক হাঁটা। সম্পূর্ণ একটা কর্মশীল দিন।

বলতে না বলতেই দেখা গেল সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা নীল রঙের দোতালা বাস। অনেকটা যেন আমাদের এল-নাইনের মতন… যা থাকে কপালে…। ‘জয়-মা-কালী’ বলে উঠে পরা গেল বাসটার উপরতলায়।

************************************************************************************

৭ লন্ডন প্রথম দিন (খ)

কমপক্ষে হাজার কুড়ি লোকের জন্য মাত্র তিনখানা পুলিশ দেখে ভাবছিলাম, ব্যাটারা নিশ্চয়ই কোথাও প্লেন ড্রেসের খোঁচর রেখেছে। ঘাপটি মেরে বসে আছে ব্যাটারা এদিক ওদিক। আরে ভাই! ফেমাস স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বলে কথা। এত’টা কাঁচাকাজ কি আর তারা করবে? আর বাস্তবিকই, আশেপাশের দুচারজন সাহেবের অগ্নিমূর্তি হাঁটাচলা দেখে, ভেবেও নিচ্ছিলাম তারা আদপে পুলিশ। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। তবে ভিড় আছে ভালই। রোববারের বাজার! ভিড়ের মধ্যে দুতিনটে সাহেবকে কনুই করে আর মেমেদের পা মাড়িয়ে, বাকিংহ্যাম প্যালেসের দরজার দিকে মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে এগোনোর সময়ে, ওইরকমই এক দাঁতখিচোনো সাহেবকে প্লেন ড্রেসের রক্ষী ভেবে, টুক করে সরিও বলে নিলাম একবার। কিন্তু এঁরা কি পুলিস? এঁরাও তো রোববারের সকালে রানির প্রাসাদের ছবি ওঠাতে আমারই মত ব্যস্ত দেখা গেল। অর্থাৎ কিনা, হিসেব দাঁড়ালো, ওই পুরো দশ বারো হাজার জনগণের জন্যে, সাকুল্যে ওই তিনটি রক্ষীই বরাদ্দ করেছেন সরকার বাহাদুর? আচ্ছা এঁদের কি আমাদের দেশের মতন সন্ত্রাসবাদের ভয়টয় নেই নাকি?

ওই তিনটির মধ্যে, একটিকে তো দেখছি ব্যাটা মহানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন একটা বাইসাইকেল চেপে। টহলফহল দেওয়ার মতন কিছু একটা করছেন বলে মনে হল। আরেকটি ইউনিফর্ম-ধারী লোক, সামান্য বয়স্ক, আর মনে হল, লোকটা একটু যেন আলসেও বটে। একই জায়গায়ে দাঁড়িয়ে তিনি দেশের প্রশাসন প্রয়োগ করছেন। আর সেটাও করছে ফুল স্টাইলে! মুহুর্মুহু ঠোঁটের ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে সিটি মারছে পুলিসটা। অনেকটা আমাদের বাবুঘাটের ভাসানের সময় সিভিক গার্ডের মতন। আর তৃতীয়টি তো নেহাতই বাচ্চা। হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে বেচারা সারা পৃথিবীর লোকজন সামলাতে। আরিব্বাস! এত লোক আসে প্রতিদিন সকালের চেঞ্জ অফ গার্ড দেখতে? নাকি রোববারের ছুটির দিন দেখে, আজকেই উপচে পরেছে ভিড়?

তবে দেখারই বা হাতিঘোড়া কি আছে এখানে? গার্ড তো যতই বদলানো হোক না কেন, বেচারাদের তো ওই নাক অবধি কালো ভালুকের লোমের টুপি আর লাল টুকটুকে জামা পরে নিঃশ্বাস চেপে (ও আরও অনেক কিছু চেপে) ঠায়ে দাঁড়িয়ে থাকা! রানিমা কি দেখে বুঝবেন, গতকালকের কারা ঘরে ফিরলেন আর আজকের সকালে কারাই বা তাদের বদলি ডিউটি দিতে এলেন? তারই মধ্যেমধ্যে বাচ্চা পুলিশটা পকেটমারির ভয় দেখাচ্ছে জনসাধারণকে। মেয়েরা আর তাদের মা ভদ্রমহিলা মারকাটারি রকমের স্মার্ট সেজে এসেছেন। বেস্ট বেস্ট জামাপ্যান্ট পরে, স্কার্ফ গলায়, টুপি মাথায়, হাসিখুশি ফুরফুরে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক। তাঁদের ভয় ছিল বৃষ্টির, আর সেটা যখন নেই, তখন পকেটমারি তো কোন ছাড়! বারে বারে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে, আরে তোমার কিন্তু আদ্ধেক পাউন্ড সামলে রাখার কথা! বাকী আদ্ধেক আমার পকেটে।

মা আবার একটি সদ্য কেনা ওভারসাইজড সানগ্লাস পরেছেন, আর বড়টি আবার একটি পপসিঙ্গারদের মতন ছোট্ট ক্যাট আই গ্লাসেস। আর তারই সাথে ছোটোটি’র বিলিতি এই প্রাসাদ নিয়ে হাজারো রকমের কোশ্চেন। পকেট সামলে, কনিষ্ঠার কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে, মেয়ে – বউয়ের একাধিক ভঙ্গিমায়ে ছবিটবি তুলে দিয়ে, যখন সবেমাত্র বাচ্চা পুলিশটির সঙ্গে একটু ভাব জমানো গিয়েছে, তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় দশটা বাজে। ভাবলাম মা’কে একটা ভিডিও কল করে নেই এইবেলা, মা ঘুমিয়ে পরার আগে। কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেলনা।

দেখা গেল, অকস্মাৎ লোকজনের ছোটাছুটি কেমন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সকলে কেমন যেন নিজেদের দখল নেওয়া জায়গাটিতে দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন শাস্তি পাওয়া স্কুল বাচ্চাটার মতন। আর আচমকা চারিধার একদম নিশ্চুপ। যেন একটা পিন পড়লেও শব্দ পাওয়া যাবে। আমার পাশেই দাঁড়ানো এক সজ্জন জাপানি লোক তো গার্ড বদলানোর বিউগল বাজনাটা কানে আসতেই, কেমন যেন একটা বিহ্বল হয়ে পরলেন। আর বিরাটকায় আরবি ঘোড়ায় চেপে বীরপুরুষ গার্ডেরা যখন একদম আমাদের সামনে এসে পরেছে, ঝমঝমাঝম করে বাজছে রানি বন্দনার বিলিতি সঙ্গীতের মুর্চ্ছনা, তখন মুহূর্তেই জাপানি দাদাটি একেবারে ধনুকের মতন বেঁকে গিয়ে প্রণিপাত করে একবার নমো করলেন বলে মনে হল। স্বভাবসুলভ ফচকেমিতে একবার জাপানি দাদাটিকে শুধু বলেছি, ‘নট দি কুইন স্যার, ওনলি হার গার্ডস’। গার্ড বদলে গেছে, আর জাপানিকে করা আমার বাজে তামাশাটি শুনেই, আচমকা দেখি দুই মেয়ের হাত ধরে, তাদের মা হাঁটা লাগিয়েছেন বহির্গমনের পথের দিকে। কি না? জাপানিকে এমন প্রহসনটা নাকি উনি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। অগত্যা একটা অনর্থক কৌতুকের জন্যেই আমাদের বাকিংহ্যাম প্যালেসের গল্প ওইখানেই শেষ করে, হাঁটা লাগালাম গোল্ডেন ট্যুরস এর বাসস্টপের দিকে। পরবর্তী বাস আসতে সময় নেবে মিনিট পাঁচেক মতন। ততক্ষণে ‘আর জীবনে কোনদিন জাপানিদের কোনপ্রকার উপহাস করবনা’ বলে বারচারেক দিব্যি কাটা হয়ে গিয়েছে মা-কালীর নামে। আর এ ধরনের কোনও রকমের দুষ্টুমি দেখলে, সে নাকি সোজা প্লেন ধরে ইন্ডিয়া।

এইসব অনুপযোগী খুনসুটি আর ঝগড়াঝাঁটির মধ্যেই, বিগবেন আর ওয়েস্ট মিন্সটার যে পেরিয়ে গিয়েছে, সে খেয়াল করা হয়নি একেবারেই। তাছাড়া বিগবেনে অল্পবিস্তর মেরামতি বা কি একটা সংস্কারের কাজ চলছে, তাই সে ঘড়িটুকুন দেখা গেলেও, টাওয়ার কিন্তু আগাপাশতলা কালো তেরপলে ঢাকা। তবে আগে থেকে এত ছবি দেখা, এত ওয়েবসাইট ঘাঁটা সত্ত্বেও, নীল বাসের ইয়ারফোনে বারংবার ঘোষণা সত্ত্বেও, ওয়েস্টমিন্সটারটা কিভাবে যেন মিস হয়ে গেছে আমাদের। তাহলে কি পার্লামেন্ট, ওয়েস্টমিন্সটার এবে, লন্ডন আই, সাউথ ব্যাঙ্ক, এ সবই ফসকে গেল নাকি? গিন্নি একটা অভিযোগ মার্কা চাহনি দিলেন আমার দিকে! বললেন, সারাদিন এমন চ্যাংড়ামি করোনা, কিস্যু খেয়াল থাকেনা তোমার! নাও, এবার শুরু হল, সব ব্যাটাকে ছেড়ে এবার গেঁড়ে ব্যাটাকে ধর।

************************************************************************************

৮ লন্ডন প্রথম দিন (গ)

আচ্ছা, ইতিহাস মানেই কি রাজারানিদের গল্প? তবুও আমাদের বৈদিক যুগ, মহেঞ্জোদারো হরপ্পা অবধি ঠিকঠাক চলেছিল। তারপরেই কোত্থেকে যে দুম করে চলে এল মহামতি অ্যালেক্সান্ডার, আর তার সাথে সাথেই একধার দিয়ে সরলরেখায়ে চলতে শুরু করল মগধ, মৌর্য, চোল, কুষাণ, গুপ্ত, পাল, ইত্যাদি। আর তারপরে সেই লাইন দিয়েই শুরু হয়ে গেল সুলতান, মুঘল, মারাঠা, ব্রিটিশ, গান্ধী, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এ কিন্তু ঐতিহাসিকদের একটা ভারী অন্যায়। হ্যাঁ মানছি, সাময়িক অব্যাহতি দিতে, মাঝেমধ্যে এসেছিলেন গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর বা নবরত্নের সভাসদরা। কিন্তু সেটুকুই কি যথেষ্ট, সেদিনের সমাজ, মানুষ আর তাঁদের জীবনকে বুঝতে? কে কাকে কবে যুদ্ধে হারালেন, কি ভাবে হারালেন আর ঠিক কোন সনে হারালেন, কেবল এটুকু জানলেই কি চলবে আমাদের? জাদুঘরগুলিতে ভর্তি করে রাখলেই চলবে, যুদ্ধে ব্যবহৃত বর্ম, বল্লম আর কামান? হেরে যাওয়া রাজাটির খবর কি পাওয়া যাবেনা কোথাও?

ওয়েস্টমিন্সটার গির্জা দেখে বেরিয়েই ডানহাতে টেমস নদীর উপরে যে গমগমে ব্রিজটি, সেটির নামও ওয়েস্টমিন্সটার ব্রিজ। আমাদের স্টপেজ ফসকে ততক্ষণে হাঁটা হয়ে গিয়েছে তিন-চার কিলোমিটারের মতন, আর গোড়ালির ব্যাথা কিঞ্চিত কমাতেই বুঝি ওই ব্রিজটির উপরে পশরা নিয়ে বসা, স্ট্রীটশপিং’এ তখন নজর গিন্নির। শপিং বলতে ওই ফ্রিজে লাগানোর বিভিন্ন ধরনের চুম্বক, আর হরেক রকমের ছোটোখাটো স্মারক-গিফট। গিন্নি যখন তাঁর বান্ধবীদের গিফট বাছছেন আর প্রাণপণ নব্বই ঘরের নামতা দিয়ে গুন করে চলেছেন প্রতিটি দাম লেখা স্টিকারকে, আমি মেয়েদুটোকে সামলেসুমলে একটা সিগারেট ধরিয়ে আলস্যভরে ভাবতে শুরু করলাম ইতিহাসের কথা। ভাবলাম, গির্জার গায়ে তো কেবল রাজারানিদের নামই লেখা দেখলাম। আর কয়েকজনের ব্রিফ বায়ো-ডাটা। ফলকে ফলকে ছাপা অষ্টম হেনরি, পঞ্চম ফিলিপ, দ্বিতীয় এডওয়ার্ড, প্রথম রবার্ট, ষষ্ঠ জেমস, আর শুধু এইসবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে দেখেছেন দর্শনার্থীরা। আর মাথাফাথা উঁচিয়ে, সূর্যটাকে বেশ খানিকটা ঢেকে দিয়ে, সদম্ভে দাঁড়িয়ে একটি সুবিশাল রোমান স্থাপত্যকর্ম। ওয়েস্টমিন্সটার এবি। অবশ্য নেটফ্লিক্স সিরিজে ‘দ্য কুইন’ দেখার সুবাদে, গিন্নিও দেখছিলাম সকলের মতন হামলে পরে দেখে নিচ্ছেন সেইসব। মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিচ্ছিলেন রাজারানিদের সব নামগোত্র। আর দেখলাম চারপাশের সবুজ বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন রাজরাজড়াদের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। আর নিচে রোমান হরফে তাঁদের নাম ও গুণাবলী। তাও সে লেখাগুলি এতোটাই উচ্চতায়ে, যে আমাদের তৃতীয় বিশ্বের বেঁটে মানুষের তো ঘাড়ব্যাথা হওয়ার জোগাড়। আমি একটু ইদিক উদিক করাতেই, মাঝে তো গিন্নির দুবার হুকুমও এলো, কিছু বাছাই-করা ফলকের ফোটোগ্রাফ নিয়ে নেওয়ার জন্য। কি না, সেগুলি পরে, পড়ে খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া যাবে।

একটি ভারতীয় পরিবারকে পাশে দেখে তো ভয়ঙ্কর রকমের ইংল্যান্ডীয় ইতিহাসে আগ্রহী বলে মনে হল। ঢাউস একটি ক্যামেরায়ে পেল্লায় একটি জুমলেন্স লাগিয়ে লোকটা ফটোগ্রাফি করে চলেছেন গির্জার আর আশেপাশের যাবতীয় ভাস্কর্যের। কে জানে বাবা? বিলেত বলেই বোধহয়, নইলে পোড়ার আগ্রাফোর্টে আরেকটু সময় দিলে বোধহয় ভালো করতেন ভদ্রলোক। সে দুর্গের নির্মাণকৌশলও তো আমার দেখা অন্যতম সেরা একটি ব্যাপার। সিগারেটটা শেষ করে বুঝলাম, আসলে ইতিহাস জবাব দেয়না কিছুরই। ইতিহাস উত্তর দিতে পারেনি, কতবার কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ হেঁটে গিয়েছেন এই ওয়েস্টমিন্সটার ব্রিজের উপর দিয়ে? আচ্ছা, বলুন তো, টেমস নদীতেও কি মানুষজন গঙ্গার মতন ডুব দিয়ে স্নান করেন বা অতীতে নিয়মিত করতেন? কিছু না হলেও, এটার তো জবাব দেওয়া উচিতই, দেখছি তোমরা মানে ব্রিটিশরা গোটা আটেক ব্রিজ বানিয়ে রেখেছ টেমসের উপরে, তাহলে গঙ্গার উপরে মাত্র একটা হাওড়া ব্রিজ বানিয়েই কাজ সারা হয়ে গেল কেন তোমাদের? এবার বলুন, ওই যে তরুণী নারীর দলটা ব্রিজের উপরে বসে ছবি আঁকছে, আর চারপাশে ভিড় করে রাস্তার মানুষজন উঁকি মেরে দেখছে, এ প্রচলন কবেকার? কে করেছিলেন এর শুরু? এ সব অবান্তর প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আছে, তবে ইতিহাসের কাছে নেই। ইতিহাস যে কেবল রাজাদের কথা বলে। আমাদের নয়।

তবে ব্রিজের উপরের দোকানগুলোতে একটা মজার জিনিস দেখতে পাওয়া গেল। আর সে জিনিস প্রায় সব দোকানেই রেখেছে দেখলাম। একটা ছোট্ট চারইঞ্চির বেগুনী ফ্রক পরা পুতুল। আলাদা করে না বলে দিলেও চলবে, সেটি কিন্তু বর্তমান রানিমা এলিজাবেথের একটা ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ। বোধহয় সোলার পাওয়ারে চলছে সেই আহ্লাদী পুতুলটা আর সারাটা সময় ধরে সে নিরবধি ঘাড় নেড়ে, সব্বাইয়ের মনোরঞ্জন করে চলেছে। আচ্ছা! ইংল্যান্ড তো রাজারানিদের দেশ, একটা চাঁছাছোলা কিংডম। এ জিনিস তাহলে দেশের সরকার থেকে মঞ্জুর করা হয়েছে, তার মানে? গণতন্ত্র গণতন্ত্র চিল্লিয়ে আমরা ভারতবাসীরা এত গলা ফাটাই, আমরা কি আমাদের দেশের দোকানগুলিতে এমন একটা কৌতুকপ্রদ পুতুল রাখতে পারব গান্ধীজীর বা একটা কি বেদম মজার প্রাহসনিক কার্টুন আঁকা যেতে পারে রবিঠাকুরের? ভাবা যায়, কবিগুরু সারাটা দিন আম্রকুঞ্জে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোমর হিলিয়ে চলেছেন সকলের বিনোদন করতে?

চিরায়ত মতের মনার্কি না হয় নেই আমাদের দেশে, কিন্তু যেটা রয়েছে বা গত ষাট বচ্ছর ধরে চলে আসছে, সেটিকে নিদেন অ্যারিষ্টক্র্যাসি ছাড়া কিছু বলা যাবেনা। ডেমোক্র্যাসি তো নয়ই। গণতন্ত্র এখনও আমাদের দেশে হয়ত সেই প্রাথমিক রূপেই রয়ে গিয়েছে, বিলিতিদের মতন আধুনিকতম রূপ পেতে তার এখনও দেরী রয়েছে ঢের। ব্রিজের দুধারে অসংখ্য দ্রষ্টব্য। লন্ডন আই, কান্ট্রি হল, পুরসভা, এইসব বেবাক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তো দুদিকেই। সে সব দেখতে দেখতেই এলাকার বড়দা বিগবেন বলছে দেড়টা কিন্তু বেজে গিয়েছে। গোড়ালিটা টনটন করছে ভয়ানক রকমের! মা বোধহয় ওদিকে রানি রাসমণি দেখে এই একটু পিঠটান করল। নাহ বেলা হয়ে যাচ্ছে… মোমের পুতুল দেখতে গেলে, এইবেলা দৌড়নো উচিত পা ব্যাথাফ্যথা শিকেয় তুলে।

************************************************************************************

৯ লন্ডন প্রথম দিন (ঘ)

গত দুই শতাব্দী ধরে কলকাতার পার্কস্ট্রীট, এসপ্ল্যানেড, ডালহৌসি বা বাকী সকল অ্যাংলো পাড়ায়ে যেমন বসবাস করতেন বা বসতি করার একচেটিয়া অধিকার পেতেন কেবল সাহেবসুবোরাই, তেমনই আজকের বাজারে সাউথহল, ওয়েম্বলি, হউন্সলো, হ্যারো, রেডব্রিজ বা ক্রয়ডনে একবার গিয়ে শুধু পরতে পারলেই হল। দেখা যাবে আমজনতার মাঝে বেতাজ বাদশার মতন রাজ করছেন কেবলমাত্র ভারতীয়রাই। লেসটার এলাকাটা আবার মোটামুটি ব্রিটিশদের পাড়া হলেও, দিনকে দিন নাকি সেখানে বেড়ে যাচ্ছে গুজরাটিদের সংখ্যা। অন্যদিকে ব্রিকলেনে দেখুন! অধিকাংশই সেখানে বাংলাদেশী আর নিউহ্যাম? নিউহ্যাম তো নাকি পুরোটাই প্রায় দখল করে নিয়ে বসেছে পাকিস্তানিরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভোল পালটে এখন ইন্ডিয়া কোম্পানি ইন ওয়েস্ট বললে খুব একটা ভুল বলা হবেনা। চিকেন টিক্কা মসালা আর ডালমাখনী তো প্রায় জাতীয় ডিশের পর্যায়েই চলে গিয়েছে এখানে। লালমুখো সাহেবরাও অফিস ফেরতা সে চার্ট বাস্টার জিনিষ হামলে পরে খাচ্ছেন রোজ রোজ। এই তো সেদিনই কোথায় একটা পড়লাম, ইন্ডিয়ান ফুড এখন বিলেতে এমনই জনপ্রিয় যে, বাকিংহ্যাম, কেন্সিংটন প্যালেস বা উইকেন্ডের উইন্ডসর ক্যাসলেও হ্যারি আর উইলিয়ামদের জন্যে তরিজুত করে রাঁধা হচ্ছে নিয়মিত। মোটকথায়, ভারতীয়রা আর সকল দেশের মতনই, এ দেশেও একটা বেশ ভালোরকমের উঁচু সম্ভ্রম নিয়ে বহালতবিয়তে পায়ের উপর পা তুলে আছেন।

যা দেখছি, অচিন দেশের মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর কিন্তু সে হিসেবের বাইরে নয়। অতীতে সেখানে কি ছিল, কাদের মূর্তি রাখা হয়েছিল আশির দশকে বা সত্তরের দশকে, কেউই প্রায় জানেননা। আর সে যাই থাকনা কেন, সে জাদুঘর আজকের জমানার স্রেফ ব্যবসায়িক দাবী মেনেই, একদম পাক্কা ভারতীয় পর্যটকদের মনোরঞ্জন করতেই যেন দিনকে দিন পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। তবে দেখা গেল, বাইরে কিছু অল্পসংখ্যক সাহেব মেমদের লাইন পরেছে হয়ত, কিন্তু ভিতরে ঢুকেতেই সে জায়গা একদম যেন পুরীর স্বর্গদ্বার। হিন্দিতে বা গুজারাটিতে অনর্গল কথা বলে চলেছেন প্রায় সকলেই। ভাল করে কান পাতলে হয়ত টুকটাক বাংলাও শোনা যেতে পারে এদিক ওদিক থেকে। জাদুঘরের ভিতরে এমন দেশজ সমর্থন পাওয়া যাবে, আগে থেকে জানা থাকলে, বাইরের টিকিট কাউন্টারের লালমুখো সাহেবটাকে আরও একটু কড়কে দিয়ে আসাই যেত। টিকিট আমাদের কাটা ছিল আগের থেকেই, আর সেটা বোঝাতে গিয়েই, কি একটা প্রশ্নের জবাবে ব্যাটাচ্ছেলে বলে কিনা, কুড ইয়উ প্লিজ স্পিক উইথ মি পোলাইটলি? আরে বস, আমাদের ঠাণ্ডা মাথায়ে বলা ইন্ডিয়ান ইংরিজি ওই অমনটাই। আমরা কি আর বাপু তোমাদের মতন অতশত ভাষার মার্জিত মারপ্যাঁচ জানি নাকি? একবার তো ইডেনে ইংল্যান্ডের সাথে ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে, আমাদের শুভ্রশেখর চারটে ইংরেজ সাপোর্টারকে টানা পাঁচদিন ধরে ইংরিজি বলার ভয়ে, তাদেরই প্লেয়ারদের নাম শুনিয়ে গেল। লোকগুলো আমাদের দিকে চোখ ফেরালেই শুভ্র চিল্লিয়ে বলতো, হ্যালো মাই ব্রাদার… গুচ, গ্যাটিং, ফেয়ারব্রাদার। দেখিয়ে দিতাম আমাদের ভাষায়ে যদি অহরহ কথা বলতে হত তোমাদের! ব্যাটা সন্ধি সমাস কারক বিভক্তি মিলিয়ে কেমন স্কলারশিপ পাওয়া পোলাইট ভাষা বেরোয়, পরীক্ষা হয়ে যেতো তোমাদের হাতেনাতে।

মাদাম তুসোটা যেন স্পেশাল অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পালকি আর তার ছোটো বোনটির কথা ভেবেই। দুজনেরই সব ফেভারিট ফেভারিট রকস্টার সিনেমা আর্টিস্ট আর পপস্টারেরা সব একত্রিত এক ছাদের তলায়। দু পা আগে গেলেই বাঁদিকে রিহানা, জাস্টিন বিবার, আবার খানিক ডানদিকে ঘাড় ঘোরালেই দাঁড়িয়ে আছে লেডিগাগা, ব্রিটনী স্পিয়ারস। আবার অন্যদিকে দেখলাম আমাদের মতন বুড়ো হাবড়াদের জন্যে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বিটলস, বব মার্লি বা মাইকেল জ্যাকসন। আর শুধু তাই না! বলিউডি ব্যাপারস্যাপারও বেশ মারাত্মক উত্তেজনার। মাত্তর তিরিশ পাউন্ডেই, যখন তখন শাহরুখের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ো, কাঁধে হাত দিয়ে সেলফি নিয়ে নাও সলমনের সাথে, বচ্চন সাহেবের সাথে হ্যান্ডসেক করে নাও বিনা বাধায়ে। আমার গিন্নি তো দেখলাম, প্রথম দিকটা ট্যাঁরা ঋত্বিক রোশনের আর প্রিয়াঙ্কা চোপরার সিনথেটিক টাইপের মুর্তিতে খুব একটা সন্তুষ্ট না হলেও, পরের দিকে ব্রুস উইলিস, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, লিওনার্ডো ডিক্যাপ্রিও আর টম ক্রুজ বা জর্জ ক্লুনীকে হাতছাড়া করলেন না একদম। এদিকে আমারও সুড়সুড়ি হয়েছিল জুলিয়া রবার্টসকে জড়িয়ে একটা অন্তরঙ্গ ছবি নিয়ে নেওয়ার, কিন্তু জুলিয়াটা দেখলাম ব্যাটা বড্ড বেঢপ লম্বা। আমার সাথে তাঁকে মানালনা এক্কেবারেই।

জাদুঘরের ওপর-নীচ, নকশা বা মানচিত্র গুলিয়ে যাচ্ছিল ঢুকে যাওয়ার পরেই। আর সেটা আরও ওই ঘুলমূলীয়ে গেল বলিউডী সেকশনটার পর থেকেই। তারপরে কোথাও আইনস্টাইন, কোথাও নেলসন ম্যান্ডেলা, বা আবার কোথাও খোদ চার্লি চ্যাপলিন – দেখছে আর চমকে চমকে উঠছে পালকি! দেখে নাও, মোবাইলে ছবি নিয়ে নাও আর শুধু এগিয়ে যাও জনগণের স্রোতে। যেন কুরলা স্টেশনে ট্রেনটা এসে দাঁড়িয়েছে। পেছনের পাবলিকের চাপে, আপনাকে ট্রেন থেকে নেমে যেতেই হবে। সে আপনার গন্তব্য যতই দাদার বা প্রভাদেবী হোক না কেন! কেবল সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। যাত্রাপথে কোথাও একটা স্যাঁতস্যাঁতে সিঁড়ি, কোথাও বা একটা কৃত্রিম গুহা, কখনও উপরে, কখনও নিচে, এইভাবেই চিহ্নের সাথে সাথে কন্যাযুগলের হাত চেপে এগিয়ে চলেছিলাম আমরা কর্তা গিন্নি।

হঠাৎ দেখি আকস্মিকভাবেই ট্রাফিক গিয়েছে থেমে। না, একবার তো উঁকি মেরে দেখতেই হচ্ছে। পালকিই এগিয়ে গেল আমাদের ছেড়ে। তারপরেই উত্তেজিত হয়ে সে এসে বলে, বাবা এখুনি এসো তো একবার। কি কাণ্ড দ্যাখো এইদিকে! কৌতূহল হল! কি ব্যাপার রে? স্বয়ং মাদাম তুসো নিজে এসে গেল নাকি রে? জলদি গিয়ে দেখি না, এ তুসোফুঁসো কেউ না, এ আমাদের একদম নিজের ঘরেলু ব্যাপার… একটা বড় হলঘরের ঠিক মধ্যিখানে বীরবিক্রমে গোটা দশেক স্পটলাইটের নিচে আলো করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং মোদী। ঠোঁটে একটা মন কা বাত টাইপের হাসি, আর তারপরেই চোখের পলক না ফেলে, কেবল ক্যামেরার খ্যাচখ্যাচ। দেখছি কিরকম একটা অকারণ আবেগপ্রবণ হয়ে পরেছেন পর্যটকদের সকলেই, আরে বাপরে বাপ! পুরো আস্ত মোদী সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর চিরাচরিত হাপপাঞ্জাবী, জ্যাকেট আর চুড়িদার পরে।

আর তারপরেই চট করে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া গেল, নাহ! আর নয়… আর স্পাইডারম্যান, আয়রনম্যান দেখার কোন মানে রইলনা কিছুই… চলে চল পালকি এইবারে! যা দেখার তা দেখা হয়ে গিয়েছে আমাদের! এবার না হয় বেকার স্ট্রীটের শার্লক হোমস দেখে কিছু একটা লাঞ্চ সেরে নেওয়া যাবে। কারণ মোদীকে সামনে থেকে দেখে নিলেও, পেটের খিদে কিন্তু তখনও মরেনি এতটুকুও।

************************************************************************************

১০ লন্ডন প্রথম দিন (ঙ)

ফেলুদারা ছিল তিনজন আর আমরা চার। মাদাম তুসো দেখে বেরোনোর পরেই নাকি তোপসে আর লালমোহনবাবু ফেলুদা’কে অন্ধের মত অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু কোথায় যাওয়া হচ্ছে, সেটা ফেলুদা আগে থেকে তাঁদের কিছুই খুলে বলেনি। সত্যজিৎ লিখেছেন, “এখানকার অনেক রাস্তার নাম বড় বড় পাথরের ফলকে লেখা থাকে। একটুক্ষণ চলার পর সেইরকম একটা ফলক চোখে পড়ায় ব্যাপারটা এক ঝলকে বুঝে নিলাম। রাস্তার নাম বেকার স্ট্রিট। ২২১বি বেকার স্ট্রিটে যে শার্লক হোমসের বাড়ি সে কে না জানে? ওই নম্বরে যদিও সত্যি করে কোনও বাড়ি নেই। কিন্তু কাছাকাছি নম্বর তো আছে। ফেলুদা সেইরকম একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গভীর গলায় বলল, গুরু, তুমি ছিলে বলেই আমরা আছি। আজ আমার লন্ডন আসা সাৰ্থক হল”।

সেরকমই অতি নাটকীয় কিছু একটা করতে চাইছিলাম আমাদের বাকী তিনজনের সঙ্গে। আগে থেকে কিছু না বলেকয়ে নিয়ে যাবো হাঁটিয়ে আর একদম হুট করে সামনে যখন এসে পরবে ২২১বি বেকার স্ট্রিট, ফেলুদার ওই ফেমাস ডায়লগ’টা ঝেড়ে একটু হাততালি কুড়োবো ওঁদের থেকে, এটুকুই ছিল আশা। কিন্তু বাদ সাধল গিন্নির হাঁটুর ব্যাথা, আমার গোড়ালির আর বাচ্চাদুটো তখন খিদের জ্বালায়ে ভয়ানক রকমের কাবু। চারটে বেজে গিয়েছে, এখন কিছু একটা চটজলদি খেয়ে নেওয়াটাই জরুরি বলে মনে হচ্ছিল। অতএব, শার্লক হোমসের নাটকটা না হয় একটু পরে করা যাবে, আগে তো পেটপূজো। এই ভেবেই ঢুকে পরা গেল সামনেরই একটা চালু ধাঁচের রেস্তরাঁয়ে। মাদাম তুসো থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে। দোকানটার নাম দেখলাম ব্ল্যান্ডফোর্ডস। বাইরে বড়বড় করে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে, ব্রিটিশ, ইতালিয়ান, মেডিটেরানিয়ান, ভেজিটেরিয়ান ফ্রেন্ডলি। ওই শেষেরটার লোভেই বুঝি গিন্নি আমার এককথায়ে রাজি। ভারতের বাইরে গেলে তিনি নাকি সেখানকার ম্যাগি ফুটিয়ে খেতেও একটা আঁশটে বদখৎ গন্ধ পান। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, নিরামিষ খাবার খাবেন গিন্নি, সস্তা হওয়ার চান্স তো রয়েইছে আর তাঁর ভাগ্য তেমন ভাল হলে, সেটা গন্ধবিহীনও হতে পারে।

বিলেতের রেস্তোরাঁর একটি বিশেষ ব্যাপার হল তাঁদের বসার জায়গার ব্যবস্থাটা। প্রতিটি রেস্তোরাঁরই বাইরে থাকবে কমপক্ষে তিনটে থেকে চারটে টেবিল। একদম ফুটপাথের উপরেই। আর চারিপাশে ছড়ানো ছিটনো গোটা দশেক চেয়ার। বাইরে রাখা প্রত্যেকটি টেবিলের উপড়ে অবশ্য করেই থাকবে একটা করে অ্যাশ-ট্রে, তাতে উপচে পড়ছে সিগারেট, এদিক ওদিক ছড়ানো ছিটনো ছাই আর হরেক দেশের নারী পুরুষেরা সেই বাইরের টেবিলে, কেউ দাঁড়িয়ে আর ভাগ্য ভালো থাকলে বসে, বীয়ার পান করে চলেছেন। মার্কিনীরা যেমন কোক, তেমন দেখেছি কিছু বীয়ার পান করতে পারে এই মহাদেশের মানুষগুলো! আর সে কারণেই ইউরোপের সব শহরেই ঠিক এমনটাই ব্যবস্থা। এদের নাকি এদিক সেদিক জল পান করতে ভয় লাগে, পাছে পেট মোচড় দিয়ে কলেরা হয়! তাই রাস্তার মোড়ে মোড়ে এরকম সব দোকান! এ’গুলোকে এদেশে বলে ক্যাফে। তবে এসব জায়গায়ে অজস্র বীয়ার পান করার সুব্যবস্থা থাকলেও, বিলিতি পাব বলতে ঠিক যা বোঝায়, তা কিন্তু এগুলো নয় মোটেই।

ব্ল্যান্ডফোর্ডসে জায়গা পাওয়া গিয়েছে নিচের তলায়। কাঠের একটি সিঁড়ি দিয়ে গোটা পনেরো স্টেপ নেমেই, দেখলাম থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন পানীয় আর হরেক রকমের খাবার। ছিমছাম ব্যবস্থা, অনেকটা আমাদের বুফে সিস্টেমে যেরকম দেওয়া হয়। একটা ট্রেতে তোমাকে প্লেট, চামচ, কাঁটা, ছুঁড়ি নিয়ে, তারপরে খাবারের দিকে যাওয়া। উঠিয়ে নাও তোমার পছন্দের যা কিছু খাবার, ফ্রিজার থেকে বের করে নাও তোমার পছন্দের পানীয়। যা খুশী, যত খুশি। তারপরে সব খাবারের কাউন্টারগুলোর শেষে একদম ক্যাশ কাউন্টার। সেইখানে তোমার প্রদত্ত বিল মিটিয়ে, ব্যাস… তারপরে টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়া শুরু। সব রেস্তরাঁয়ে অবশ্য এইরকম সিস্টেম নয়। হয়ত লাঞ্চের সময়কার ভিড় এড়াতেই এমনটা ব্যবস্থা করে রেখেছেন ব্ল্যান্ডফোর্ডসের কর্তৃপক্ষ।

বিলেতে এসেছি, বিলিতি খাবার দিয়ে বউনী করার জন্যে আমরা বাপ মেয়ে ফিস অ্যান্ড চিপস নিলেও, ছোটজন আর তাঁর মা কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে, ঠোঁট কামড়িয়ে এবং গন্ধটন্ধ শুঁকে শেষ অবধি পাতে নিয়ে এসেছে যথাক্রমে ভেজিটেবল লাসানে ও আলুর পাই। ফিস অ্যান্ড চিপসের সাথে একগাদা কড়াইশুঁটি দেখে পালকির সামান্য কৌতূহল হচ্ছে বুঝতে পেরে, তাকে বুঝিয়ে দেওয়া গেল ইংরেজদের কড়াইশুঁটি প্রীতির গল্প। অন্যদিকে আলুর পাই আর সবজির লাসানে, ব্ল্যান্ডফোর্ডস দোকানটা যে একদম ঝুলিয়ে ঝোল করে ছেড়েছে, সেটা মা – মেয়ের মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল। দেখলাম দুজনেই আলু আর পাই একসাথে মেখে নিয়ে লেবু চিপে আর লঙ্কার সস ঢালছে তাতে! দেখতে লাগছে যেন একদম বিবেকানন্দ পার্কের চুরমুরের মতন।

বেলা চারটের সময় অমন গুরুপাক খাওয়া। আর তার ওপরে গোড়ালিতে খয়েরি রঙের ফোস্কা, গিন্নির হাঁটু টনটন আর কন্যাদের ঘনঘন চোঁয়াঢেঁকুরে বোঝাই যাচ্ছিল আর টানা যাবেনা বেশিক্ষণ! কিন্তু আজকেই তো আবার টাওয়ার অফ লন্ডনের টিকিট কাটা, আর তারপরেই টেমসের উপরে নৌবিহারের কথাও তো লেখা রয়েছে প্ল্যানে। ম্যাপ বলছে, এইজায়গা থেকে টাওয়ার অফ লন্ডন পৌঁছতে আবার একটা অরেঞ্জ লাইনের বাস পাকড়াও করতে হবে। আর এই এতক্ষণে একটাও সেইরকমের বাস তো চোখেও পড়েনি আমাদের কারোরই। এইসব ভাবছি আর ভাবতেই ভাবতেই পায়চারি করার ভঙ্গিতেই হাঁটছি তখন আমরা। আর খাবার পরে একটা করে আইসক্রিম খাওয়ার কথাটা বাজারে ছাড়ব কিনা, সেই বিবেচনা করতে করতেই সামনে দেখি একটা বিশাল ব্রোঞ্জের রাজকীয় স্ট্যাচু। তবে না। এ সকালে দেখা ওয়েস্ট মিন্সটারের মতন রাজারাজরা কেউ নন। মুর্তিটার দেখলাম বেশ ধারালো মুখচোখ, মাথায়ে একটা মস্ত টুপি আর ঠোঁটে একটা বাঁকানো স্মোকিং পাইপ। আমাদের বাঙালীর গুরু ফেলুদা, ইনি হলে তারও গুরু শার্লক। ইয়েস, স্বয়ং শার্লক হোমস। মোবাইল ফোনে একটা ছবি তুলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে নিলাম, গুরু আজ আমার মেয়ে বউকে লন্ডন বেড়াতে আসা সাৰ্থক হল। তবে ডায়লগটার পুরোটা আর বলিনি। ওটা নাহয় আমাদের রজনী সেন রোডের জন্যই তোলা থাক।

************************************************************************************

১১ লন্ডন প্রথম দিন (চ)

ছুটিতে বউ মেয়েদের নিয়ে বিলেত বেড়াতে এসে, অবকাশের সব বিস্তারিত বৃত্তান্ত গল্পের আকারে লিখে রাখাটা, কিন্তু যা দেখছি বেশ শ্রমসাধ্য আর দুস্কর ব্যাপার। তাছাড়া পদ্যলেখা আর রীতিমতন ভ্রমণ আখ্যায়িকা – এই দুটো কিন্তু কোনমতেই এক নয়। তবুও, এদেশে অনেককাল পরে পরিবার সমেত বেড়াতে এসে, চারিপাশে যা দেখছি, যা শুনছি, সবই কেমন যেন নতুন ঠেকছে আর সবেতেই কেন জানিনা একটা বিচিত্র উথালপাথাল রকমের উত্তেজনা হচ্ছে। চারপাশে ঝাঁকেঝাঁকে মানুষ দেখছি হরেকরকম। মধ্যে মধ্যে নারী পুরুষের খুচখাচ জমায়েত। বহুসংখ্যক ছোট বড় দোকান, বাজার, ফুলের বাগান, মাঠ। লন্ডনের স্বপ্নের মতন এক একটা রাস্তায়ে বাকী দুনিয়াটার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে, গোড়ালির ফোস্কা সামলেও, বিস্মিত হয়ে পড়ছি ভিন্ন রুচি, ভিন্ন কৃষ্টি, মানুষের ভিন্নরকম চালচলন দেখে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মিছিল করে আসা অজ্ঞ এক ভাগচাষীর মতন দুচোখ ভরে দেখে নিচ্ছি লন্ডন শহরের চরম নাগরিক ব্যবহার। আর এই উত্তেজনা, এই শিশুবৎ কৌতূহলই বুঝি ছাইভস্ম লিখে রাখতে জুগিয়ে যাচ্ছে প্রেরণা।

ভ্রমণের গল্প লিখে রাখতে গেলে কিন্তু কেবল জায়গার বিবরণ, ছবি আর বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে গেলে, সেটা হবে একটি ব্যর্থ গাইডবুক। আরে মশাই, বাঙালী জাতি লেখাটাকে খুঁটিয়ে পড়বে, পড়ে টানা দশ মিনিট সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে ভাববে, তারপর কল্পনার ডানায় বেমালুম ভর করে নিজের বউ মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে আসবে লন্ডন! তবেই না লেখকের সাফল্য? লেখক যা লেখার তাতো লিখলেন, সেটা বাঙালী পাঠক পাঠিকা তো বুঝলই, কিন্তু যা লিখতে গিয়েও লিখলেন না, সেটাও যেদিন ছবির মতন দেখতে পাবে পাঠক, সেদিন হবে আসল তৃপ্তি! কে বলতে পারে! মধ্যশিক্ষা পর্ষৎ পাঠ সংকলনে ছাপিয়েও তো দিতে পারেন এই ভ্রমণের গল্প?

এই’তো সবেমাত্র ঘণ্টাখানেক আগেই টেমস নদীর উপর, ষ্টীমারে চেপে ঘুরে এলাম। শার্লক হোমস সাহেবের বাড়ী হয়ে, আমাদের পৌঁছনোর আগেই কিন্তু তখন টাওয়ার অফ লন্ডন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই আর সময় নষ্ট না’করে চলে আসা হয়েছিল টেমসের ঘাটে। একটা পেল্লায় সাইজের জলযানে কেবলমাত্র সারেঙসাহেব, তার সহকারী একজন যুবক আর আমরা চারটি মাত্র প্রাণী। কোন জেটি থেকে উঠলাম, কোন জেটিতেই বা ফিরলাম, সেসব খেয়াল নেই এখন আর সেসব তথ্য দেখলাম সত্যিই একদম গৌণ। কারণ টেমসের কালো জলে, কোন আবেগ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গঙ্গাবক্ষে যতবারই আমার চড়া হয়েছে নৌকোয়, নিজের অজান্তেই কেন জানিনা, মুখে অনায়াসে এসে গিয়েছে ভাটিয়ালী গান… রসিক নাইয়া! কউনবা দ্যাশে যাওরে তুমি, সুয়াই গাঙ বাইয়া? আমার মামা গায়। তবে সেই গানটা টেমসের উপরে থাকার সময়ে একবারের জন্যেও মনে এল’না কেন? পালকি শুনে ফিকফিক করে হাসছে, তার কাছে এটা একটা দুঃখজনক ঘটনা নয়। টেমস নদীতেও তো গঙ্গার মতন স্রোত যথেষ্টই ছিল, উজানগামী স্রোত। আচ্ছা, আমাদের এই চারজনের বদলে যদি, এই ষ্টীমারে, সুনীল, শক্তি, সন্দীপন, তারাপদ রায়েরা থাকতেন? শক্তি কি একবারের জন্যেও একটা উদ্ভট গান গেয়ে উঠতেন না? বা একটা পল্লিগীতি? একবারের জন্যেও কি তাঁর সুরার বোতলটা জলে ছুঁড়ে দিয়ে, সারেঙসাহেবের হাত থেকে স্টিয়ারিং হুইলটা কেড়ে ষ্টীমারটা চালিয়ে দিতে পারতেন না কটসওয়লড অথবা নর্থ সি’য়ের দিকে?

একটা সিগারেট ধরিয়ে আমি ভাবছিলাম চাইবাসার কথা। আর এদিকে টাওয়ার ব্রিজ, লন্ডন ব্রিজ, মিলেনিয়াম ব্রিযের পর আরও গোটা পাঁচেক নাম না জানা ব্রিজের নীচ দিয়ে সফরের পর, আজ সকালেই ঘুরে যাওয়া ওয়েস্টমিন্সটার ব্রিজের জেটিতেই নেমে পরতে হল, ঘণ্টাখানেক নৌবিহারের পর। আর সেখান থেকে গোল্ডেন ট্যুরসের রেড লাইন বাসে করে ফের গ্লস্টার রোডের পথে। ফেরার পথে এক মুহূর্তের জন্য সহসা দেখা পাওয়া গেল হাইড পার্কের। ঈশ কি দারুণ সবুজ রঙটা! কতদিন হয়ে গেল, একবারও আমাদের ময়দানে যাওয়া হয়নি! এবারে একটা পুরো দিন, সকাল থেকে সন্ধ্যে ময়দানে বসে কাটাতে হবে। সেদিন কোথায় যেন একটা পড়লাম, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার আগে থেকেই নাকি বিদেশভ্রমন করেছিলেন প্রচুর। আর নোবেল প্রাপ্তির পরে তো বেশ ঘনঘনই তাঁকে যেতে হয়েছিল বিভিন্ন বিদেশসফরে। তাঁর ‘ইউরোপ প্রবাসীর পত্র’ বা ‘পথের সঞ্চয়’ বইগুলি পড়া নেই আমার। তবুও সব দেশ ঘুরে এসে, সেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই তো আবার দেখতে বলে দিয়েছেন ঘরের সামনের শিশিরবিন্দুর কথা।
কেন্সিংটনের হোটেলটা অনেকটা শিয়ালদা স্টেশনের কাছাকাছি হোটেলগুলির মতন। অত গিঞ্জি নয়, আবার গ্র্যান্ড হোটেল তাজ হোটেলের মতন ঝাঁ চকচকে কিছু নয়! তবে এই হোটেলের ঘরটরগুলো তেমন অপরিচ্ছন কিছু না হলেও, এরকম ছোট্ট ঘরে কিন্তু গত বিশ-পঁচিশ বচ্ছর আমাদের থাকা হয়ে ওঠেনি। পালকিরা দুইবোনে মিলে তাও মোটামুটি একটা বড় ঘর পেয়ে গেলেও, আমাদের বরাতে জুটেছে সরু একচিলতে একটা অপ্রশস্ত ঘর। খাট বিছানা, বালিশ কম্বল আর জামাকাপড়ের একটা পুঁচকি ওয়ার্ডরোব। বাথরুমের উলটো দিকের দেওয়ালে কোনওরকমে ঝোলানো রয়েছে একটা টেলিভিশন। আর সেটাতে চ্যানেল বলতে, হাতে গুনে পাঁচটি থেকে ছটি। সাঙ্ঘাতিক দুঃখের বিষয়, সে পাঁচটির কিন্তু একটিতেও বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা দেখানো হচ্ছেনা। চা, কফি বানানোর গরম জলের কেটলি হোটেল থেকে একটা দিয়েছে বটে, কিন্তু তার সাথে মাত্র একটা করেই মাথাপিছু চা-পাতার ব্যাগ। বাথরুমে পানীয় জলের জন্যে, হাতে গুনে দুটো প্ল্যাস্টিকের গেলাস। পিপাসা পেলে, ওয়াশ- বেসিনের কল থেকেই জল পান করে নিতে হবে। কলের জল পান করাটা অবশ্য বিদেশে নতুন কিছু নয়।

ভ্যালু ফর মানি না পেলে কি হবে, ভেবে দেখা গেল, এসবে আমাদের অসুবিধা তেমন কিছুই নেই। সারাটা দিন তো প্রায় বাইরেই কাটানো হচ্ছে। রাতের দিকে হোটেলে ফিরে এসে প্রয়োজন তো কেবল একটা বিছানার। আর গিন্নির মতে, সেটাই যখন পাওয়া গিয়েছে, তখন হোটেল নিয়ে ট্র্যাভেল এজেন্টের সাথে হুজ্জুত করে হবে’টা কি? তাছাড়া যতটা বোঝা গিয়েছে, আজেবাজে বকে তো লাভ নেই। কেন্সিংটনের মতন বড়োলোকি জায়গায়ে কিন্তু থাকতে হলে, একটু আধটু ছোটোখাটো সমস্যা তো তোমাকে সইয়ে নিতেই হবে বাপ। হাতের নাগালে তোমার গ্লস্টার রোডের আন্ডারগ্রাউন্ড, একগাদা রেস্তোরাঁ, পাব, আরও কত কি! এই তো আজকেই যেমন টেমস নদীতে ষ্টীমার চাপার পর কেমন সুন্দর একটা ফিরতি রুটের নীল বাস ধরে ফিরে আসা গেল গ্লস্টার রোডের স্টপেজে। ক্লান্তিতে ছোটটির মুখ একটু গোমরা হয়েছিল, তাই হোটেলে ফেরার সময়ে বাটার নান আর চিকেন কোর্মা দিয়ে খাওয়া সেরে নেওয়া হল, ‘লাইট অফ ইন্ডিয়া’ রেস্তরাঁয়ে।

আজকের দিন এখানেই শেষ। গোড়ালির ফোস্কাটা বেশ জবরদস্ত পড়লেও, কালকে আবার আছে নতুন প্ল্যান, নতুন সব জায়গায়ে হানা দেওয়া। পালকিকে ম্যাপ ধরে ধরে আন্ডারগ্রাউন্ড চড়ানো আছে, আছে পিকাডিলি সার্কাসে বিকেলের চা পান করা, ট্র্যাফ্যালগার স্কোয়ারে ফটোসেশন, আর তার সাথেই আছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আর নাচ্যারাল হিস্ট্রির মিউজিয়াম দেখা। এই সব ভাবতে ভাবতেই দিনের শেষ সিগারেটটা পান করতে ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে আবার হোটেলের নিচে নামা। আকাশে একটা গাঢ় রং ধরেছে। একটি বিদেশিনী নারী ফিরে আসছেন হোটেলে। দূর থেকে ব্রিটিশই তো মনে হল তাঁকে, নতুবা মার্কিনী হবে! আমার দিকে চেয়ে মেমটি একটু হাসলেন বলেই তো মনে হয়েছিল। তার দিকে তাকিয়ে আমিও প্রত্যুত্তরে হাসতে গিয়ে কেমন একটা বিবর্ণ মতন হয়ে গেল মেয়েটির মুখখানা। ছুটে ঢুকে গেলেন হোটেলের দরজা দিয়ে! ঈশ কি বোকা আমি! সারাদিন লন্ডনে ঘুরে বেরিয়ে ভেবেছিলাম, সারা দুনিয়ার সবাই আমার ভাল বন্ধু। দিনের শেষে এখন মনে হল, আমি প্রাচ্য দেশের লোক বলেই কি এমন ব্যবহার?

************************************************************************************

১২ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (ক)

সকালে হোটেলের নিচে ঠিক সেই একই জায়গায় আল – মাদিদের সঙ্গে ফের দেখা। আজও তাঁকে দেখা গেল, কি একটা চিবোচ্ছেন আর সিগারেটে শোঁ-শোঁ করে টান মেরে বেগ আনছেন বুঝি! আর সেই করে-করে, বেচারা কিন্তু আজ বেশ উপদ্রুত। কপালে একদম বেশ কয়েকটা ভাঁজ পরে গিয়েছে। থুতনি ঝুলে গিয়েছে। আমার তো মাদিদের সঙ্গে মাত্র একদিনেরই আলাপ, তাও সে আবার মিনিট পাঁচেকের সিগারেট খাওয়ার সুত্রে, নইলে ঠিক জিজ্ঞাসা করে নিতাম ভদ্রলোকের কোষ্ঠের সেরকম কিছু প্রবলেম টবলেম আছে কিনা। আরে, আমাদের মতনই তো বয়স হবে তাঁর, হয়তো বা একটু কমসমও হতে পারে। আর এই বয়সেই তো শুরু হয় এসব ব্যাধি। আহারে! আমাদের তহবিল থেকে দু চামচে কব্জ-হর দিয়ে দিলে হয়ত’বা একটু আরাম পেতেন মাদিদ। আচ্ছা, ওমানে বা কাতারে কি ইশবগুল গোছেরও কিছু পাওয়া যায়না? ধনী দেশ বলে কেবলই পেট্রল আর ডিজেল?

আগেই বলেছি, ব্রেকফাস্টটা এ হোটেলে একেবারেই সাধারণ। আর আমাদের ছোটোজন, সে তার কেতাদুরস্ত দিদিটির মতন ব্রেকফাস্ট খেতে পছন্দও করেনা একেবারেই। একেবারে তার কাকার মতন! তাছাড়া গতকালের ডিম ভাজাতেও নাকি একটা বদখৎ আঁশটে গন্ধ পেয়েছে সে। তবে ‘না-খাওয়া’ নিয়ে দুশ্চিন্তা আমাদের চারজনের মধ্যে নেই বললেই চলে! ছোটোটির প্রাতরাশে উপোস নিয়ে সামান্য দুর্ভাবনা দেখাতেই, গিন্নি চোখ টিপে গতকাল রাতের সেই ভারতীয় রেস্তরাঁয়ে নানরুটি আর চিকেন-কোর্মার পরিমাণটা হাত দেখিয়ে কেবল মনে করিয়ে দিলেন। লাইট অফ ইন্ডিয়া দোকানের বাংলাদেশী ওয়েটার ছেলেটা – মাহরুফ না কি একটা নাম তাঁর, সহজেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন, চারজনের মধ্যে আসল খাইয়ে কেডা?

আমাদের আজকের প্রথম গন্তব্য হোটেলের থেকে অদূরেই, ন্যাচারাল হিস্ট্রির মিউজিয়াম। টিকিট কাটার কোন মাথাব্যাথা নেই, কারণ মিউজিয়ামটা সকলের জন্যেই সারা বছরই একদম ফ্রী। অকৃত্রিম একটা সুবিশাল রোমান স্থাপত্য। কড়া কিউরেটররা গাঢ় বেগুনী রঙের জ্যাকেট পরে করে তদারকিতে ব্যস্ত। আমাদের সাথে মিউজিয়াম দেখতে ঢুকেছে প্রায় গোটা পাঁচশো কোন একটা প্রাইমারি ইশকুলের বাচ্চাকাচ্চা। তাও ভাল, ওই বাচ্চাকাচ্চাগুলো সব এধার ওধার না থাকলে, এমন একটা গুরুগম্ভীর জায়গায়ে তো একটু ভয় পেয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। আমার তো বুকটা বেশ ধুকপুকই করছিল। মিউজিয়ামের দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা পেল্লায় নীল তিমির কঙ্কাল ঝোলানো রয়েছে। তবে বোঝা যাচ্ছে এ জাদুঘরের কিন্তু জাতই আলাদা। দুপাশে চলে গেছে টানা করিডোর আর মেইন হলেই, ডায়ে কোটি বছরের পুরনো মুণ্ডুহীন স্টেগোসরাস, বাঁয়ে দাঁতাল টি-রেক্সের ধড়, সামনে একটা সুবিশাল জিরাফের কাঠামো আর দু’পা এগোলেই অতিকায় অন্য কি একটা নাম না জানা স্তন্যপায়ী জীব। প্রতিটা প্রদর্শিত বস্তুর পাশ ঘেঁষে, তাঁদের বৈজ্ঞানিক বিশদীকরণ। পালকি আর তাঁর মা যা দেখার দেখছেন, ছোটটি আমার কাছ ঘেঁষে একটু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ানো। আসলে আমরা দুজনেই বুঝতে পারছিনা কিছু। যা বোঝার কেবলমাত্র বুঝে যাচ্ছে জিওলজি’র ছাত্রছাত্রীরা আর আমার গিন্নি। কোথাও ঝুঁকে পড়ছেন, কোথাও আবার অযথা বোঝার চেষ্টায়ে নখ কাটছেন দাঁতে।

ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে ঢুকে প্রথমদিকটা মোবাইলে ছবিটবি তুলেছিলাম বেশ কয়েকটা। খানিকক্ষণ পরেই যখন দেখা গেল, প্রায় কোনকিছুরই অর্থোদ্ধার করা যাচ্ছেনা, ঠিক তখনই বেরিয়ে আসতে হল। বাইরে এসে খোলা হাওয়ায়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসেছি, গরমে অসহ্যয়ও ঘাম হচ্ছে। আধঘণ্টা খানেক পরেই গিন্নি তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে হেলেদুলে বেরিয়েই বললেন, “তুমি কি বোকা নাকি? কি বলব তোমাকে! এই অ্যাদ্দুর এসেও, ফেমাস ডারউইন সেন্টারটা দেখলেনা”? আমিও মুহূর্তে নির্বিকার মুখ করে একটা কাঁচা ঢপ দিয়ে বলে দিলাম, “দেখলাম তো! সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট তো? ধুর ও জিনিস তো আমার অনেক আগেই দেখা”।

স্নায়ুচাপে ভুগলেই দেখেছি, গিন্নি আমার সাথে ঈষৎ আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। জাদুঘর থেকে বাইরে বেরিয়েই, যেইনা বলেছি, দাঁড়াও না ওই দেওয়ালটার সামনে! একটা ছবি নেই। এই আর্জি জানাতেই, খামোখা আদিম মুখঝামটা দিচ্ছেন দেখা গেল। মেয়েদেরকেও দেখলাম যেন একটু কম সক্রিয়। উদাসীন পায়ে হাঁটছে আমার সাথে সাথে। অর্থাৎ মাটির উপরে এরা চগবগে হলেও নিচের পাতাল রেলে ঢোকার ব্যাপারে কিন্তু, তিনজনেই টেনশানে ভুগতে শুরু করেছে। গত দুদিন ধরে পালকিই আমাদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম পরবর্তী কর্মসূচিতে, কিন্তু আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে পথ চিনিনা। এবারে মুখ্যভূমিকা যে বুড়ো বাপকেই পালন করতে হবে, সেটা বুঝে নেওয়া হল। আর সেই অনুসারে, খোদ লন্ডনারদের মতন আত্মবিশ্বাসী পায়ে এস্কেলেটর দিয়ে তিনটি অবলা নারীকে কোনরকম ভেবাচেকা খাওয়ার সুযোগ না দিয়ে, এক্কেবারে নিয়ে এসেছি সটান ভূগর্ভে। সাউথ কেন্সিংটন স্টেশন থেকে, কোনওরকমের সমস্যা ছাড়াই, প্রিপেড ট্র্যাভেল কার্ডটা ব্যবহার করে, স্টেশনের ভেন্ডিং মেশিনে, রীতিমতন অনায়াসে চারখানা আনলিমিটেড ট্রেনযাত্রার টিকিট কিনে ফেলার পর, গিন্নি দেখলাম পালকির কাছে তাঁর স্বামীর বিলিতি প্রযুক্তিজ্ঞানের তারিফই করছেন।

একবার বুঝে গেলেই, লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডের কিন্তু মজাই আলাদা। এমন সহজবোধ্য আর সাবলীল ভাবে কালার কোডিং করে আন্ডারগ্রউন্ডের নক্সা করেছে সাহেবরা, যেন আমার সত্তরোর্ধ বাপ- মা’কেও একা ছেড়ে দিলে, তারাও বাকিংহ্যাম থেকে বেমালুম চা-পান করে স্বচ্ছন্দে ফিরে আসতে পারবেন। রেলের ভিতরে যখন কানে হেডফোন গোঁজা জনৈক মেম যাত্রীকেও রেলের নক্সা জরিপ করতে দেখা গেল, তখনই মা আর তাঁর দুই মেয়ে দেখলাম, মোটামুটি ধরে ফেলেছে ছকটা। পালকিই দেখলাম ইশারা করল তাঁর বোনকে আর মা’কে… দরজার কাছে এসে দাঁড়াও, এর পরের স্টেশনটাই পিকাডিলি সার্কাস। রেল ঘ্যাঁস করে এসে দাঁড়ালো স্টেশনে। পিকাডিলি সার্কাস স্টেশন… দুদ্দাড় করে নামছে সব প্যাসেঞ্জার! কিন্তু নামতে গিয়ে থমকে গেছে আমাদের বাকী তিনজন। আর ঠিক তক্ষুনি কোত্থেকে যেন একটা ললিত কণ্ঠে সাবধান করে বলে উঠল, প্লিজ মাইন্ড দি গ্যাপ বিটউইন দ্য ট্রেন অ্যান্ড দ্য প্ল্যাটফর্ম”। চারজনেই হ্যাচোর প্যাঁচোর করে উঠে এলাম এস্কেলেটর চড়ে, কোন দিক দিয়ে বেরোলাম জানিনা। শুধু এটুকু জানি যে আমাদের সামনে এখন জিতা জাগতা ‘পিকাডিলি সার্কাস’। আর তার মানে, আমাদের চোখের সামনেই এক ঝাঁক পৃথিবী! পালকি দেখলাম একদম ঘাবড়ে ঘোড়া হয়ে গেছে। মুখ শুকনো করে আমাকে বলল, “বাবা এইবার”? আমি তিনজনকে দেখলাম একটু ঘাড় ঘুরিয়ে, যেন বলতে চাইলাম, জাগো বাঙালী জাগো, ঘাবড়ে গেলে চলবেনা। থামলে আমাদের চলবেনা। বেকার অজুহাত দিলে চলবেনা। চলো এবার কভার আর এক্সট্রা কভারকে বাইসেক্ট করে সৌরভ গাঙ্গুলির মতন আর একটা বাউন্ডারি মেরে আসি!

************************************************************************************

১৩ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (খ)

বাচ্চা মেয়েদুটো নিশ্চিত ভেবে রেখে দিয়েছিল পিকাডিলি সার্কাস নিয়ে যে সমস্ত বিচিত্র বর্ণনা তারা শুনেছে অ্যাদ্দিন বাবার মুখে, তার বুঝি অনেকটাই বানানো। কি এমন আশ্চর্য জায়গা এই পিকাডিলি সার্কাস যে একটা লোক সারাদিন সে জায়গার মাহাত্ম্য নিয়ে বকবক করে চলেছে? এ’কি তোমার নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার নাকি? লন্ডনে তো দেখার জায়গা কম কিছু নেই, তবুও এই পিকাডিলি পিকাডিলি করে লোকটার এতটা মাতামাতি কিসের? শেষবার ওদের বাবার পিকাডিলি সার্কাসে আসা হয়েছিল একা। দুহাজার পাঁচে। সেটাও হউন্সলো শহরতলী থেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে চেপে। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা অবধি অলসভাবে একাই বসেছিলাম আর গোটা এক প্যাকেটের কাছাকাছি সিগারেট শেষ করেছিলাম। কোন মাস কোন দিন মনে নেই, তবে সেবার মেঘ ছিল আকাশে আর মাঝেমাঝে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আজকের মতন রোদ্দুরহীন আলো নয়। সেদিন সবাই কেন জানিনা আসা যাওয়ার পথে একবার আমার দিকে চেয়ে দেখে নিচ্ছিল। হয়ত ভাবছিল বুঝি, প্রাচ্যের এক যুবক কি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে শেষমেশ পিকাডিলিতেই ঠাঁই নিল নাকি? একজন ঝাঁকড়া চুলের গায়ক বিরামহীন গান গেয়ে যাচ্ছিল। সে গান কেবল ইংরিজিতে নয়, আরও বেশ কিছু অজানা ভাষার গান শুনেছিলাম তাঁর কণ্ঠে। ল্যাটিন নাকি ফরাসী হবে বোধহয়! সেই অপরাহ্নে আমার সামনে পিকাডিলির অনেক’কটা বড়বড় বাড়ির আলো নিভে গিয়েছিলো, অজস্র দোকানপাট বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কেবল জ্বলজ্বল করছিল ওই কোনের বাড়িটার স্যানিও আর কোক লেখা বিখ্যাত নিওন সাইন দুটি।

তবে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের বাইরে বেরোতেই আজ কিন্তু একটা ছোটোখাটো বিস্ফোরণ ঘটে গেল। বিস্ফোরণই বলব, নাহলে আর কি? তিনটি নতুন মানুষের কথা প্রায় হারিয়ে গিয়েছে দেখলাম, জমজমাট পিকাডিলি সার্কাস দেখে। আরেব্বাস! কর্তার দেওয়া বর্ণনার সাথে মিলল কি মিললনা, জানা গেলনা। তবে গিন্নি তো ভুত দেখার মতন চমকে উঠেছেন মনে হল। আর তাঁকেই বা দোষ দেই কেমন করে? আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে এস্কেলেটর আর তারপরে বারো পনেরো ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উপড়ে উঠে সামনেই অবিশ্রান্ত রঙিন জনস্রোত। শ্যাফটসব্যারি মেমোরিয়ালের কালো একটা মূর্তি আর সেই চাতালটাতেই বসে আছে সাত সাগর তেরো নদীর পারের শতাধিক মানুষ। আর অদ্ভুত ব্যাপার, সেই সেদিনের মতন আজও গান গেয়ে চলেছেন এক যুবক। গীটার বাজিয়ে আর তাঁকেই গোল করে ঘিরে অজস্র মানুষ তাদের মোবাইল ক্যামেরায়ে ছবি তুলে রাখছেন, কিছু পাউন্ডের বিনিময়ে।
মেয়ে দুজন কেমন একটু ঘাবড়েই গিয়েছে মনে হচ্ছে। বিশাল একটা রাস্তার মোড়, প্রকাণ্ড কয়েকটা জটিল রাস্তা, গোটা সাতেক ট্রাফিক সিগন্যাল, ওই কোনের বাড়ীর রাক্ষুসে নিওন সাইন বোর্ডটা, সারি দিয়ে বড় ছোটো মাঝারি দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, ব্যস্তসমস্ত অফিসযাত্রী আর তার মধ্যেই শতাধিক ফুর্তিবাজ নারী পুরুষের মাঝখানে নিজেকে তখন একটু হলেও অর্থহীন লাগছিল। সেই দুহাজার পাঁচেও মনে হয়েছিল, এ আবার কোথায় এসে পরলাম রে বাবা? হুঁশ করে পাশ কাটিয়ে, কে একটা চোখ ধাঁধানো সবুজ জ্যাকেট পরে, বাইসাইকেল চালিয়ে চলে গেল! একটা দমকলের লালগাড়ী অসম্ভব দ্রুত বেগে চলে গেল সাইরেন বাজাতে বাজাতে। সামনের রাস্তাটা দিয়ে, অন্য একটা গলির দিকে! সেকি লন্ডনেও কি আবার আগুনটাগুণ লাগে নাকি? কোথাও প্রযুক্তি, কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও আড্ডা, আবার কোথাও বা একজোড়া জ্যান্ত নারী পুরুষ নিজেদের মধ্যে গভীর হয়ে পবিত্র চুম্বনে রত। পিকাডিলি সার্কাসে যেন সত্যই এক সার্কাস শুরু হয়েছিল অনেককাল আগে। সেই ক্রীড়া, সেই রঙ্গ, সেই প্রদর্শনী যেন শেষ হয়নি আজও। আমরা যেন এক অদ্ভুত রূপকথার উপন্যাসের মাঝখানে ঢুকে পরেছি।

সম্বিত ফিরে এলে, গিন্নি ব্যস্ত হয়ে পরলেন তাঁর শপিং’এ। এখানে আর ফ্রিজে লাগানোর চুম্বক নয়, একটু প্রোমোশন হয়ে গেছে, এবারে কেনা শুরু হয়ে গেল বাচ্চাদের টি-শার্ট। পাশাপাশি চারটে পাঁচটা দোকান, আর এই দোকানটা বেশ বড়। গিন্নি একটা একটা করে টি-শার্টে হাত দিচ্ছেন, ট্যাগটা আড়চোখে দ্যাখে আমার দিকে চাইছেন। উরিব্বাপ, সবই প্রায় বিশ পাউন্ডের মতন দাম। ভুরু কুঁচকে নামটা কষে বোঝা যাচ্ছে মালটা অত্যন্ত দামী, তবুও পিকাডিলি চত্বর থেকে কেনা তো! পালকিরা বাইরে, মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছে তাদের মায়ের কেনাকাটা হল কিনা। মনে হয় বলতে চায়, আরে অত উলটেপালটে দেখোনা, যা নেওয়ার নিয়ে নাও, হাতের নাগালে পৃথিবী পেয়ে গেছি, তোমরা এখানে বেকার টাইম বরবাদ করোনা!

এদিকে গোড়ালির অবস্থা এতক্ষণে বেশ শোচনীয়। ওদের বললাম, একটু হেঁটে গেলেই তো ডানহাতে হার্ড-রক ক্যাফে। গিয়ে একটু বসলে হয়, দারুণ ফেমাস। সেখানে গিয়ে সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ঢুকে পরা গেল। একটু চা, কফি বা বিয়ারটিয়ার পান করলে মন্দ হয়না। কিন্তু সেই ক্যাফে এখনও ঝাঁপ খোলেনি। আমরা এবার ঢুকে পড়লাম পাশের বড় রাস্তায়, একটা মস্ত সিনেমা হল আর আকাশ ঢাকা দুটো ইউনিয়ন জ্যাকের পতাকা। আর সেই রাস্তাতে ঢুকেই জবাব দিয়ে দিল পা। অগত্যা আগুপিছু না ভেবে বসে পরা গেল সামনের একটা চায়ের দোকানে। দোকানটা দামী হবে, বেশ সাজানো গোছানো! যদিও তখনও আফটারনুন হয়নি, তবুও বিলেতের আফটারনুন টি’টা তো একটা বড় ব্যাপার। হাই-সোসাইটি’র গণ্যমান্য মেমসাহেবদের মধ্যে এই জাঁকজমক করে আফটারনুন টি ব্যাপারটার কিন্তু একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। সুগন্ধী চা আর তার সাথেই অর্ডার করা হল ক্লটেড ক্রিম আর স্ট্রবেরী জ্যাম দিয়ে স্কোন্স। সাহেবরা নাকি বিকেলের দিকে চায়ের সাথে স্কোন্স খান আর পুঁচকে পুঁচকে কেক এবং সরু করে কাটা চীজ আর শসার স্যান্ডউইচ। স্কোন্স’এর কথায় পরে আসা যাবে, কিন্তু তার আগে অসম্ভব মুখরোচক ক্লটেড ক্রিমের ব্যাপারটা বলে নেওয়া জরুরি। জিনিসটা আসলে জমানো দুধের ক্রিম। মিষ্টি নয় একেবারেই, কিন্তু কেমন একটা টকমিষ্টি স্বতন্ত্র স্বাদ আছে।

দুটো টেবিল দূরেই চারটে ছোকরা বসে বেশ জোরে জোরে কথা বলছে। ইংরিজি নয়, তার মানে এঁরা ব্রিটিশ নয়। তবে খাঁড়া নাক আর কালো চূল দেখে মনে হয় লোকগুলো গ্রীক নতুবা ইতালিয়ান। তাঁদেরই সাইডে একটি অল্পবয়স্ক ছেলে বেশ গোলগাল দেখতে, ওদের দলে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা, তবে এর নাকটা স্বাভাবিক। একটু লালচে দাঁড়ি আছে ছেলেটার, বোধহয় ব্রিটিশই হবে। চা পান শেষে, গিন্নি গিয়েছেন রেস্তোরাঁর টয়লেট ব্যবহার করতে। মেয়ে দুজন নিজেদের মধ্যেই আলাপ করতে ব্যস্ত। আর এমন সময়েই ব্রিটিশ ছেলেটি এগিয়ে এসে, আমার থেকে হঠাৎ লাইটারটা চেয়ে বসল। এগিয়ে দিলাম আমার লাইটারটা, আর তারপরেই সিগারেট ধরিয়ে জিনিষটা ফেরত দিয়েই, উদাসীন গলায় ছেলেটা আমাকে বলে কিনা, ‘থ্যাঙ্ক ইয়উ স্যার।“ বলে কি সাহেবটা? সাহেবরাও আবার কাউকে স্যার বলে ডাকে নাকি?

************************************************************************************

১৪ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (গ)

ছোটবেলায় হুটহাট বেরিয়ে পরা হত অনেক জায়গায়। আমার বাবা ছিলেন টিপিক্যাল বাঙালী, একদম বেড়াতে যাওয়ার পোকা। বেড়ানোর বিষয়ে তিনি কোন যুক্তি মানবেন না। তবে সব বেড়ানোই কাছাকাছির মধ্যে, এই যেমন নর্থ বেঙ্গলের পাহাড়, এক রাতের জার্নি। কখনও বিহার বা ওড়িশার একটা কোন মাঝারি জঙ্গল। তাছাড়া পুরী দীঘা ডায়মণ্ড হারবার তো লেগেই থাকতো হরদম, বছরে এক কি দুবার। তেমন কোন প্লানিং ফ্যানিং কিচ্ছু নেই! ধুর, আগে বেরিয়ে তো পরি, তারপরে না’হয় দেখা যাবে। সস্তার কোন হোটেল বা লজে রাত্রিবাস করা, আর নইলে বাবার অফিসের হলিডেহোম! সেখানে আবার রান্না করে নিতে হয় নিজেদের! মা কোনদিন এসবের কৈফিয়ত চাননি বাবার থেকে। পরের দিন মায়ের ছুটি। দু-পাশ খোলা জিপগাড়ীতে যেতে যেতে, রাস্তার ধারের কোনো দোকানে ভাত, চারা মাছের ঝোল আর ঝুরঝুরে আলুভাজা। আর তারই সাথে একটা চায়ের প্লেটে নুন লেবু কাঁচালঙ্কা। একটা দিনের মধ্যেই কি গভীর আলাপটাই না হয়ে যেত সেই জিপগাড়ীর চালকের সঙ্গে। সেই লোকটাকে দেখে কক্ষনও মনে হবেনা, গ্রামের বাড়ীতে ওর চার-চারটে ছেলেমেয়ে আর বয়স নাকি চল্লিশের কাছাকাছি। বিকেল একটু গাঢ় হলেই, হুট করে এখানে সেখানে জিপগাড়ী থামিয়ে, পান করে নেওয়া হত চা আর কটমটে কোন বিস্কুট বা পকোড়া। জিপগাড়ী পেরিয়ে যাবে কোনো একটা ব্রিজ, একটা নাম-না-জানা চড়া পরে যাওয়া নদীর উপর দিয়ে। হয়তো সেই নদীটির নাম জয়ন্তী অথবা ভইরি। আর সে নদীর পাশেই হয়ত সে গাঁয়ের শ্মশানঘাট।

আচ্ছা, লন্ডনে কোন শ্মশানটশান নেই? টেমসের পাশে, কাশীর হরিশচন্দ্র ঘাটের মতন? তবে কি এ শহরের হিন্দুরা মৃতব্যক্তিকে দাহটাহ করেননা? খ্রীষ্টান বা মুসলমানদের মতন কবর দেন? সত্তর পাউন্ডের কাছাকাছি খরচা করে অমন ট্যালটেলে বিলিতি চা পান করে, শ্মশান ছাড়া আর কিছুই আমার তখন মাথায় আসছেনা। তবে স্কোন ব্যাপারটা কিন্তু ভয়ানক মারকাটারি খেতে লেগেছে আমাদের। পালকি বলল, বাবা এই জিনিষটা কিন্তু আর একদিন খেতে হবে লন্ডনে থাকতে থাকতেই। তবে গিন্নির স্কোন কেমন লেগেছে জানা গেলনা, কারণ মহিলা একটু তফাতে। বুক খালি করা নিঃশ্বাস ছাড়ছেন হাঁটতে হাঁটতে। সে হতোদ্যম ভাব, সে মন্দা-অবস্থা, দুম করে চায়ের দোকানে সত্তর পাউন্ড খরচের জন্যে, না হাঁটুর ব্যাথাটা চাগাড় দিয়েছে আবার? জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল, কোনোটাই নাকি নয়। বরং খুব উত্তেজিত শহরের মধ্যিখানে এসে, জানালেন, ট্র্যাফালগার স্কোয়ার যাওয়ার রাস্তায়ে, সামনে ব্রিটিশদের ন্যাশানাল আর্ট গ্যালারী দেখার জন্যে প্রাণ নাকি তাঁর আঁকুপাকু করছে। আমার আবার আর্টের নামে, ঠিক ওই সময়েই গোড়ালিটা একটু টনটনিয়ে উঠল।

আর্টের নামে মহিলাটি অতিপ্রতিক্রিয়া দেখালেও, সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট বিতৃষ্ণা রয়েছে। আর সে কারণেই, গোড়ালীর ফোস্কার দোহাই দিয়ে, কোনোমতে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলাম ন্যাশানাল আর্ট গ্যালারির ট্যুরটা। কিন্তু ওই, মানুষ ভাবে এক আড় হয় আরেক! অতর্কিতেই বৃষ্টি নেমে যাওয়ার কারণে, বউয়ের হাত ধরে ঢুকেই পড়তে হল সেই সুবিশাল অট্টালিকার ভিতরে। তবে আনন্দের বিষয়, এটাও ফ্রী। বাইরে ঝিরঝিরে বর্ষা আর ভিতরে কিনা বিনামূল্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিছু ছবির সংগ্রহ, এই দুয়ে মিলেই বুঝি সত্তর পাউন্ডের শোকটা ভুলে যাওয়া গেল চট করে। আর কিছু না হোক প্রাকৃতিক দুর্যোগে, মাথার উপরে ছাদটা তো ফ্রী’তে পাওয়া যাবে। তাছাড়া নিজের মনকে বোঝালাম, দূর পাগলা, তুই তো বাঙালী, এই লন্ডনের বুকে গোটা পৃথিবীর আর্ট অ্যান্ড কালচারের ব্যাপারটা তুই দেখবি না তো কে দেখবে? আর দায়িত্ব তো নিতেই হবে কাউকে না কাউকে! বইমেলায় তো কত্ত গোড়ালি ব্যাথা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটেছিস, আর এই বেলা যত্ত ন্যাকামি?

ভিড় আছে কিন্তু ভিতরে। তবে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতন এই ভিড় বালখিল্যদের ভিড় নয়। এখানে সব সমঝদারদেরই জটলা বেশী। এক একজনের অমনোযোগী হাঁটাচলা, মারিয়ো কেম্পেসের মতন লম্বা চূল, নাকের ডগায় মোটা ফ্রেমের খয়েরি চশমা আর তাঁদের অস্ফুট স্বরে কথাবলা আর সেই সাথে তাদের উদাসীন পোশাক পরিচ্ছদ দেখলেই কিন্তু বোঝা যায়, এঁরা কেউ বাঙালী না হতে পারেন, তবে আমার মতন ছ্যাবলা নন। প্রত্যেকেই প্রায় বাঙালীদের মতনই খাঁটি রসজ্ঞ ব্যাক্তি। বরং বেশী বৈ কম নয়! আর এখানেই প্রথম দেখতে পেলাম, সাহেবরাও কিন্তু বাঙালীদের মতন চটি পরে। ভাবা যায়? দেড়দিন হয়ে গেল লন্ডনের রাস্তায়ে রাস্তায়ে ঘুরছি। এখনও পর্যন্ত একজনকেও দেখা যায়নি যে চটি ফটফটিয়ে হাঁটছে। ভিখারির গায়ে শতছিন্ন সোয়েটার পরা থাকেলও, পায়ে কিন্তু তাঁদের বেশ চকচকে রঙিন স্নিকারস পরতেই দেখা গিয়েছে।

একটা জায়গা পেয়েছে ছোটজন, আর ইশারায় ডাকছে আমায়। কেয়া বাত, এই সুযোগেই গ্যালারির ভিতরের বেঞ্চিটাতে বসে প্রথমেই খুলে ফেলা হল জুতোমোজা। মাত্র দুদিনের হাঁটাতেই পা’টা কেমন যেন নীলচেমতন হয়ে গিয়েছে, প্রতিটি শিরা উপশিরা যেন এখুনি ‘ডিয়ার স্যার’ বলে একটা ছুটির দরখাস্ত লিখতে বসবে। তবে মজার বিষয় এই যে, আমার দেখাদেখি, প্রথমে আমাদের কন্যাযুগল ও তারপরে বেশকিছু নারীপুরুষ কিন্ত দখল করে নিলেন গ্যালারির বাকীসব বেঞ্চগুলোই। বসতে পেয়েই, তাঁদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন খুলে ফেলেছেন তাঁদের জুতোজোড়া। বুঝিয়ে দিলাম নিয়মের বাইরে গিয়ে পথিকৃত সেই বাঙালীই। শিল্প-পাগল সাহেবরাও তো শেষমেষ অনুকরণ করতে একরকম বাধ্য হলেন।

অন্যদিকে গিন্নিটি ততক্ষণে আর্টের ব্যাপারে চরম পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। দূর থেকে দেখছি মুখে একটা আলগা গাম্ভীর্য। হাঁটুব্যাথা নিয়ে কোন অভিযোগ যেই। আমাদের সামনে দিয়ে হনহন করে দ্রুতবেগে বেড়িয়ে গেলেন দুতিন বার। চিনতেই পারলেননা বুঝি। হুমড়ি খেয়ে ছবি দেখছেন, প্রায় ফুরিয়ে আসা ব্যাটারীর মোবাইল দিয়ে বিভিন্ন ধরণের ছবি তুলে রাখছেন, বিশাল বিশাল সোনার গিল্টিকরা ছবিগুলির। গ্যালারির প্রধানকক্ষে, যেটি কিনা সবচেয়ে বড়, সেখানে দেওয়ালে টানানো প্রায় সবই, দেখা গেলো, ধার্মিক গোছের ছবি। পনেরশো ষোলশ শতাব্দীর শিল্পীদের। নাম পড়লেই বোঝা যাবে, মোটের উপর সকলেই ফরাসি বা ইতালীয়। সব ছবিতেই হয় যীশুখ্রীষ্ট স্বয়ং আছেন বা অন্য কোনো ইউরোপীয় ধর্মগুরু আর রোমক রাজপুরুষেরা। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতন এখানেও, সবকটা ছবির পাশেই সে ছবির ইতিহাস লেখা আর শিল্পীর সংক্ষিপ্ত বায়োডেটা। অনেকে দেখলাম ফটো নিচ্ছেন সেই ফলকগুলোরই। এক এশীয় দম্পতিকে তো দেখা গেল, শিল্পীর ছবি আঁকার মিডিয়াম নিয়েই ফাঁকায় খুব তর্ক চালাচ্ছেন নিজেদের মধ্যে।

পাশের বেঞ্চিতেই বসা প্রফেসর শঙ্কুর মতন দেখতে এক পক্বকেশ ভদ্রলোক আর দোমড়ানো কমলা গাউন পরা একটি সিরিঙ্গে মেয়ের কথা আড়ি পেতে শুনছিলাম অনেকক্ষণই। আর নিজের সাথেই নিজে বাজি ধরছিলাম, এরা কিছুতেই স্বামী – স্ত্রী নন! তাঁদেরই কথায়ে বোঝা গেলো, এই গ্যালারিতেই নাকি একটা ভ্যানগঘ, একটা দ্যভিঞ্চি আর একটা মাইকেলএঞ্জেলো রাখা রয়েছে। উপর তলায়ে। আরেব্বাস, তাহলে তো দারুণ ব্যাপার, ভীষণ নামজাদা তো সেসব ছবিগুলো। এ বাবা! কলকাতায়ে থাকতে, বিড়লা অ্যাকাডেমি চিত্রকূট গ্যালারি দেখিনি কোনদিন। এতগুলো বছর বাস করেও, মুম্বইয়ের জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারিও অদেখা অধরাই রয়ে গিয়েছে। ধুস, দেশের গর্ব অবন ঠাকুরই দেখলাম না। অবহেলা করলাম, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, হুসেন বা বিকাশ ভটচাজের মতন শিল্পীদের। আর এখানে এসে কিনা, ভ্যানগঘ আর দ্যভিঞ্চি নিয়ে আদেখলামো করা হচ্ছে?

তবে জিনিষটা ছাড়াও যাচ্ছেনা। খালি মনে হচ্ছে, এখন যদি না দেখি, পরে নিজের কাছে নিজেকে কৈফিয়ত দিতে পারা যাবে তো? ঐতিহাসিক একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো? পায়ের বেদনাফেদোনা ভুলে এখন কেমন যেন একটা চরম অপরাধীর মতন লাগছে! নাকি গিন্নিকে একবার বলে দেখব, মোবাইলে অন্তত ভ্যানগঘের ছবিটার দুটো ফটো তুলে নিয়ে এসো? পরে নাহয় ধীরেসুস্থে দেখে নেওয়া যাবে। নিখুঁত প্ল্যানটা ছিল কিন্তু! তবে পরমুহূর্তেই আবার মনে হচ্ছে, না বস, এ কিন্তু একটা লাইফটাইম অপরচুনিটি, এই সুযোগ না মিলেগি দোবারা। বুদ্ধবাবুই তো বলেছিলেন, “ডু ইট নাউ”। ঈশ, তখন যদি সক্কলে শুনত! তাছাড়া বাইরে তো বৃষ্টি কমেনি এখনও।

************************************************************************************

১৫ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (ঘ)

কিস্যু ভাল নয় আমাদের। সব কিছুতেই একটা কেমন অজানা নিরাপত্তাহীনতায়ে ভুগছে গোটা দেশটা। ভেবে দেখো, একটা সামান্য লোকাল ট্রেনে চাপতে গেলে প্রথমেই পাবলিকের একের অপর এক হুমড়ি খেয়ে চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, তারপর একে গুঁতিয়ে ওকে কনুই করে একটু পরে ধুত্তোর বলে গালিগালাজ আর একদম লাস্টে স্রেফ হাতাহাতি। এছাড়া আর কিছু আশা করা অনুচিত। তেমনই বিলেতে দেখো। বাচ্চা থেকে বড়, সকলে কেমন সুন্দর শ্বাসবন্ধ একটা সংযম দেখায় সব কিছুতেই। খুব ভাল্লাগে আমার, দেখো কোথাও তেমনভাবে কোনরকমের লম্বা লাইন বা বাড়তি নিয়ন্ত্রণ কিচ্ছু নেই। সবাই কেমন নিজের অজ্ঞাতেই মেনে চলেছে একটা অকথিত নিয়মানুগ অভ্যাস। ওই যে কথায় বলেনা, বিলিতি ভদ্রতা!

এদিকে গত দুদিনেই অবিরল ‘প্লিজ’, ‘মে আই’, ‘থ্যাঙ্ক ইয়উ’, ‘ইয়উ’আর ওয়েল্কাম, ‘এক্সকিউজ মি’ আর ‘পার্ডন মি’ শুনে শুনে আমাদের ছোটোমেয়ে কিন্তু আর কারোর সামনে সাহস না পেয়ে, তার মা আর দিদির সাথেই শুরু করে দিয়েছে একটা অদ্ভুত শালীন ব্যবহার। মুখে চব্বিশটা ঘণ্টা সে ঝুলিয়ে রেখেছে একটা শান্ত অমায়িক হাসি আর সাথে সাথেই তার বাচনভঙ্গী বা ইংরিজি উচ্চারণ, দুটো বাস্তবিকই সাহেবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাতে আর কিছু না হলেও, ফালতু বকবকানিটা কমে গিয়েছে একদম। লক্ষ করছি, ব্যাটার হাঁটতে চলতে এলোপাথাড়ি হুড়ুমদুড়ুম পা ফেলা নেই, আজকের হাঁটা যেন অনেকটা সিধে, উল্টোপাল্টা জায়গাতে ধুপ করে না দেখেশুনে বসে পরা নেই, যেন তার গোটা শরীর থেকেই অগোছালো ব্যাপারটা উবে গিয়েছে ম্যাজিকের মতন।

বিলেতে একটা রাত কাটিয়েই বুঝে নিয়েছে, ভয়ঙ্কর রকমের বিরক্ত লাগলেও কিন্তু এই দেশটাতে বুঝি বিরক্তি প্রকাশ করা নিষেধ। ন্যাশানাল গ্যালারীর সাময়িক বিশ্রামের পরেও, প্রত্যেকের পা দুখানা কিন্তু আবার হাল ছেড়ে দিয়েছে। আমরা সক্কলে যারপরনাই বিরক্ত। বেদনায়ে আর ক্লান্তিতে, কথায় কথায় খারাপ ধরণের ঝগড়া লেগে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। গিন্নি যেন উনুনে আগুণ দিয়েই রেখেছেন। এদিকে লন্ডনের গলিখুজি রাজপথ দিয়ে কোথায়ে যে আমরা হেঁটে চলেছি, কারোর পরোয়া নেই! তবে ছোটজন, যে কিনা এতকালের ফচকে, সে কিন্তু তারই মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও শিষ্টাচার বজায় রেখেছে অনবরত। কিছুতেই তার আপত্তি নেই, ইতিউতি চাইছে আর পা ব্যাথার খবর জানতে চাইলেই জবাব আসছে, “ইটস ওকে বাবা.. নো প্রবলেম, আই ক্যান ভেরি ওয়েল ম্যানেজ”। তাছাড়া তার কাঁধে একটা বড়সড় ব্যাগপ্যাক। তাতে ছাতা, জলের বোতল, জরুরি ওষুধপত্তর, সাংসারিক টুকিটাকি আরও কতকি! সে সব ঝামেলা বয়েও মেয়ের আমার কোনো প্রকার বিরক্তির চিহ্ন নেই মুখে। বিলিতি ভদ্রতায় নিখুঁতভাবে সে সামলে চলেছে সব অপ্রতুলতা।

অবশ্য সে ভদ্রতা দেখা গেল ক্ষণস্থায়ী। পাদুটো এতক্ষণ ফ্রী’তে ডিউটি দিয়েছে, গিন্নি রেগে অস্থির। কি একটা বড় রাজপ্রাসাদ পেরিয়ে একটা মোড় ঘুরতেই দেখা গেল আমরা পৌঁছে গিয়েছি ট্র্যাফালগার স্কোয়্যারে। আর সেখানে পৌঁছেই দেখা গেল গোটা পাঁচশো মতন মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছেন এদিক ওদিক বা পা-ফা গুটিয়ে বসে আছে আলসের মতন! আর তার সাথে উড়ে বেড়াচ্ছে কিছু না হলেও হাজার দুয়েক পায়রা! কাতারে কাতারে পায়রা দেখে ছোটটার বিলিতি আদবকায়দা সব নিমেষে ভ্যানিশ। একদল করে পায়রা এধার থেকে ওধারে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ছে, ফোয়ারায়ে জলপান করছে, আর মেয়ের আমার, মুখ পাংশু থেকে পাংশুতর হয়ে উঠছে। কোথায় সকলে মিলে ট্র্যাফালগারের বিখ্যাত ফোয়ারাটার সামনে ক’টা ফ্যামিলি ফটো নিয়ে নেব, না পায়রার অত্যাচারে সেই মেয়ে তখন ভয়ানক আতঙ্কিত। আর পায়রাগুলোও মারাত্মক টাইপের, কুকুরের মতন প্রায় পায়ের আঙুলফাঙুল চেটে দেবে নাকি? গতকাল থেকে এদিক সেদিক ঘুরলেও, চারজনের একটা ফ্যামিলি ফটো নেওয়া হয়নি। এদিকে কাজ কিন্তু অনেক, একটা মিছিল যাচ্ছে, তার ছবি তুলে নিতে হচ্ছে, নিয়মিত ইয়ার্কি করে গিন্নিকে একটু মুডে রাখতে হচ্ছে, আর তার সাথে পালকিকে সুযোগমতন বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে, অ্যাডমিরাল নেলসনের গল্প। পালকির চোখ দেখলাম গোল্লা গোল্লা হয়ে গেছে! পালকিকে বলে দিচ্ছি নেলসন সাহেবেরই বুদ্ধিমত্তায় কেমন করে ব্রিটিশরা নেপোলিয়নের ফ্র্যান্সের বিরুদ্ধে ট্র্যাফালগারের নৌযুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। যুদ্ধে নেলসন সাহেবের একচোখ কানা, আর একটা পা খোঁড়া হয়ে যাওয়ায়, ক্রিকেটেও একশো এগারো রানে কোন ব্যাটসম্যান থাকলে, বিলিতি আম্পায়ার ডেভিড শেপার্ড কেমন কুসংস্কারে একপায়ে তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে থাকতেন।

সূর্যটা বোধহয় এতক্ষণে ন্যাশনাল গ্যালারীর পিছনে চলে গিয়েছে। পিছন দিক থেকে একটা আলোর ছটা মতন আসায়, ট্র্যাফালগার স্কোয়ার থেকে অদূরেই গ্যালারীটাকে কি অসাধারণ লাগছে দেখতে। পালকি ম্যাপ দেখে তার মা’কে বোঝাচ্ছে, ওই’যে ডানহাতের সোজা রাস্তাটা চলে গিয়েছে, ওটা গেছে কভেন্ট গার্ডেনের দিকে, আর বাঁদিকে একশো মিটার হাঁটলেই তো চায়না টাউন। নেলসন সাহেবের নামের ওই মনুমেন্টটা পেরিয়ে নাক বরাবর সোজা চলে গেলেই, হাউস অফ পার্লামেন্ট, বিগবেন আর তার থেকে সামনে এগোলেই গতকালের বাকিংহ্যাম প্যালেস। পশ্চিমে একের পর এক দূতাবাসগুলো। এই’তো এখানে দাঁড়িয়েই তো ক্যানাডা দেশের মস্ত পতাকা ঝোলানো একটা বিশাল অট্টালিকার মতন বাড়ি দেখা যাচ্ছে। কি লম্বা রে বাবা পতাকাটা! পালকি বলল, আচ্ছা! গতকাল এতটা কাছে এসেও আমরা ট্র্যাফালগার স্কোয়ারটা দেখে গেলাম না কেন? অকপটে ওদের কাছে স্বীকার করে নিলাম আমার অজ্ঞতা। এরই মধ্যে দেখা গেল, কয়েকটা অসমসাহসী পর্যটক কোন এক উপায়ে ওই মনুমেন্টের উঁচু সিংহগুলোর পায়ের কাছে গিয়ে উঠেছেন। সিংহের সামনে চড়ে, বীরদর্পে তাঁরা থামস-আপ করে দাঁড়াচ্ছেন আর নিচে দাঁড়ানো তাঁদের বান্ধবীরা ছবি নিয়ে নিচ্ছেন মোবাইলে। বিস্ফারিত নয়নে পায়রা দেখে আর ট্র্যাফালগার স্কোয়ারে একটা অর্ধেক সকাল কাটিয়ে আমরা ততক্ষণে ভয়ানক রোমাঞ্চিত।

বৃষ্টিটা পুরো কমেছে এতক্ষণে। মেঘহীন আকাশ, আর একটু যেন পিকনিক পিকনিক টাইপের হালকা রোদও উঠে গিয়েছে এই সময়ে। ট্র্যাফালগার স্কোয়ারে লোক বুঝি বাড়তে শুরু করেছে একটু একটু করে। রাস্তার উল্টোপিঠেই, যেদিকটা পার্লামেন্ট, সেদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনটা চারিং ক্রস আর অন্যদিকের স্টেশনটার নাম লেসটার স্কোয়ার। আচ্ছা, এরপরে ব্রিটিশ মিউজিয়াম যেতে গেলে, কোন স্টেশনের থেকে ধরব পরবর্তী ট্রেন? লেসটার নাকি চারিং ক্রস? চারিং ক্রসের সামনেই একটা ছোট্ট মেলা মতন বসেছে। দু চারটে খাবারের স্টল, হয়ত হট-ডগ আর আইসক্রিম বিক্রি করছে তারা। দলে দলে উচ্ছল নারী পুরুষ সেই স্টলের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে লেসটার স্কোয়ার স্টেশনের দিকে। বাড়ি ফেরতা ব্রিটিশ যুবকদের রসিকতায়, খিলখিল করে হাসছে ব্রিটিশ সুন্দরীরা…

আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে, হাঁ করে বুঝি সেইসবই দেখে চলেছি। আর মনোযোগ দিয়ে দেখছি আমার পায়ের গোড়ালির ফোস্কাটা… আর ঠিক তখনই তাদের মধ্যে এক যুবক দল ছেড়ে এগিয়ে এসে আমাদের শুধোলেন, আপনাদের গোটা পরিবারের এই ফোয়ারাটার সামনে কি একটা ফটো তুলে দেবো?

************************************************************************************

১৬ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (ঙ)

প্রথমে বিস্তর গাঁইগুই আর তার কিছুক্ষণ পরেই চার দুগুণে আটখানা পা সম্পূর্ণরূপে ধর্মঘটে চলে যাওয়াতে, প্রায় চল্লিশ মিনিটের কাছাকাছি একটা গোলাকার পার্কের বেঞ্চিতে বসে রয়েছি আমরা। জায়গাটার নাম ব্লুমসব্যারি স্কোয়ার গার্ডেন। অপরূপ সুন্দর সাজানো বা সমৃদ্ধ তেমন কিছু নয় জায়গাটা, ছোট্ট বাহুল্যবর্জিত একটা স্থানীয় পার্ক। আসলে আয়তনে খুব বড় মাপের না হলে, পার্ক না’বলে কিন্তু বিলেতে বলা হয় ‘গার্ডেন’। তাছাড়া কেবলমাত্র বিলেতে কেন? পার্ক কথাটা থাকলেই কিন্তু বুঝে নেওয়া উচিত যে জায়গাটা একাধারে বড় এবং সর্বসাধারণের সম্পত্তি। অন্যদিকে গার্ডেন অর্থেই তার একটা বেসরকারী বা ব্যক্তিগত মালিকানা গোছের বৈশিষ্ট্য ছিল বা এখনও বুঝি আছে। লন্ডনের উদাহরণে যেমন হাইড পার্ক, রিজেন্ট পার্ক, গ্রিন পার্ক, এগুলো কিন্তু সবই পার্ক। আর প্রায় হাইড পার্কেরই পাশেই কেন্সিংটন গার্ডেনটা কিন্তু হাইড পার্কের সদৃশ হলেও, তাকে বলা হবে গার্ডেন, যেহেতু সেটি রানিমাদের কেন্সিংটন প্যালেসের সঙ্গে লাগোয়া ও একসময়ে ব্যক্তিগতই ছিল।

চারিং-ক্রস স্টেশন থেকে হলবর্ন, আর ম্যাপ অনুযায়ী হলবর্ন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থেকে গ্রেট রাসেল স্ট্রীটের উপরে ব্রিটিশ মিউজিয়াম হেঁটে যেতে সময় লাগার কথা সাত থেকে দশ মিনিট। আর হাঁটাপথের মাঝেই পরছে ব্লুমসব্যারি গার্ডেনটা। অচঞ্চল সোমবারের একটা দুপুর। আমাদের অদূরেই একটি বেঞ্চি জুড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছেন এক বৃদ্ধা নারী। তার পরনে একটা রঙচটা সোয়েটার আর তার পায়ের কাছেই রাখা অনেক ক’টা বাজারের থলে। হয়ত মহিলা সব্জিবাজার করে বাড়ী ফেরার সময়ে, বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছেন সামান্য। অথবা এমনটা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়, এই বৃদ্ধা হয়ত বাড়ীতে বাড়ীতে জিনিসপত্র ডেলিভারির কাজ নিয়েছেন সম্প্রতি। আমাদের মতনই বাড়তি হাঁটাহাঁটি করে, গোড়ালির ব্যাথায়ে ব্লুমসব্যারির বাগানে শুয়ে কর্মবিরতি নিয়ে নিচ্ছেন!

উল্টোপিঠেই একটা বেঞ্চে, তিনটি চোয়াড়ে মার্কা ছোকরা বসে বীয়ার পান করছে অবলীলায় আর অনবরত ধূমপান (বা অন্য কোন ঠাকুর দেবতার উৎকৃষ্ট ধোঁয়া) করে চলেছে। সঙ্গে চলছে তাদের সরব খোশগল্প! ব্যাটারা এক্কেবারে আমাদের অতীতদিনের মতন, ইশকুল কিমবা কোচিং ক্লাস ফাঁকি মেরে, আড্ডা সেরে বাড়ি গিয়ে মা’কে একরাশ মিথ্যেকথা বলবে। হয়ত এই ব্লুমসব্যারিটাই এই কিশোরদের ম্যাডক্স স্কোয়ার। আমাদের প্ল্যান করা হয়েছিল, লাঞ্চ সেরে নেওয়া হবে একটু বেলা করে, ব্রিটিশ মিউজিয়াম দেখে নেওয়ার পর। তারপরে সন্ধ্যের স্কোনস সহযোগে বিলিতি চা, হাইড পার্কের আশেপাশে কোথাও, আর তারপরে হোটেলে ফেরা। কিন্তু এই অক্ষম পায়ের ধ্বংসাত্মক ব্যাথাটাই ভোগাচ্ছে বেশ আর তার জন্যেই বুঝি হাইড পার্কের প্রাপ্য থেকে, অযথা নষ্ট হচ্ছে সময়।

ঢিলেঢালা স্লো মোশনে হাঁটছি আমরা চারজনেই। সকাল থেকে ন্যাচারাল হিস্ট্রি আর ন্যাশনাল গ্যালারীর মতন রসকষহীন জায়গা দেখে, আবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নামেই আমার গায়ে জ্বর আসছিল। আচ্ছা, কোনরকমেই কি বাদ দিয়ে দেওয়া যায়না ব্রিটিশ মিউজিয়ামটা? কিন্তু সেই প্রস্তাবের আগেই বেখাপ্পা তর্ক শুরু হয়ে গেলো, ছি-ছি কি অশিক্ষিত তুমি, তোমার লজ্জা করেনা টাইপের তর্জন-গর্জন আর তারপর কথাবন্ধের প্রতিজ্ঞা। আরে বাপ রে, কোথায় লাগে তখন মাথা ঠাণ্ডা রাখা ব্রিটিশ ভদ্রতা? তবে আরও দিন আটেক তো বাকী রয়েছে ছুটির, এরপরে আছে লন্ডনের কান্ট্রিসাইড, রয়েছে স্কটল্যান্ড, উত্তর পশ্চিমে ইনভার্ণেস, নিখুঁত আয়েল অফ স্কাই, আরও কত কি! সেসব বিবেচনা করেই, ব্লুমসব্যারির ঝিমনো দুপুর ছেড়ে, পা-বাড়ানো হল মিউজিয়ামের দিকে।

লন্ডনের গ্রেট রাসেল স্ট্রীটটা আমাদের পার্ক স্ট্রীট এলাকার লিটল রাসেল স্ট্রীটের থেকেও সঙ্কীর্ণ। জাদুঘরের সামনেই ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন স্মারক, চিনি মাখানো ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া বাদামভাজা, আর দেখা গেল আগত পর্যটকদের মধ্যে অধিকাংশই প্রবীণ লোক। কিন্তু মজার বিষয়, তাঁদের হাঁটার স্পীড কিন্তু আমাদের চার বাঙালীর চেয়ে দ্বিগুণ। বাইরেই গোটগোট অক্ষরে লেখা রয়েছে মোবাইল ফোনে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে। কিন্তু কেউই দেখলাম তা মান্য করছেন না। গিন্নির মুখটা বদলে গিয়েছে আবার, তাঁর মুখে এখন একটা স্মিত সবজান্তা হাসি!

রোমান স্থাপত্যেই তৈরি এই জাদুঘরটাও। সামনের দিকটা উঁচু হয়ে ওঠা এবড়োখেবড়ো থামগুলো দেখলে, অনেকটা আমাদের কলকাতার টাউনহলের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে ওঠা আর তারপরেই বোঝা গেল, স্থান নির্বাচনটা জুতসই না হলেও, লন্ডন শহরের আর সব দ্রষ্টব্যের মতন, ব্রিটিশ মিউজিয়ামটাও কিন্তু কোনরকম কার্পণ্য না করেই বানিয়েছে সাহেবরা। এখানেও যথারীতি কিউরেটরদের দাদাগিরি চলছে। তাঁদের বেশির ভাগ শ্বেতাঙ্গ হলেও, কালোও রয়েছে দেখা গেলো দু চারজন। নারী পুরুষ নির্বিশেষে, প্রত্যেকের পরনে সাদা জামা, গলায় ঝোলানো একাধিক আইডেন্টিটি কার্ড, কালো ট্রাউজারের উপরে চওড়া বেল্ট আর সকলেরই কোমরে ঝুলছে ঢাউস টর্চ আর গোটা বিশেক করে পেল্লায় লোহার চাবি। সেই চাবির ঝনঝনানিতেই, যথেষ্ট ভিড় থাকা সত্ত্বেও, এলাকা কিন্তু একদম তাঁদেরই নিয়মাধীন।

গোড়ালীটা এইবারে ভোগাচ্ছে চরম, আর সে ব্যাথাটা উৎসাহ পেয়ে, এবার পৌঁছে গিয়েছে কোমরে। কোনোমতে একটা বেঞ্চিতে, একচিলতে জায়গা পেয়ে গিয়ে, আর এগোনো হয়নি মিউজিয়ামের ভিতরে। গিন্নি আর মেয়েরা তখন নতুন সক্রিয়তায়, আপনজনকে ফেলেই, জাদুঘর ঘুরে দেখতে ব্যস্ত। খানিকটা সময় সেখানে কাটিয়ে, কফি ও ধূমপানের আশায়ে অপেক্ষা শুরু বাইরের এক কফিশপে। বেশ যাচ্ছেতাই রকমের খিদে পেয়ে গিয়েছে তখন… বাইরে টুকিটাকি জিনিসপত্রের কয়েকটি দোকান আর তার পাশেই একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। আহা! এখানে যদি একটু ভাত ডাল তরকারি পাওয়া যেত, বৌদির দোকানের মতন!

************************************************************************************

১৭ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (চ)

নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রীটের উপরে “জয়’স চাইনিজ” নামের একটা রেস্তরাঁয়ে অদ্ভুতরকম ভালো চীনে খাবার খেয়ে আমরা তখন টিউবে। আবার মিনিট কুড়ি উল্টোদিকে হেঁটে আসতে হয়েছে হলবর্ন স্টেশনে। পরে দেখা গেলো, রেস্তোরাঁটার কাছেই, রাসেল স্কোয়ার স্টেশন থেকেও আসা যেতো, আর তাতে বোধহয় সময় লাগত খানিকটা কম। যাক গে! তবে, অফিসটাইম এখনও শুরু হয়নি আর সেইজন্যে ট্রেনে বসার জায়গাও পেয়ে গিয়েছে ওরা। এবারে আমাদের লক্ষ্য হাইড পার্ক। যথারীতি বাড়তি খেয়ে, পেট সকলের যথেষ্ট ভরা। চীনে উদ্ভিদের স্টারফ্রাই, চিকেন কুংপাও আর সুইট অ্যান্ড সাওয়ার মুরগী দিয়ে আজকের লাঞ্চ কিন্তু জমে গিয়েছিল ভাল। তবে ওই বাঙালীদের যা’হয় আরকি! অসংযমী খিদের চোটে অর্ডার দেওয়া হয়ে গিয়েছে অতিরিক্ত। বোকার মতন অর্ডার দেওয়াতে নাকি, পয়সার নামে পয়সা খরচা করছে স্বামী, আর সে কারণেই গিন্নি বুঝি সামান্য নিরুদ্যম। তাছাড়া এতটা বেলা করে খাওয়া, এই বয়েসে কি আর পোষায়? ঘড়িতে ইতিমধ্যে সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছে।

হাইড পার্ক পৌঁছতে হলে, নামতে হয় নাইটসব্রিজ স্টেশনে। হাইড পার্ক কর্নার স্টপেজে নামলেও হয়, তবে নাইটসব্রিজ থেকেই নাকি হাঁটা কম। পার্কে পৌঁছে কিন্তু বেজায় খটকা লাগল। এতসব বিস্ময়কর গল্প শুনেছি হাইড পার্কের! সে বাগান নাকি থাকে লোকজনের ভিড়ে ভিড়াক্কার। বিখ্যাত সব রাজনৈতিক ডেমনসট্রেসনস… তাছাড়া পিঙ্ক-ফ্লয়েড, কুইনের মতন সুপরিচিত রকগ্রুপও নাকি একটা সময়ে হাইড পার্কে নিয়মিত লাইভ অনুষ্ঠান করে গেছে। এতো দেখছি মাইলের পর মাইল, সবুজ মখমলের মতন ঘাস, মস্ত বড়বড় গাছ দিয়ে ঘেরা একেবারে নিঃশব্দ, জনশূন্য একটা উদ্যান। দুরে নিভৃতে বসে আলাপচারিতায়ে ব্যস্ত কতিপয় নরনারী। তবে একদিক থেকে যেন ভালই হয়েছে। সারাটা দিন গিসগিসে লোকজনের সাথে হেঁটে বেরিয়ে, হাইড পার্কের এই আকস্মিক নির্জনতাই বুঝি অনেক ভাল।

তামাম বাঙালীদের বদভ্যাস সর্বত্র গিয়ে গান শোনা। ওড়িশার বাংরিপোশি অরণ্যের মধ্যে চড়ুইভাতি করতে যাওয়া দুটি বাঙালী পরিবারকে আমি অনেককাল আগে ট্র্যানজিস্টর চালিয়ে ‘প্যায়ার হোতা হ্যাঁয় দিওয়ানা সনম’ শুনতে দেখেছি। পালকি আর তার বোনকেও দেখা গেলো, সে নিয়ম বজায় রেখেছে এখনও। তবে তারা একদিনেই বিলিতি আচরণে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াতে হেডফোন ব্যবহার করে। আমাদের অদূরেই একটি মুসলমান পরিবার শতরঞ্চি পেতে আরাম করছেন। আর সামনে হেলেদুলে খেলে বেড়াচ্ছে প্রায় সমবয়েসি পাঁচটি শিশু। আচ্ছা, সবকটি শিশুই কি এই দম্পতির নাকি লোকটির আরও দুটি স্ত্রী রয়েছে? হয়ত তিন বউয়ের মধ্যে সদ্ভাব নেই একেবারেই আর আজকে লোকটির এই স্ত্রীটিকে নিয়েই ভদ্রলোকের হাইড পার্ক বেড়াতে নিয়ে আসার কথা! গিন্নি বললেন, “বোকার মতন দেখোনা ওদিকে”। পাছে মুসলমান পরিবারটা কুপিত হয়! আমি চোখ সরিয়ে নিলাম, ঘাড়ে তো আমার একটাই মাথা।

শোনা গেছে ‘বিপাসনা’ নামের একধরনের মেডিটেসন নাকি ভীষণ রকমের জনপ্রিয় হয়েছে আজকাল। যিনি সে ক্রিয়া করবেন, তাকে নাকি টানা দিন দশেক মৌন হয়ে থাকতে হবে। হঠাৎ খেয়াল হল, আমি তো প্রায় কুড়ি মিনিটের উপর কথাই বলিনি কারোর সাথে। আচ্ছা, আমরা কি একে ওপরের সাথে এখন একটু খোশগল্প করতে পারিনা? আড্ডা গল্প এইসবই কি একে ওপরের প্রতি কৌতূহল ফুরিয়ে গেলে লাঘব হয়ে যায় অনেকটাই? তবে এরকম চুপচাপ থাকার মধ্যে একটা মাতন আছে, অনেকটা নির্বাক সিনেমার মতন। পালকিরা কি একটা বিষয় নিয়ে যেন অনবরত হেসে চলেছে। হয়ত আমাদেরই মধ্যে কারোর ভুল ইংরিজি নিয়ে! তবে আমি কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা সেই আড্ডায়ে।

ধূমপায়ী বলে আজকাল লজ্জায়ে পরতে হয় সব জায়গাতেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক সেদিকে অনেক মানুষই বসে আছেন, কিন্তু অনেক ঠাহর করে দেখা গেল, ধূমপান কিন্তু কেউই করছেন না। এত লোক নিজেকে শুধরে নিলেও, আমি কেন পারছিনা? তবে ধূমপান ছাড়াও স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ে আজকাল সকলেই সচতন। আর সেই সচেতনতাতেই, পাঁচটা বাজতেই হাইড পার্ক কেমন আমূল বদলে গেল। হঠাৎ কোথা হতে যে পার্কের মধ্যের একমাত্র লাল সড়কটি দিয়ে ঝাঁকেঝাঁকে বাইসাইকেল চলতে শুরু করেছে, তার খবর বুঝি আমাদের জানা ছিলনা আগে থেকে। এরা বলেন বাইকিং, আর বাইকিং নাকি নিয়মিত চালিয়ে গেলে, সুফল পাওয়া যাবে মর্নিং ওয়াক বা অন্য কোন ব্যায়ামের চেয়েও বেশি। যুক্তিহীন কৌতূহলে আর একটা স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের আশায়ে, দুইকন্যা আর তাঁদের মা তখন হাঁ করে দেখছেন সেই সাইকেল আরোহীদের। “কি সুন্দর চেহারা দেখেছ এক একজনের”? আর সেই মুহূর্তেই আমাদের গোটা পরিবার চায়ের সাথে বিস্কুট, পাউরুটির সাথে মাখন, রাতে খাবার পরের চকোলেট আর পাতে কাঁচা নুন খাওয়া বন্ধ করে দিল। এদের দেখে বাড়ী ফিরে আমাদের কে কি খাবে, কি খাবেনা, গিন্নি ঠিক করে দিলেন নিমেষে!

প্ল্যান ছিল হাইড পার্কে আমরা শুয়ে থাকব অনেকক্ষণ, যতক্ষণ না জ্যোৎস্নায়ে ঢেকে যায় ঘাসগুলো। আঁধারে কালো হয়ে যাওয়া গাছের পাতাগুলোতে যখন আলাদা করা যাবেনা ওক আর পাইনে। কিন্তু এই তো খানিকক্ষণ আগেও বেশ নরম রোদ ছিল। হঠাৎই, শনশন করে একটা কেমন ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। খুব কৌতূহল ছিল দেখে নেব, সরল মায়াময় এই বাগানে আম-জাম-কাঁঠালের গাছ রয়েছে কিনা? তা সে জিজ্ঞাসার নিরসন তো আর হলনা আমাদের! বাইরে বেরোনোর মুখটাতে একদল অফিস ফেরতা মানুষ ভিড় করেছেন রাস্তার ওপারে যাওয়ার জন্য, সাইকেল আরোহীদের ভিড়ে পেরোনোর সুযোগই হচ্ছেনা তাঁদের। একবার কি তাঁদেরই জিজ্ঞাসা করে দেখব, দাদা এখানে কি আমাদের পেহেলগাঁওের মতন তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায়? আমার যে হাইড পার্কের জ্যোৎস্না দেখার খুব সখ!

************************************************************************************

১৮ লন্ডন তৃতীয় দিন (ক)

আল-মাদিদ আজ গ্রিনীচ শহরে চলেছেন, কি একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কনফারেন্সে হাজিরা দিতে। সিগারেট ফুঁকছেন, তবে গতকালের মতন সহিংস ভাবে নয়। আর আজ বেশ একটা আয়েস দেখা যাচ্ছে মাদিদের ধূমপানের মধ্যে। ভোরে পেটটা পরিষ্কার হয়ে গেলে যেমনটা হয় আরকি! এদিকে সকাল-সকাল যথেষ্ট ক্ষিপ্রতায়ে আমাদের তিন মহিলাও ব্রেকফাস্ট সেরে লবিতে এসে পরেছেন। চোখেমুখে প্রত্যয় আর পরিতোষ মিশ্রিত হাসি ঝোলানো, পালকি গুছিয়ে নিয়েছে আজকের বাসের টিকিট, কুপন আর বিভিন্ন ধরণের ভাউচার। প্রথমে উইন্ডসর ক্যাসেল দিয়ে শুরু করে, অপরাহ্নে রোম্যান বাথ আর শেষে স্টোনহেঞ্জ দিয়ে সারা হবে আজকের দিন। সকালের আলোয় বাপ যখন বাচ্চার ছবি নিতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়েই মাথাটা আমার বিগড়ে দিলেন হতচ্ছাড়া মাদিদ। মাত্র দুদিন সকালের বন্ধুত্বই হয়েছে বিপদ, নইলে কোন সাহসে তিনি তিনজনকে মিলিয়ে ‘লাভলি সিস্টারস’ বলে ঠাওরালেন, সে কেবল মাদিদই জানেন। তবে মধ্যবয়েসী ভারতীয়রা, কাতারিদের চেয়ে অনেকটাই বেশি বিজ্ঞ। কেবল একটা প্রখর দৃষ্টি দিয়ে মাদিদকে মেপে, এগিয়ে যাওয়াই সমীচীন বলে মনে করলাম।

আমরা যারা উবের বলি, তাঁদের নিয়ে পালকিরা উপহাস করে। মার্কিনী উচ্চারণ নাকি উবের নয়, উবার। আর শেষের বয়-শূন্য ‘র’টা অনুচ্চারিত থাকলে উপযুক্ত হয় বেশি। আমাদের দেশের উবার অথবা বিদেশের উবার, ডেকে নেওয়ার পদ্ধতি দেখা গেল কিন্তু একইরকমের। তবে আমাদের দেশে উবার পাওয়া যায় অনায়াসে, আর খোদ কেন্সিংটনে দাঁড়িয়ে দেখা গেলো, পরপর তিনটি উবারই ক্যান্সেল করে দিল আমাদের আর্জি। তাদের মধ্যে শেষজনের নাম মহম্মদ, আর সর্বশেষে সেই মহম্মদ ভাইও ঝুলিয়ে দেওয়াতে চাপে পরে যাওয়া ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন গতি ছিলনা। সকাল আটটা’র মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে। রাস্তা পেরোনোর সিগন্যাল লাল থাকা সত্ত্বেও, গিন্নি তখন দুই মেয়ের হাত ধরে, ক্রোমওয়েল রোডের উপরে দিশাহারা হয়ে হোলসেল ছোটাছুটি করছেন। একাধারে ঘড়ি দেখা আর তারই সাথে পরিবারের বাকী তিন বিহ্বল সদস্যাকে সামলাতে আমার নিজেরও তখন বেশ নাজেহাল দশা।

এক একটা দিন বুঝি অন্যরকম। মানুষ সেদিন ভাবে একরকম আর হবে ঠিক তার উল্টোটাই। আগে থেকে ভাবা ছিল, লন্ডনের ব্ল্যাক-ক্যাবে ওদেরকে চড়াতে হবে একবার, আর সেই সুযোগ যে আজ সকালেই আচমকা এসে পড়বে, এ আগে থেকে পরিকল্পনায় ছিলনা। কে যেন একজন বলছিলেন, ব্ল্যাক-ক্যাব নাকি ভয়ানক রকমের দামী। সেসব বিলিতি চালকদের ভাড়ার উপরে, বাড়তি পঁচিশ পারসেন্ট টিপস সংযোজন করে না দিলে, তাঁরা নাকি বেজায় বিরক্ত হন আর বেমানান কিছু তীক্ষ্ণ খোঁয়াড়ী করতেও পিছপা হননা। তাছাড়া থাইল্যান্ড ব্যতীত, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই আমার ট্যাক্সি চালকদের উপরে একটা অবিশ্বাস রয়েছে। আজ মঙ্গলবার, বাইরে লন্ডনের অফিসটাইম শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা চারজনেই ব্ল্যাক-ক্যাবে চেপে, কিছুতে বাইরে মনঃসংযোগ করতে পারছিনা ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে না পৌঁছনো পর্যন্ত।

আমাদের ছোটটা বেশ কিপ্পুস। এ রাস্তা ও রাস্তা পেরিয়ে ট্যাক্সিটা এগোচ্ছে লন্ডনের ট্রাফিক ঠেলে, আর সে কিনা বেশ সরবেই মিটারে কত উঠল, তা ঘোষণা করে চলেছে অনবরত। সে তো একরকমের পরশু রাতের ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁটার মতনই ব্যাপার হল। মেনুকার্ডের বাঁদিক থেকে ডানদিকে না পড়ে, উর্দুর মতন ডান থেকে বাঁয়ে পড়াতে বাংলাদেশী ওয়েটার মাহরুফ একটু বাঁকা হেসে চলে গিয়েছিল অন্য টেবিলে। তবে এরই মধ্যে ছোটোটারই পর্যবেক্ষণের প্রশংসা না করে পারা গেলনা। একটু ঘাড় বেঁকিয়ে বাইরে দেখছে সে। জিজ্ঞাসা করাতে জবাব এলো, গাড়ীটা কিন্তু খুব কালো নয়, বাবু। একটু স্লাইট স্লাইট ব্রাউনও আছে।

এদেশে ‘বাস’ মানে কেবলমাত্র শহরের সীমার মধ্যেই চলাচলের যান। সে যানগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে লালরঙের ও দোতলা। লন্ডনের পরিসীমার বাইরে গেলেই, সে বাস হয়ে যাবে একতলা আর তার নাম বদলে হয়ে যাবে কোচ। বাস বলে আর ডাকা যাবেনা তাকে! ভিক্টোরিয়ার কাছাকারি পৌঁছে দেখা গেল, সে এক ভারী ভেল্কি লাগার মতন ক্রিয়াশীল জায়গা। প্রচুর ব্যস্তসমস্ত পর্যটকের জমায়েত, লোকজন ঘুরছে ফিরছে, লাইনে দাঁড়াচ্ছে, বাসে ট্যাক্সিতে ট্রেনে উঠে পরছে দৌড়ে, সব মিলে এক ভয়ানক ভজঘট ব্যাপার। অনেকটা যেন আমাদের হাওড়া স্টেশনের মতন, তবে অত্যন্ত শৃঙ্খলা কিন্তু বজায় রয়েছে সব কিছুতেই। ব্ল্যাক-ক্যাবের ড্রাইভারটা একটু উদাস রকমের, কোচ স্টেশনের নামে, তিনি যেখানে ছেড়ে দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেলেন, সেখানে দূর থেকে দেখা যাচ্ছে লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া রেলস্টেশন। আর ঘড়িতে আটটা পঁয়ত্রিশ। গিন্নি ভয়ঙ্কর রকমের নার্ভাস হয়ে পরেছেন, কোচ মিস করে আজকের দিনটা যে একদম আমাদের বেকার যাবে, সেই ভেবে সারাক্ষণ জিভ চুকচুক করেছেন। থইথই একটা ভিড়ের মাঝে, খানিক চুপ করে জরিপ করে নিতে হল জায়গাটা আর তারপরে ম্যাপ আর বিভিন্ন সাইনবোর্ড দেখে দেখে জোরসে হেঁটে, পৌঁছে যাওয়া হল এক মস্ত খটমট বাড়ির সামনে। গিন্নি প্রাণপণ দৌড়েছেন আমাদের সঙ্গে, এখন একটু ঘামছেন। বেকায়াদায় দৌড়ে ছোটটার বোধহয় পেটে খিঁচ ধরেছে একটু। সে’ও হাঁপাচ্ছে আর পেটে হাত বুলোচ্ছে অসভ্যের মতন! একটা পেল্লায় দরজার বাইরে কয়েকটি মানুষ প্যাম্ফলেট বিলোচ্ছেন গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানীর। আর তাঁদের কাছেই জেনে নেওয়া গেল, আমাদের কোচ ছাড়বে ছয়-নম্বর লেন থেকে। যাক, ছেড়ে যায়নি তাহলে! লেট তাহলে আমাদের একার হয়নি। বহুত লোকই আজ লেট! প্রকাণ্ডকায় গোটা দশেক ঘন নীল-রঙের বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে এদিক ওদিক, অনেকটা আমাদের বম্বে-পুণে লাক্সারি বাগগুলোর মতন। ছয় নম্বরে গিয়ে উইন্ডসর ক্যাসেলের বাসের লাইনে দাঁড়াতেই, ট্যুর কোম্পানির লোকেরা সবুজ রঙের একটা করে টিকিট যখন কব্জিতে পরিয়ে দিয়েছে রাখীর মতন, তখনই আমাদের ছোটোটা মনে করিয়ে দিল, বাবু এটা কিন্তু বাস নয়, এটা একটা কোচ।

************************************************************************************

১৯ লন্ডন তৃতীয় দিন (খ)

ঠাকুর ঠাকুর করে রওনা দিয়ে দিয়েছি আমরা, নীল কোচটা এখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে উইন্ডসর ক্যাসেলের দিকে। বাইরের দিনটা ফাটাফাটি রকমের সুন্দর আর শহুরে গণ্ডীর বাইরে বেরিয়ে চারিধার যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠছে। ঘন সবুজ অপরূপ প্রান্তরের মধ্যে এক প্রশস্ত হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলেছে আমাদের গোল্ডেন ট্যুরসের কোচ। দুপাশের বাড়িঘরের মাপ দেখছি ক্রমশ ছোটো থেকে আরও ছোট হয়ে আসছে। শৈশবের ড্রয়িংক্লাসে ঠিক এমনটাই কোনো সিনারি ছবি আঁকতে চাইবে যে কোনো শিশু। সাদা পাতাটার অর্ধেকটা জুড়ে খয়েরিরঙের একটি খাটো বাড়ি, তার মাথায় একটা কালচে চিমনি, বাড়িটার দুপাশে ঠিক হাতেগুনে দুটো ঝাঁকড়া ওকগাছ আর বাকীটা সবুজ ঝোপঝাড় দেওয়া ঢালাও মাঠ। পরে থাকা সাদা পাতাটার বাকী অর্ধেকে একটা গাঢ় নীল প্যাস্টেল আকাশ আর আকাশে একটা নিটোল কমলারঙের সূর্য। বাড়াবাড়ি রকমের রোদ নেই তাতে একদম। কেবল আমাদেরই নয়, অতি আগ্রহী মন নিয়ে কোচের সকলের চোখই জানালার বাইরে। তবে দুঃখের বিষয়, উইন্ডসর ক্যাসেল লন্ডন থেকে মাত্র মাইল পঁচিশেক দুরে, সময় লাগবে মাত্র একঘণ্টার মতন। সুতরাং বেশিক্ষণ বুঝি এই মনোরম প্রকৃতির বিরল আস্বাদ আর নেওয়া যাবেনা।

কোচে আমাদের বাঁপাশে যে নারী পুরুষটি সফর করছেন, তারা বেলজিয়ামের লোক। আমাদের মতন গরমের ছুটিতে লন্ডন বেড়াতে এসেছেন দুজনে। তবে স্কটল্যান্ড যাবেন না! বেলজিয়ান হলেও, এঁদের বাসস্থান কিন্তু ফ্রান্সের কলম্বাস নামের একটা শহরে। তবে দেখে আমাদের দেশের মতন সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়না, এরা সম্পর্কে স্বামী – স্ত্রী কিনা! তাছাড়া সরাসরি জিজ্ঞাসা করাটা এ দেশের রুচি অনুপাতে, একটা মূর্খতা। প্রাইভেসি নিয়ে ছেলেখেলা নয় বাবা! লোকটা একটু গোমড়ামুখো, মিশুকে নন একেবারেই, ওই একদুই কথার আলাপে যেটুকু জানা গেলো, এনারা বেশ ঘরকুনো, আমাদের মতনই। আমার বাবা মায়ের মতন উঠলো বাই তো কটক যাই গোছের, খুব একটা এদিক সেদিক বেরিয়ে পরাটা এঁদের ধাতে নেই।

কোচে না চেপে, অনেক পর্যটক কিন্তু উইন্ডসর আসে ট্রেনে। কোচে ঘণ্টাখানেক সময় লাগলেও, ট্রেনে এই দূরত্ব আসতে সময় লাগবে আধঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট। এখন পৌনে দশটা, আমাদের কোচটা এসে দাঁড়িয়েছে উইন্ডসরের ছোট্ট একটা রেলস্টেশনের ধার ঘেঁষে আর সেই প্লাটফর্মে একটা সবুজ রঙের ফাঁকা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনটাতে একটা কয়লার ইঞ্জিন আর দুটোমাত্র ক্ষুদ্রাকার কামরা। অনেকটা দার্জিলিঙের টয়ট্রেনের সাথে মিল পাওয়া যায়। অদুরে রেললাইনের উপরে একটা ওভারব্রিজ পেরিয়ে উইন্ডসর অঞ্চল আর তার সন্নিকটে উইন্ডসরের সুবিখ্যাত ক্যাসেল। আমাদের কোচটা ছাড়াও ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে আরও গোটা পনেরো কুড়ি কোচ আর দলেদলে পর্যটক হেঁটে চলেছে ক্যাসেল দর্শন করতে। রাস্তার দু-পাশে বর্নময় পিটুনিয়া ফুলের বাগান আর সারি দিয়ে ছোটছোট দোকানঘর। আইসক্রিম আর কফি ছাড়াও, স্মারক গোছের সামগ্রীও বিক্রি হচ্ছে সেখানে। ক্যাসেলে পৌঁছনোর ওই পাথর বাঁধানো হাঁটা পথটুকু এত নয়নাভিরাম, যে ক্যামেরায় ছবি নিয়ে রাখছেন প্রায় সকলেই।

পৃথিবীর কাছে ইউনাইটেড কিংডমের জাতীয় পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক হলেও, রানিমার নিজস্ব ধ্বজা কিন্তু আলাদা। এ’র নাম রয়্যাল স্ট্যান্ডার্ড আর এই ধ্বজায় মূলত লাল আর হলুদ রঙের চারটি চৌখুপিতে, চার রকমের ভিন্ন প্রতীক আঁকা থাকে। রানিমা যখন যে স্থানে অবস্থান করেন, এই নিশানটি সেই স্থানে উড়তে দেখা যাবে সর্বক্ষন। রানি নিজে উপস্থিত না থাকলে, নিয়মানুসারে, সব জায়গাতে ইউনিয়ন জ্যাক ওড়ানোর ব্যাবস্থাই থাকবে। আজ কিন্তু উইকএন্ড নয়, কিন্তু দেখা গেল ক্যাসেলে ঢোকার লাইন পরেছে লম্বা। গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানির গাইড ভদ্রলোক একটু চিন্তিত, বললেন, এমনটা তো সচরাচর হয়না।

ক্যাসেলে অগ্রসর হওয়ার রাস্তাটা বেশ সরু আর সে পথেরই দুপাশে অনেককটি সুবিশাল বটগাছ। ওই রাস্তার দুধারে ছোটছোট বাসায় সব থাকতে দেওয়া হয়েছে প্যালেসের কর্মচারীদের। আর তার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলেছে আমাদের কোচের লাইনটা। সকালের দিকে সামান্য শীতভাব থাকলেও, এখন বেলা এগারোটায়ে বেশ ঝাঁঝালো রোদ আর সেই তাপে ঘাম হচ্ছে বেশ। আমাদের দেশে এমন লাইন দিতে হলে, মানুষ কতরকমের কার্যকলাপ শুরু করে দেন। কেউ স্রেফ বাবু হয়ে বসে পড়বেন রাস্তায়, কেউ অযথাই রাগ দেখাবেন, বা কেউকেউ ঠাট্টাতামাশা শুরু করে দেবেন অচেনা মানুষের সাথে। ঝালমুড়ি লেবু লজেন্স খেয়ে গুমোট আবহাওয়ায়ে ঘামফাম হলে, কেউ আবার ঘনঘন জলের ঝাঁপটা মারবেন চোখেমুখে। তবে এ’লাইনটাতে সকলে কেমন নিশ্চল রোবটের মতন স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক সরলরেখায়ে। এই অদরকারি ডিসিপ্লিন দেখে আমরা বেশ হতবাক হয়ে গেলাম।

আমাদের দেশ হলে ক্ষোভে এতক্ষণে ইট পাটকেল শুরু হয়ে যেত! আরে ভাই, দ্রষ্টব্য জায়াগায়ে ঢুকতেই এত সময় লেগে গেলে, আসল মজা বুঝি ফুরিয়ে যায় তার আগে। ছোটটার বাথরুম পেয়েছে, আর এবারে ভিতরে ঢুকতে পারলে যেন বাঁচা যায়, ঢুকেই প্রথমে ছুটোছুটি করতে হবে বাথরুম খুঁজে বের করতে। অবশেষে ক্যাসেলের সিংহদরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমে যেটুকু বোঝা গেল, এটি আসলে সুবিশাল একটা দুর্গ। বা দুর্গের আদলে তৈরি একটা অতিকায় রাজপ্রাসাদ। বিঘা বা একরের হিসেব তো আমরা কেউ বুঝিনা, তবে আকারে আয়তনে প্রাসাদটির নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট, আপার আর মিডল টীয়ার মিলিয়ে, যে কোন দিন, দিল্লীর লালকেল্লা বা যোধপুরের মেহরনগড়ের দুর্গকে লজ্জায় ফেলে দেবে উইন্ডসর। জয়পুরের আমের কেল্লাকে বলবে, ভাই তুমি একটু সাইডে যাও! দুর্গের চারপাশে আদিগন্ত তৃণাবৃত মসৃণ উন্মুক্ত জমি আর তার পাশেই বয়ে চলা টেমসের দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য একটা রূপ। এবারে প্রমাণিত হল, লন্ডনের ব্যস্ততা ছেড়ে, রানিমা কেন উইন্ডসরের স্বপ্নপুরীতে চলে আসেন সপ্তাহান্তে। গাইড লোকটার তা আর বিশদে বুঝিয়ে বলে দেওয়ার প্রয়োজন হলনা।

বাইরে থেকেই ক্যাসেলটার গোটা দশেক ছবি তুলে, দুইকন্যা সমেত সাততাড়াতাড়ি ঝাঁপিয়ে পরা হয়েছে ক্যাসেলের মধ্যে একটা বিশেষ আইসক্রিমের দোকানে। সেই আইসক্রিম নাকি বানানো হচ্ছে, রয়্যাল ফ্যামিলির রয়্যাল গরুর দুধে। দোকানটাতে লাইন পরেছে বেশ, দেখা গেল এখানেও সবচেয়ে সস্তা কিন্তু ভ্যানিলা, মাত্র পাঁচ পাউন্ড। মেয়েরা ব্লুবেরি ক্রিমেরটা বেছে নিলে, আমাদের কর্তা গিন্নি একটাই ভ্যানিলা ভাগ করে চালিয়ে নেওয়া হল। আমার সন্তুষ্টি রয়্যাল গরুতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, গিন্নি কিন্তু সর্বাংশে ঘুরে দেখেছেন উইন্ডসরের অভন্ত্যর। ফেরার পথে তাঁর গল্পে শোনা গেলো, ক্যাসেলের ভিতরে সব নাকি সোনার। সোনার দেওয়াল, সোনার খাট, সোনার সিলিং, সোনার ডাইনিং টেবিল, সোনার বাতি, মায় সিঁড়ির রেলিঙও নাকি সোনালী। একেবার ঠাকুমার ঝুলির বিবরণের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে উইন্ডসর ক্যাসেল। একদম নাকি সোনার অত্যাচার! বুঝলাম এদেশে দুয়োরাণী বলে কিছু নেই, বিলেতে সবই বুঝি সুয়োরানীর বৈভব। কোচে হেঁটে ফেরার সময় মনে হল, প্রাসাদে সব যদি একঘেয়ে সোনালী হয়, পার্থক্য বোঝাতে রাস্তার রঙীন পিটুনিয়াগুলো তো আছে।

গোল্ডেন ট্যুরসের লাঞ্চ প্যাকেট সংগ্রহ করে কোচে উঠে দেখা গেল, বেলজিয়ান নারী পুরুষটি ফিরে এসেছেন আমাদের অনেক আগেই। আর এবার তাঁদের অবারিত খুনসুটি দেখে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা আর যাই হন, স্বামী-স্ত্রী নন মোটেও।

************************************************************************************

২০ লন্ডন তৃতীয় দিন (গ)

ধুর! কোন তুলনাই চলেনা, কিন্তু তবুও আমাদের মধ্যে কেন জানিনা, কথা হচ্ছিল ভারতবর্ষ নিয়ে! এত কিছুর তারতম্য, এত সব ফারাক থাকা সত্ত্বেও কেন যে খালি বারেবারে নিজের দেশের কথাটা মনে আসে আর পুরো সময়টা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে একটা অসম তুলনা। এই যেমন, দূরপাল্লার বাসে উঠলেই আমার গানের কথা মনে হয়! এমন সারাদিনের একটা বাস সফরে, পিছনের সীটের যুবকযুবতীরা দল বেঁধে একটা সমবেত গলায় গান ধরতে পারতো। এমন উপভোগ্য একটা পরিবেশে, হেঁই সামালো-র কোরাস বা ধিতাং-ধিতাং বোলে, কিন্তু স্বচ্ছন্দে জমে যেত বেশ। অজানা অপিরিচিত যাত্রীরা ছন্দে-ছন্দে হাততালি দিয়ে তাল ঠুকবে। আর সে তালে তালে গায়ক গেয়ে উঠবে আরও উচ্চস্বরে। হঠাৎ কারোর কোন অনুমতি ছাড়াই, সামনের দিকের বর্ষীয়ান কেউ একটা পল্লীগান ধরবেন খোলা গলায়, পেছনের যুবকেরা ধুঁয়ো ধরবে আর একটা অনুচ্চারিত মৈত্রী আরম্ভ হয়ে যাবে পর্যটকদের মধ্যে।

উইন্ডসরকে পিছনে ফেলে, এবারে আমরা চলেছি রোম্যান বাথের দিকে। মঙ্গলবারের মধ্যাহ্নে গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানির কোচ এখন একেবারে নিস্তব্ধ। কোথাও কেউ টুঁ শব্দটি করছেনা, চারিপাশের দৃশ্যাবলী এখনও মোটামুটি একইরকমের, দুধারে সবুজের ঢেউখেলানো প্রকৃতি। মনে হয় কেউ কোনদিন সেই সবুজে পা রাখেনি। কেবল সকালের তুলনায় রোদের তেজটা এখন বুঝি একটু বেড়ে গিয়েছে। বম্বে–পুণা যাত্রার মতন, এরা কিন্তু সর্বক্ষণ বাসের এয়ার-কন্ডিশানিং মেশিন চালিয়ে রাখেনা। আর গাইড লোকটা ভয়ানক ফিচেল, মিনিটদশেক এয়ার-কন্ডিশানিং’টা চললে, ব্যাটা বন্ধ করে রাখছে পরের আধঘণ্টা। আর এই গুমোটে তো জানালা খোলার উপায়ও নেই।

তবে যে যাই বলুক, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য অসম্ভব মনোরম হলেও, আমাদের দেশের মতন শ্বাসরুদ্ধকর কিছু নয়। ওক আর পাইনের মধ্যে দিয়ে এই পথ, আর মাঝে মাঝে এক একটা ছবির মতন সাজানো গ্রাম। কুলকুল করে বয়ে যাওয়া একটা স্রোতহীন নদী আর ছোটো একটা গির্জা। সোনাঝরা সৌন্দর্য, কিন্তু এই দেখে বিভূতিভূষণ কিন্তু আর একটা আরণ্যক লিখে ফেলতে পারবেন না কিছুতেই। পথে চোখে পরছেনা একটাও মহীরুহ, একটাও পুষ্করিণী বা চমকে ওঠার মতন গা ছমছমে একটা অরণ্য। পুরোটাই যেন একটা সিনথেটিক সিনথেটিক ব্যাপার! জলপাইগুড়ির বাসের মতন, দুম করে রাস্তায়ে তড়িঘড়ি বাস থামিয়ে দেওয়া হচ্ছেনা, দুটো হাতি তাদের শাবক নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে বলে। বড় কোন বৃক্ষের নিচে ময়ূর বা ল্যাজঝোলা টিয়ার ঝাঁক দেখা যাচ্ছেনা একটাও রাজস্থানের মতন। আর বনস্পতির আন্দোলন ধরিয়ে শনশনিয়ে হাওয়াও বুঝি চলছেনা এদেশে। মোটকথায়ে এই দৃশ্যপট অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর লাগলেও, আদিমতার যেন কোন শিহরন নেই এখানে।

রোম্যান বাথকে ছোটো করে শুধুমাত্র বাথ বলা হয়। রোম্যান কথাটা বুঝি যোগ করা হয়েছে কেবলমাত্র ইতিহাস আর গাইডবুকের জন্য। কোম্পানির গাইড ভদ্রলোকও দেখা গেল বলছেন দ্য সিটি অফ বাথ। রোম্যানদের কৃতিত্ব না দেওয়ার জন্য, নাকি এর পিছনে কোন বাণিজ্যিক বুদ্ধি রয়েছে, সেটা কিন্তু উপলব্ধি করতে পারা গেলনা। নগর না বলে বাথকে একটা ছোটো শহরতলী বললে বুঝি ঠিক হয়। তবে যে’কয়টি বাড়িঘর দেখা গেল বাথে ঢোকার মুখের বাসস্ট্যান্ডে, সেগুলি লন্ডনের মতন সাবেক স্থাপত্যের নয়, বরং একেবারে সুপ্রাচীন পৌরাণিক যুগের। কালচে হলুদ রঙের সুবৃহৎ বেশ কয়েকটি অট্টালিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যেন কোনো এক অদ্বিতীয় সম্রাটের খেয়ালে। সবকটা বাড়ীতে কেমন খুপরি খুপরি জানালা আর প্রতিকটা বাড়িই যেন ওয়েস্টমিন্সটার অ্যাবি’র এক একটা ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। ওইসব বাড়িগুলোরই মধ্যে দিয়ে একটা সঙ্কীর্ণ সড়ক চলে গিয়েছে। আর সেই সড়ক ধরে পর্যটকেরা লাইন করে দেখতে চলেছেন বিখ্যাত রোম্যান বাথ।

কোচ নির্দিষ্ট স্থানে ছেড়ে দেওয়ার পর আসল দ্রষ্টব্যে গিয়ে পৌঁছতে সময় লাগবে হেঁটে মিনিট পাঁচেক। রাস্তার দুপাশে অনেক কটা দোকান। তবে একটা দুটো ছাড়া কিন্তু সবকটারই দুপুরে ঝাঁপ বন্ধ রাখা রয়েছে। একদম আদর্শ ব্রিটিশ ব্যাপার, যেটা কিনা দেখা যেত কলকাতায়। খানিকটা পেরিয়েই একটা আয়ত চাতাল, আর তার চার চৌহদ্দি জুড়ে রাখা রয়েছে অনেককটা কাঠের বেঞ্চি। সবকটাতেই বসে রয়েছেন পর্যটকেরা আর মাঝে একঝাঁক যুবক গীটার বাজিয়ে গান গেয়ে চলেছে। কোন অকারণ হইচই নেই চারিপাশে, বেশ ঠাণ্ডা নিরুপদ্রব একটা পরিবেশ। তবে ওই গানের মাঝে কেবল ভেসে আসছে বাড়িগুলোর কার্নিশে বসা কয়েকটা পাখির উগ্র কর্কশ আওয়াজ। আকারে বেশ বড়সড় সাদা রঙের পাখিগুলো। ছাই রঙের তাদের ডানা আর দেখতে যেন পায়রা আর হাঁসের মিশ্রণ। সুকুমার রায় এই জীব দেখেই বুঝি তাঁর খিচুরি পদ্যটা লিখেছিলেন!

ঢোকার মুখটাতে কিঞ্চিত ভিড় আর ভিতরে ঢুকেই চোখে পরল ছোট্ট একটা উষ্ণ জলাশয়। বরং জলাশয় না বলে, চৌবাচ্চা বললে ভাল হয়, বড়জোর তিরিশ ফুট বাই ষাট ফুটের একটা আয়তক্ষেত্র। চৌবাচ্চাটাতে টুপটুপে নীল ঘোলাটে জল আর সে জল যে গরম ও ছোঁয়া নিষেধ বুঝতে গেলে, কয়েকটি জায়গায়ে ওঠা বুড়বুড়ি আর চারধারের নানাবিধ বিজ্ঞপ্তিই একমাত্র উপায়। আর তার সাথে সন্নিহিত বিশাল বিশাল থামগুলোর উপরে একটি ঝুলন্ত প্রাঙ্গণ মতন ছাদ। আর ওই প্রতিকটা থামের উপরে একটা করে রোম্যান পুরুষের মূর্তি। সকলেই রাজা। আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক যে মূর্তিটা, সেটি বেশ বড়, পাবলিকে ঘিরে ধরেছে সেটাকে! এই মূর্তিটা স্বয়ং সম্রাট জুলিয়াস সিজারের। বাকী রোমক পুরুষেরা বেশ এলিয়ে বসে থাকলেও, সিজার বাবাজী কিন্তু বসে রয়েছেন তাঁর শিরদাঁড়া টানটান করে।

এখানেও দেখা গেল, কিউরেটরদের কড়া রক্ষণাবেক্ষণ। বিদেশিনী দুই পর্যটক হতবুদ্ধি হয়ে একটা বাচ্চা কিউরেটরকে চেপে ধরেছে, আর গিন্নি দেখলাম তাদের সাথেই কান খাড়া শুনে চলেছেন বাথের ইতিহাস। এই মুখটাই গতকাল দেখেছিলাম ন্যাচারাল হিস্ট্রির মিউজিয়ামে বা ন্যাশানাল গ্যালারীতে। পালকি আর তার ছোটবোনও মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে! তিনজনে আঙুল মটকে আর ভুরু কুঁচকে বুঝে নিচ্ছে কিভাবে এই বাথের উষ্ণ জলে স্নান করে সারিয়ে নেওয়া হত বাতব্যাধি, গাঁটের ব্যাথা আর কুষ্ঠ। সেই শুনে, দেখা গেলো তিনজনেই এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে সালফারের উৎসস্থল। নাহ! এখন সিন ক্রিয়েট করা বিরোধী পক্ষের মতন এদের জ্ঞানআহরণে আর বাগরা দেবনা বরং ঠিক করলাম, এবারে দেশে ফিরে এঁদের একবার বক্রেশ্বর বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে।

************************************************************************************

২১ লন্ডন তৃতীয় দিন (ঘ)

সারাদিনের ব্যাপক ছুটোছুটিতে খ্রিষ্টপূর্ব আর খ্রিস্টাব্দ গুলিয়ে গিয়েছে রে ভাই! আর ভালই বোঝা যাচ্ছে, গাইড লোকটাও একেবারে ফাঁকা স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান গোছের জিনিষ। তবে লোকটার ভয়য় নেই একদম! সকালের দিকের উইন্ডসর ক্যাসেলের ইতিহাসে ব্যাটার ভাষণে ফাঁকফোকর তেমন কিছু না থাকলেও, বিকেলে বাথ ছাড়ার পর থেকেই কিন্তু লোকটার ব্যাখ্যায়ে হাজার অসঙ্গতি ধরা পরছে। কোচের পিছনের দিকে অনেকেই অবশ্য এখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু কেস জমে গেছে সামনের দিক, কোচের একদম সামনের দিকে বসা এক দাড়িওয়ালা নিরীহ বৃদ্ধ কিন্তু এইমাত্র দু একটা বেশ ভালো কটাক্ষ করছেন গাইডকে। এবারে আমাদের গন্তব্য স্টোনহেঞ্জ আর স্টোনহেঞ্জের কি একটা জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত অর্থ বৃদ্ধকে বোঝাতে না পেরে গাইডটা এখন একদম ঘেমেনেয়ে একশা। আর বৃদ্ধের কাছে গাইডের হেনস্থা হওয়া দেখে দিনের প্রথমবারের জন্য মুচকি হাসতে দেখা গেল আমাদের পাশে বসা বেলজিয়ান নারীটিকে। পুরুষটি এখন ঝিমোচ্ছেন আর রূপসী মহিলা তাঁর খয়েরি গগলস খুলে চোখেমুখ সাফ করছেন একটা ওডিকলোনে ভেজা টিস্যু পেপারে। এদিকে গাইড লোকটা সামনের দিকে হার মেনে এবারে গুটিগুটি আসছেন পিছনে। কান দুখানা তাঁর রাগে লাল, মহা খাপ্পা হয়েছে সে বুড়োটার উপরে। দেখে মনে হচ্ছে, মনে মনে ব্যাটা বলছে, বাপরে! খুব বাঁচা বেছে গেছি, আর সামনের দিকে আমি ফিরছিনা।“

বাথ থেকে স্টোনহেঞ্জ লাগে একঘণ্টার মতন। বিকের চা কফি পান করার বিরতি দেওয়া হয়েছিল বাথেই কারণ শোনা গেলো, স্টোনহেঞ্জে খাবার দাবারের বিশেষ কোনরকম সংস্থান নেই। সে জায়গার আশেপাশের দশ মাইলের মধ্যে নাকি কোন জনবসতিই তেমন নেই। বাইরের দৃশ্যাবলী এখনও প্রায় একই, বড় গাছফাছ প্রায় নেই বললেই চলে। বরং এদিকের আকাশ বোধহয় আরও বেশি ঘন নীল আর ঘাসের প্রান্তর আরও বেশি সবুজ। একইসাথে এমন ঘন নীল আর সবুজের কন্ট্রাস্ট দক্ষিণ ভারতীয় কাঞ্জিভরম শাড়ীতেই বুঝি একমাত্র দেখা যায়। মাঝে মাঝে পেরিয়ে যাওয়া হচ্ছে দু একখানা বর্ধিষ্ণু গ্রাম, গোটা দশেক লাল টালির ছাদ দেওয়া গ্রামের বাড়ি। বাড়িগুলোর প্রত্যেকটার উপরে টানানো একটা করে আদ্যিকালের টেলিভিশনের অ্যান্টেনা। সামনে একটা করে ছোটো বাগান, আর দু পাঁচটা মরশুমি ফুলের বাহারি গাছ। দু পা এগোলেই একটা গির্জা, একটা সরাইখানা ও একটা পোস্টঅফিস। এই কয়টি আবশ্যকীয় উপাদান থাকলেই, সেই দশটা বাড়ি মিলে তৈরি হবে একটা গ্রাম। দোকান বাজার ছাড়া কিভাবে একটা গ্রাম চলতে পারে? এ প্রশ্ন করে অবশ্য গাইড লোকটিকে ঝামেলায় ফেলার কোন মানে হয়না! লোকটা পেছনের একটা সীটে বসে একটু রেস্ট নিচ্ছে এখন। পালকি আর তাঁর বোন লোকটাকে দেখে হেসে খুন হচ্ছে এখন। তাছাড়া এই একঘেয়ে সবুজাঞ্চল দেখে আমি যত ভাবছি, আগামীবার যেভাবেই হোক মাসাইমারা যাবো, গিন্নি দেখছি তাঁর মেয়েদের বকাবকি করছেন। বাইরের দৃশ্য তারা না দেখে গাইডটাকে দেখে হাসার জন্য।

সামনের বৃদ্ধ গজগজ করছেন এখনও, আর তারই মধ্যে আমরা হুট করে পৌঁছে গিয়েছি স্টোনহেঞ্জে। ইতিহাসের তথ্য নিয়ে লোকটা ভুলভাল বললেও, একটা বিষয় কিন্তু একদম সঠিক বলেছে লোকটা। একটা অদ্ভুত জনমানবহীন তেপান্তরের মাঠের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের কোচ। স্টোনহেঞ্জ তো দূরের কথা, সামনে কেবল একটা দোতলা আধুনিক ওয়েলকাম সেন্টার ছাড়া আর চারধারে কিচ্ছুটি নেই। যতদূর দেখা যায়, ততদুরই কেবল ঢালাও মখমলের মতন সবুজ ঘাস। তাছাড়া দেখা গেল, জায়গাটা খুবই নির্জন, আমাদের দলটা ছাড়া আর কেউ কোত্থাও নেই। আচ্ছা এখানে এসে কারোর যদি খুব খিদে পায়? গিন্নি বললেন, এইটাই ভালো। এরকম একটা নিরিবিলি জায়গাতে, যদি একগাদা দোকান বাজার গজিয়ে যেত বা মুড়ি তেলেভাজা বিক্রি হত, তাহলে বুঝি তোমাদের খুব ভালো লাগত? আহা, এমন একটা জায়গায়ে যদি একটা রুপোলী নদী থাকতো আর সে নদীর পাশে বসে পান করা যেত অল্প মহুয়া? কিমবা অকৃপণ চিৎকারে গাওয়া যেত একটা রবীন্দ্রনাথের গান? গিন্নির মুখে এখন পশ্চিমের রোদ্দুরটা পরেছে, স্কার্ফটা দিয়ে মাথাটা আগলেছে সে আর সেই দেখে বেশ একটা রিনরিন প্রেম প্রেম লাগছে পুরো জায়গাটা!

স্টোনহেঞ্জ যাওয়ার সাটল বাস ছাড়ছে ওয়েলকাম সেন্টারের সামনে থেকে। দুটোই মাত্র বাস। গাঢ় ষ্টীল রঙের বাসদুটো আর পিছনে বাঁকা বাঁকা অক্ষরে লেখা “স্টোনহেঞ্জ – স্টেপ ইনটু ইংল্যান্ডস স্টোরি”। মাত্র দুই মাইল দূরেই আমাদের দ্রষ্টব্য আর সে কারণেই বাসে সীটের সংখ্যা কম। বাস ছাড়তেই, একটি রেকর্ডেড নারীকণ্ঠের মাধ্যমে পর্যটকদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্টোনহেঞ্জের ইতিহাস। আর সেই ভাষ্যর একলাইন শুনেই বোঝা গেলো, গাইড ভদ্রলোকটিকে বৃদ্ধটি কেন কটাক্ষ করছিলেন!

অনেককটা এবড়ো খেবড়ো পাথর। ইতিহাসের কোন এক অদ্ভুত হিসাবনিকাশে সেই পাথরগুলো কেমন একে অন্যের সাথে সমান্তরাল আর সমকোণের সামঞ্জস্য রেখে খাড়া রয়ে আছে সেই ব্রোঞ্জযুগ থেকে। চারপাশে আর কিচ্ছুটি নেই, কেবল সবুজ আর সবুজ। সেই ঘাস হয়ত গজিয়েছে গতকালই, তবুও স্টোনহেঞ্জের সামনের সেই ঘাসকেই কেমন যেন অতীতকালের বলে মনে হচ্ছে। গাইড লোকটা এসে বলল, যারা ইচ্ছুক, তারা এখানে ওয়াকিং ট্যুর করতে পারেন। স্টোনহেঞ্জকে কেন্দ্রস্থল করে, সাড়ে চার কিলোমিটার টানা একটি ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে আসতে হবে। যারা সেটা করছেন তারা অবশ্য আমাদের দলের নন। সকালে এসেছেন, সারাদিন স্টোনহেঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক খুঁটিনাটি জেনে নিতে।

অদূরেই দেখা যাচ্ছে একটি ছোট্ট বনানী। যেমনটা দেখা গিয়েছিল আমার এক মাসীর বীরভূমের বাড়ির কাছের শীতপুরের জঙ্গলে। গিন্নি দেখলাম স্কার্ফটার্ফ সরিয়ে স্টোনহেঞ্জ নিয়ে জটিল গবেষণায়ে মত্ত, পাথরের ফলকে লেখা ইতিহাসটা খুঁটিয়ে পড়ে নিচ্ছেন। ছোটটি সেলফি তুলছে, আর আমি ভাবছি, ভাগ্যিস এমন প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাপারটা আবিষ্কার হয়েছে বিলেতে। ব্যাটা, আমাদের দেশে হলে আদ্দিনে বোধহয় এটাকে একটা অনন্য শিবলিঙ্গ ভেবে, একটা মন্দির গড়ে নেওয়া হত!

************************************************************************************

২২ লন্ডন চতুর্থ দিন (ক)

উবার ধরার কোনো চেষ্টাই আজ করা হয়নি। আর গতকালের মতন আজও, আটটার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে। একবার গ্লস্টার রোড বা কেন্সিংটন সাউথ থেকে টিউবে চাপার কথা যে মাথায় আসেনি তা নয়, কিন্তু পালকি বলল, চারজনে মিলে টিউবে গেলে, ট্যাক্সির চেয়ে বুঝি খরচা পড়বে বেশি। তাছাড়া গিন্নি গতকালের উবারের উটকো ঝামেলা আর শেষ মুহূর্তের দৌড়োদৌড়ির টেনশনটা ভুলতে পারেননি। উবার বা টিউবের কথা একবার তুলতেই, পরিত্রাহি চিৎকার করে আগুণ চোখে তাকিয়ে, দুই মেয়েকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে তেড়েফুঁড়ে হাঁটা লাগিয়েছেন বড়রাস্তায়ে। বুঝলাম সাড়ে তিনদিন বিলেতে থেকে তাঁর সাহস এখন বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই। তাঁর হাঁটাচলা এখন অনেকটাই চিতাবাঘিনীর মতন।

আজকে আর ডানদিক বাঁদিক বিবেচনা না করে, সটান ক্রোমওয়েল রোডের মোড়ে গিয়ে ধরা হল একটা ব্ল্যাকক্যাব। আজ পেয়ে গেলাম একটা অসম্ভব চকচকে কালো গাড়ি, গাড়ীটাতে মোমপালিশ মারা হয় বুঝি দিনে দু’বার, আর তার ততোধিক চকচকে এই গাড়ীর চালক লোকটা। এই ড্রাইভারকে বুঝি, লন্ডন ব্ল্যাকক্যাব ড্রাইভারদের ‘এম্বলেম’ হিসেবে অনায়াসে চালিয়ে দেওয়া যায়। বয়স্ক, হেঁড়ে গলা, নির্বিকার একটা চাহনি, রাশভারী মুখ, মাথাজোড়া সেমিসার্কেল একটা টাক, চিবুকের নিচে একটা বিদঘুটে গলকম্বল, ধূসর রঙের কলার তোলা চেকচেক একটা কোট, চোখে তাঁর একটা আরশোলা রঙের ভারী চশমা, ডান হাতে তাঁর স্টিয়ারিং হুইল আর সবচাইতে যেটা আমাদের চোখে পরল, সেটা চালকের বাঁ-হাতে একটা পুরনো খবরের কাগজ। যেটাকে কিনা বিলেতে বলে ট্যাবলয়েড।

আমাদের ওখানে, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ী চালাতে দেখেছি অসংখ্য ট্যাক্সিচালককে, তবে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে, খবরের কাগজটাতে উদাসীন চোখ বোলানো, এটাই বুঝি দেখার বাকী ছিল বিলেত দেশে এসে। মোটের উপর যা বুঝলাম, লোকটা হাবেভাবে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাকী ইন্ডিয়ান টুরিস্টগুলোর মতন প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সকাল সকাল জ্বালাবেননা ভাই! এদেশে উবারের ব্যাপারটা সঠিক জানা নেই, তবে লন্ডন ব্ল্যাকক্যাব লাইসেন্স পেতে হলে নাকি বড়ছোটো মিলিয়ে লন্ডন শহরের বিশ হাজারের উপর রাস্তা, বিভিন্ন লেন বাইলেন আর তার তস্য গলিখুঁজির হদিশ আর সাড়ে তিনশো স্ট্যান্ডার্ড রুটের মুখস্থ ধরা দিতে হয় পরীক্ষার্থীর। কে যেন বলল সেদিন, কমসে কম নাকি তিন থেকে চারবছর করে লেগে যায় এক একটা ড্রাইভারের সেই ট্যাক্সির পরীক্ষায়ে পাশ করতে। কিন্তু তাই বলে, এমনই ডাকসাইটে অভিজ্ঞতা এঁর, এতোটাই সুপার নৈপুণ্য, যে শেষে কিনা খবরের কাগজ দেখতে দেখতেও অনায়াসে চালিয়ে নিচ্ছেন তাঁর ট্যাক্সি?

তবে পুরনো খবরের কাগজে চোখ বোলানো দেখেই বুঝে গেছি, লোকটা মারাত্মক দাম্ভিক, আর তাছাড়া আমাদের দেখেই হয়ত চট করে বুঝে নিয়েছেন, এঁরা আটপৌরে দরিদ্র মানুষ। বোধহয় ভাবছে, ব্যাটারা হাঘরের দেশ থেকে বেড়াতে এসেছে বিলেতে! লোকটা ভিক্টোরিয়ায়ে পৌঁছে, টিপ-ফিপ তো আমাদের থেকে কিছু নিলইনা, বরং মিটারে চোদ্দপাউন্ড কুড়ি পেন্স ওঠাতে, একটা কুড়ি পাউন্ডের নোটে, পুরো ছয় পাউন্ড ফেরত দিয়ে দিলেন। কি ভাবছে লোকটা? সাহেবত্ব চুমরে ভাবছে সকাল সকাল গোহারান হারিয়ে দিলাম চারটে ইন্ডিয়ানকে! ওঃ কি মজা! ঠিক সেই সময়টাতে তাঁর ঝোল্লা মুখের ডোরাকাটা কাঠিন্য দেখে, ওকে যে পাঁচটা পাউন্ড বকসিস দিয়ে বুঝিয়ে দেবো, ভাই আমরা আচ্ছে দিনের দেশের লোক, আর বাজে রকমের দরিদ্র বা নির্লজ্জ কোনটাই নই! তবে ভিক্টোরিয়ায়ে নেমে সে সাহস বা সুবুদ্ধি হলনা আমার। আমি আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, আর লোকটা হুঁশ করে তাঁর রইস ব্ল্যাক ক্যাবখানা ইয়উ টার্ণ করে বেরিয়ে গেল অন্যদিকে।

আজকেও কোচের সামনে একটা ছোট্ট লাইন, আর লাইনটাতে আমরা দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই এক যুবতী এসে আমাদের প্রত্যেকের হাতে রাখী বাঁধার মতন পরিয়ে দিয়ে গেল একটা করে সবুজ ব্যান্ড! ঠিক গতকালের নিয়মই চলছে আজ! তবে কোচে চেপে দেখা গেলো আজকের গাইড ভদ্রলোক বেশ বর্ষীয়ান। কালকের উইন্ডসরের লোকটার মতন ফক্কর নয়! তবে এ লোকটাও পাক্কা ব্রিটিশ। বিরলকেশ, বেঁটে, এবং বয়েসের ভারেই হয়ত একটু কোলকুঁজো হয়ে পরেছেন। বেশ বেঁকিয়ে চুরিয়ে আমাদের বললেন, আগে নাকি কাজ করতেন বিবিসি’তে। অবসরের নেওয়ার পরে, ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এখন কাজ নিয়েছেন গোল্ডেনের হয়ে। তবে বোঝা যাচ্ছে মিথ্যে বলেনি লোকটা, অসম্ভব মার্জিত এঁর কণ্ঠস্বর, ভীষণ ধারালো এঁর ইংরিজি বাচনভঙ্গি। হাতে পূর্ণদৈর্ঘ্যের একখানা ছাতা আর মুখে একটা উচ্চাঙ্গের হাসি। এঁর নাম জানা গেলো ডেভিড। তবে টুরিস্ট লাইনের লোক বলেই কিনা জানিনা, ডেভিডের মধ্যে কিন্তু ওই দাম্ভিক ব্যাপারটা নেই। আর দেখলাম আছে সেন্স অফ হিউমার। পালকিদের সাথে তো এঁর জমে গেল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। বাস অবশ্য এখনও ছাড়েনি।

ডেভিডের সাথে আলাপ হয়ে মন আমাদের খুশ হয়ে গেলেও, আজকের সমস্যা কিন্তু অন্য। গোল্ডেন ট্যুরসের কোচ আজ পুরোপুরি ভর্তি একগাদা চীনেম্যানে। ঝাঁকে ঝাঁকে চীনেম্যান চলেছেন ওয়ারউইক ক্যাসেল, উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বাড়ি আর অক্সফোর্ড বেড়াতে। কোচের ভিতর, সামনে পিছনে ডানদিকে বাঁদিকে উপরে নিচে, যেদিকে দু’চোখ যাচ্ছে, সেদিকেই উপবিষ্ট রয়েছেন চীনে নারী পুরুষেরা। কোচের একদম সামনের দিকের তিনটে সীটে কয়েকজন আমেরিকান রয়েছেন, মাঝামাঝি আমরা চারটি বাঙালী আর একটু এগিয়ে দুটি মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষ। আর কোচের বুঝি বাকী সকলেই এসেছেন চীনদেশ থেকে। চাই চুং ফুং ফাং ভাষায়ে অবিচ্ছিন গালগল্প করে চলেছেন নিজেদের মধ্যে। চীনেরা এতো উচ্ছ্বাসপ্রবণ আর গল্পপ্রিয় হয়, জানা ছিলোনা তো আগে।

এই দলটির সাথে দোভাষী রয়েছেন বটে একজন, তবে কোচে চীনেদের সংখ্যাধিক্যয়ে, ডেভিড বেচারা কিন্তু পরে গিয়েছে মহা ফাঁপরে। দেখা গেল, চীনের দলটি একবর্ণও ইংরিজি বোঝেন না। এদিকে তাদের দোভাষী গাইডটা কথা বললে, ডেভিডের ভাষ্য প্রায় কিছুই শোনা যাচ্ছেনা। আর মজার বিষয় চীনে গাইডটা ভয়ানক বাচাল। একবার কথা শুরু করলে, সে ব্যাটা কিছুতেই থামতেই জানেনা। ডেভিড দুলাইন কথা বললে, তর্জমা করতে লাগছে তাঁর পাঁচ মিনিট।

তবে সমস্যার সমাধান করল কোচের নবীন চালক অ্যান্টোনিও। পর্তুগীজ যুবক অ্যান্টোনিও ডেভিডের কণ্ঠস্বর প্রযুক্তির কোনো এক উদ্ভাবনী উপায়ে বিভক্ত করে দিল দোভাষীর কণ্ঠ থেকে। ডেভিড কথা বলা শুরু করল একটি ভিন্ন মাইক্রোফোনে, আর সেই ধারাভাষ্য আমাদের কানে আসা শুরু হল ইয়ারফোনের মাধ্যমে। আর চীনে লোকটা তখন অন্য মাইকে। হালকা অসুবিধা থেকে গেলেও, সেটা বরদাস্ত করে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখা গেলনা। এদিকে খুব বোঝা যাচ্ছে, বেশ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেও, আমেরিকানরা বা ডেভিডও কোনপ্রকার বিরক্তি প্রকাশ করলনা।

আগেই বলেছি সেন্স অফ হিউমারের কথা, যা দেখছি, ডেভিডের রসবোধ অত্যন্ত উঁচুমাপের। ধারাভাষ্যে লোকটা তাঁর শানিত ইংরিজি ভাষা ব্যবহার করছে অনেক মেপে, আর সব কথায় সযত্নে বিবেচিত, পরিমিত কৌতুকে, আমরা ততক্ষণে তাঁর ফ্যান হয়ে গিয়েছি। রবি ঘোষকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে, কৌতুক সম্বন্ধে স্বয়ং সত্যজিৎ রায় একবার বলছিলেন, কেবল ভালো স্ক্রিপ্ট বা কন্টেন্ট থাকলেই হয়না, কমেডির মুখ্য উপদান কিন্তু টাইমিং আর কণ্ঠস্বরের বিস্তার। দেখা গেলো, দুটোতেই ডেভিডের পটুতা রয়েছে।

তবে ডেভিড কিন্তু কমেডিয়ান না। তাঁর কাছে আছে বিলিতি গল্পের অফুরন্ত ভাণ্ডার আর তার সাথে একজন সুদক্ষ গাইড মাত্র। লোকটা গল্পের মাঝেই খুব চতুর ভাবে ঢুকিয়ে দিচ্ছে তামাশা আর সে তামাশা জুড়ে কেবল ইংরেজদের অকৃতিত্বের গল্প। আমেরিকা বা ইউরোপের অন্যদেশের তুলনায়, মায় ভারতীয়দের তুলনায়, তাঁদের জাতিটা যে কত অকর্মণ্য, কত গর্দভ, তার গল্পই যেন আজ ফেঁদে বসেছে ডেভিড। মার্কিনী পুরুষ নারীরা খুব মজা পাচ্ছেন, কয়েকজকে তো হেসে লুটিয়ে পরতে দেখা গেল। কিন্তু এটা কি জানে ডেভিড, ওই সাহেবি ব্যাঙ্গ, ওই প্রহসনের মাঝেই যে লুকিয়ে আছে প্রচ্ছন্ন দম্ভ, অস্ফুট আত্মাভিমান, সেটা বোঝার মতনও একজন যাত্রী রয়েছে তাঁরই কোচে?

************************************************************************************

২৩ লন্ডন চতুর্থ দিন (খ)

আজকের কথা বলছিনা। এক্সপ্রেস হাইওয়ে থেকে বাঁদিকে পুনে সিটিতে ঢুকেই একসময়ে বোঝা যেত এটা কিন্তু বিশুদ্ধ আঁতেল মারাঠিদের শহর। মুম্বইয়ের মতন তিতকুটে দোআঁশলা ব্যাপার নয়। অনেককাল আগে যেমন পাক্কা বাঙালীয়ানা ব্যাপারটা বোঝা যেত পার্কসার্কাস বেকবাগান পেরিয়ে গড়িয়াহাট গোলপার্কে ঢুকলে। ওয়ারউইক শহরে এসে পরলে কিন্তু বোঝা যাবে, এই জায়গাটা পুরোদমে ব্রিটিশ। লন্ডনের মতন পাঁচমিশেলী কিছু নয়। শহরে ঢুকে বাঁহাতে একটা রেলস্টেশন, সেই রেললাইনের নিচ দিয়ে সরু স্যাঁতস্যাঁতে একটা রাস্তা, ছোটো কয়েকটা দোকানপাট, একটা পাবলিক লাইব্রেরি, একটা পুরনো থিয়েটার হল আর একটা ব্যাঙ্ক, তার লাগোয়া একটা ছোট্ট চতুষ্কোণ পোস্টঅফিস। দুরে দেখা যাচ্ছে একটা গম্বুজওয়ালা গির্জার চুড়া আর একটা ওয়াচ টাওয়ার। থমথমে শহর, তবু মনে হয়, হয়ত এখুনি কোথাও বেজে উঠতে পারে বিউগলের বাজনা। রাস্তায়ে যানবাহন কিছু থাকলেও, পথচারী দেখা যাচ্ছেনা কোনদিকে – পুরো ব্যাপারটাই কি’রকম নির্ভেজাল ব্রিটিশ। আমাদের কোচটা এখন বাঁক নিল ওয়ারউইক ক্যাসেলের দিকে। ডেভিড এবার কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আপনারা ওয়ারউইক এসে ক্যাসেল ছাড়া কি আর কেউ কিছু দেখে নিতে চান? যেমন এখানে ওয়ারউইক ওল্ড টাউন দেখতে আসেন অনেকে, অনেকে আবার লর্ড লেসটারের হাসপাতাল!” এইটুকুতেই ক্লান্ত লাগছে যথেষ্ট, আমরা মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, “আমাদের আলাদা করে তেমন কিছু দেখে নেওয়ার নেই, জানিওনা আমরা, যা আছে আপনার সফরসুচিতে, সেটুকুই যথেষ্ট”।

ক্যাসেলে ঢোকার জন্যে, কোচটা যেখানে এসে থেমেছে, সে এক খুব সঙ্কীর্ণ রাস্তা। জায়গাটা এতোটাই সরু, যে ওই গোল্ডেন ট্যুরস এর বাসটা উলটোদিকে কাটানোর জায়গাটুকু পর্যন্ত পাওয়া যাবেনা বলে মনে হচ্ছে। রাস্তাটার দুপাশে ঘন গাছপালা আর দুরে দেখা যাচ্ছে একটা পাথরের উঁচু পাঁচিল। ডেভিড বলল, “দেখে নিন সক্কলে, ওই পাঁচিলের ওপাশেই বিখ্যাত ওয়ারউইক ক্যাসেল, তবে ঢুকতে গেলে আমাদের একশো মিটার মতন বেঁকেচুরে যেতে হবে”। পাঁচিলটা বাইরে থেকে কেমন একটা শ্রীহীন ঠেকল, কেমন একটা লোনাধরা। এমন একটা নিস্তব্ধ জায়গার, এমন একটা এঁদো গলির মধ্যে, আশেপাশে যে একটা মস্ত রাজপ্রাসাদ রয়েছে, তা না বলে দিলে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যাবেনা। টিরটির শব্দে কয়েকটা পাখি কোরাস গেয়ে চলেছে কোন একটা গাছের ডালে। এদিকে কোচ থেকে নামার পরেই, টিপটিপ করে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে উড়ে বেড়াচ্ছে গোটাকয়েক প্রজাপতি আর পতঙ্গ। গত তিনদিনের অর্জন করা সাহসে, ছাতা সোয়েটার বা জ্যাকেট কিছুই বহন করা হয়নি আজ। তাই বৃষ্টির ছাঁটে সামান্য একটু শীতও বোধহয় লাগছে তখন সকলের।

পাখিগুলো এই সবেমাত্র একটু চুপ করেছে। আমরা সকলে লাইন করে এগোচ্ছিলাম প্যালেসে ঢোকার আগে, একটু তফাতে আমেরিকানদের জটলাতে ডেভিড কি একটা বেশ হাত-পা নেড়ে, ছাতাটা উঁচিয়ে বোঝাচ্ছেন, আর ঠিক এমন সময়ে শোনা গেলো একটা নদীর আওয়াজ। খুব আশ্চর্য হয়ে ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা এখানে কি কোন নদী আছে?” ডেভিড জানালো, “নদী আছে বৈকি একটা। তবে এই নদীটা ছোটো। ভেবে বসবেন না, এ আবার টেমসের মতন বড় কিছু!” এই নদীর নামই অ্যাভন। ডেভিড আরও জানালেন, প্যালেসে ঢুকে ডানদিকের পরিখার উপরে তাকালেই নিচের উপত্যকায়ে দেখা যাবে সে নদীটিকে। নদী শুনলেই আমার কেবল মনে হয়, জুতো খুলে একটু পা ভিজিয়ে আসি। হয়ত একটু মেয়েলী গোছের ইচ্ছেটা। কিন্তু টিপটিপ বৃষ্টিতে, হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে নদীর তটরেখায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে যে সুখানুভব পাওয়া যায়, তা বুঝি ওয়ারউইকের রাজপ্রাসাদ দর্শনে নেই!

ঢুকে গেছি আমরা ক্যাসেলে আর মুহূর্তেই বুঝে গেলাম, উইন্ডসরের তুলনায় ওয়ারউইক ক্যাসেলটা একবারে শিশু। আর ক্যাসেলে ঢুকে দেখা গেলো, এ যেন অনেকটা লন্ডনের মাদাম তুসো মিউজিয়ামের মতনই। প্যালেসের ঘরগুলো বিশাল কিছু নয়, তবে চারিধারে মসৃণভাবে ছড়ানো ছিটনো রয়েছে মোমের সব অতিকায় মুর্তি। কাঠের মেঝেওয়ালা বৈঠকখানা ঘরটাতে নিভু নিভু ফায়ারপ্লেসের সামনে প্রকাণ্ড কাউচে বসে আলাপচারিতায়ে ব্যস্ত মোমের সাহেব মেমরা। পাশেই একটা শোবার ঘর, এক এলোকেশী মেম রাজকন্যা শুয়ে রয়েছে পালঙ্কে আর পায়ের কাছে এক লালমুখো রাজপুরুষ কি একটা বলতে চাইছে রাজকুমারীকে। হয়ত লোকটা প্রেমের প্রস্তাব দিতে এসেছে, কিন্তু কোমরে তার গোঁজা মস্ত একটা ছুরি। প্রস্তাবে না বললেই যেন ঘ্যাঁচ করে এখুনি ঢুকিয়ে দেবে রাজকুমারীরই পেটে। অন্যদিকে প্যালেসের একটা খাবার ঘর। সুদীর্ঘ লম্বা ডাইনিং টেবিল, থরেথরে সাজানো সোনালি থালা বাটি, সোনার কাঁটাচামচ, রুপোর গেলাসে পানীয়। পাশ দিয়ে একটা বেঁকানো সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরে! গিলটি করা পেল্লায় এক একটা ফ্রেমে বিভিন্ন রাজারানীদের পোট্রেট। চীনেরা পাগলের মতন ছবি তুলে নিচ্ছে সেসব দৃশ্যের।

ডেভিডের দেওয়া ইতিহাস অত বোধগম্য হলনা, তবে তার ভাষ্য থেকে এটুকু বোঝা গেলো, ওয়ারউইক ক্যাসেল আসলে ছিল একটা দুর্গ। অনেককাল আগে অ্যাভন নদীর তীরে ইংল্যান্ডের নরম্যান সম্রাট উইলিয়াম বানিয়েছিলেন। ডেভিড বলল, এই নরম্যানরা আসলে নাকি ছিলেন ফ্র্যান্সের লোক। ইতিহাসের একটা সময়ে, ইউরোপের উত্তরে ডেনমার্ক নরওয়ে আইসল্যান্ড থেকে নিয়ে গোটা পশ্চিম ইউরোপ দখল করে নিয়েছিল এই অত্যাচারী নরম্যানগুলো। উইলিয়ামের পরের যে গল্প, তাতে অনেক নাম রয়েছে। উইলিয়াম, হেনরি, এডওয়ার্ড, থমাস, জন, আরও কত। কত শত হাত বদল হয়ে বছর চল্লিশেক আগে মাদাম তুসোদের কোম্পানি কিনে নিয়েছে এই ওয়ারউইক ক্যাসেল। তবে তার আগে, এই উইলিয়াম আর হেনরিদের মধ্যে, এই ক্যাসেলের দখল, মতবিরোধ আর মালিকানা নিয়ে দিনের পর দিন হয়ে গেছে কেবল যুদ্ধ আর যুদ্ধ। নরম্যান বনাম নরম্যান, অ্যাংলো স্যাক্সন বনাম নরম্যান। ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ, বাপ ছেলেতে যুদ্ধ, শালা ভগ্নীপতির যুদ্ধ, শ্বশুর জামাইয়ে যুদ্ধ, দুই ভায়রা ভাইয়ে যুদ্ধ, কাকা ভাইপোতে যুদ্ধ, দুই বন্ধুতে যুদ্ধ, এই কোন্দলের কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন শ্রান্ত হয়ে পরছিলেন সকলেই! আচ্ছা রাজার বংশে জন্ম হলে কি সকলকেই একটা করে দুর্গ কিনে নিতে হবে? আর না কিনলে কি পড়িমরি করে ছিনিয়ে নিতে হবে অন্য কারোর থেকে? রাজার জীবনের মুখ্য লক্ষ্যই কি অস্থাবর একটা দুর্গ?

আসলে এদের জাতটা অসমসাহসী। আমাদের মতন টেনশনবাজ আর ভীতু নয়। এদিকে ডেভিড গড়গড় করে ক্যাসেলের ইতিহাস বলে চলেছে, দোভাষী সেটারই তাৎক্ষনিক তর্জমা করে দিচ্ছে আর চীনে পর্যটকেরা হাঁ করে গিলছেন সেসব কাহিনী। ক্যাসেল তো এদেশে সব জায়গায়ে ছড়ানো। সাসেক্স, নরফোক, ম্যানচেস্টার, ইয়র্ক বা ডার্বিশায়ার, সবই তো ক্যাসেলের জন্য প্রসিদ্ধ। তার মানে, সব ক্যাসেলেই কি আছে এমন নিষ্ঠুর রক্তাক্ত ইতিহাস? শয়ে শয়ে মানুষ খুনের কাহিনী। ডেভিড একগাল হেসে জানালেন, “হ্যাঁ, এদেশের ক্যাসেল ব্যাপারটা মানেই একনাগাড়ে পাঁচশো বছর ব্যাপী যুদ্ধ আর রক্তপাত”। আচ্ছা ডেভিড লোকটা যদি এত ভালো ইতিহাস জানে, এই সকল উৎসুক চীনেদের কি শোনাতে পারছেন না হিউয়েন সাং’এর ভারত পরিব্রজনের গল্প? চীনদেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে মানসিক ভাবে বিষণ্ণ কিশোর, জীবনের কি চরম আস্বাদই না পেয়েছিলেন নালন্দায়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে? আচ্ছা, এঁদের জিজ্ঞাসা করলে হয়না, চীনে কি বৌদ্ধ পরিব্রাজকরা এখনও আছেন? ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং’এর মতন? নাহ, এই ধরাবাঁধার ইতিহাস মনোযোগ না দিয়ে বরং অ্যাভন নদীটা ওই পরিখার উপর দিয়েই দেখে আসা ভালো। হয়ত বা দেখা যেতে পারে, অ্যাভনের তীর ধরে হেঁটে আসছেন কোন এক আনমনা পরিব্রাজক, দুহাজার উনিশের পৃথিবীটাকে কমনীয় করে তুলতে!

************************************************************************************

২৪ লন্ডন চতুর্থ দিন (গ)

নীতিবাক্যটা হল, ক্যালাস আর ভাবুক গোছের মানুষদের জীবনে অনেক ফালতু দুর্দশা পোয়াতে হয়। আর তার সাথে যদি আবার তলতলে বাঙালী আবেগ মেশানো থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। নইলে চীনেম্যানদের বিরামহীন কিচিরমিচিরের মাঝে, কোন বোকার হদ্দ বিলিতি অ্যাভন নদীর সাথে আমাদের দিশী কপোতাক্ষের নদের উপমা ভাঁজবে মনে? হ্যাঁ, কালজয়ী সনেট তো রচনা করেছেন উভয়েই। উভয়েই তো লিখেছেন নাটক। আর মিল সেরকম খুঁজতে চাইলে, সে’তো ডজনখানেক মিল খুঁজে বের করা যায়। একজন তাঁর সমাধিতে লিখে গেলেন, “গুড ফ্রেন্ড ফর জেসাস সেক ফরবেয়ার, টু ডিগ দি ডাস্ট এনক্লোসড হিয়ার”। আর অন্যজনে লিখলেন, “দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে…”। তবে আর দোষ কোথায়? ওয়ারউইক ক্যাসেলের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে পিছনে ছেড়ে, আমাদের কোচ এখন হেলেদুলে চলেছে শাল-সেগুনের বনানী পেরিয়ে। দুধারে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। এ ভোঁতা বয়েসেও কেমন মনে হয়, অ্যান্টোনিও যদি নামিয়ে দিতেন এমন এক রোমাঞ্চকর নীরবতার মাঝে, আলের উপর দিয়ে দেওয়া যেত একছুট। মাঠ ঘাট পেরিয়ে। ডেভিডের ভাষ্যে সম্বিত ফিরতে বোঝা গেল আমাদের কোচ পৌঁছে গিয়েছে স্ট্র্যাটফোর্ড। স্ট্র্যাটফোর্ড আপঅন অ্যাভন।

ডেভিড কিন্তু তাঁর ভাষ্যের কৌশলে, এই স্ট্র্যাটফোর্ডে পৌঁছনোটাকে একটু আবেগে চুবিয়ে, আরও একটু নাটকীয় করে তুলতেই পারতেন। যেরকম উথালপাথাল লেগেছিল কলেজ জীবনে প্রথমবার কেঁদুলি মেলায় পৌঁছে। ইয়া বড় একটা ঝরঝরে বাস লাল মাটির ধুলো উড়িয়ে একটা প্রান্তরে আমাদের তিনজনকে বিকেলবেলা ছেড়ে দিয়ে বলল, এই নাও, এটাই মেলা, ভিড় জমবে পরশু থেকে। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে বসে পরেছিলাম কয়েকগজ দূরে একটা চায়ের দোকানে, আকাশে তখন একটা কনেদেখা আলো। আজকে খুব মনে পরছে সেই দিনটার গল্প, স্ট্র্যাটফোর্ড আসার পথে গাছের ফাঁক দিয়ে, গোটাকয়েক বার দেখা গিয়েছে অ্যাভন নদীটা। সেই সেবারে যেমন দেখা গিয়েছিলো অজয় নদ। তবে ওয়ারউইক ক্যাসেলের পরিখার উপর দিয়ে অ্যাভনকে যতটুকু দেখা গিয়েছিলো, তাতে তো যথেষ্ট চঞ্চল মনে হয়েছিল নদীটাকে। স্ট্র্যাটফোর্ড পৌঁছে দেখা যাচ্ছে, এরাম ছিঃ! নদীর দুপাশ তো নির্দয়রূপে পাথরে নিবদ্ধ। এ নদীটা তো বেশ শীর্ণকায়, খরস্রোতা নয় একেবারেই। তবু কেন যে অদরকারি শাসন করা হচ্ছে এমন শান্ত নদীটাকে?

মাঝারি শহর এই স্ট্র্যাটফোর্ড আপঅন অ্যাভন। আর সকলে তো ছোটো করে স্ট্র্যাটফোর্ড নামেই ডাকছেন! তবে ‘আপঅন’ কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে কেন? কেবল পর্যটকদের কথা ভেবে? নাকি আরও একটা দুটো স্ট্র্যাটফোর্ড শহর রয়েছে ব্রিটেনে? মাথা ঝাঁকিয়ে ডেভিড জানালেন, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের স্ট্র্যাটফোর্ড একসময়ে বাণিজ্যের বিচারে ছিল এক জমজমাট শহর। অ্যাভনের উপরে ক্লপ্টন ব্রিজ নির্মাণের পর, স্ট্র্যাটফোর্ডের বাণিজ্যিক কদর বেড়ে গিয়েছিলো বহুগুণে। তাছাড়া বাঁয়ে নাক বরাবর গেলেই তো ব্রিস্টল, অদূরেই অক্সফোর্ড, একটু উপরের দিকটা ক্যামব্রিজ আর আরও একটু এগিয়ে গেলে বার্মিংহ্যাম, এই সব মিলিয়ে স্ট্র্যাটফোর্ড ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যময় একটি স্থান। ডেভিডের মুখে এইসব গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ চমক। একদম ব্রেকিং নিউজ, বড়রাস্তার পাশেই। বাঁদিকের একটা খড়ের ছাউনি দেওয়া কুটির। আয়তনে কুটিরটা বেশ বড়। অ্যান্টোনিয়ো কোচটাকে একটু মন্থর করতেই, ডেভিড বলল, ওই দেখুন শেক্সপীয়ারের বাড়ি। গিন্নি হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠে দাঁড়ালেন! বলে কি লোকটা? কোথায় সকাল থেকে ভেবে রাখা আছে রূপসী অ্যাভন নদী, গাছে গাছে থোকা থোকা সাদা গন্ধরাজ ফুল, একটা পাহাড়ি ঝর্না, আর তার পাশে একটা ছোট্ট পর্নকুটির! এতো একেবারে কেঁদুলির চেয়েও বড় চমক দিল ডেভিড। এতো পাক্কা শহুরে বেমানান ব্যাপার! কোথায় আমার ক্যালাস কল্পনার কপোতাক্ষ আর কোথায় যশোর খুলনার সাগরদাঁড়ি গ্রাম? বাঁদিকে মোড় ঘুরেই কোচ ঘ্যাঁস করে দাঁড়িয়ে গেল, শেক্সপীয়ারের বাড়ির প্রাঙ্গণে এসে।

কয়েক মিটার হেঁটেই, একটা ইটবাঁধানো লাল পথ। দুপাশে সারি দেওয়া টুকিটাকির দোকান, একটা দুটো রেস্তোরাঁ। আর এখানেও ভিড় জমিয়ে গান গাইছেন দুটি ব্রিটিশ যুবক। এতো হদ্দ শহর, স্কটল্যান্ডের লাল সবুজ চেকচেক কাপড়ের মাফলার বিক্রি হচ্ছে আকাশছোঁয়া দামে আর শেক্সপীয়ার ওয়েলকাম সেন্টারের সামনে পর্যটকদের মস্ত এক সর্পিল লাইনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ডেভিড। ওই ওয়েলকাম সেন্টার পেরিয়েই আমাদের ঢুকে যেতে হবে শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে। সিকিউরিটি চেকিং করে, প্রথমে পর্যটকদের দেখানো হচ্ছে দু মিনিটের একটা বাধ্যতামূলক ফিল্ম। শেক্সপীয়ারের জীবন আর তাঁর সাহিত্য সঙ্ক্রান্ত সমস্ত তথ্য নিয়ে। আচ্ছা শেলি, কীটস, লর্ড বায়রন, অ্যালফ্রেড লর্ড টেনিসন, বা উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ – এঁদের জন্মভিটেতেও কি এমনটাই এলাহি কাণ্ড হয়? এ যেন বিলেতের এক জোড়াসাঁকোয় এসে পরলাম আমরা! হাতের কাছে জোড়াসাঁকো থাকতে, কপোতাক্ষ নদের তীরে আর কজনাই বা যাবেন?

নাটকের চেয়ে কাব্য বেশি রচনা করলেও, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার সাহেব জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন নাটক রচনা করেই। আর তাঁর জন্মভিটেতে যেন নাটকের ছাপটা সুস্পষ্ট। বাইরে থেকে মস্ত বড় লাগলেও, ভিতরের পরিসরে কুটিরটি বেশ ছোটো। একটা দোতলা কাঠের বাড়ী, উভয় তলায়ে অপ্রশস্ত গোটাচারেক করে ঘর। বাড়ির পিছনের উঠোনে, শেক্সপীয়ারের রচনা করা নাটকের অংশ মাতিয়ে অভিনয় করছেন কয়েকটি যুবক যুবতী। ওঁরা একটা দেখালেন রোমীয় জুলিয়েটের অংশ আর অন্য আরেকটা হালকা কমেডি। বেশ ভালোই অভিনয় তাঁদের, তবে একটু যেন চড়া মেলোড্রামাটিক মনে হল। চারপাশের কয়েকটি কাঠের বেঞ্চিতে বসে রয়েছেন মননশীল কিছু দর্শকবৃন্দ। তরুণ শিল্পীরা একটা করে সর্গ শেষ করছেন আর উৎসাহী দর্শকদের করতালিতে ফেটে পরছে সেই প্রাঙ্গণ। দেখা গেলো, বেশ হৈহল্লা আর আড্ডার মধ্যেই সাহেবরা কেমন ঐতিহ্য আর বাণিজ্যকে সার্থক ভাবে চালিয়ে নিয়ে চলেছেন।

পাক্কা আধঘণ্টার মতন সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ীতে কাটিয়ে, গিন্নি আর মেয়েরা যখন উচ্ছল ইংরিজি সাহিত্য আর কালচারের নাগাল প্রায় পেয়ে গিয়েছে, হতচ্ছাড়া বৃষ্টিটা শুরু হল আবার। ডেভিড ডাক দিয়েছে, এরপরে আমাদের অন্য গন্তব্য, আপাতত আমাদের এই ইংরিজি সাহিত্যের নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ হল।

************************************************************************************

২৫ লন্ডন চতুর্থ দিন (ঘ)

ড্যাবড্যাব করে দেখছি আমরা চারজন। একটা মাঝারি অট্টালিকার সামনে থেমেছে আমাদের কোচটা আর বাসস্টপে বসে আছে একটা মাঝবয়েসী মানুষ। পরনে তাঁর একটা খয়েরি রঙের হাতকাটা জ্যাকেট আর খুব বড় দাড়ি তাঁর। চৌকো মুখটাতে লোকটাকে দেখতে লাগছে অনেকটা কার্ল মার্ক্সের মতন। দুর্দান্ত স্মার্ট! লোকটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গুটিকতক যুবক যুবতী। তবে যুবক না বলে এঁদের অবশ্য কিশোর বলা চলে। অনেকের পিঠে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে একটি দুটি ফাইল বা খাতাবই। তারা সমবেত হয়ে কি একটা বলছে আর মানুষটা মনোযোগ দিয়ে শুনছে তাঁদের কথা। জামাকাপড়ের বাছবিচার বা তেমন বাহার টাহার নেই কারোরই, সাধারণ প্যান্ট-জামা আর হালকা সোয়েটার জ্যাকেট পরিধান করেই আছে সকলে। চশমা আছে কয়েকজনের আর তার পিছনেই একজোড়া করে ঝাঁ চকচকে চোখ। গিন্নি দুই কন্যাকে সামান্য ছদ্মবকুনি দিয়ে বললেন, “দ্যাখ, এদের, এদের দেখে শেখ… আহাহা… দেখলেও চোখ জুড়িয়ে যায়, হীরের টুকরো ছেলেমেয়ে সব! আর তোরা দুটো? বাসের ভেতর জানালার ধার নিয়ে সেই তখন থেকে লাঠালাঠি করছিস!” একটু দুরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম আমি আর বুঝতে পারলাম, ভোরবেলা বেরোনোর আগে, ভেবেচিন্তে ঘন নীল রঙের টি-শার্ট’টা পরে আসলেও, আসল অক্সফোর্ড ব্লু কিন্তু আদপে এরাই। আর এঁদের বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখই জানান দিচ্ছে সেই খবর।

কয়েকহাত দূরে রাস্তাটা যেখানে দুভাগ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে ডেভিড গোল করে অক্সফোর্ডের কাহিনী বলা আরম্ভ করেছে সবে। বলছে এখানে মোট ঘণ্টা দুয়েকের মতন সময় দেবে সকলকে। নিজেই ঘুরিয়ে দেখাবে গোটা শহরটা। অন্ততপক্ষে আসল আসল জায়গাগুলো। চীনেগুলো কিন্তু এরই মধ্যে হাঁকপাঁক শুরু করে দিয়েছে। সটান হাঁটা লাগিয়েছে একজন দুজন, কিসের যে এদের এত তাড়া, সে স্বয়ং ভগবানই জানেন! সেই সকাল থেকে তিষ্ঠোতে দিচ্ছেনা ডেভিডকে। ডেভিড এদিকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তাঁর সাথে হাঁটার বদলে, যাত্রীদের কেউ যদি কোন নির্দিষ্ট কলেজ, বা মিউজিয়াম ইত্যাদি দেখে নিতে চান, বা চা, কফি বিয়ার-টিয়ার পান করে নিতে চান, ডেভিডের তাতে কোন আপত্তি নেই। তবে কোচ কিন্তু অক্সফোর্ড ছাড়বে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে পাঁচটায়ে। ফেরার মীটিং পয়েন্ট ঠিক করা হল এই বিউমন্ট স্ট্রীটের মোড়ে, ওই অট্টালিকাটার সামনে! একটা লোহার দরজা পেরিয়ে কয়েক ধাপ সিঁড়ি, আর তারপরেই অনেকটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের আদলে চারখানা বড়বড় থাম। দেখলাম পালকি তার বোনকে ফিসফিস করে বোঝাচ্ছে, “দ্যাখ এটাই হল ফেমাস অ্যাশমৌলিয়ান মিউজিয়াম অফ আর্ট অ্যান্ড আর্কিওলজি”।

আগ্রহী মন নিয়ে ভিড়ের মধ্যে অনুসরণ করা শুরু হল ডেভিডকে। ঠিক এক-একটা ইটের মতন করে মাপ করে কাটা পাথরের বাঁধানো সড়ক। খুব সুপ্রাচীন সে পথ, তবে বহু শতাব্দী ধরে পড়ুয়া আর পর্যটকের হাঁটায়, সে পথ কিন্তু এখনও খারাপ হয়নি এতোটুকু। একটা দুটো ছাড়া যানবাহন কিছু চলছেনা তেমন, কেবল ঝাঁকে ঝাঁকে উৎসুক ভ্রমণকারীর দল সার বেঁধে যেন অক্সফোর্ড পরিক্রমায়ে বেরিয়েছেন। বিকেল হয়ে আসছে, শিক্ষার্থীরা বুঝি কলেজ থেকে যে যার বাসস্থানের অভিমুখে ফিরে যাচ্ছেন। দেখা গেল সব্বাই কেমন খুব শিক্ষিত চেহারার! স্টাইল ফাইলের বালাই নেই তেমন কারো। এর মধ্যে অকারণে পালকি এবং তার বোন, দুজনেই নিজেদের মধ্যে কোন এক অজানা বিষয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টায়ে মেতে উঠেছে। সারাটা দিন কিন্তু ওয়ারউইকে বা শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে বেশ সজাগ হয়েই ছিল দুজনে। হয় ক্লান্ত, নয় বোধহয় অক্সফোর্ডের পড়ুয়াদের দেখেশুনে এক অজ্ঞাত হীনমন্যতায়ে ভুগতে শুরু করেছে দুজন? তাই বুঝি ইচ্ছে করেই নজর করছেনা অক্সফোর্ডের কলেজগুলোকে?

ডেভিড নিজেই পড়ত অক্সফোর্ডে। গতকালের গাইড এটা বললে, হালকা বুকনি ভেবে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু সকাল থেকে বোঝা গিয়েছে, ডেভিড কিন্তু ফাঁকা তুচ্ছ জিনিষ নন। বিদ্যাবত্তা ও সারবত্তা তাঁর যথেষ্ট রয়েছে। কেবলমাত্র অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা বা পরিচিতি দিয়ে কিন্তু ভদ্রলোক বৃত্তি চালাচ্ছেনা। এদিকে আমার বারকয়েক আমেরিকার বোস্টন – ক্যামব্রিজ শহরে যাত্রার সুবাদে, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি বা ম্যাসাচুসেটস ইন্সিটিউট অফ টেকনোলজি দেখা হয়ে গিয়েছে, দুহাজার দশে স্ট্যানফোর্ডও দেখা হয়ে গিয়েছিল বাইরে থেকে। সবকটাতেই এক বিস্ময়কর রকমের স্থাপত্যকলার নিদর্শন থাকলেও, অক্সফোর্ড কিন্তু একদম অন্য ধাঁচের। ডেভিড এক এক করে প্রতিষ্ঠানগুলি দেখাচ্ছে আর প্রত্যেকটি দেখে মনে প্রথমেই আসছে ভক্তি। শিক্ষার পীঠস্থান বুঝি দেখতে এমনই হবে! আমেরিকার মতন সাঙ্ঘাতিক রকম বিস্তীর্ণ কোনোটিই নয়, তবুও মনে হবে, শিক্ষার এক একটি যেন মন্দির বা সৌধ দর্শন করে নেওয়ার সুযোগ এসেছে আজ।

সকাল থেকে হাঁটাচলা করে পাদুটো এখন একটু শিথিল হয়ে পরেছে, জলতেষ্টা পেয়েছে আর এদিকে চীনেরা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। আর খুব চনমনে স্বভাব তাঁদের দোভাষীটার। কি করে যে সব চীনেদের তুষ্ট করে রাখবেন, এই নিয়ে তিনি সর্বদা ব্যস্ত। সারাদিন একসাথে ঘোরাঘুরি করলে, বুঝি মানুষে মানুষে দূরত্ব কমে যায়। ডেভিডের অফুরন্ত গল্পের স্টক দেখেই, চীনেদের মধ্যে ইংরিজি বোঝা দু-তিনজন কিন্তু এসে ভিড়েছেন আমাদের দলে। বিধিবৎ শিক্ষার সাথে লিখতে জানার একটা ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। সে মুখে বলে বা অনুকরণ করিয়ে যতই ঘরোয়া শিক্ষা দেওয়া যাক না কেন, না লিখলে বুঝি শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়না। হিয়েরোগ্রিফিলিক্স বা ওইরকম কিছু লিখিত লিপি প্রথম প্রচলন করেছিলেন মিশরীয়রা, তারপরে উত্তরে রোম গ্রিস এথেন্স, পূর্বে মেসোপটেমিয়া পেরিয়ে, লিপির প্রচলন আসে চীনদেশে। ইতিহাস বলে, তখনও বৈদিক যুগ শুরু হয়নি ভারতবর্ষে। তবে ততদিনে হিন্দুধর্ম নিজেদের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছে জাতপাতের ব্যাপারটা। কোন এক অন্ধ ফরমুলায়ে বৃত্তি, বর্ন, বংশগতির নিরিখে চার ভাগে শ্রেণিভুক্ত করে নিয়েছে নিজেদের। সেই ফরমুলার বিরুদ্ধে সেদিন কোন শক্তিধর কেউ রুখে দাঁড়ালে হয়ত অন্যরকম হত আজকের ভারত?

আগেই বলেছি, ডেভিড নিজে একজন অক্সফোর্ডের প্রাক্তন। পেমব্রোক কলেজের ছাত্র ছিল। পাশ করেছে সেই উনষাট সনে, তাঁদের আমলে, এথলেটিক্স নিয়ে কলেজে কলেজে রেষারেষির গল্প শোনাচ্ছিল ডেভিড। মোট তিরিশটা কলেজ ছিল তাঁর সময়ে, যা কিনা আজ উনচল্লিশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সাথেই জানাচ্ছিল, ইউনিভার্সিটির নানাবিধ পরিচালন প্রথা, বিভিন্ন আইন, এইসব নিয়ে একের পর এক সংবাদ। বলছিলেন বাকী খ্যাতনামা প্রাক্তনদের কথা। ডিউক ডাচেসরা তো আছেনই, তার সাথে এই অক্সফোর্ডই দিয়েছে, একগাদা প্রাইম মিনিস্টার আর প্রেসিডেন্ট। তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার, টেরিজা মে বা ডেভিড ক্যামেরন প্রভৃতিরা, তেমনি মনমোহন সিং, ইমরান খান বা বিল ক্লিনটন আর অস্ট্রেলিয়ার টোনি অ্যাবটও কিন্তু অক্সফোর্ডের উৎপাদন। আরও অনেক নোবেল লরিয়েট, কবি, ব্যবসায়ী, সাহিত্যিক, বিভিন্ন সফল মানুষের বিবরণ দিচ্ছিলেন ডেভিড, সবদিকে অতটা নজর না করলেও, নিজের স্বতঃস্ফূর্ততায়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া হল, খ্রাইস্ট কলেজের সামনে। অকারণেই একটা ছবি নিয়ে নেওয়া হল এর সামনে। অ্যালবার্ট আইস্টাইনের স্মরণে।

হুস করে এক একটা দিন কেমন কেটে যায়, বেড়াতে এলে। ডেভিড এখন আমাদের মতনই ক্লান্ত, ঘড়িতে পাঁচটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোচ ছাড়া যাচ্ছেনা কারণ এখনও দুজন চীনে ফিরে আসেননি কোচে। ওদের দোভাষীটা খুঁজতে গেছে ওই দুজনকে। অ্যান্টোনিয়ো কড়া ভাষায়ে হাত পা নেড়ে ডেভিডকে কীসব যেন বলছে! বকুনিই দিচ্ছে বোধহয়, আর খুব অসহায় লাগছে ডেভিডকে এখন! অ্যান্টোনিয়ো বেশ অশালীন ভাবেই বলছে, ঘড়ি ধরে আর ঠিক দশ মিনিট দেখবে সে, তারপরে লন্ডন ফিরে যাবে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই! এরই মধ্যে একজন বয়স্ক চীনে বাস থেকে নেমে কি একটা বেশ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন অ্যান্টোনিয়োকে, কিন্তু কেউ সে ভাষার একবর্ণও বুঝতে পারলনা! পাত্তাও দিলনা কেউ। হাল ছেড়ে দিয়ে ফের বাসে উঠে গেল চীনে লোকটা। এরই মধ্যে একটা হুরমুরিয়ে বৃষ্টি নেমে গিয়েছে, বেশ বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি! গিন্নি এসে পিছন থেকে দুটো আলতো টোকা মেরে বললেন, “আশ্চর্য তো! তুমি চীনেম্যানদের কথা ভেবে খামোখা ভিজছ কেন বৃষ্টিতে? এসো, এখুনি বাসের ভেতরে চলে এসো, আর সমস্ত ব্যাপারে বোকার মতন মাথা গলাতে যাও কেন তুমি”?

************************************************************************************

২৬ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (ক)

সকালটা খুব সুন্দর আজকে। একটা ঝলমলে রকমের রোদ্দুর উঠেছে। সকালে হোটেল থেকে চেক আউটের পর মালপত্তর নিয়ে এইমাত্র আমরা পৌঁছে গেলাম লন্ডনের কিংসক্রস রেলস্টেশনে। কিংসক্রসে নেমেই একগাদা সূর্যমুখী ফুল দেখে পালকি বেশ শিহরিত হয়ে গিয়েছে! ছোট মেয়ের ঘুম কাটেনি এখনও, সে তার মা’কে জোরসে আঁকড়ে রেখেছে কি একটা অজানা ভয়ে! এখানে এসে যা বুঝলাম, ইউরো-স্টারের ট্রেনগুলো লন্ডন প্যানক্র্যাস স্টেশন থেকে ছাড়লেও, এডিনব্র বা অন্য নর্থবাউন্ড ট্রেনগুলো ছাড়ছে কিংসক্রস থেকে। আর একদম লাগোয়া এই দুটো রেলস্টেশন। আজ চেকআউটের পর, কেন্সিংটন থেকে আলির গাড়িতেই আসা, তবে আলি নিজে আসেনি আজ। আব্দুল নামের অন্য এক ছোকরাকে পাঠিয়েছে আমাদের নিতে। আব্দুল বলল, সে আলির চাচাতো ভাই! আলির মতন মিশুকে নয় আব্দুল, তবে কিংসক্রসে সওয়ারীকে নামানোর আগে জরুরি কথাটা কিন্তু জানিয়ে দিতে ভুললনা। জানালো, এডিনব্র’তে আমাদের সঙ্গে থাকবে অ্যানড্রু, আলির টিমেই আছেন এই অ্যানড্রু, নর্থের টুরিস্টদের দেখাশোনার ভার অ্যানড্রু’র উপরেই, আর আব্দুলের থেকেই নিয়ে পালকি নিয়ে নিয়েছে অ্যানড্রু’র ফোননম্বর। জয়-মা বলে, কিংসক্রসে ঢুকে যাওয়ার পর বুকটা বেশ খালি-খালি লাগা শুরু হল। গিন্নিকেও দেখা গেল, বেশ বিষণ্ণ হয়ে একটা বেঞ্চিতে বসে রয়েছে। লন্ডন শহরের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্যতা বুঝি বেশ ভালই জমে উঠেছিল এই চারদিনে। নৈকট্য বেড়ে গিয়েছিল, আসলে, কোন জায়গা ছেড়ে না এলে বুঝি সে জায়গার গরিমার নাগাল করা মুশকিল।

অসম্ভব পরিছন্ন এই কিংসক্রস। দাপট নেই টিকিটচেকারের বা রেলপুলিশের আর হাওড়া শিয়ালদার মতন ব্যস্তও তেমন কিছু নয়। স্টেশনটার প্রধান অংশে দাঁড়িয়ে মনে হবে, যেন এক হালফ্যাশানের শপিং-মলে ঢুকে পরা হয়েছে। ট্রেনের আওয়াজ, যাত্রীর ব্যস্ততা, রেলকোম্পানির মাইকে ঘোষণার বাড়াবাড়ি বা অন্য কোন উঁচুপর্দার কোলাহল কিছুই আমাদের কানে আসছেনা। রাশিরাশি কোমল আলো দিয়ে সাজানো, এই কিংসক্রসের সাথে যে কোন মাঝারি বিমানবন্দরের সাথে অনায়াসে তুলনা করা যাবে। সুদৃশ্য টিকিট কাউন্টার আর এনকোয়ারি জানালার পাশেই একটা ওয়েটরোজ কোম্পানির সুপারমার্কেট, তাছাড়া বিভিন্ন ক্যাফে, ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি ছাড়াও আরও হরেক রকমের ফুডপ্লাজা, সব মিলিয়ে কিংসক্রস এক জমজমাট ব্যাপার। তবে হাওড়া শিয়ালদা স্টেশনগুলোও এখন অনেক উন্নত আর আধুনিক হয়ে গিয়েছে। তবুও তাদের যেন কিংসক্রসের মানে পৌঁছতে গেলে আরও কাঠখড় পোড়াতে হবে।

আমার ধারণায়, রেলস্টেশন মানেই যেন সবকিছু কেমন সাময়িক গোছের হবে। সব টেম্পোরারি! শুধু রেলপুলিশের ঘণ্টায় ঘণ্টায় গটমটিয়ে হাঁটাহাঁটি আর কংক্রিটের বাঁধানো প্ল্যাটফর্মটুকুই যেন স্থায়ী, বাকী সবই যাওয়া আর আসা। যাত্রীরা পিলপিল করে যথাসময়ে আসবে, সাময়িক অপেক্ষা করবে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে অথবা মাটিতে হোল্ডল বিছিয়ে আর তারপর ট্রেন এসে গেলেই ধাঁ, নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলে যাবে নিজ নিজ ট্রেনে চেপে। আর ট্রেনটাও দেখবেন, প্ল্যাটফর্মে ঘ্যাঁস করে এসে দাঁড়াবে একটা লম্বা হুইসল বাজিয়ে আর আকস্মিক ভাবে বেড়ে যাবে লোকসমাগম। হাজার হাজার মা, তাদের কাঁখে তাদের সন্তান! ওই গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে থাকবে ক্রেতা, থাকবে বিক্রেতা, স্টেশনের পাশেই বসে যাবে হয়ত একটা সান্ধ্যবাজার, আলুবেগুণের পসরা। অদূরে তৈরি হবে একটা বেশ্যাপল্লী, শুনশান সন্ধ্যের দিকে হাতে কুপী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে স্ত্রীলোকেরা আর খুচরো দুটো ফড়ে। কিংসক্রসেও হয়ত প্রকৃতির নিয়মে এমনটাই চলেছে! কেবল সবই বুঝি তাদের উন্নত, আধুনিক আর সাহেবি আভিজাত্য মাখানো। ওই যেমন, পশ্চাদ্দেশ পরিষ্কার রাখতে কেউ জল ব্যবহার করে গাড়ুতে, প্রকাশ্যে মাঠেঘাটে। কেউ আবার মতন মগে। কেউ তো আরও উন্নত প্রযুক্তির হ্যান্ড-শাওয়ারে। আর যে দেশে এসেছি, সেখানে তো জল ব্যবহারের কোন পন্থাই জানেনা এঁরা।

তবে আর কিছু হোক না হোক, গত চারদিনে বিলেত বেরিয়ে, বলতে বাঁধা নেই, আমার গিন্নির আর দুই মেয়ের কিন্তু নিজেদের উপর আস্থা বেড়ে গিয়েছে হাজারগুন। এডিনব্র’র ট্রেন দেবে কোন প্ল্যাটফর্মে আর তা জানা যাবে কোন এনকোয়ারি কাউন্টার থেকে, দেখা গেলো পালকি সড়গড় করে ফেলেছে মিনিট কয়েকেই। সেই দুবাই বিমানবন্দরে বা গ্যাটউইকে যেমন একটা থুতনি ঝুলনো অনিশ্চিত ভাব ছিল পালকির মায়ের মুখে, সেই স্নায়ুচাপ এখন বুঝি একেবারেই ভ্যানিশ। এ যেন লুঙ্গি গেঞ্জি পরা গাঁয়ের ছেলের, শহরে পা রেখে ভোল পালটে গিয়েছে বিলকুল। এখন রীতিমতন প্যান্ট শার্ট পরে ট্যাক্সিতে চাপছে সে।

এডিনব্র পৌঁছতে লন্ডন নর্থইস্টার্ন রেলের এই ট্রেনটা নেবে সাড়ে চারঘণ্টার মতন সময়। অর্থাৎ পৌঁছতে পৌঁছতে সেই বেলা তিনটে সাড়ে তিনটে বাজিয়ে দেবে। তাই, দুপুরে কি খাওয়া হবে সেই নিয়ে একটু চাপা উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেল গিন্নির মুখে। আর যাই হোক, এমন একটা রেলকামরায়ে কি আর শসা বা চীনেবাদাম ফিরি করবে সাহেবরা? সেই দুশ্চিন্তায়ে, ওয়েটরোজের স্টোরটার থেকে তুলে নেওয়া হল একপ্যাকেট স্কোনস, চারটে স্যান্ডুইচ, আলুর চিপস, জলের বোতল আর কোক। আমাদের বিলিতি স্কোনস খাওয়ার ঔৎসুক্য দেখে, স্টোরের সুপারভাইজার মহিলা তিনটে ছোটো শিশিতে ক্লটেড ক্রিমও ফ্রি দিল তার সাথে। আর এই সময়েই পালকি এসে ঘোষণা করল, এসো তোমরা, পা চালিয়ে এসো, ট্রেন দিয়ে দিয়েছে। বাইশ নম্বরে।

ট্রেনে উঠলে যে কোন বাইরের দৃশ্য কেমন একটা রহস্যময় হয়ে ওঠে। কোনদিক দিয়ে এলাম আর কোনদিকে ঠিক যাচ্ছি গুলিয়ে যায় আর কোন ধরণের যুক্তিবোধ আমার কাজ করেনা। আর সেই কারণেই বুঝি ট্রেনে খাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু মাথায়ে আসেনা আমার। তবে এই বিলিতি ট্রেনে ওঠার পর, আমাদের চারজনের মালপত্তর গোছাতে যা অনর্থক ঝামেলায় পরা গেল আর তার জন্যে কামরার মধ্যে যে পরিমাণ লজ্জাদায়ক বিশৃঙ্খলা, তাতে আমার খিদে উবে, ছোট্ট একটা হার্ট অ্যাটাক হলেও কিছু করার ছিলনা। নেহাত পরিবারটির এখন নিজেদের ওপর অগাধ আস্থা, তাই বুঝি মিনিট পাঁচেকেই কাটিয়ে নেওয়া গেল থতমত ব্যাপারটা। তবে এই ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা একদম হাতে গোণা, সেটাই একদিক থেকে বাঁচোয়া। ফার্স্ট ক্লাস চেয়ার কার কামরা, পেল্লায় সব বড়বড় নীল রঙের গদিআঁটা সীট। তবুও যেন একদম তাজ্জব বনে যাওয়ার মতন তেমন কিছু নয়। বাঁপাশে মুখোমুখি এক বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা। দুজনেই নাকের ডগায় রিডিং গ্লাস দিয়ে খবরের কাগজ দেখছেন। আর চোখের ফাঁক দিয়ে একটা উদ্ধত ভঙ্গীতে আমাদের জরিপ করছেন। হয়ত ভাবছেন, কি বিপদেই না পরা গেল বাপু, এই এখন চার চারটে ঘণ্টা এই গাঁইয়া ইন্ডিয়ানগুলোর বকবকানি সহ্য করতে হবে!

প্রাথমিক ব্যাপারগুলো সামলে নিয়ে এবারে যখন স্কোনস আর ক্রিমের দিকে নজর দেওয়ার কথা আর দুপাশের দৃশ্য রমণীয় হয়ে উঠছে মিনিটে মিনিটে, সেই সময়েই দেখা গেল, লন্ডন নর্থইস্টার্ন রেলওয়ে ফার্স্ট ক্লাসে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও অঢেল পানীয় সরবরাহ করে। অবিকল বিমানের মতন। বলতে না বলতেই একজোড়া মেয়ে নিয়ে এসেছে তাঁদের পানীয়ের সম্ভার! তাতে চা কফি দুধ ফোলের রস ছাড়াও রয়েছে হরেক রকমের ওয়াইন আর বীয়ার। আর পিছনে পিছনে আসছে বিপুল খাবারের ট্রলি। আর কি নেই তাতে! চমকে উঠে শুনি, ঘ্যাটাং ঘ্যাটাং আওয়াজে ট্রেনটা এখন একটা নদী পেরোচ্ছে। টেমসই হবে বোধহয়, লন্ডনের আশেপাশে টেমস ছাড়া আর তো তেমন কোনো নদী আছে বলে জানা নেই! আচ্ছা টেমস তো এঁদের প্রাণ, লন্ডনের হৃদস্পন্দন! এঁরা শ্রদ্ধাবনত হয়ে দু-পাঁচ পয়সা ফেলেন না টেমসে? যেমন মোগলসরাই ছেড়ে ট্রেন কাশীতে ঢোকার সময়ে ফেলা হত?

************************************************************************************

২৭ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (খ)

সীট ছেড়ে উঠল প্রথম ছোটজনই। বোধহয় বাথরুমের খোঁজে। এই গত আড়াইঘণ্টায়ে দুইজনের কেউই ওঠেনি নিজের জায়গা ছেড়ে। গ্যাঁট হয়ে বসে ছিল, যদি সাধের জানালার ধারটা চলে যায়। গিন্নির আবার থেকে থেকে কেবলই নাকি মনে হচ্ছে, আমাদের দিকটা নাকি অতটা সুন্দর নয়। কিরম সব ঝুপ্সি গাছফাচ! ওই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দিকের সিনারিটাই নাকি অনেক বেশি নয়নাভিরাম। একদিক থেকে ব্যাপারটা কিন্তু তেমন ভুল কিছু নয়। আমাদের দিকটা সত্যি বেশ সাদামাটা, আর যেমন যদি ধরা যায় ট্রেনটা দক্ষিণ থেকে উপকুল ধরে উত্তর-পুর্বে চলেছে, তাহলে হিসেবমতন নর্থ-সি টা কিন্তু ওঁদের দিকেই আসার কথা। কিন্তু তাই বলে তো আবার ভদ্রতার মাথা খেয়ে, ওদের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পরা যাবেনা! সে কারণেই যা একটু খেদ থেকে যাচ্ছে।

মিনিটখানেক বাদেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফিরে এল আমাদের ছোটোকন্যা। মনমরা হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে জানালো, “ফালতু ট্রেন এটা, এই ট্রেনটাতে কোন বাথরুম ফাথরুম নেই! বলে কি মেয়েটা? গত দুদিনের গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানির কোচে একটা করে গোটা বাথরুম থাকলেও, এমন অত্যাধুনিক দূরপাল্লার বিলিতি ট্রেন বাথরুমহীন? সাহেব মেমরা কি তবে ট্রেনে বেগটেগ এলে, সেসব বেমালুম চেপে রাখে নাকি? খুব চিন্তায় পরে গেছে সে, তবে সমাধান বের করল শেষ অবধি আমাদের পালকিই। বোনকে বাঁচাবার তাগিদে, একবার পায়চারি করেই বাথরুম সনাক্ত করে ফেলেছে সে। দুটি কামরার মাঝে একটা অর্ধবৃত্ত গোছের দরজার মতন। একেবারে ভিতরের দেওয়ালের রঙে রঙ মেলানো। এসব এলাকার চলতি নিয়ম জানা না থাকলে, বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই। অগোচরেই থেকে যাবে সেই দরজা। সন্মুখভাগে নির্দেশ লেখা একটা ছোট্ট বোতাম আর সেই বোতামেই হালকা হুঁশিয়ার চাপ দিলে খুলবে বাথরুমের দরজা। দেখা গেল, কেবল দরজা নয়। ভিতরের বাকীসব সারসার বোতামফোতামগুলোও মাত্রাতিরিক্তভাবে যান্ত্রিক। দুই কন্যার মুখে আধুনিক দিনের বাথরুমের এহেন বিবরণে, গিন্নি বুঝি আর বাকী ফলের রসটুকু পান করলেন না। অবশ্য বাথরুম খুঁজে পেয়েও, ছোটোটির তখনও মুখভার। তার জানালার ধারটা বিনা নোটিসে দখল করে নিয়েছে তার মা।

বাইরের দৃশ্য অসাধারণ থেকে ক্রমান্বয়ে অনন্যসাধারণ হয়ে উঠছে। সেই দৃশ্যে অভিভূত হয়ে, চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়েই লজ্জার মাথা খেয়ে ক্ষণে ক্ষণে তুলে নেওয়া হচ্ছে ছবি। মিনিট পনেরো বাদে বাদে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কোন একটা ছোটো স্টেশনে। মোরাম বিছনো ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, একটা ফোয়ারা, ঢালুর দিকে কিছু ফুলের চারাগাছ, আর ছোটো একটা ইট রঙের গ্র্যানাইটের অফিসঘর আর সেই অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে একটা বেঁটে স্টেশনমাস্টার সবুজ পতাকা নাড়িয়ে আমাদের যেন অনুমতিদান করছে ইংল্যান্ড পেরিয়ে স্কটল্যান্ডে ঢোকার জন্যে। মনে হয় যেন জাহাজের ক্যাপ্টেন! মজার কথা, ট্রেনটার গতিও এমন কিছু নয়। যেন আমাদের ছুটির মেজাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সে আজ একটু ঢিমে তালে ছুটছে এডিনব্র’র দিকে। আর আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করা যায়, কোন স্টেশনেই সেরকম কেউ কিন্তু ওঠানামা করছেন না। এমনকি, কয়েকটা ছোটো স্টেশন তো দেখা গেল একেবারে জনমানবহীন। এমনকি স্টেশনমাস্টারও পর্যন্ত উপস্থিত নেই সেখানে।

চোখে পরছে পরিত্যক্ত গাড়ীর গ্যারাজ, একটা তালাবন্ধ লোহার দরজা, বোঝা যাচ্ছে অনেককাল কেউ আসেনি সেখানে! ইংল্যান্ড বুঝি ক্রমাগত চলে যাচ্ছে চোখের আড়ালে। ইয়র্ক, ডার্লিংটন তো চলে গেল খানিকক্ষণ আগেই। এবারে বোধহয় ডারহ্যাম আসবে একটু পরেই। আমাদের ঠিক পেছনদিকটা যারা বসে আছে, তাদের একদল নামবে ডারহ্যাম আর অন্যদল বোধহয় নিউক্যাসেল। পাশের বৃদ্ধার সাথে চোখাচুখি হয়েছে বেশ কয়েকবার। একবার তো আমাদের দিকে চেয়ে মহিলা হাসল বলেই মনে হল। উল্টোদিকের বৃদ্ধ গুরুতর রকমের গম্ভীর। তবে শেষমেশ দেখা গেল গিন্নির কথাই সঠিক। দৃশ্য এদিকেও মোটামুটি রকমের মনোরম, তবে এদিকে যেন একটু ঝোপঝাড় একটু বেশি চোখে পরছে বলে মনে হয়। ভাল দৃশ্যগুলো সব ওদিকেই। কিন্তু তাই বলে তো চোখের মাথা খেয়ে ওদিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকাও যায়না। যদি কোন কারণে ওঁরা মনে করে আমরা ওঁদেরকে প্রচ্ছন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করছি? এদিকে আমরা যে ট্রেনে চেপে এমন মনোরম দৃশ্য আগে কোনদিন দেখিনি, সেটা তো এরা নাও জানতে পারে। এরকম প্রবীণ কেউ আমার সামনে সটান বসে থাকলে, আমি কিন্তু তাদের সাথে এতক্ষণে গল্প জুড়ে দিতাম। তবে এখন কেন অস্বস্তি হচ্ছে? এই যেমন এই বুড়ো লোকটাকে বুঝিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে, এই এখুনি উইয়ার নামের যে নদীটি পেরিয়ে গেল ট্রেনটা, সেটা আদপে কোন নদীই নয়। আমাদের দেশের নদীগুলোর অনুপাতে সেটা বড়জোর একটা নালা। এঁদের তো আমাদের সাথে গল্পগুজব করে জেনে নেওয়া উচিত ব্রহ্মপুত্র বা মহানদী কতটা বড়? আরে, অন্যান্য পশ্চিমী দেশগুলোতে আর কিছু না হলেও, ভারতের আধ্যাত্মিকতা, যোগব্যায়াম বা টেররিসম ইত্যাদি নিয়ে অনেক কৌতূহল রয়েছে। আমেরিকায়ে তো প্রায়শই রবীন্দ্রনাথ আর রবিশঙ্কর নিয়ে গড়বড় করে ফেলে মার্কিনীরা। অ্যামেরিকার আসরে ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেও, প্রতিবার সেই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে আমার কেমন একটা অদ্ভুত তৃপ্তি হত মনে। এই বৃদ্ধটি কি তবে বোবা?

এইমাত্র ডারহ্যাম ছেড়ে গেল ট্রেন। ছোটকন্যা পা-ফা তুলে জমিয়ে বসেছে সীটে। এইমাত্র লাঞ্চে স্যান্ডুইচ আর চা দিয়ে গেছে রেলকোম্পানির সেবিকারা। স্যান্ডুইচটা স্যমন মাছের শুনে ছোটটা আর নিলনা সেই খাবার। বোধহয় আঁশটে গন্ধ পেয়েছে! ট্রেনের গতি বেশ মন্থর, পিছনে বসা পুরুষটা উঠে দাঁড়িয়ে মালপত্তর নামিয়ে নিচ্ছেন বাঙ্ক থেকে। নিউক্যাসেলে নামবে বোধহয়। প্যান্টট্যান্ট ঝেড়ে, লোকটা সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই, তার পাশের মহিলা তাঁকে চকাস চকাস করে দু গালে দুখানা মোক্ষম চুমো খেল। আরে! যাদের এতক্ষণ ভাবছিলাম, এক অফিসে কাজকম্ম করে দুজন, কম্পিউটার আর কীসব খাতাপত্তর খুলে মনোযোগ দিয়ে হিসেবনিকেশ করছিল, তারাও বিনাবাক্যব্যয়ে একে অন্যকে মাগনায়ে এমন চুমো দেয়? আমি কেমন রোমাঞ্চিত হয়ে গেলাম। যখন সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি, গিন্নির দেখা গেল ভুরু কুঁচকে গেছে! কিছু একটা বাজে সন্দেহ করছে বুঝি সে! এতক্ষণ একটু বেশীই দেখে ফেলেছি বোধহয়, চকিতে গিন্নির দিকে ফিরে তাকাতেই, বেশ জোরেই সে এবার বলল, “এই চা-টা খাচ্ছ কিকরে? এক্কেবারে ট্যালটেলে, স্যান্ডুইচটা বিস্বাদ। এগুলো তোমার আর খেতে হবেনা”! আমি আবার জানালার দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম, না ভাই, বেড়াতে এসে ফালতু ঝামেলা পোষাবেনা। বৃদ্ধারও দেখলাম চোখে পরেছে ব্যাপারটা। গিন্নির দিকে তাকিয়ে মিচকে হাসি হেসে যেন বোঝাতে চাইছে, “আরে ছাড়ো! সব পুরুষই এক, সে তোমার ইন্ডিয়া হোক বা বিলেত”।

************************************************************************************

২৮ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (গ)

রেলগাড়ির সাথে আমার ব্যক্তিগত রোম্যান্স ছিল ছেলেবেলায়। কু-ঝিকঝিক আওয়াজ আর দুলুনি, ঘাম আর তামাক মেশানো গন্ধ, খোলা জানালা দিয়ে অপরিমেয় বাতাস আর কয়লার কুঁচি। বর্ধমান পেরোলে ওই চাষাড়ে ভিড়েও, স্লিপার ক্লাসের যাত্রীদের সবাইকে কেমন যেন এক পরিবারের বলে মনে হতো। মেঝের কোনায় জমে যাওয়া চিনেবাদামের খোলা, পানের পিক, ছেঁড়া খবরের কাগজ আর অপরিছন্ন বাথরুমের দুর্গন্ধের মধ্যে হয়ে যেত কত বিয়ের সম্বন্ধ, কত প্রেম। এই ট্রেনটা তাই বুঝি অচেনা। নিউক্যাসেল ছাড়ার পর, একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছিল। এখন মেঘফেঘ কেটে আকাশ আবার যথেষ্ট নীল, ডানহাতে এবার মাঝে মাঝে দেখা দিচ্ছে নর্থ-সি আর গোটা কামরাটা এখন বিলকুল ফাঁকা। ছোটটা আধশোয়া হয়ে পরেছে তার জায়গায়ে আর পালকি জানালার কাঁচে নাক ঠেকিয়ে দেখে নিচ্ছে বাইরের বৃক্ষবিরল ঘন সবুজ মাঠ, ছোটছোট নদীর উপরের সেতুগুলো। আর মিনিট চল্লিশেকের মধ্যেই বোধহয় ঢুকে যাবো এডিনব্র! রেলের রাস্তা কিন্তু বেঁকেছে মাঝেমধ্যেই, এখন কোথাও কোথাও একটু যেন ওঠাপড়া। স্কটল্যান্ডে ঢোকার মুখে যা দেখছি, সবই ভয়ঙ্কর রকমের অভিরাম, কিন্তু তবুও যেন মেলানো যাচ্ছেনা আমার শৈশবের অঙ্কের সাথে।

এ যেন অনেকটা গোপাল ভাঁড়ের গল্পের মতন। টাক চুলকে গোপাল বলে, আমি আপনার ওই টাকাটাই নেব রাজামশায়, জ্ঞানট্যান চাইনা আমার। কি জানেন রাজামশায়, যার যেইটা নাই, ঠিক সেইটাই তো সেই ব্যাটা চায়। খাঁটি সত্যি কথা, মানুষের চরিত্র যেন ঠিক তাই। যার কাছে যেটা নেই, সেটাতে যেন তার ততোধিক আসক্তি। নামজাদা গায়কের দলটা শহরের বিলাস ছেড়ে টানা তিনমাস এসে কাটিয়ে যায় ঋষিকেশের সাধুর আখড়ায়ে, তিনখানা বিদেশী গাড়ীর মালিক সকালবেলায় জগিং করতে বেরোয় ডাক্তারের কথা মেনে, আর অন্যদিকে আশৈশব রেললাইনের ধারের বদ্ধ বসতির মেয়ে প্রতি শিবরাত্তিরে মানত করে, তার যেন একটা বারান্দাওয়ালা দোতলা বাড়ীতে বিয়ে হয়। আমাদের অবস্থা বুঝি অনেকটা সেইরকমের। ক্ষুধার্ত চোখে বাইরের বিচিত্র দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা এইমাত্র এসে পরলাম এডিনব্র ওয়েভারলি। ট্রেন ঢুকছে এডিনব্রতে আর ছোটকন্যা বারকয়েক হ্যাঁচ্ছো দেওয়াতে, গিন্নির নজর তখন তার দিকে।

ওয়েভারলি রেলস্টেশন কিন্তু মানুষজনে ছয়লাপ! ঝড়ের গতিতে লোক নামছে ট্রেনের থেকে আর আমরা চার বাঙালীও টুক করে ভিড়ে গিয়েছি সেই প্রাণান্তকর প্রবাহে। লিফটে করে উঠতে হবে উপরের তলায় আর উপরে উঠতেই দেখা হয়ে গেল ড্যানিয়েল ক্রেইগের সঙ্গে। তাঁকে দূর থেকে দেখে পালকি রইরই করে উঠেছে। ক্রেইগ সাহেব ঠিক আলির মতন একটা পেল্লায় মার্সিডিজ ভ্যান নিয়ে প্রতীক্ষায়ে করছেন আমাদের। চোখে একটা ছাই রঙের চশমা! তবে এ গাড়ির রং দুধসাদা, আলির মতন কালো নয়। আমাদের দেখতে পেয়েই লোকটার একগাল হাসি। চশমাফসমা খুলে ফেললেন ক্রেইগ আর এবারে বোঝা গেল, নাহ! এ আমাদের জিরো জিরো সেভেন ড্যানিয়েল ক্রেইগ-ফেগ কেউ নয়। আলির টিমের অ্যানড্রু। নচেৎ আর কোন বিশেষ তারতম্য নেই। আর কেবল আদল নয়, গঠনে, পরিধানে, চালচলনে বা অঙ্গভঙ্গিতে, লোকটা একদম বসানো ড্যানিয়েল ক্রেইগ। দেখা গেল, অ্যানড্রু কিন্তু নিজেও ভালমতন জানে ব্যাপারটা আর সে বিষয়ে যথেষ্ট আত্মসচেতন লোকটা। কিন্তু এঁর ধাত জানা নেই। মাত্র মিনিট তিনেকের আলাপে, জেমস বন্ডের সাথে তাঁর সাদৃশ্য নিয়ে, সাততাড়াতাড়ি বেশি বলাবলি করলে, যদি বিগড়ে যায় তার মেজাজ?

অ্যানড্রু কিন্তু ঝানু লোক। ভাল কথা বলে আর আলির মতন গ্রাম্ভারি নয়। তাছাড়া সারা পৃথিবীর হাজার ট্যুরিস্ট ঘেঁটে যার রুজি রোজগার, তার তো সুবক্তা আর সেয়ানা হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই। প্রথম থেকেই আমাদের সাথে এমন অমায়িক ব্যবহার শুরু করেছেন, যেন আমরা তাঁর অনেককালের আত্মীয়। এমনকি এইমাত্র গাড়িতে বেবাক চালিয়ে দিয়েছে একটা অরিজিত সিংহের সুপরিচিত বলিউডি গান। আর তাতে আমাদের ছোটজন একটা অদ্ভুত কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে অ্যানড্রুর দিকে! একটু আগেই বোধহয় এখানে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, তাই বাতাসটা সামান্য শীতল। রাস্তাটাও ভেজা।

লন্ডনের মতন এডিনব্র’র হোটেল’টাও সিটি সেন্টারে, ওয়েভারলি রেলস্টেশন থেকে গাড়িতে লাগল মিনিট পাঁচেকের মতন। উলটোদিকেই এডিনব্র শহরের খ্যাতনামা থিয়েটার হল – প্লেহাউস থিয়েটার। আর বাইরেই বড়বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে – ফ্রাইডে, টুয়েন্টি এইটথ জুন – দ্য পিঙ্ক ফ্লয়েড এক্সপিরিয়েন্স। মানে আগামীকাল সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায়ে। তবে এখন শুধু হোটেলে ঢুকে পোঁটলাপুঁটলি রাখা আর তারপর দেখতে যেতে হবে এডিনব্র ক্যাসেল। হাতে মাত্র মিনিট কুড়ি সময় আছে আমাদের কারণ অ্যানড্রু জানালেন ক্যাসেলের ঝাঁপ নাকি বন্ধ হয়ে যায় পাঁচটায়ে।

ডেভিডের মতন না হলেও, দেখা গেল অ্যানড্রু বেশ জ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ। আর তার সাথে আজ জুটে গিয়েছেন আমার গিন্নি। স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের যাবতীয় বিরাগ বিরুদ্ধতা আর যুদ্ধফুদ্ধ নিয়ে আউটল্যান্ডার নামের কোন এক টিভি সিরিয়াল দেখার সুবাদে, তিনি আজ দেখলাম বেশ সক্রিয়। যেন চলছে একটা যুগলবন্দীর খেলা, কথায় কথায় অ্যানড্রু’র দিকে গিন্নি আমার ছুঁড়ে দিচ্ছে বেয়াড়া প্রশ্ন, বাক্যালাপের মাঝে অনেকটা ইচ্ছে করেই যেন খুচুরখাচুর নিয়ে আসছে কিং ডেভিড ওয়ান, কিং ম্যালকম টু, আর হলিরুড অ্যাবির তাবৎ রাজকীয় সব গল্প। আর তখন আমি চারপাশ মিলিয়ে নিচ্ছি আমার ইশকুলের বন্ধু ভাস্করের বাবা রসায়নের সুপরিচিত অধ্যাপক ডক্টর পার্থসারথি চক্রবর্তী’র গল্পের সাথে। খুব সম্ভব আমাদের ক্লাস ফোরে বা ফাইভে পড়ার সময়ে, ভাস্করদের নিউ আলিপুরের কোয়ার্টারে ডক্টর চক্রবর্তীর মুখে শুনেছিলাম এডিনব্র ইউনিভার্সিটি’র গল্প, এডিনব্র’র বোটানিক্যাল গার্ডেন আর এখানকার চিড়িয়াখানার সবিস্তার বর্ণনা। সেই ছবি ঠিক মাথায় আসছেনা কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছে, এই নগরী একটি অত্যন্ত সুন্দরী স্থান। একটা অদ্ভুত নির্জনতা, স্থাপত্য, ইতিহাস আর চমৎকার আবহাওয়া নিয়ে লন্ডনের মতন চোখ ধাঁধানো না হলেও, বহিরঙ্গ রূপ কিন্তু অনেকটা একই। দেখা গেল, মাঝে মাঝে ছেলেবেলার কল্পনা কিন্তু বাস্তবের থেকে অধিকতর মন্দ হতেই পারে।

এডিনব্র ক্যসেলে ঢোকার রাস্তায়ে, অ্যানড্রু ঠিক যেখানটা আমাদের ছাড়ল, তার থেকে একটা খাড়াই মতন রাস্তা উঠে গিয়েছে ক্যসেলের দিকে। রাস্তাটি যথেষ্ট জনবহুল আর অনেকটা যেন অক্সফোর্ডের পাথরে বাঁধানো রাস্তার মতনই। তবে এটি বেশ এবড়োখেবড়ো। ক্যসেলটি উইন্ডসর বা ওয়ারউইকের তুলনায় অনেক ছোটো। তবে শহরের একদম টঙে বলে, পুরো এডিনব্র শহরটার একটা অপরূপ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে নারী পুরুষ এখনও ঢুকছে ক্যাসেলে! আচ্ছা ক্যাসেলে ঢুকলেই কি পুরোটা ঘুরে দেখতে হবে? গিন্নি এগিয়ে গেছে তার মেয়েদের নিয়ে, কোথা থেকে যে এতো এনার্জি পাচ্ছে, কে জানে? ওকে চেঁচিয়ে ডেকে বলব একবার? শুনছো, আমি আর ভেতরে যাবনা! আচ্ছা, ওই ক্যাফেটাতে এক কাপ চা অথবা কফি নিয়ে বসে থাকা যায়না ঘণ্টার পর ঘণ্টা? এখানে তো কম পয়সার খদ্দেরকেও খেদিয়ে দেওয়ার কোন নিয়ম নেই।

************************************************************************************

২৯ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (ঘ)

ঘড়ি দেখলে মনে হতে পারে রাত। কিন্তু এডিনব্রর আকাশ এখনও দেখছি দিব্যি দিনের আলোয় ভরা। আর একদম ঘন নীল এই আকাশ। কেউ যেন আলাদা করে আলগোছে রয়্যাল ব্লু কালি লেপে দিয়ে গেছে আকাশটার গায়ে। পূবে তাকালেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে জ্বলজ্বলে নর্থ-সি। অতটা স্পষ্ট নয়, তবে আজকের আকাশ যেন নর্থ -সি’এর চেয়েও বেশী নীল। একটু আগে বেশ গরম লাগছিল। কোথা থেকে যেন এখন একটা হাড়কাঁপুনি হাওয়া বইছে আর তাই জন্য সামান্য শীতভাব লাগছে সকলের। সকলে মিলে রবার্ট ব্রুসের মূর্তির নিচে একখানা গ্রুপ ছবি তুলেই, গিন্নি ব্যস্তসমস্ত হয়ে একদল শেতাঙ্গিনীদের স্রোতের সাথে মিছিল করে ক্যাসেলে ঢুকে গেলেন পালকিকে নিয়ে। ছোটটিকে তার বাপের জিম্মায় রেখে। কথায় কথায় স্কটল্যান্ডের ইতিহাস আওড়ানো আর একটা টেলিভিশন সিরিয়াল যে একজনের মনে এতখানি প্রভাব ফেলেছে, সে নিয়ে একটু মস্করা করেই দেখা গেল, ক্যাসেলের এক্কেবারে অন্দরেই একটা হুইস্কির মস্ত প্রদর্শনশালা। তবে এরা অবশ্য ইংরেজদের মতন পাঁচমিশেলি মদটাকে হুইস্কি বলেন না। এরা বলেন মল্ট। বড়বড় কোম্পানির কতরকমের নামজাদা সব মল্ট, মিনিয়েচার বোতলে পুরে আগুণ দামে বিক্রি করা চলছে। আর তার সাথে পর্যটকদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই মল্ট পান করবার প্রথা। চেখে দেখার জন্য প্রদর্শনশালার চারদিকে বহু কাউন্টার, আর সেসব কাউন্টারে হেদিয়ে পরে মাগনায়ে মল্ট পানের জন্যে বেশ গাদাগাদি লক্ষ্য করা গেল। ছোটটা এবারে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙ্গাচ্ছে, বিরক্ত হয়েছে বুঝি! মদ্যপানের বিষয়ে ছোটকন্যার সাথে আমার মতভেদ বিস্তর। সে জানে যে তার বাবার সামান্য এদিক-ওদিক নিয়ে আপত্তি জানাবার কোন কারণ নেই, তবুও এই প্রদর্শনীতে ঢোকার পরেই, অস্থির হয়ে সে বেরিয়ে এল নাকটাক কুঁচকে। মদ্যপায়ী পাপিষ্ঠ মানুষদের সাথে এক মুহূর্তও কাটাতে চায়না সে। বালাই ষাট! বেকার খিটিমিটি না বাড়িয়ে তাই তাকে নিয়ে সাততাড়াতাড়ি সেই বাজে দোকানটা থেকে বেরিয়ে আসাই যথাযথ মনে হল।

ক্যাসেল থেকে বেরিয়ে কেবল হাঁটা আর হাঁটা, আর এই হাঁটা ব্যাপারটা কেমন এখন একটা রোজকার অভ্যেসে এসে গেছে! গিন্নি বললেন, “আমার কিন্তু দারুণ লাগছে, তোমরা যে যাই বল, পায়ে হেঁটে না বেড়ালে ব্যাপারটা কিন্তু জমেনা ঠিক”। আমারও অনেকটা সেরকমই মনে হল। এই কিছুটা করে হাঁটা, তারপরে গোড়ালি-টনটন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ, সাময়িক জিরিয়ে নেওয়া, আর তারই মাঝে দুটো-একটা রাস্তার উটকো দোকানে সস্তার কেনাকাটা, কফিপান, এসব ছাড়া জায়গাটা কেমন নিজের বলে বুঝি মনে হয়না। অ্যানড্রু সময় মঞ্জুর করেছিল দুঘণ্টা, কিন্তু দেড় ঘণ্টাতেই ক্যাসেল দেখার কাজ মিটে গিয়েছে আমাদের। ক্যাসেল থেকে বেরোনোর ঢালু রাস্তাটার শেষে একজন স্কটিশ মানুষ পশমের চেকচেক স্কার্ট পরিধান করে ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে। ঢিলেঢালা স্কার্টটাতে কি আরাম! এছাড়া সবুজ গামবুটের মতন এক বিশাল মোজা আর মাথাতেও একটা বিশাল ধড়াচুড়ো পরে রয়েছে লোকটা! এই বসনটা স্কটিশ পুরুষমানুষদের স্বাদেশিক পোশাক। আর এই স্কার্ট ব্যাপারটাকে স্কটল্যান্ডে বলে কিল্ট। পালকি ফোন করেছে অ্যানড্রুকে, সে নাকি আসতে সময় নেবে আরও আধঘণ্টার মতন। এদিক ওদিক তাকিয়ে ঢুকে পঢ়া গেল একটা মাঝারি মাপের জামাকাপড়ের দোকানে। এখানে কিল্ট বিক্রি হচ্ছে সস্তায়।

এসব শহরের মধ্যে একটা চিরন্তন ব্যাপার রয়েছে। হয়ত লন্ডনের মতন বনেদী ব্যাপার কিছু নয়, তবু অবয়ব দেখে এডিনব্র’র উপরে একটা সহজ ভক্তি জন্মায়। শহরের সমস্ত কিছুতেই একটা বিচার-বিবেচনাপূর্ণ ভারসাম্য, একটা সুষম সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দাঁড়িপাল্লা দিয়ে এত কিছু হিসেবকনিকেশ করে পাঁচশো হাজার বছর ধরে এই জিনিষ বজায় রাখা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। আকাশের নীল রঙটায় এখন একটু ফ্যাকাসে ধরেছে, কিন্তু দিনের আলো এখনও রয়েছে পুরোমাত্রায়ে। অ্যানড্রু মানুষটা সত্যিই খুব ভাল, কন্যা দুজনের আর্জিতেই সে আমাদের এডিনব্র শহরের আশপাশ ঘুরিয়ে নিয়ে চলেছে স্কটল্যান্ডের সুবিদিত হ্যাগিস পুডিং খাওয়াতে। অবশ্য হ্যাগিসের আগে, অ্যানড্রু আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আর্থারস সীটে, আর সেখান থেকে নাকি গোটা এডিনব্র দেখা যাবে ছবির মতন। লোকটা এখন পুরো গল্পের মেজাজে আছে। পথে বড় রাস্তা, সরু পথ দিয়ে গাড়ী অবাধে ঘুরিয়ে দিচ্ছে নিজের খেয়ালখুশি মতন। সবই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে, তবুও বাইরে থেকে দেখে নেওয়া হচ্ছে হলিরুড অ্যাবি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ স্কটল্যান্ড ইত্যাদি। সবকটা বাড়ী হলদেটে রঙের, অনবদ্য স্থাপত্য, সামনে ঘাসের লন আর কালো লোহার গ্রিলের বেষ্টনী। আচ্ছা এডিনব্র শহরে প্রোমোটার সম্প্রদায় কেউ থাকেন না? নতুন বাড়ী তৈরি হয়না? এরা নাগরিক সভ্যতার ব্যাপারে এতটা শৃঙ্খলা রাখেন কিভাবে?

ট্রেজার আইল্যান্ডের রচয়িতা রবার্ট লুই স্টিভেন্সনের গল্প শোনাচ্ছিল অ্যানড্রু। যে বাড়ীতে লেখক বাস করতেন, তার সামনে ছবি তুলে নেওয়া হল গোটাকয়েক। আর গল্প শোনা হল হলিরুড পার্কের। সেখান থেকেই কিছুটা দূরেই শুরু হচ্ছে আর্থারস সীট। অ্যানড্রু জানালেন, আর্থারস সীট নাকি আর আগের মতন নিরিবিলি নেই। হিলওয়াকিং ব্যাপারটা জনপ্রিয় হয়ে যাওয়াতে, ভিড় বেড়ে গিয়েছে ভয়ঙ্কর। আর্থারস সীট মূলত একটি তৃণাবৃত ঢালু জায়গা। একটু এগিয়ে একটা ছোট্ট পুষ্করিণী, অ্যানড্রু জানাল এটার নাম নাকি সেন্ট মার্গারিট লখ। বহু সংখ্যায়ে রাজহংসী সাঁতরে বেড়াচ্ছে তাতে। কোথায় ভিড়? হাজার হাজার মাইল সবুজ জমি পরে আছে সামনে, গিন্নি দেখলাম অ্যানড্রু’কে ভিড় কাকে বলে বোঝাচ্ছেন! বিকেল থেকে হ্যাগিস পুডিং খাওয়ার এতো প্ল্যান আঁটা হচ্ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও, খাওয়া সেরে নেওয়া হল, সাবওয়ে’তে। প্রথমত, খিদেয় আমাদের মাথা ঘুরছে। আর দ্বিতীয়ত, হ্যাগিস পুডিং ব্যাপারটা নাকি তৈরি হয় ভেড়ার হার্ট, লিভার আর ফুসফুস দিয়ে। আমরা বাউল বিবাগীর দেশ থেকে এসেছি, ওই রবার্ট ব্রুস মার্কা খাবার আমাদের পেটে ঢুকলনা শেষ পর্যন্ত। তবে খাওয়ার সময় একটা কথাও বলছেনা আমাদের ছোটজন। সাবওয়ে স্যান্ডুইচেও আঁশটে গন্ধ পেয়েছে সে। কি অসহায়, কি বিষণ্ণ সেই দৃশ্য!

************************************************************************************

৩০ স্কটল্যান্ড দ্বিতীয় দিন (ক)

হোটেলের ঘরের বালিশ নিয়ে সমস্যাটা, আমার পারিবারিক সুত্রে পাওয়া। কাঁহাতক সহ্য কড়া যায় এতো নরম নরম বালিশ? তাছাড়া লক্ষ্য করে দেখা যায়, যতো দামী হোটেল, তাদের বালিশ বুঝি ততো নরম হবে। এমনকি বাজি ধরে বলা যায়, পুরীর স্বর্গদ্বারের হোটেলের বালিশ, স্টেশনের বাইরের হোটেলের বালিশের চেয়ে নরম হবে বেশী। কেনসিংটনটা সামলে নেওয়া গিয়েছিলো বালিশের উপরে শক্ত কম্বলটা মোটা করে পেতে। এখানে অবশ্য সে জো নেই, একটা হালকা ভরসা ছিল যে এডিনব্র’র হোটেলে হয়ত বালিশের সমস্যা অতটা হবেনা। কিন্তু কোথায় কি? এডিনব্র’র এই হোটেলের সবচেয়ে নিরেটতম বালিশটাতে মাথা দিতেই একটা ভুস করে হাওয়া বেরোনোর আওয়াজ আর মাথার চাপে সে বালিশের দুদিক স্ফীত হয়ে, সে এক বিতিকিচ্ছিরি দমবন্ধ করা পীড়া। টিভি সিরিয়ালের গল্পে, গিন্নি বলেছিলেন, নির্ভীক স্কটিশ মানুষেরা নাকি অনমনীয় গোছের। ভয়ঙ্কর শক্তপোক্ত। তা তারা এমন মোলায়েম বালিশে শুয়ে ঘুমোন কি করে? সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করায়, রিসেপশনের ছেলেটা জানাল, সে নিজে স্কটল্যান্ডর মানুষ নয়, বাসিন্দা মাত্র। আর মূলত মার্কিনী পর্যটকদের কথা মাথায় রেখেই নাকি হোটেলের ঘরে রাখা হয় পাখির পালক আর কাপাস মেশানো বিশেষ ধরণের বালিশ। তাছাড়া ছেলেটাও ঠিক, তেজী স্কটিশ মানুষেরা নিজের দেশে, হোটেলেই বা উঠবেন কেন?

তবে গতকালের এডিনব্র সফরে কিন্তু লন্ডনের মতন এশিয়ান জনতা দেখা যায়নি খুব একটা। মাত্র একটি দুটি ভারতীয় পরিবার দেখা গিয়েছিলো ক্যাসেলে বেড়ানোর সময়ে। প্রবীণ দক্ষিণভারতীয় বাপ মা। সমর্থ মানুষটির একমাথা কাঁচাপাকা চুল, পরনে পুরু জ্যাকেট আর পায়ে সদ্যকেনা ধপধপে সাদা স্নিকার জুতো। দেখেই বোঝা যায়, একটা সময়ে ভীষণ কর্মঠ ছিলেন মানুষটি। নিরলস খেটে গিয়েছেন তাঁর সারাটা কর্মজীবন। সাথে হয় ছেলে-ছেলের বৌ, নয় মেয়ে-জামাই নিয়ে তারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্কটল্যান্ড। যুবকটিকে জামাই বলেই মনে হচ্ছিল। নয়ত বৃদ্ধার সামান্য হাঁটতে অসুবিধা হলেও, সে হাত বাড়াচ্ছিল না কেন? নিশ্চয়ই জামাইটা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। ব্যাটার অনসাইটের কাজের ফাঁকে, দেদার বিদেশী মুদ্রা সঞ্চয় হয়ে যাওয়াতে, বউয়ের বাপ-মা’কে বিদেশভ্রমণ করিয়ে দিচ্ছে।

লন্ডনে কিন্তু পর্যটকদের মধ্যে গুজরাটি আর পাঞ্জাবী দেখা গিয়েছিলো অনেক। এডিনব্র’তে তেমন নয়। অ্যানড্রু জানাচ্ছে, টুরিস্ট হিসেবে কিন্তু বহুসংখ্যায়ে ভারতীয় আসেন, কিন্তু তাঁদের থাকার জায়গা প্রধানত গ্লাসগোতে। তাছাড়া তাঁদের তো আর আমাদের মতন হোটেলে থাকতে হয়না। তাঁরা থাকবেন তাঁদের কাকা পিসী, মামা মাসীদের সাথে। অ্যানড্রু জানাল, পঞ্চাশের বা ষাটের দশক থেকে গ্লাসগোতে নাকি যে প্রকার সাম্রাজ্য ভারতীয়দের আছে, সে নাকি না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। সেখানে পথেঘাটে কেবল ভারতীয় আর ভারতীয়। গোটা গ্লাসগো চত্বরটাই যেন তাঁদের দখলে, সাহেব মেমেরা বরং সেখানে সংখ্যালঘু। আর সেখানে নাকি ফি-বছর মিলনমেলা গোছের একটা সম্মেলন বসে একবার করে। সেই মেলায় বম্বের ফিল্মজগতের থেকে তাবড় নামীদামী তারকারা আসেন মেলার উৎকর্ষ বাড়াতে। একটু হড়বড় করেন, নইলে অ্যানড্রু’র গল্পের বিষয়বস্তু কিন্তু ভারী মুগ্ধ করে দিল আমাদের। আনন্দে একটা সাম্প্রতিক হিন্দি গান চালিয়ে দেওয়া হল গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে। অসাধারণ রোদ উঠেছে আজ আর শীতভাবটা একটু যেন বেড়েছে। আকাশে আজকেও একটা আসমানি নীল রঙের চাদর পাতা। বরং গতকালের চেয়ে আজকে দেখছি বেশী দীপ্তি তার।

ঘণ্টাখানেক লেগেছে এডিনব্র থেকে। আমাদের লিনলিথগো প্যালেসে নিয়ে এসেছে অ্যানড্রু। প্যালেসে ঢুকতে পাঁচশো মিটার মতন একটু খাড়াই পথ রয়েছে। গাড়ীটা যাবে স্বচ্ছন্দে কিন্তু রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবক বালকটা জানাচ্ছে, প্যালেসের পার্কিং আজকে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে আগে থেকেই। খুব আন্তরিক ভাবে সে পালকিকে বলল, একটু হাঁটতে হবে সকলকে। সত্যি কথা বলতে কি, হাঁটা শুনে আর বুঝি আগের মতন আতঙ্ক লাগেনা। গত পাঁচদিনে বুঝি হাঁটা হয়ে গিয়েছে প্রায় পাঁচ-দশ’কে পঞ্চাশ মাইলের মতন। বেশী বই কম নয়! হাঁটার নামে গিন্নি একটু গাঁইগুই করছে দেখে আমরা তিনজনেই তাঁকে খুব দুয়ো দিলাম!

প্যালেসটা কিরম যেন একটু ঠাণ্ডা গোছের দেখতে আর কোত্থেকে একটা স্থানীয় কিউরেটর দৌড়ে এসে জানাল, এই লিনলিথগো প্যালেসেই জন্মগ্রহণ করেছেন স্কটল্যান্ডের গৌরব – জেমস ভি আর মেরী কুইন। হকচকিয়ে গেলাম আমরা সকলেই! চোখ কুঁচকে গিয়েছে গিন্নির, কিন্তু মুখে একটা মুচকি হাসি বজায় আছে এখনও! ভেবেছিলেন স্কটল্যান্ডের আগাপাশতলা সব জেনে গিয়েছেন। আউটল্যান্ডার সিরিয়ালের দৌলতে চারদিকের জ্ঞান আহরণ হয়ে গিয়েছে পুরোটা। কিন্তু হায়! বেহালার কোচিং সেন্টার সাজেশন দেয় এক, আর পরীক্ষায়ে প্রশ্ন আসে আরেক। কারা এই জেমস ভি আর মেরী কুইন? তাঁরা কি স্কটল্যান্ডের বিগতদিনের কোন রাজারানি নাকি লেখক লেখিকা নাকি কোন বৈজ্ঞানিক? আর এই সব ইতিহাস যারা জানেননা বা সেরকম কোন অযথা আগ্রহ নেই, লিনলিথগো প্যালেস দেখে তাঁদের মনে হবে একটা আদ্যিকালের ভুতুড়ে বাড়ী। সেই মোটামুটি একই রকমের। হলদেটে রঙের একটা বিশাল রাজপ্রাসাদ। তবে এটা বলতেই হবে যে গাঢ় নীল আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রাসাদটাকে কিন্তু মানিয়েছে জব্বর। আয়তনে নেহাত ছোট হওয়ার দরুন কেল্লা বা দুর্গ বলা যাবেনা লিনলিথগো প্যালেসকে। আউটল্যান্ডারে এঁদের কথা আছে কিনা বিশদে না জেনে, সাত পাউন্ড করে এক একটা টিকিট কেটে নেওয়াটা কি যথার্থ হল?

তবে ঢুকে দেখা গেল, প্যালেসের রাজারানিদের বংশানুক্রমিক তথ্য লেখা রয়েছে বিভিন্ন ফলকে ফলকে। কাঁচের বাক্সে সাজিয়ে রাখা আছে বিভিন্ন স্মারক। পর্যটকেরা সেসব তথ্য খুঁটিয়ে পড়ে নিচ্ছেন, অনেকে আবার দেখা গেল, হামলে পরে খাতায় লিখে নিচ্ছেন নোট করে। তারই মধ্যে অবাক করলেন আমার গিন্নি। কোন একটা ফলকে জ্যাকোবাইট-ফাইট গোছের কি একটা লেখা দেখে, কেমন একটা তড়িঘড়ি বদলে গেলেন মুহূর্তের মধ্যে! অদ্ভুত মনোযোগী একটা মুখ বানিয়ে হঠাৎ একাগ্রতা সহকারে দেখা শুরু করলেন ঘুরে ঘুরে। প্যালেসের ভিতরটা বেশ জটিল, গোলকধাঁধার মতন। এই সিঁড়ি, ওই গলি, সঙ্কীর্ণ বারান্দা দালান পেরিয়ে একটা বড় হলঘর। সেখান থেকে দুরে দেখা যাচ্ছে প্যালেসের প্রাচীর। আরও দুরে কিছু ছোট পাহাড়, আর সেখানে গিয়ে আকাশের নীল রেখাটা মিলিয়ে গিয়েছে আস্তে আস্তে। তবে এত কিছুর আগে কিন্তু একটা ঢালু সবুজ মাঠ আর মাঠের এপারেই একটা শান্ত দীঘি, এঁরা যাকে বলেন লখ। উফ! লখটাতে নিশ্চিন্তে সাঁতরে বেড়াচ্ছে দুটি মাত্র রাজহংসী। এঁরা বলছেন এটা একটা ছোট্ট স্থানীয় লখ, লখ লিনলিথগো। ধুর! এই ভুতুড়ে লিনলিথগো প্যালেসে ঘুরে বেড়ানোর মনখারাপ করার আর কোন মানে হয়না। বরং ওই নিস্তব্ধ লখে গিয়ে এক আঁজলা জলপান করে নিলে কেমন হয়?

************************************************************************************

৩১ স্কটল্যান্ড দ্বিতীয় দিন (খ)

এমনই একটা সুখের দিন বুঝি প্রত্যেক মানুষ চান আসুক তার জীবনে। লিনলিথগো সেরে স্টারলিং যাওয়ার পথে, চতুর্দিকে ঢেউখেলানো সবুজের সমারোহ। মেঘহীন আকাশে কোমল রোদ্দুর। আজকের তাপমান খুব বেশী হলে, হয়ত হবে বাইশ থেকে পঁচিশের ঘরে। তবে বাতাসে সামান্য শীতশীত ভাব। সমতল এক সড়ক ধরে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে এল অ্যানড্রু। বড়সড় হাইওয়ে কিছু নয় এটা। তবু এই স্টারলিং পৌঁছনোর রাস্তাটা এত মসৃণ আর এত ট্রাফিকবিহীন, সত্তর মাইল বেগে চলা গাড়ীতে কফিপান করে নেওয়া গেল অনায়াসে। অদ্ভুত ভাল স্কটিশ কফি। মার্কিন দেশের মতন বাড়াবাড়ি রকমের তিতকুটে কিছু নয় বা অত্যধিক দামীও নয় ইতালিয়ান ক্যাপুচিনো’র মতন। আগেকার দিনে, বিয়েবাড়িতে বরযাত্রীরা এলে, স্টিম মেশিনে বানানো যেমন কফি পরিবেশন করা হত, এই পানীয়টাও যেন অনেকটা ওরকম স্বাদের।

স্কটল্যান্ডে এসে, সেরকম কোন বিশেষ স্কটিশ খাবার এখনও অবধি চেখে দেখা হয়নি। লন্ডনে অবশ্য সে সুযোগ হয়ে গিয়েছিল প্রতিদিন। শরীরের কথা একরকম ভুলে গিয়ে, পুরু কড মাছের সুবিশাল একেকটা ভাজা, মোটামোটা আলুর ডুবো-তেলে চোবানো ফ্রাই আর কড়াইশুঁটির সেদ্ধ দিয়ে বিকেলের খাওয়া সারা হচ্ছিল প্রায় প্রত্যেকদিন। কিন্তু গতকাল স্কটল্যান্ডের সাঙ্ঘাতিক হ্যাগিস পুডিং কোনক্রমে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তার বিপজ্জনক উপাদানের গল্প শুনে। স্টারলিং ক্যাসেলে ঢোকার চড়াই রাস্তাটার মুখে, ঠিক যেখান দিয়ে ক্যাসেলের প্রাচীরটা শুরু হয়েছে, সেখানেই একটা সাবেকি স্কটিশ রেস্তরাঁ। চোখ ধাঁধানো তেমন কিচ্ছু নয়, বাইরে থেকে খুব ম্লান চেহারা তার, দোতলা বাড়ীটা কালচে ইটের তৈরি। আর গরাদ দেওয়া অনেকগুলো জানলা! রেস্তোরাঁটার নাম পোর্টকুলিস। অ্যানড্রু জানাল, পোর্টকুলিস রেস্তরাঁটা নাকি খুব প্রসিদ্ধ। তবে সাধারণ খাবার জায়গার তুলনায় জায়গাটা কিন্তু অপেক্ষাকৃত দামী। খানিক বাদেই ভিতর থেকে ঘুরে এসে পালকি খবর দিল, পোর্টকুলিসে এক একজনের খাবার খেতে পরবে গড়ে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পাউন্ডের মতন। দামী আছে! তবে অ্যানড্রু তার সাথে এ’ও জানাল, পোর্টকুলিসের হ্যাডক মাছের রুটির গুঁড়ো মাখিয়ে ভাজা আর মাশরুম দিয়ে হ্যাডক পাস্তার নাকি স্বর্গীয় স্বাদ। আর তার সাথে দুপুর-দুপুর একগেলাস স্থানীয় বিয়ার পান করে নিলে তো কথাই হবেনা কোন।

এমন এক শীতল সুন্দর অপরাহ্ণে বাঙালী হয় ময়দানের মেলায় ঘুরে বেড়ায়, নইলে মাংস ভাতের চড়ুইভাতি করে। অথবা আলসেমি করে, বাড়ির ন্যাড়া ছাদে মাদুর পেতে বসে লুডো খেলতে খেলতে কমলালেবু খায় আর নইলে স্রেফ লেপমুড়ি দিয়ে জব্বর একটা ভাতঘুম। আর আমরা কিনা এমন এক সময়ে, একের পর এক বিলিতি প্যালেস আর ক্যাসেল দেখে চলেছি! বাকী ক্যাসেলের থেকে স্টারলিংটা ছোট হলেও, এখানে কোন কারণে কিন্তু দেখা গেল সিকিউরিটি’র বেশ কড়াকড়ি। তবে সে গার্ডদের সৌজন্যবোধ লক্ষ্য করার মতন। আমাদের দেশের শপিংমলের গার্ডদের মতন অতিরিক্ত রকমের ভদ্রতা করে বিনাবাধায় ছেড়ে দেওয়ার মতন বিনয়ী তারা নন। আবার মুম্বই বিমানবন্দরের মতন অযথা কঠোর মানুষও নন।

স্টারলিং ক্যাসেলে ঢোকার মুখেই একটা ঘাসে ঢাকা সুবিস্তৃত লন আর তার বাঁহাতে নিচেই একটা মস্ত সমাধিক্ষেত্র। সারি দিয়ে কবর আর তার মধ্যে দুটো বেশ বড় ঝুপসি গাছ। আগুপিছু না বুঝে সেই গোরস্থানকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে একটা ছবি তুলে নিতে পাশের মেমটি দেখা গেল নাকটাক কুঁচকে তার হোমরা চোমরা চেহারার স্বামীটিকে কি যেন একটা বলছেন! খুব ভালই বোঝা গেল, ভারতীয় টুরিস্টের এই মৃত্যুর ছবি নেওয়ার ব্যাপারটা তাঁদের না পসন্দ। কবরখানা বুঝি তাঁদের কাছে পবিত্র হয়! আহা, তোমরা আমাদের দেশে এসে রেলবস্তি’র টেপফ্রক পরা নাকে সিকনি গড়ানো বাচ্চার ছবি নিতে পারো, রাস্তার টিপকলে স্নান করছেন রুগ্ন বৃদ্ধ, সেই ছবি বেমালুম ছাপিয়ে দিতে পারো তোমাদের নামজাদা ম্যাগাজিনে, আর আমরা তোমাদের একটা কবরখানার ছবি নিলেই, তাতে কি এমন পাপ হয়ে গেল, তা কেবল তারাই জানবেন। সকাল থেকে এমন একটা মনোরম দিনে, মনের মধ্যে একটা ফালতু খিঁচ ঢুকে গেল।

প্রথম সিকিউরিটি চেকের পর কিন্তু প্রবেশ সবজায়গায় অবাধ। কাঠের একটা সেতু পেরিয়ে, টিকিট কাটার পর দেখা গেল, ক্যাসেলের ভিতরে মানুষ অনেক, কিন্তু ভিড় তেমন নেই। দেখা গেল, ক্যাসেলে ঢুকেই গিন্নির চোখমুখ আবার কেমন বদলে গেছে! মুখের মধ্যে সেই চিরপরিচিত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জেদটা দেখা যাচ্ছে, যেটা দেখা গিয়েছিল উইন্ডসরের দিন বা গতকালের এডিনব্র’তে। এখন সব ইন্দ্রিয়গুলো তাঁর সজাগ, বোঝা গেল, গত তিন চারদিনে ক্যাসেলের পর ক্যাসেল দেখতে দেখতে গিন্নির কেমন একটা নেশার মতন হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে আমার নজর আশেপাশের প্রকৃতির দিকে হলেও, স্কটল্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে আমার নিকট পরিবারের সর্বক্ষণ এরকম কৌতূহল ছিল, সেটা আগে থেকে জানা ছিলনা। হঠাৎ মনে হয়, আমি প্রত্যহ ক্যাসেলে ঢুকতে যাবো কেন? আজকের এই সুন্দর সকালটায় স্টারলিং’এর রাজা রানিদের কথা না জানলে আমার কোন মহাভারতটা অশুদ্ধ হয়ে যাবে?

ঢুকতে চাইনা আমি এই গোমড়া ক্যাসেলে। ইটে গড়া মধ্যযুগীয় সভ্যতার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি দেখতে চাই ওই দূরের নদীটার পাশের স্তব্ধ অরণ্যটাকে। আর আমি পোর্টকুলিসে বিয়ার পান করে হ্যাডক মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে চাই। ওরা সকলে আমাকে ছেড়ে ঢুকে গেল স্টারলিং ক্যাসেলে। আমি একা হয়ে গেলাম। বড় দুর্লভ এই একাকীত্ব।

************************************************************************************

৩২ স্কটল্যান্ড দ্বিতীয় দিন (গ)

বাঙালী কবিরা জন্ম রোমান্টিক। তাছাড়া শুধু কবি কেন, সব বাঙালী পুরুষ নারীরাই জীবনের কোন না কোন একটা সময়ে, এন্তার পদ্য লেখে! খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মতন রাজনীতির জগতের নিয়ন্ত্রিত মানুষেরাও বাদ পরেননা সেই অভ্যাস থেকে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যে কোন ধরণের চরম বিতর্ক বিপদেও বাঙালী কিন্তু নিজের অজান্তে এনে ফেলতে পারেন আকাশ, চাঁদ, বৃষ্টি বা নদীর গল্প। স্কটল্যান্ডের মতন নির্জন তন্ময় সৌন্দর্য আমরা ইহজীবনে দেখিনি। হয়ত ব্রহ্মপুত্রের মতন পুরুষোচিত নয় এই রূপ, হয়ত বা এই রূপ অনেকটাই মেয়েলী! তবুও জীবনানন্দ বা বিভূতিভূষণ এই সযত্নে রাখা মাঠঘাট, প্রান্তর বা এই রাস্তা, এই ঘাস, ধাপধাপ করা চিত্রানুগ ফুলের বাগান, বা এমন একটা নির্মেঘ আকাশ দেখলে কিসের সাথে যে এই প্রকৃতির আদল খুঁজতেন, সে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে বেশ। অন্যদিকে গিন্নি একটু আধটু, বিলেতের ইতিহাস আর মধ্যযুগীয় রোমান সভ্যতা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেললেও, ছোট নদীর উপরে আচমকা একটা নীরব সেতু বা একটা স্বচ্ছ জলাশয় দেখে কিন্তু সরল বালিকার মতনই ব্যাকুল হয়ে পরছে থেকে থেকেই।

কাগজে লেখা রয়েছে স্টারলিং’এর পর গ্লাসগো। আর সে জায়গা তো এখান থেকে মাত্র ছাব্বিশ মাইল দুরে। সময় লাগবে একঘণ্টারও কম! কিন্তু গ্লাসগো মানে তো আবার একটা সভ্য শহর। লন্ডন এডিনব্র’র মতন। তার মানে কি আবার কিছু কালচে হলুদ রঙের অট্টালিকা? ঐতিহাসিক স্থাপত্য, পাথরে বাঁধানো রাস্তা, থমথমে গির্জা আর নামজাদা কয়েকটা রেস্তরাঁ? হ্যাঁ, দেশে ফিরে এসে হয়ত, সপ্তাহান্তের আড্ডায়ে জামার কলার উঁচিয়ে বলা চলবে, স্কটল্যান্ডের মেইন দুটো শহর দেখে এলুম – এডিনব্র আর গ্লাসগো! কিন্তু মন? মন কি ভরবে আরও একটা ইটের সভ্যতা দেখে? পোর্টকুলিসে বসে হ্যাডক মাছের মধ্যাহ্নভোজন সারতে সারতে এই কথাই কেবল ঘুরছে মাথার মধ্যে। ইশ! কেন যে তখন সাহস করে নিজেরা গাড়ী চালিয়ে এলাম না? আর কিছু না হোক, কারোর অধীনে তো বেড়াতে হতনা। এখন গ্লাসগো না গিয়ে, ইচ্ছেমতন চলে যাওয়া যেত ওই ডানদিকের সবুজ বনানীর দিকে। কিমবা এই রাস্তা ধরেই চলে যাওয়া যেত নাক বরাবর, বেপরোয়া গাড়ী চালিয়ে! কিমবা হুট করে দাঁড়িয়ে পরা যেত ওই বাঁ হাতের চড়ে বেড়ানো ভেড়াগুলির পাশে! অথবা ফিরে যাওয়া যেত ওই বৃক্ষটির কাছে, যেখানে কুচকুচে কালো টুপিপরা পাখিটি টিউ – টিউ শব্দ করে ডাকছিল? আরে, ট্র্যাভেল এজেন্টের বিচ্ছিরি কাগজে লেখা থাকলেই কি সেটা তো আর দেশের আইন হয়ে যেতে পারেনা। কিন্তু গ্লাসগো ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা উথাপন করলে অ্যানড্রু যদি বেঁকে বসে?

এসব দেশের একটা সুবিধা, কিছুটা ঘুরে বেড়ালেই জায়গাটা তেমন আর অচেনা লাগেনা। হিসেবটা চটজলদি বুঝে নিয়ে, মনের মধ্যে একটা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। তাছাড়া আজকের এই প্রযুক্তির যুগে ম্যাপ ব্যাপারটা তো সকলের মুঠোর মধ্যে। স্টারলিং ছেড়ে গ্লাসগোর রাস্তায়ে এসে, কেন জানিনা মনে হচ্ছে, লখ লমন্ডটা বেশ কাছেই। ট্র্যাভেল এজেন্টের চুক্তিতে আগামীকালের প্ল্যানে লখ নেস থাকলেও, কোন এক অজানা কারণে বাদ পরে গিয়েছে লমন্ড হ্রদটা। ঠাণ্ডাটা সকালের চেয়ে এখন অনেকটা কম আর বাইরে সুন্দর বাতাস। এবার গাড়ির এয়ার কন্ডিশনিং বন্ধ করার অনুমতি চাইল অ্যানড্রু।

আমি মন দিয়ে অ্যানড্রু’কে দেখছিলাম। লোকটাকে দেখতে পাক্কা জেমস বন্ড মার্কা হলেও, এখন বাইরের বাতাসে তার সোনালি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। আর এখন বড্ড সাধাসিধা লাগছে তাঁকে। গতকাল থেকে যেটুকু দেখা গেছে, লোকটার একটাই দোষ, বড্ড তড়বড়িয়ে কথা বলে আর কমা ফুলস্টপ ছাড়া নির্বিকার সেই ইংরিজি বোঝা আমাদের পক্ষে একটু দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। আচ্ছা এখন তো লোকটা বেশ খুশি খুশি মেজাজেই আছে, একবার সরাসরি বলে দেখব নাকি আমাদের গ্লাসগো না গিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে চলো, অ্যানড্রু? আমার উদ্দেশ্য শুনেই পিছনের সীটে গিন্নির শুরু হয়ে গিয়েছে উদ্বেগ! বউদের এই অকারণ উদ্বেগের কারণ আমি আজ অবধি বুঝে উঠতে পারলাম না! আমার মাকেও দেখেছি, আরে বাবা! বেকার চাপ নিয়ে তো কোন লাভ নেই! বলে দেখাই যাক না একটাবার, যদি ব্যাটা না যায় তো না যাবে! যদি অতিরিক্ত কিছু টাকা চায়, তাহলে সেটা বাড়াবাড়ি কিছু না হলে সেটাও ব্যবস্থা করা যাবে! বিকেলের চা’টা গ্লাসগোয় পান না করে, যদি লখ লমন্ডের উপরে একটা ডিঙিনৌকোয় বসে পান করা যায়, তাহলে কিন্তু সত্যিই জমে যাবে! পালকি রাস্তার পাশে মাঠটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে! একটা ছোট্ট টিলা আর গোটা দশেক বাড়ীর একটা উদাসীন গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছি আমরা! কিছু জায়গায়ে চাষ আবাদ হয়েছে ভালমতন! ছোটকন্যাও তার বাবা আর মায়ের কথোপকথনে বেশ চিন্তান্বিত। তবে তাকে দেখেও মনে হচ্ছে সে বুঝি গ্লাসগো যাওয়ার চেয়ে, লখ লমন্ডেই যেতে ইচ্ছুক।

রাস্তার বাঁদিক আর ডানদিকের মধ্যে সবুজের অনেক তফাত। বাঁদিকটা মকাইচাষের ক্ষেত হলেও, ডানদিকটা ঠাসা শাল সেগুণের গাছে। ম্যাপ দেখলাম। আরে, লখ লমন্ড যেতে হলে, আমাদের আর আধমাইল দূরেই ডানদিকে বাঁক নেওয়া উচিত! গিন্নি চোখ কুঁচকে আছেন! ছোটটিরও ভ্রু উপরের দিকেই! পালকি হঠাৎ উদাসীন গলায় চকিতে বলে উঠল, অ্যানড্রু… ক্যান ইয়উ টেক দ্য নেক্সট রাইট? উই উইশ টু গো টু লখ লমন্ড প্লিজ।

************************************************************************************

৩৩ স্কটল্যান্ড দ্বিতীয় দিন (ঘ)

ডানপাশটা কিন্তু এবারে বেশ অরণ্য-অরণ্যের মতনই লাগছে। আমাদেরটা ছাড়া আর তেমন কোন যানবাহন আশেপাশে দেখা যাচ্ছেনা এই মুহূর্তে। একটা প্রশস্ত কালো রাস্তা আর তার দুপাশে লাগাতার প্রকাণ্ডকায় শাল-সেগুণের গাছ। আবহাওয়ায়ে সামান্য উষ্ণ আঁচ পেয়ে, জানালার কাঁচগুলো ইতিমধ্যে নামিয়ে দিয়েছিল অ্যানড্রু আর তাতে বোধহয় আমাদের ছোটটার গা ছমছম করতে লেগেছে। এই বুঝি একটা মস্ত চিতাবাঘ তার দিকে ঝুপ করে লাফিয়ে পরবে। তবে এই অরণ্য একদমই পাতলা, কোন বন্যপ্রাণী নেই, অ্যানড্রুর মুখে এইরকম খবর শুনে এখন একটু স্বস্তি পেয়েছে সে। আমার আবার কেন জানিনা, সাজানো কোন কিছুই পছন্দ লাগেনা। অরণ্য হলে, সেটা যদি হত পালামৌ’এর মতন! ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া নাম না জানা শয়ে-শয়ে গাছ উপরের দিকে গোল হয়ে ঢেকে দেবে আকাশটাকে, কোমর উঁচু ঘাসের ভিতর দিয়ে অসংযত পায়ে হেঁটে যাব আমরা শৈশবের কয়েকজন মিলে। পায়জামা’য়ে লেগে থাকবে বনকাঁটা, সূর্য ডুবলে একটা স্টেটসম্যান পত্রিকার বদলে, গুটিকতক আধুনিক মোবাইল ফোন বিনষ্ট করে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, এগিয়ে যাবো কোন একটা মহুয়ার ঠেকের দিকে।

তাল কেটে যাচ্ছে ‘রবার্ট-দ্য-ব্রুস’ এর গল্পে। শুধু তাল কাটা নয়, আমার সমস্ত রকমের কাব্যিক চিন্তা তছনছ করে বিভিন্ন স্কটিশ রাজারানি সমেত স্কটল্যান্ডের হরেক ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত নিয়ে অ্যানড্রু আর গিন্নির আড্ডা বেশ জমে উঠেছে আর ঘড়ি এখন দুপুর পেরিয়ে বিকেলের দিকে। গিন্নির মুখে গেলিক ভাষার প্রসঙ্গ শুনে অ্যানড্রুকে দেখা গেল যারপরনাই উত্তেজিত। বেশ ব্যস্ত হয়ে তিনি আমাদের গেলিক আর ইংরিজির তফাত বোঝাতে বসেছেন। এই বনে বন্যপ্রাণী না থাকলেও, দেখা গেল, পাখি রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। পাখির ডাক শুনতে পেলে আবার আমার সেই সময়টাতে মানুষের কণ্ঠস্বর একেবারে ভাল লাগেনা। কিন্তু এখন কি আর করা যাবে?

লখ লমন্ড পৌঁছনোর আগে অ্যানড্রু আমাদের নিয়ে এসেছে এক স্থানীয় হুইস্কি ডিস্টিলারি’তে। ডিস্টিলারিটার নাম গ্লেনগয়েন। আমাদের দেশে গ্লেনফিডিখের নাম তো নিয়মিত রূপে শুনেছি। গ্লেনমোরাঞ্জি শুনেছি। শুনেছি গ্লেনলিভেটের নামও। কিন্তু গ্লেনগয়েন নামের এই পানীয়টার নাম শুনিনি দেখে অ্যানড্রু দেখলাম বেশ বিস্মিত হল। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে, কারখানা টারখানা কিচ্ছু নয়, একটা বড়সড় রকমের গ্রামের বাড়ী, গাঢ় লাল রঙের টালির ছাদ। অনেক রকম গাছপালা দিয়ে সাজানো সে বাড়ী আর বাড়ীর সামনেই একটা বর্ণময় ফুলের বাগান। বেশ কিছু পর্যটক এসেছেন। সকলেই সাহেব মেমসাহেব। ডিস্টিলারি পরিপালন করছেন যারা, তারা সব পর্যটকদের থেকে তমসুক লিখিয়ে রাখছেন, ড্রিঙ্কিং অ্যান্ড ড্রাইভিং’এর আইনের জন্য। ডিস্টিলারিতে ঢুকতে গেলে, টিকিট জনাপ্রতি বারো পাউন্ডের। আর জানা গেল ডিস্টিলারির থেকেই মল্ট-হুইস্কি বা মদ্যপানের অন্য কোনও সামগ্রী খরিদ করলে আরও কিছু-কিছু ছাড় পাওয়া যাবে। যেমন আটান্ন পাউন্ডের একটি সাতশো মিলির বোতল পাওয়া যাবে পঁয়তাল্লিশ পাউন্ডে। আর দেখলাম, সামগ্রী রেখেছেনও এঁরা। মল্ট হুইস্কি পান করতে গেলে যে এত রকমের সাজ সরঞ্জাম লাগে, তা আমাদের আগে জানা ছিলনা।

ডিস্টিলারির ভিতরের থেকে বাইরেটা বেশী মনোরম। তবে বাতাসে একটা কিরকম যেন স্যাঁতস্যাঁতে ভাব রয়েছে আর যেন কেউ কিছু না বলে দিলেও বোঝা যাচ্ছে, কারখানার পেছনেই হয় একটা নদী নয় একটা ঝর্না রয়েছে। একটা সদ্য বৃষ্টি হয়ে যাওয়া সোঁদা গন্ধ, আর তার মধ্যে কয়েকটা অতীব সুন্দর বসবার জায়গা। গাছের গুঁড়ি কেটে বানানো হয়েছে পর্যটকদের জন্য। আয়ত্তের মধ্যে হলেই, এইখান থেকেই হয়ত একটা মল্ট হুইস্কির বোতল কিনে দু পাত্তর পান করে নেওয়া যেত। মিশিয়ে নেওয়া যেত ওই ঝর্নার থেকেই খানিকটা শীতল জল। কিন্তু আমাদের গোটা পরিবার এইসব বিষয়ে বেশ বাতিকগ্রস্ত, সেই কারণে এই মতলব মাথায়ে এলেও, একটু মুচকি হেসে এগিয়ে গেলাম গাড়ির দিকে। মাথার উপর দিয়ে হুশ করে উড়ে গেল কয়েকটি সারস ধরনের সাদা পাখি। আর আমি সতৃষ্ণ চোখে তাঁদের দেখে নিলাম একবার।

লখ লমন্ডের সঙ্গে আমার ছেলেবেলার সম্পর্ক রয়েছে। আর গাড়ীতে উঠে সেই গল্পই শোনানো হচ্ছিল অ্যানড্রু’কে। অ্যানড্রুর সাথে এই এলাকার সংযোগ অনেকদিনের। তাছাড়া পর্যটনের ব্যবসা করে পেট চালায় ভদ্রলোক, এখানকার ভূগোল ইতিহাস ছাড়াও সবরকম স্থানীয় খোঁজখবর নখদর্পণে তাঁর। লখ লমন্ডের যত গল্পই অ্যানড্রু শোনান না কেন, যতই বিস্তারিত করে বলুন না আমাদেরকে, লখ নেসের সাথে লখ লমন্ডের গরমিলের কাহিনী, আমার স্মৃতি কিন্তু তখন দৌড়চ্ছে আনন্দমেলার পাতায়। চোখের সামনে ভাসছে ক্যাপ্টেন হ্যাডক লখ লমন্ড নামের এক পাত্র হুইস্কি পান করছেন, আর কুট্টুস ব্যাটা ক্যাপ্টেনের অসাবধানী গেলাস থেকে ছলকে পরা খানিকটা পানীয় চেটে নিয়ে, অসংলগ্ন ব্যাবহার শুরু করছে। কিন্তু যতদূর মনে পরছে, অনুবাদক লখ’এর জায়গায়, বাঙলায়ে বোধহয় লিখেছিলেন লচ। লচ-লমন্ড। অ্যানড্রু’কে আসল উচ্চারণ লখ না লচ, সামান্য এটুকু জিজ্ঞাসা করাতেই, খেঁকিয়ে উঠল ভদ্রলোক। উনি তো আর জানেননা, ওঁদের গেলিক ভাষা নিয়ে আড্ডাটা পুরোটা উপেক্ষা করে গিয়েছিলাম আমি। তাহলে ‘চ’ আর খ’য়ের তফাতটা আর ধরব কি ভাবে ভাই?

************************************************************************************

৩৪ স্কটল্যান্ড তৃতীয় দিন (ক)

আপাতদৃষ্টিতে কথাটা শুনতে খারাপ লাগবে আর অনেকেই হয়ত ভিন্নমত হবেন। তবে এখনও অবধি সব দেখেশুনে, যা মনে হচ্ছে, ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ড মিলিয়ে গোটা বিলেত দেশটার কিন্তু ঐতিহ্যের পিছনে একটা অদ্ভুত রকমের লোভ রয়েছে। সারা বিশ্বের কাছে একটা যেন নাম কিনে নেওয়ার খিদে। হ্যাঁ, আছে ওঁদের অনেক কিছুই। সবই ভীষণ সুদৃশ্য আর বনেদিয়ানার ছাপ সুস্পষ্ট। কিন্তু তাই বলে সেই চমৎকারিত্ব, সমস্ত কিছুতে বিদ্যমান নয়। নইলে অ্যানড্রু’র মতন ঝাড়াঝাপটা লোকের, কিন্তু লখ লমন্ডের মতন একটা অতি সাধারণ দীঘিকে এমন অত্যুক্তি করে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে না বললেও চলত। কই, চিল্কা হ্রদ দেখাতে নিয়ে যাওয়ার সময় তো ওড়িয়া গাইড লোকটা কোনদিন ক্যস্পিয়ান সাগর, মিশিগ্যান বা অন্টারিও লেকের সাথে চিল্কার অকারণ তুলনা টানেননা। এদিকে গতকাল গ্লেনগয়েন থেকে বেরিয়ে, লখ লমন্ডের কাহিনী বর্ণনা করার সময়ে, অ্যানড্রু ভূগোলের ব্যাপারটাকে অনাবশ্যক ভাবে ঐতিহাসিক করে তুলতে গিয়ে, প্রায় নিওলিথিক-চালকোলিথিক করে ছেড়েছিল আরকি! গিন্নি তো অ্যানড্রুর মুখে সেই সব শুনে মুখ এমন করে ফেলেছিলেন, যেন স্কটল্যান্ডে বেড়াতে এসে মানস সরোবরটাও মাগনায়ে দেখা হয়ে যাচ্ছে অ্যানড্রুর দৌলতে। বিরক্তি লেগেছিল আমার। কিন্তু তাও ভেবে দেখেছিলাম, কাল সকালেই তো এডিনব্র ছেড়ে চলে যাচ্ছি ইনভার্ণেস। নইলে গুগল-টুগল ঘেঁটে একটা মুখের মতন জবাব দিয়ে দেওয়া যেত ভদ্রলোককে।

আসলে মানুষ হিসেবে আমরা ভারতীয়রা বুঝি বড্ড বেশী লাজুক। কিসের জন্য, কোন অজানা কারণে যে সাহেব-মেম দেখলে আমরা এত আমতা – আমতা করি, তার কোনও যুক্তি আসেনা আমার মাথায়। নইলে কোনও সাধারণ বিষয়কে মেলোড্রামাটিক করে তুলতে বাঙালীর তো বিশেষ কসরত করার কথা নয়। একটা ক্ষয়াটে চেহারার দীঘি। শান্ত আর যথেষ্ট মনোরম। লম্বা অনেকটাই। তাতে মিশমিশে কালো জল আর তার চারপাশটা আগাগোড়া পাথরে বাঁধানো। কয়েকটি পরিবার চড়ুইভাতি মতন করছিলেন দীঘিটির আশেপাশে। অবশ্য রান্নাবান্না কাউকে সেরকম করতে দেখা যায়নি। বরং লোকজন, ছেলেপিলেরা খেলাধুলা করছিল বেশী। এমনকি অনেকেই তাঁদের পোষা কুকুরটিকে পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছেন। তারাও লমন্ডের হাড়হিম করা জলে, শরীরটা কিঞ্চিত ডুবিয়েই, ঝাঁকিয়ে জল ঝেড়ে ফেলছে। আমরা যেদিকটা দাঁড়িয়েছিলাম, লমন্ড হ্রদের সেই পাড়ে অনেক ঝোপঝাড় আর তারই মাঝে লুকিয়ে একটা ক্যাফে। সকলেই সেখানে খোলা আকাশের নিচে বসে বীয়ার বা কফি পান করছে। এই দৃশ্য দেখে, আর যাই হোক, হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি বেড়ে যায়না।

তাছাড়া লখ লমন্ড চত্বরে পা রেখেই আমার কেন জানিনা মনে হয়েছিল, আরে! এই জায়গাটা তো আমার ভীষণ চেনা। একদম যেন আমাদের রবীন্দ্র সরোবরের মতন। ওই ঝোপঝাড়ের মধ্যেই কয়েকটা বেঁটে গাছ তাদের শাখা নুইয়ে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পরেছে। লন্ডন বা এডিনব্র শহরের সব কিছু দেখেশুনে যেমন ভারত ভারত বলে মনে হয়না, লখ লমন্ড কিন্তু আহামরি তেমন কিছুই নয়। বিলেতের সমগ্র সভ্য মানুষ যদি ভেবে নিয়ে থাকেন ভগবান তাঁদেরকে, আর একমাত্র তাঁদেরকেই নিজের সব ধনসম্পত্তি উজার করে দিয়ে দিয়েছেন, তবে কিন্তু তারা ভুল। সাধারণ, অসাধারণ আর অনন্যসাধারণ মিলিয়েই তো ঈশ্বরের সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ হয়ত বাঙালির তথা ভারতের সবচাইতে নামীদামী লেখক, এমনকি বিশ্বের দরবারেও তিনি সুবিখ্যাত! কিন্তু তাই বলেই কি রবীন্দ্রনাথ একটা শরৎবাবুর মতন উপন্যাস লিখে ফেলবেন? অথবা শেক্সপিয়ার সাহেবের মতন একটা নাটক?

আমাদের আজকের ইনভার্ণেস যাওয়া আবার সেই ট্রেনেই। এডিনব্র ওয়াভেরলি স্টেশন থেকে সকাল সাড়ে দশটায় স্কটরেলের টিকিট, আর এইবারও সাহস করে সেই ফার্স্ট ক্লাস’এর। তবে এই ফার্স্ট ক্লাসের টিকিটের দাম কিন্তু লন্ডন নর্থ ইস্টার্ন রেলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। কে জানে, কমদামী ফার্স্ট ক্লাসে, খাবার দাবার বা পানীয়, হয়ত স্কটরেলের সেবিকারা বোধহয় মেপেঝুপে দেবেন! ওয়াভেরলি স্টেশনে ন’টার মধ্যে পৌঁছে দিল অ্যানড্রুই। ট্রেনে ভালমন্দ কি খেতে পাবো জানা নেই! সেই চিন্তায়, আজকের হোটেলের ব্রেকফাস্টটা একটু বেশী করেই খেয়ে নেওয়া গেল। তবে এই হলিডে ইন হোটেলের ব্রেকফাস্ট’টা একটু কিরকম ধরণের যেন! ধাপে ধাপে প্রচুর খাবার দাবার বুফেতে রাখা রয়েছে। কিন্তু ডিম, দুধ আর পাউরুটি ছাড়া সবকটাই কিরকম একট বদখত দেখতে। সসেজগুলো খুব বেশী রকমের মোটা আর এমনকি বিশাল কাঁচের বাটিতে জমানো দইটাও কেমন যেন একটা কমলা রঙের। আসলে বুঝি মাথার মধ্যে এখনও ওই ভেড়ার ফুসফুস দিয়ে তৈরি করা হ্যাগিস পুডিং’এর ছবিটা ভাসছে। গরুর মাংস ছাড়া, খাবারের ব্যাপারে আমার সেরকম কোন বাছবিচার কিছু নেই। তবুও ওই ঘোলাটে দইটা দেখে কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠেছিল।

ওয়াভেরলি স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটা দৈর্ঘ্যে বেশ ছোট আর দেখতে খুবই সুন্দরী। ঘন নীল রঙের তার শরীর। আর তার মাঝে মাঝে হালকা ছাই রঙের স্ট্রাইপ। ঘড়িতে এখন দশটা বেজে গিয়েছে। ট্রেনটা স্টেশনে দাড়িয়ে রইলেও, ভিতরে ওঠা যাচ্ছেনা। কারণ দরজাগুলি ভিতর থেকে এখনও কুলুপ আঁটা অবস্থাতেই রয়েছে। আকাশী নীল জামা আর গলায় কালো টাই বাঁধা অনেককটি মানুষ দৌড়োদৌড়ি করছেন প্ল্যাটফর্মে গত মিনিট দশেক ধরে। কিন্তু কেউই আর দরজাটা খুলে দিচ্ছেন না। আর এদিকে আমাদের মালপত্তরও তো খুব কম কিছু নয়। কিংস ক্রস থেকে এডিনব্র’র ট্রেনে চেপে, আমাদের চারখানা ঢাউস সুটকেস সাইজ করে রাখতে গিয়ে কিন্তু কালঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল। আর সেই জন্যই, প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনোর পড় থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছিল, অন্ততঃপক্ষে যেন ফার্স্ট ক্লাস কোচের সামনেটা গিয়ে সটান অপেক্ষা করতে পারি। একটা অসাধারণ সূর্য উঠেছে আর সেই সূর্যালোকে আমি প্ল্যাটফর্মের উলটোদিকের একটা গির্জার ছবি নেওয়ার চেষ্টা করছি। পালকি তার মায়ের সহযোগিতায়ে টিকিটের প্রিন্টটার উপরে খোঁজার চেষ্টা করছে কোচ নম্বর আর সীট নম্বর! আর বিপত্তির শুরু সেখানেই।

************************************************************************************

৩৫ স্কটল্যান্ড তৃতীয় দিন (খ)

যুবকটির বুকের বাঁদিকে স্কটরেল কোম্পানীর যে ব্যাজ ধারণ করা ছিল, তাতে তাঁর নাম লেখা ছিল ‘অমিত’। অর্থাৎ কিনা নির্ঘাত সে ভারতের লোক। আর তা না হলেও, নামটা তো ভারতীয় হতেই হবে। কারণ, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কায়ে কি কারোর নাম অমিত হতে পারে? অবশ্য ছেলেটি কিন্তু বাংলাদেশী হতেই পারে! তার মানে তো বাঙালী… আরে, সে তো আমরাও বাঙাল। তাহলে কি তখনই এডিনব্র প্ল্যাটফর্মে চিল্লিয়ে বলা উচিত ছিল, অমিত… আমি বাঙাল, একদম খাস ঢাকার বাঙাল! জেলা বিক্রমপুর। এই এতক্ষণে একটা ক্ষীণ আশা জাগছে মনে। ভারতীয় হোক বা বাংলাদেশী, এই অমিতেরই মাধ্যমে স্কটরেলের অসমীচীন নিয়মের একটা জুতসই বদলা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কি চূড়ান্ত আন্তরিকতাহীন কোম্পানী রে বাবা! ফার্স্ট ক্লাসের টিকিটে নাকি কোনরকম সীট নম্বর, কোচ নম্বর থাকবেনা। মামদোবাজির কারবার! মাঝে মাঝে নাকি টুরিস্ট সিজনে, একআধ দিন এমন নিয়ম হতেই পারে! সেই সব দিনে পুরোটাই নাকি ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ ব্যাপার। আগে এসো, আগে বোসো! মুঠোয়ে চারটে টাটকা তাজা টিকিট, ফার্স্ট ক্লাসের! সেই কবে লন্ডন কিংস ক্রস স্টেশন থেকে প্রিন্ট আউট করে সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছিল আমার কম্পিউটার ব্যাগটায়ে! আর এখন কিনা, একটা অপ্রশস্ত সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টের বাথরুমের সামনে চারখানা পেল্লায় সুটকেস নিয়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে একটা ভারতীয় পরিবার। বেচারা আর কাদের বলে? অদূরেই ফার্স্ট ক্লাসের সীটগুলো, আর গদিআঁটা নরম চেয়ারে আরাম করে পায়ের উপর পা তুলে খবরের কাগজ পড়ছেন গোটা বিশেক সাহেব মেমসাহেব!

প্ল্যাটফর্মে গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকার সময়েই এক প্রবীণা মেমসাহেবের সাথে আমার অমার্জিত বাকবিতণ্ডা শুনে এগিয়ে এসেছিল অমিত। বৃদ্ধাটি তখন আমাকে স্কটরেলের রাশ – ডে’র নিয়ম বোঝাচ্ছেন আর আমি চরম ভদ্রতার সাথে ক্রমাগত বলে চলেছি, রাশ-ডে হোক আর যাই হোক না কেন, রেল কোম্পানীর এই নিয়ম চরম অনুচিত। তোমাদের এমন আদবকায়দাদুরস্ত দেশের সভ্য রেলকোম্পানীতে এমন একুশে আইন সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়! পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন গুটিকতক স্কটরেলের কর্মচারী। আর তাদের মধ্যেই ছিল অমিত। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরে, এ হেন ন্যায়বিরুদ্ধ দৃশ্য দেখে অমিতও যেন কি একটা বলছিলেন বাকীদের! তখনই আমাদের চিল্লিয়ে ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু বেআক্কেলে ট্রেনটা ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে।

এর থেকেও বিরক্তিকর ট্রেনযাত্রা আগে আমি করেছি। একবার জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেসে যেতে গিয়ে পরপর দুরাত কাটিয়ে দিয়েছি চীনেবাদামের খোলার মাঝে। স্লিপার ক্লাসের মেঝেতে। তারপর একবার তো কাটিহার থেকে নর্থ বিহারের সহরসা নামের একটি শহরে যেতে গিয়ে চরম দুর্ভগ পোয়াতে হয়েছিল আমাদের মাঝরাতে, বাঙ্কে শুয়ে পরার মিনিট দশেক পরেই একঝাঁক তীর্থযাত্রী মাথায় গাঁট্টা মেরে তুলে দিয়েছিল আমাদের। তবে তখন বয়েস ছিল নিতান্তই অল্প। শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্য তেমন একটা গায়ে লাগতনা। তাছাড়া এই তো কিছুকাল আগেও, সীটফিট রিজার্ভ করে ট্রেনে চেপে, কিছু না হলেও বার দশেক নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে কোন প্রবীণ মানুষকে। তাতে অবশ্য বিরক্ত লাগার চেয়ে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যেত অনেক বেশী।

আমাদের বাকী তিনজনে এখন বসে রয়েছে কাঠের মতন। বাথরুমের বাইরে তিনটে সীট এখন পাওয়া গিয়েছে। তার একটাতে এক মেমসাহেব আর দুটোটে ভাগাভাগি করে আমরা বাকীরা। দেখছি পালকির দুটো ভুরুর মাঝখানটা ভয়ানক রকমের কুঁচকে রয়েছে। অন্যদিকে গিন্নির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিরক্ত হয়েছিলেন তিনিও। কিন্তু এখন চোখাচুখি হতেই মুচকি হাসলেন আমার দিকে চেয়ে। বুঝলাম থিয়োরিটা হল আর কোনরকম বেকার ঝামেলা চাইছেননা শান্তিপ্রিয়া মহিলা। বললেন, “এবার ঠাকুর ঠাকুর করে চলো বাবা, আর কোন ক্যায়স করোনা”।

কিন্তু এতক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার, হয়ে গিয়েছে, আমার বাঙালী মন এখন প্রচণ্ড রকমের প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে! সামনে দিয়ে এইমাত্র চোয়াল নাড়াতে নাড়াতে হেঁটে বাথরুমে গেলেন একজন লালমুখো সাহেব! চুইংগাম চিবুচ্ছে বোধহয় দামড়া লোকটা, লোকটাকে দেখতে একটা পশুর মতন। তাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, এই পশুটারই নাম কর্নেল ডায়ার। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, ব্যাটার হাতে এখনও জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্ত লেগে রয়েছে। গিন্নি মুখে স্মিত হাসি বজায় রাখলে, আমার ভায়লেন্ট মাথায়ে এখন ঘুরছে চরম বাস্তব। ব্যাটারা তো বাঙলায়ে এসেছিল সাধারণ ব্যবসা করতে। আর তারপরেই কথার খেলাপ করেছে এঁরা। তারপরে পলাশীর খলনায়ক ক্লাইভের হাত ধরে শুরু হয়ে যায় পাইকারি হারে লুঠপাট, খামোখা নির্যাতন আর দিনেদুপুরে রাহাজানি। নইলে এতো অল্প সময়ের মধ্যে একটা গোটা দেশ ব্যাটাদের পক্ষে দখল করা সম্ভব হতনা! আনতাবড়ি চিন্তায়ে আর অপমানে আমার বুকের অনেকটা বেশ অবশ মতন লাগে! জয় বজ্রংবলি চিল্লিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বো নাকি লোকটার উপরে?

স্কটরেলের এই লাইনটাকে বলে হাইল্যান্ড মেনলাইন। এডিনব্র, গ্লাসগো বা লন্ডন থেকে ফার নর্থ লাইনে পরতে হলে, যেকোনো ট্রেনকেই আগে হাইল্যান্ড লাইন দিয়ে ইনভার্ণেস যেতে হবে। ফার নর্থ আর হাইল্যান্ডের মধ্যে ইনভার্ণেসকে অনায়াসে ‘বর্ধমান’ টাইপের একটা স্টেশন বলা চলে। সে মেন লাইনই হোক বা কর্ড লাইন, ট্রেন সেই তোমার বর্ধমান গিয়ে দাঁড়াবেই দাঁড়াবে! তবে এই হাইল্যান্ড লাইনের অনেকটাই নাকি এখনও সিঙ্গল লাইন। কিন্তু তাতেও কোনরকম অসুবিধা হয়না। কারণ এডিনব্র থেকে ইনভার্ণেসের ট্রেন দিনে মাত্র চারটে। একটু আগেই ডানপাশে চলে গেল, ডালহুইনি নামের একটি স্টেশন। এই ডালহুইনি নামের একটি মল্ট হুইস্কি খুব বিখ্যাত। যে মহিলাটি এডিনব্র প্ল্যাটফর্মে আমাদের বোঝাচ্ছিলেন স্কটরেলের রাশ-ডে’র নিয়ম, দেখলাম তিনি এবার নিজের সীট ছেড়ে এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। পালকি হাঁটুদুটো গুটিয়ে নিয়েছে, ভাবছে মহিলা হয়ত বাথরুমে যাবেন! কিন্তু একি? অবাক করা ব্যাপার। বগলদাবা করে সঙ্গে মহিলা নিয়ে এসেছেন ফার্স্টক্লাসের একটা পরিচারিকা মেয়েকে। আর মেয়েটার সাথে একটা কফির পাত্র আর একটা ট্রে’তে হরেক রকম কেক বিস্কুট।

এডিনব্র প্ল্যাটফর্মের উল্টোপাল্টা বিতণ্ডার বিষাদ এখনও ঠোঁটে টাটকা রয়ে গিয়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের সাথে সাথে এখন আবার আবছা মনে পরে যাচ্ছে রক্ত গরম করা চউরি-চউরা’র ঘটনা। কিন্তু আমাদের ছোটটির ক্ষুধার্ত মুখের দিকে চেয়ে সমস্ত কাতরতা যেন একটা ঢোঁকেই গিলে নিতে হল। একচুমুক কফি পান করেই বৃদ্ধা মহিলার সাথে আমরা সকলে নিঃসঙ্কোচে ভাব করে নিলাম। কিন্তু এই চমকই আজকের শেষ চমক নয়। পরের স্টেশন অ্যাভিমোর। নীল সুন্দরী ট্রেনটা এসে সবে দাঁড়িয়েছে প্ল্যাটফর্মে, কোত্থেকে যেন হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের কামরায়ে উঠে এসেছে অমিত! বুর্জোয়াদের ওপর জিঘাংসা ভুলে আমার সর্বাঙ্গে একটা শিহরন হল। কালো রঙের টাইটা খুলে রেখেছে অমিত। বেশ ব্যস্ত হয়ে, পালকির থেকে চারখানা টিকিট নিয়ে সইসাবুদ করে দিয়ে জানাল, কয়েকদিনের মধ্যেই নাকি আমাদের রিফান্ড প্রসেস করে দেওয়া হবে। এই তাঁর এই সই’টাই নাকি প্রমাণ! মনে হচ্ছে, জিতে গেলাম, মনে হচ্ছে, লর্ডসের ব্যালকনি’তে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা চারজন, গা’য়ের টি শার্ট’টা খুলে একবার মাথার উপরে ঘুরিয়ে দেবো নাকি? গিন্নির দিকে চেয়ে দেখলাম, ওষ্ঠে বেশ একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রেখেছেন। জাদুর মতন এসেছিল আবার জাদুর মতন অমিত উধাও হয়ে গেল অ্যাভিমোরেই! সাথে সাথে আমাদের মনের রিভলিউসনটাও উধাও… জেতার পরে এখন মনে মনে অমিতের প্রতি একটা প্রবল টান অনুভব করলেও, তাঁকে আর যাবার বেলায় জিজ্ঞাসা করা হলনা… ভাই অমিত, তুমি কি বাঙালী?

************************************************************************************

৩৬ স্কটল্যান্ড তৃতীয় দিন (গ)

ইনভার্ণেসে আমাদের হোটেলের নামটা বেশ গালভরা। ম্যাকডোনাল্ড ড্রামোসি হোটেল। জায়গাটা শহরের একটু বাইরের দিকে। ইন্টারনেটের দৌলতে জানা গিয়েছিল, হোটেলটা খুব বড় আর নাকি প্রায় দশ একর জমি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। রেল স্টেশন থেকে মিনিট পঁচিশেক লেগে গেল ট্যাক্সিতে চেপে সেখানে পোঁছতে। হোটেল তো নয়, যেন খাঁখাঁ এক বিস্তৃত প্রান্তরে, একটা ছোটোখাটো আদিম প্রাসাদ গোছের বাড়ীটা। ঠিক বাঙলা ভাষায়ে বর্ণনা করে বোঝানো যাবেনা জায়গাটার মধ্যে কতটা পরিমাণে শূন্যতা রয়েছে! যতদূর আমাদের চোখ যাচ্ছে, দুপাশটা ঘন সবুজ অঞ্চল। এখনও ঝিরঝির করে একটানা একঘেয়ে বর্ষা হয়ে চলেছে। আর তার সাথে চলছে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। ট্যাক্সিচালক জন জানাল, ইনভার্ণেসের এরকম আবহাওয়া নাকি চলবে আরও তিন থেকে চার দিন। মাঝখান থেকে একমাত্র ভাল খবর হচ্ছে, কাজে লেগে যাচ্ছে ধার করে আনা ইয়েতিমার্কা নীল জ্যাকেটটা। এমন বেয়াড়া আবহাওয়া এ’মুলুকে আসা ইস্তক পাইনি আমরা। হোটেলটার মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে, গোটা পঞ্চাশ মিটার মতন ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে একটা গাড়িবারান্দায়ে এসে থেমেছে আমাদের ট্যাক্সিক্যাব। দুপাশের সবুজ লনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটি বিশালকার শিংওয়ালা হরিণের তাগড়াই মূর্তি! এগুলোকেই বোধহয় বলে স্ট্যাগ। আরও এদিক ওদিক কিছু অন্য মর্মরমূর্তি। স্কটল্যান্ডীয় রাজপুরুষদের হবে হয়তো।

তবে এখনও অবধি ইনভার্ণেস পৌঁছে অবধি যা দেখা গেল, সব আছে এখানে। স্ট্যাগের মূর্তি, প্রাসাদোপম হোটেল, কনকনে বাতাস, কেবল জ্যান্ত প্রাণী নেই একটাও। কেউ বললে বিশ্বাস করবেনা, স্টেশন থেকে নেমে হোটেলে আসার রাস্তায়ে এখনও পর্যন্ত মানুষ দেখিনি একটাও। হেঁচড়ে-পেঁচরে মালপত্তর নিয়ে হোটেলের রিভলভিং দরজা খুলে ঢুকেও কারোর টিকি দেখতে পাওয়া গেলনা। লবিটা রীতিমতন বড় হলেও, রিসেপশন কাউন্টারটা ছোট। একটা কোনায়ে দুটো চেয়ার টেবিল আর কম্পিউটার দিয়ে যথেষ্ট অত্যাধুনিক ভাবেই সাজানো। কিন্তু সেই চেয়ার টেবিলে বসার লোকটা যেন কোনো এক ছুমন্তরে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। গোটা লবিটার দামী নরম গালিচার উপরে বিভিন্ন কারুকাজের সোফা আর আরামকেদারা দিয়ে সৌন্দর্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। আর নিভু-নিভু কোমল কিছু ল্যাম্পশেডের আলোয়ে সে কেমন একটা রহস্যময় রূপ ধারণ করেছে। টেবিলগুলোতে কয়েকটা ওয়াইনের খালি গেলাস আর গোটা লবিতে খেলে বেড়াচ্ছে দুটো শিশু। কি ব্যাপার, এদের বাপ মা নেই এখানে?

আউটল্যান্ডার টিভি সিরিয়ালের দৌলতে ইনভার্ণেসের নাম আমার গিন্নির অজানা না থাকলেও, এই শহরের নাম আমি প্রথম শুনি আমাদের ট্র্যাভেল এজেন্ট মেয়েটির মুখে। অর্থাৎ এই বছরেরই মার্চ-এপ্রিল মাসে। তারপরে বারকয়েক গুগল-টুগল করে দেখলেও, এর আগে ইতিহাস বা ভূগোলের কোন বই বা ভ্রমণকাহিনীতে, ইনভার্ণেস নামক স্কটল্যান্ডের কোন শহরের নাম আমার শোনা হয়ে ওঠেনি। ট্র্যাভেলের মেয়েটির কাছে যখন মুখ ফুটে জানতে চেয়েছিলাম, ইনভার্ণেসটা কি? খায় না মাথায় মাখে? সে জায়গাটিতে কি বেকার কিছু খরচা বাড়িয়ে, না গেলেই কি নয়? মেয়েটি তখন প্রায় টানা আধমিনিট কোন কথা বলতে পারেনি! নিঃশব্দ বিস্ময়ে তাকিয়েছিল আমার দিকে। গিন্নিই তখন কোনওরকমে সামলে দিয়েছিলেন আমার অজ্ঞানতা। মেয়েটি জানিয়েছিল, পর্যটকরা মূলত ইনভার্ণেস শহরে আসে স্কটল্যান্ডের নৈসর্গিক শোভা দেখতে। এছাড়া আজকে সকালে ট্রেনে আসার সময়ে গিন্নি জানিয়েছিলেন, আউটল্যান্ডার সিরিয়ালের বিখ্যাত সেই কুলোডন ব্যাটেলফিল্ডটা নাকি এই আমাদের ড্রামোসি হোটেলের থেকে গাড়ীতে মিনিট পনেরো কুড়ি। ট্যাক্সি ড্রাইভার জন’কে নাকি বলে দেওয়া রয়েছে, আজকে বিকেলের দিকে সময় পেলে, দেখে আসা যাবে সেই যুদ্ধক্ষেত্রটা। অবশ্য জন নাকি এ’ও জানিয়েছে, যে সেই যুদ্ধক্ষেত্রটা এখন এমন সুন্দর একটা সবুজ মাঠ যে, কল্পনাও করা যাবেনা এই মাঠে এমন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ইতিহাসে ঘটে গিয়েছে।

সুতরাং জায়গাটা সম্পর্কে এতকিছু হৃদয়গ্রাহী গল্প শুনে, প্রত্যাশা তো স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে থাকারই কথা। হোটেলটা বা জায়গাটা যে আমাদের অপছন্দ হয়েছে, তা নয়। কিন্তু এরকম জনশূন্য হোটেলে জীবনে এই প্রথমবার। তাছাড়া ফোর স্টার – ফাইভ স্টার হোটেল এসব। খাবারদাবার কিছু খেতে হলেও তো দেখা যাচ্ছে রুম সার্ভিস ছাড়া কোন গতি নেই। আর বাইরে কাছাকাছি দশ বারো মাইলের রেডিয়াসে কোনপ্রকার রেস্তরাঁ আছে বলে তো মনে হয়না। বেশ অপ্রসন্ন হয়ে মালপত্তর লবির মাঝখানে রেখে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ট্যাক্সিচালক জনই ধরে আনল হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের লোকটাকে। জনের মুখে শুনলাম, আসল ঘটনা আর কিছুই নয়, এই হোটেলে আজ একটা বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। বেসমেন্টের ব্যাঙ্কোয়েট হলে। সেই বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতেই নাকি সব কর্মচারীরা ব্যস্ত ছিলেন। জন ভদ্রলোক এই ইনভার্ণেসেরই বাসিন্দা। সে জানাল, ইনভার্ণেস শহরে অনেক বিখ্যাত গির্জা, শপিং প্লাজা, রেস্তরাঁ আর বেশ কয়েকটা মিউজিয়াম রয়েছে। কিন্তু সেগুলো সবই সিটি সেন্টারে। আর সিটি সেন্টার ড্রামোসি হোটেল থেকে কিছু না’হলেও বারো পনেরো মাইল দুরে তো হবেই। মানে আধঘণ্টার মামলা।

তাহলে আমরা দুপুরে খাবটা কি? মনটা খাঁটি প্রকৃতিপ্রেমিক হলেও, পেট তো এদিকে ভালই চুঁইচুঁই করছে। গিন্নি এদিকে হোটেলের বিছানার নরম গদিটদি আর বালিশ যাচাই করে দেখলেও, ছোটটি তো আমাদের কাঁচুমাচু মুখে, বেঁচে থাকা কেক-বিস্কুটের প্যাকেট খুঁজেপেতে কিছু টুকরোটাকরা মুখে চালান করছে। পালকি এদিকে খবর দিচ্ছে, রুম সার্ভিসের মেনুতে সব কিছুই নাকি প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ পাউন্ডের কাছাকাছি। অর্থাৎ, নামে নামে চারখানা প্লেট অর্ডার করতে হলে, অন্ততঃপক্ষে শ’খানেক পাউন্ডের ধাক্কা। বৃষ্টিটা বোধহয় একটু কমেছে। তবে বাইরেটা কিন্তু এখনও বেশ ঝাপসা দেখাচ্ছে। গিন্নি রোমাঞ্চিত হয়ে বিছানা থেকে উঠে জানালার কপাটটা খুলে দিতেই ঘরে ঢুকে এল একটুখানি মেঘ। যেন পোষা বেড়াল একখানা। একটু আবেগকম্পিত হয়েই বলে ফেললেন, “একি কাণ্ড গো? একদম ভিজে যাবো যে”! ঘরের ভিতর এক পশলা মেঘের উপস্থিতি দেখে, ইনভার্ণেসের উপরে তখন আমার শ্রদ্ধা অবিশ্বাস্য রকমের বেড়ে গিয়েছে। অন্যদিকে রুম সার্ভিসের মেনু নিয়ে পড়েছে দুই বোন! এক লাইন করে দেখছে আর বারেবারে ঠোঁট উলটোচ্ছে দুজনেই! অকস্মাৎ এরই মধ্যে ছোটটি ভুরু নাচিয়ে বলে উঠল, বাবা! এখানে ডমিনোজ বা সুইগি নেই? রুম সার্ভিস না করে, ফোনে কিছু একটা অর্ডার করে দিলে হয়না? আমাদের কর্তা গিন্নির দুজনেরই নজর মেঘের দিক থেকে মুহূর্তে ঘুরে গেল আমাদের ক্ষুধার্ত দুটি কন্যার উপর।

************************************************************************************

৩৭ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (ক)

কপালটা আজকে নেহাত মন্দই বলতে হবে। ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টিটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ভোরে। এখন ভালরকম রোদটোদ না উঠলেও, ড্রামোসি ছেড়ে বেরোনোর সময়ে, হাওয়াতে কিন্তু গতকালের সেই বেয়াড়া কনকনে ভাবটা পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে দুঃখের বিষয়, ব্রেকফাস্টে ঝুলিয়েছে ড্রামোসি হোটেলটা। সাহেব ব্যাটারা বলে কিনা সাড়ে আটটার আগে ব্রেকফাস্ট দেওয়ার নিয়ম নেই এই হোটেলে। কি বাজে ধরণের নিয়ম! অগত্যা একটা করে আপেল আর গোটাকয়েক মর্তমান কলা খেয়েই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পরতে হয়েছে আমাদের। তবে বেরিয়েই, আবহাওয়ার এই মুখ চেয়ে তাকানোতে, সকলের মন খুশ। আজ সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে পৌঁছনোর কথা ইনভার্ণেস সিটি সেন্টারের বাসস্টেশনে। গতকাল রাতেও ট্র্যাভেলের মেয়েটা পইপই করে মনে করিয়ে দিয়েছে, সিটি সেন্টারের বাস স্টেশনের ছয় নম্বর বে থেকে আইল অফ স্কাই’এর বাস ছেড়ে যাবে একদম কাঁটায়ে কাঁটায়ে আটটায়ে। সুতরাং যে ভাবেই হোক আধঘণ্টা আগে গিয়ে না পৌঁছতে পারলে ব্যাপারটা একটু গণ্ডগোল হয়ে যেতে পারে।

আমাদের সফরসুচীর আজকেই শেষ দিন, আর আজ আমাদের আইল অফ স্কাই বেড়াতে যাওয়ার কথা রায়ানের সঙ্গে। এঁর পুরো নাম রায়ান রেমন্ড। আর এই রায়ান রেমন্ড মানুষটিকে এই এলাকায় মোটামুটি সবাই এক ডাকে চেনে। ইন্টারনেটে গুগল করলে, এক ক্লিকেই পাওয়া যাচ্ছে এঁর গণ্যমান্য উল্লেখ। ইনভার্ণেস, লখ নেস আর অ্যইল অফ স্কাই চত্বরে রায়ান রেমন্ড’কে একজন সেলিব্রিটি ট্র্যাভেল গাইড বলা চলে। খ্যাতির হিসেবে চার্জ অনেকটাই বেশী করেন রায়ান, কিন্তু রায়ানের সাথে আইল অফ স্কাই বেড়াতে যাওয়ার নাকি অভিজ্ঞতাই আলাদা। আইল অফ স্কাই’এর এমন এমন সব জুতসই জায়গায়ে নাকি নিয়ে যায় রায়ান, সেসব জায়গা দর্শন করে, গোটা পৃথিবীর সংজ্ঞাই নাকি বদলে যায়! পৌনে আটটা নাগাদ ঝড়ের গতিতে চলে এল রায়ান। এসেই ছয় নম্বর বে’তে চোখ বুলিয়ে নিল ঝটিতি। হাতে একটা ট্র্যাভেলারদের লিস্ট, না আঁচড়ানো চুল, অল্প দাঁড়ি, পরনে একটা কালো আর মেরুন চেককাটা কিল্ট, কালো স্নিকারস জুতো, ধূসর রঙের একটা গোলগলা গেঞ্জি আর মুখে ইলেকট্রনিক সিগারেট। রায়ানকে দেখেই মনে হল কোমরের বামদিকে একটা তরোয়াল আর ডানে একটা পিস্তল গোঁজা থাকলে বুঝি ব্যাপারটা জমে যেত আরও বেশী। গত চারপাঁচ দিনে বীর স্কটিশ মানুষের যেসব কাহিনী একটানা শুনে যেতে হয়েছে গিন্নি আর অ্যানড্রুর মুখে, সেসব কেমন যেন মিলে যাচ্ছে রায়ান’কে চাক্ষুষ দেখে। কিন্তু বেয়াড়া বৃষ্টিটা যে শুরু হয়ে গেল আবার। আর সেই সাথে কনকনে জোলো হাওয়াটা। ভেবে রাখা হয়েছিল, সিটি সেন্টারের ফটাফট ছবি তুলে নেওয়া যাবে খানকয়েক, এখন কিন্তু বৃষ্টির ধাক্কায়ে পড়ি কি মরি করে উঠে পরতে হল রায়ানের বাসটাতে।

ইনভার্ণেস সিটি সেন্টারের কোন দোকানপাট এখনও খোলেনি। নইলে রায়ানের আসবার আগেই সামান্য কিছু কেক আর কফি কিনে রাখা যেত। সকালে একটা করে আপেল আর কলা, পেটের কোন কোনায় এতক্ষণে সেসব সেঁধিয়ে গিয়েছে। অদূরেই বইয়ের দোকান আছে একটা, সেটাই দেখা গেল একমাত্র খোলা। কেবলমাত্র সংবাদপত্র বিক্রি হচ্ছে সেই দোকানে। বাঁপাশেই ভিক্টোরিয়ান মার্কেট, রায়ান জানাল এই জায়গাটাকেই বলে কুইন্সগেট। রায়ানের বাসটাকে, বাস না বলে বড়সড় একখানা গাড়ি বলাই শ্রেয়। কারণ এই বাসটাতে বসার জায়গা মাত্র ষোলো জনের। রায়ান বসেছে স্টিয়ারিং’এ। ইলেকট্রনিক সিগারেট পাশে রেখে এখন তাঁর মুখে একটা বাঁকানো মাইক্রোফোন। বাসে এসে পরেছেন বাকী যাত্রীরাও। আমাদের চারজন ছাড়াও রয়েছেন, ক্যানাডা ও ফরাসী দেশের এক এক জোড়া নারী পুরুষ। আমরা চার আর এই দুই যুগল মিলিয়ে – মোট আটটি প্রাণী। আর রায়ান।

কিন্তু রায়ানের হিসেব নাকি বলছে এখনও আসা বাকী রয়ে গিয়েছে আরও তিনজনের। ঘড়িতে সওয়া আটটা। ফরাসী নারীটির সাথে ক্যানাডিয়ান মহিলার আলাপ পর্ব এতক্ষণে শেষ। অন্যদিকে পুরুষ দুজন কেমন সুন্দর নিজেদের মধ্যে বিড়বিড় করে গল্প শুরু করে দিয়েছেন। এঁরা কিরকম সহজেই একে অন্যের সাথে আলাপ জমিয়ে ফেলতে পারে! সাত নম্বর বে’তে এসে দাঁড়িয়েছে আরও একটা গাড়ি। সে গাড়ির চালক একজন ক্ষীণকায় বৃদ্ধ। সাত নম্বরের অপেক্ষমাণ কিছু পর্যটক উঠে পরলেন সেই গাড়িটাতেই। আমাদের গাড়ির বিদেশিনী দুজন সেই বৃদ্ধকে দেখে বুঝি হেসে কুটোপাটি হলেন। অন্যদিকে আমরা চারজন চুপচাপ, মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছি। গিন্নি একটু থতমত খেয়ে আছেন, এই দুই মেমের সাথে এখনও কথা জুগিয়ে উঠতে পারেননি! ছোটজন নিরাসক্ত মুখে কি একটা গুনগুন করে গান গেয়ে চলেছে।

এবারে দেখলাম ব্যস্ত হয়ে পরেছে রায়ান নিজেই। আমাদেরও বেশ রাগ হচ্ছিল, বাকী তিন জনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেখে। মাইক্রোফোনটোন খুলে রেখে রায়ান নেমে পড়ল গাড়ি থেকে আর আমিও সেই সুযোগে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলাম। ঘনঘন ঘড়ি দেখছে রায়ান। সাড়ে আটটা বেজে গেল! এবার বোধহয় আর অপেক্ষা না করে ছেড়ে দেবে বাস। এই বাজারে লোকটার সাথে একটু ভাব জমানোর খাতিরেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কি আমার ভারতীয় সিগারেট একটা খাবে”? রায়ান আমার কথার জবাব আর দিতে পারল না। কারণ কোত্থেকে যেন ভোজবাজির মতন তাঁর বাকী তিনজন অতিথি পৌঁছে গিয়েছে ছয় নম্বরে। আর আরও মজার কথা হল, দেখা গেল তিনজনেই দেশী। একটা মধ্যবয়েসি দম্পতি। তাদের মধ্যে নারীটি বেশ স্থূলকায় ঢোসকা চেহারার, একটা বেঢপ রকমের জিনসের পেন্টুলুন পরেছেন। পুরুষটির একটু বেশীই কেতাদুরস্ত চলনবলন আর একটি পুঁচকে ছোকরা গোছের যুবক। তবে এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, এঁরা ভারতীয়, নাকি পাকিস্তানের বাংলাদেশের মানুষ? বিদেশ বিভূঁইয়ে নিজের লোক দেখে, আমার রাগ মুহূর্তে জল হয়ে গেল! তারপরে দেখলাম রায়ান রাগে ফুঁসছে। এদিকে, যুবকটি লাজুক মুখে টুক করে বাসে উঠে পরলেও, অন্য পুরুষটা রায়ানের দুর্বিনীত মুখচোখ দেখে, ক্ষমাভিক্ষা করতে গিয়ে, একদম সটান জাপটে ধরেছে রায়ানকে। এই মোক্ষম জাপটে ধরাতেই, রায়ানের মুখে এখন একটা তথাস্তু মার্কা হাসি ফুটে উঠেছে।

************************************************************************************

৩৮ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (খ)

আশ্চর্য এক রূপকথার মতন মনে হচ্ছে ইনভার্ণেস শহর ছাড়ার পরেই। শহর ছেড়ে বেরিয়েই কুড়ি পঁচিশ মাইল অতিক্রম করে, বাঁদিকে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে এবার পাল্লা দিয়ে চলেছে রূপবান লখ নেস আর ডানপাশের ঘন সবুজ বনানী। ধূসর আকাশ, আর তার সাথে কালচে নীল রঙের এই নেসের বাহ্য রূপ আর ডানপাশের সবুজ একসাথে মিলে বেশ একটা মানানসই ব্যাপার প্রতিভাত হচ্ছে। তাঁর বাহারের বাঁকানো মাইক্রোফোনে, যাত্রার টুকটাক বর্ণনা করছে রায়ান। বেশ দীর্ঘ সুরেলা আর ভারী তাঁর গলাখানা। আর তাঁর বাচনভঙ্গীতেও একটা বেশ আলসে উদাসীন ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন প্রদীপ ঘোষ একটা প্রেমের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন। রায়ান কিন্তু এখন শোনাচ্ছে লখ নেসের মনস্টারের গল্প। দেখা যাচ্ছে গিন্নি তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে বিভোর হয়ে শুনছেন সেই নেসদত্যির অলীক গল্প। আর আমি ইতিমধ্যেই চলে গিয়েছি ফ্ল্যাশব্যাকে। বোধহয় বছর দশেক পেরিয়ে গিয়েছে এতদিনে। একবার গাড়ি করে সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার সময়ে একটা জায়গা এসেছিল। সে জায়গাটার নাম বোধহয় সুন্দরনগর। মনে আছে, সেই সুন্দরনগর জনপদটাতে পৌঁছনোর আগে একের পর এক সিমেন্টের কারখানা আর সেসব কারখানার ধুলো মিশ্রিত বাতাসে হাঁপিয়ে উঠতে হয়েছিল আমাদের। আমাদেরই মধ্যে কে একজন যেন, একটা ধাবায়ে চা-পান করতে করতে ড্রাইভার ছেলেটিকে নাক কুঁচকে বলে উঠেছিলেন, “ভারী খারাপ জায়গা তোমাদের এই সুন্দরনগরটা! নাম দিয়েছ সুন্দরনগর কিন্তু তোমাদের দেশে এমন অসুন্দর জায়গা কোনোকালে দেখিনি বাপু। এই নাকি তোমাদের মানালি”? জাঠ ড্রাইভারটা মুচকি হেসেছিল। হয়ত কিছু না বুঝেই। কিন্তু চমক বুঝি আমাদের জন্যে ধরা ছিল তারপরেই। সুন্দরনগর ছাড়ার পরে মিনিট পনেরোর মধ্যেই এসে গিয়েছিলো মান্ডি আর মান্ডি থেকে টানা প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পাশে পাওয়া গিয়েছিল রূপসী বিপাশা নদীকে। হিমাচলে বিপাশাকে বলে বিয়াস। বিপাশার সেই অনাবৃত রূপ ছিল ভয়ঙ্কর রকমের সুন্দর। নিরাভরণ আদুর গায়ে যেন গাঁয়ের জলাশয়ে স্নানে নেমেছেন সুন্দরী এক যুবতী। তার সাথে আজ এই নিকষিত পালিশ করা লখ নেসের অনধিকার উপমা হয়ত টানবেন না কেউই। কিন্তু সেই সাদৃশ্য যদি দৈবাৎ কারোর প্রবল আবেগপূর্ণ চোখে ধরা পরে যায়, সেই অধীরতা তো চেপে রাখা পাপ।

লখ নেসের তীরে ছবি তুলে নেওয়ার জন্য একটা ছোট্ট পাঁচ মিনিটের স্টপ দিয়েছে রায়ান। ইলেকট্রনিক সিগারেটে ভুরভুর করে টান মারছে আর একটা ঢিপির মতন জায়গায়ে উঠে হালকা রসিকতার সুরে একটু আগে বলল, খুব মনঃসংযোগ করে দেখুন সকলে, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, এই সেই নেসির ভয়াবহ উপকুল। এইখান থেকেই মাঝেমধ্যে নেসি’কে দেখা যায়। দিন দুপুর রাত কিছুই মানেনা নেসি। তারপর আমাদের ছোটটির দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “ওই যে দেখতে পাচ্ছো, খুকি? খানিক দুরে জলের মধ্যে যে বুড়বুড়ি দেখতে পাচ্ছো, ওইতেই তো চিহ্ন দেখাচ্ছে নেসির উপস্থিতি’র”। স্কটল্যান্ডের কিংবদন্তী উপকথার নিরিখে লখ নেসের দত্যির নাম আদর করে রাখা হয়েছে ‘নেসি’। আর নেসির আতঙ্কে আমাদের কনিষ্ঠাটি তার মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো বুঝি খানিকটা। তার মায়ের মুখ দেখেও মনে হচ্ছে তাঁরও বুঝি সামান্য অসোয়াস্তি হচ্ছে যেন। তবে নেসের তীরে দাঁড়িয়ে আমার এই মুহূর্তে মনে হল, জল বুঝি কেবল জলের মতন দেখতেই হয়। সে নেসের জলই হোক, বা বিপাশা নদীর।

সকলেই গাড়ি থেকে নেমে এসেছেন। মোবাইল ক্যামেরায় নিজেদের ছবি তুলে রাখছেন বিভিন্ন ভঙ্গিমায়ে। তবে দেখছি আমাদের দেশী দম্পতিটির কিন্তু সাহসের বলিহারি। রায়ান যে ঢিপিতে উঠে দাঁড়িয়েছিল, তাঁর চেয়েও উঁচু আরেকটি ঢিপিতে গিয়ে চড়েছেন পৃথুলা মহিলাটি। একটা সাদা ফুলগাছের পাশে বেশ ঠমক নিয়ে দাঁড়িয়েছেন হাসি হাসি মুখে আর পুরুষ মানুষটি একটা অতিকায় ক্যানন ক্যামেরায়ে তুলে রাখছেন সেই ছবি। আজকাল কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বেশীর ভাগ মানুষই মোবাইল ফোনে ছবিটবি তুললেও, কিছু অতিশৌখিন জনতা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কিন্তু ইদানীং ফটোগ্রাফির বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। রাক্ষুসে সব অতিকায় জাপানী ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে দিনরাত্তির জলফড়িঙের আর পিঁপড়ের ছবি তুলে ফেসবুকের লাইক কুড়োচ্ছেন। এঁরাও কি তবে ওই দলেই পরছেন?

পালকি এসে জানাল, অন্য দেশী যুবকটি নাকি বাংলাদেশের লোক এবং আরও মজার ব্যাপার হল, এর নামও নাকি অমিত। মহম্মদ মনিরুল অমিত। যাকগে, স্কটরেলের অমিত বাঙালী না হলেও, এই বঙ্গসন্তানের সাথে এবারে মন খুলে আড্ডা দেওয়া যাবে। গিন্নি বিশ্বাস করলেন না, আমার কিন্তু কেন জানিনা ছেলেটিকে প্রথম থেকে দেখেই মনে হয়েছিল ব্যাটা খাঁটি বাঙালী। এক তো তাঁর মুখের আদল, অল্প অল্প ছাগলদাঁড়ি, পাতলা চুল, মৃদু একটা ঠোঁটঝোলানো বিজ্ঞ ধাঁচের হাসি – প্রায় সবই তো পাক্কা বাঙালীর মতন। তারপরে যখন দেখলাম, ছেলেটা আমাকে দূর থেকে দেখতে পেয়েই হাতের সিগারেটখানা ঝটিতি ছুঁড়ে সামনের ঝোপে ফেলে দিল, তখনই বুঝতে পেরেছি এ জিনিষ বাঙালী ছাড়া হয়না।

এবারে ক্যামেরা গলায় আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন দেশী ভদ্রলোকটি! বেশ ভাল তাঁর স্বাস্থ্যখানা। আর এই গত একঘণ্টায়ে যতক্ষণ তাঁকে দেখলাম, সর্বক্ষণ তো ভদ্রলোক উৎসাহে টগবগ করছেন। তাঁর দিকে চেয়ে আমি একটু হাসতেই বললেন খাঁটি মুম্বইয়া হিন্দিতে শুধোলেন, “মদ পান করবেন, ভাইয়া”? ভাল দুবোতল হুইস্কি আছে আমার কাছে। এই শীতল আবহাওয়াতে, সকাল থেকেই একটু করে করে হুইস্কি পান করছি আমরা কত্তা গিন্নি! যাক, এতক্ষণে এদের উৎসাহের কারণটা বোঝা গেল! সবিনয়ে ভদ্রলোকটির প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে রায়ানের গাড়ীতে চেপে বসলাম আমরা। আর একটু বাদেই এলিন ডনান ক্যাসেলে পৌঁছে যাবো। লখ নেস এখনও আমাদের সঙ্গ ছাড়েনি। বরং আরও নয়নশোভন হয়ে সে দেখা দিচ্ছে মাঝে মাঝেই। যে রাস্তাটা দিয়ে রায়ান এখন নিয়ে চলেছে, এই সড়কটা আরও নির্জন, আরও ছমছমে! বৃষ্টি কমে গিয়েছে এখন আর নেসের ওপারে আকাশে নরম সূর্যটা দেখে মনে হল, ভাগ্যিস বেঁচে রয়েছি! নইলে এমন একটা বিরল দৃশ্য কি দেখতে পেতাম?

************************************************************************************

৩৯ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (গ)

বেপরোয়া রোমাঞ্চের বুঝি এই শুরু হল। এবারে লখ নেস আড়ালে চলে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে। আর আবার ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টি এসে পরছে বেহিসেবির মতন, আর সে বৃষ্টি কিন্তু চলেও যাচ্ছে খানিকক্ষণ বাদেই। কেবল শূন্যস্থানে যেন উপহার দিয়ে যাচ্ছে একটা করে আকস্মিক হাসির ঝিলিক। এই বর্ষণের ত্বরিত রূপ বুঝি এক-এক জায়গায়ে একরকম। এই যেমন মিনিট পনেরো আগে কফি পানের বিরতিতে, ছোট্ট পাথুরে একটা নদীর উপর শ্যাওলা ধরা এক জীর্ণ সেতুর পাশেই গাড়িটিকে দাঁড় করিয়েছে রায়ান। বোঝাই যাচ্ছে, সামান্য আগেই এখানে হয়ে গিয়েছে এক পশলা বৃষ্টি। এখনও বড়বড় সব ঝাঁকড়া গাছের পাতাগুলো থেকে টপটপ করে ঝরে পরছে এক-একটা জলের ফোঁটা। বাতাসটা এখানে এখনও বেশ ভেজাভেজা। আর এই মুহূর্তে দেখলাম রোদ্দুরটাও বেশ জোরালো হয়ে উঠে গিয়েছে! বৃষ্টিস্নাত আর্দ্র সেতুটার থেকে সূর্যের তীব্র কিরণে এখন বাষ্পের ভাপ উঠছে। নিচের অদ্ভুত সুন্দর নদীটা দেখে উৎসাহিত হয়ে রায়ানকে শুধোলাম, “আচ্ছা রায়ান, এই নদীটা কি হেঁটে পার হওয়া যায়”? উত্তর না দিয়ে চোখ টিপল রায়ান। “রায়ান, আমরা কি একবার তবে নদীটার ওপারে গিয়ে দাঁড়াতে পারি?” এবারে রায়ান একরকম বাধ্য জবাব দিল, “না না, বাধা তেমন কিছু নেই! ইচ্ছে করলে তো অনায়াসে যাওয়া যেতেই পারে ওপারে। তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের এলিন ডনান ক্যাসেলে গিয়ে পৌঁছতে হবে কিনা!” গিন্নি দেখলাম রায়ানের সাথে আমার অযৌক্তিক বাক্যালাপে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আবার কি আজেবাজে বলতে শুরু করল মানুষটা! নদীর ওপারটায় দেখা যাচ্ছে একটা নিবিড় বনানী আর তার ফাঁকফোকর দিয়ে একটা সুদৃশ্য কুঁড়েঘর। ভাবছিলাম রায়ানকে আর একবার বলে দেখি! এদেশে আসা যাবত তো বহুসংখ্যক প্রাসাদ, ক্যাসেল, দুর্গ প্রভৃতি দেখা হয়ে গেল! আহা! ওই নিরিবিলি কুটিরটার সামনে যদি বসে, সারাটা দিন এই নদীতে ছিপ ফেলে কিছু স্যামন মাছ শিকার করা যেত! এই অপূর্ব নদীটাকে দেখে আমার ক্যাসেল দেখতে যাওয়ার ইচ্ছেটা একদম উবে গেল। নেহাত দামাল বৃষ্টিটা ফের এসে গেল, অগত্যা কফির গেলাসটা হাতে নিয়েই উঠে পরতে হল রায়ানের বাসে।

অমিত ছেলেটাকে দেখলাম অনেকটা আমারই মতন। বাঙালী বলেই হয়ত, ছেলেটার আবেগ, অনুভূতি অনেক সূক্ষ্ম। নিজের মোবাইল ফোনে অনেক’কটা অনবদ্য ছবি তুলে নিয়েছে সে নদীটার। এমনকি তার মধ্যে সেতুর উপরে আমাদের চারজনেরও একটা দুটো ছবি রয়েছে। আর যেটা কেউ লক্ষ্য করেনি, সেই কুঁড়েঘরটারও বেশ কটা ছবি নিয়ে নিয়েছে অমিত। গৌণ হলেও, সে অপরূপ দৃশ্য কিন্তু চোখ এড়িয়ে যায়নি তাঁর। তাছাড়া আরও দেখছি কয়েকটা জংলী গাছের পাতাও সন্তর্পণে ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে অমিত। আমাকে পাতাগুলো দেখিয়ে বলল, “এই দ্যাখেন চাচা! কেমন সুন্দর এই পাতাগুলান।“ অমিতের বাঙলায়ে একটা অদ্ভুত টান রয়েছে। আমরা যেরকম শুনেছি, সেরকম বাঙাল কথা নয়। তবুও শুনতে যেন আমাদের কলকাতার চলিত বাংলার চেয়ে অনেকটা অন্যরকম। ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ম্যাচ দেখতে এসেছিল অমিত। গত একবছর ধরে এই দুহাজার উনিশের জুন মাসটার জন্য তিলেতিলে পয়সা জমিয়েছে সে। একত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেল, বিয়েশাদী এখনও করেনি সে। কোনকালে সে সব উটকো ঝামেলায়ে নিজেকে জড়াবেনা বলেও স্থির করেছে সে। গত সতেরো তারিখের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে গ্রুপ-স্টেজ থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার একটা হালকা আশা জাগিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তারপরে আবার পরপর অস্ট্রেলিয়া আর ইন্ডিয়ার কাছে হেরে গেল তার টীম। তাতে অমিত বেচারা বিরক্ত হয়ে শেষমেশ চলে এসেছে ইনভার্ণেস। একগাল হেসে অমিত জানাল, “সারাটা বছর দশটা মাস মন লাগায়ে কাজকাম করি আর বাকী দুইটা মাস একদম টোটো করে ঘুরি”। ইন্ডিয়াও তো এসেছে সে। “এইতো গেলোবারই আপনেদের মুম্বাই শহরটা দেখে, গোয়া দিয়া ঊটি ফুটি – মাইসুর ফাইসুর সব দেখা আসলাম”।

অন্যদিকে আসর জমিয়ে দিয়েছেন আমাদের ক্যামেরাদাদা। কি একটা রসুনের গন্ধওলা রুটি চিবোচ্ছেন আর পায়ের কাছে রাখা জলের বোতল থেকে, অল্প অল্প করে হুইস্কিতে চুমুক মারছেন আর তার সাথে এবার গভীর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে উদ্ভট সব আজগুবি প্রশ্ন করা শুরু করছেন রায়ান কে। একটা মানুষের স্কটিশ হাইল্যান্ডস নিয়ে এতরকম ঔৎসুক্য থাকতে পারে, এঁকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেতনা। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী ঝিমোচ্ছেন। প্রশ্ন করতে করতে ভদ্রলোক এখন দেখলাম শেষ অবধি রায়ানের মাসিক আয় নিয়ে সওয়াল শুরু করেছেন, এবারে আমাকেই প্রসঙ্গ পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে হল। একটা দুটো কথাতেই জানা গেল, এঁদের বাস মুম্বইয়ের গোরেগাঁও’তে। ভদ্রলোক রায়ানের থেকে নজর ঘুরিয়ে এবারে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্রাদার তুমি সিনেমা টিনেমা কিছু দেখ? হিন্দি ফিল্ম পছন্দ করো”? ঈশ! কোন কুক্ষণে যে আমি রায়ান কে বাঁচাতে গিয়ে, প্রসঙ্গ বদলাতে গিয়েছিলাম! জবাব দিলাম, “হ্যাঁ স্যার, তা দেখি বৈকি! মাসে দুমাসে তো একটা আধটা দেখা হয়েই যায়!” আমার উত্তর শুনেই, এইবারে চলন্ত বাসে একদম সটান উঠে দাঁড়িয়ে নিজের হাতখানা বাড়িয়ে দিলেন ক্যামেরাদা। একটা অত্যধিক জোরালো রকম হ্যান্ডসেক করে বললেন, “স্যার! দিস ইজ প্রবীণ মর্ছালে.. উইডো অফ সাইলেন্স ছবিটার একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সিনেমাটোগ্রাফার এবং প্রযোজক। এই’তো গত সপ্তাহেই ক্রোয়েশিয়া আর বুলগেরিয়াতে স্ক্রিনিং ছিল ছবিটার। আরে ভাইয়া, ছবিটা তো সুপার ডুপার হিট করে গেছে না? তাই এবার পাবলিক ডিম্যান্ডে ছবিটাকে নিয়ে এলাম স্কটল্যান্ড।” বলেই নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে।

গিন্নি দেখলাম এবারে আমার দিকে চেয়ে ভুরু নাচাচ্ছেন। যেন বলতে চাইলেন, “কেমন? যেমন গায়ে পরে আলাপ জমাতে গিয়েছিলে! এবারে বোঝো ঠ্যালা। আমি যতটা সম্ভব অপরাধীর মতন গলায় প্রবীণকে জানালাম, “দেখে নেব স্যার, নিশ্চয়ই করে দেখে নেব আপনার উইডো অফ সাইলেন্স… আরে! আপনার ছবি বলে কথা। কথা দিচ্ছি, পারলে দাদা, দেশে ফিরেই দেখে নেব! বাইরে দেখলাম বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার, থামছেই বা কখন শুরুই বা হচ্ছে কখন? আমাদের তো এদিকে বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডাই লাগছে! বাতাস বইছে খুব শনশনিয়ে… তবে এই শীতের মধ্যেও প্রবীণকে কিন্তু দেখলাম দরদর করে ঘামছেন… আমার দিকে তাঁর রঙিন জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “থোড়া ট্রাই তো কিজিয়ে স্যার, চাহিয়ে তো মেরা পাস নমকিন ভি হ্যাঁয়,… ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম পালকি নীরব চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

************************************************************************************

৪০ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (ঘ)

আকাশটা কালো করে এসেছে, একদম যেন একটা স্লেটের রং। এবারে কেবল একটা চকখড়ি দিয়ে তার উপর কিছু একটা লিখে দিলেই হয়। আর আবার খুব মিহি করে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এমন কোমল বৃষ্টিতে মাত্র একশো-দেড়শো মিটার হেঁটে যেতে কারো কোন অসুবিধাই হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এদিকে যেরকম সবেগে বাতাস বওয়া শুরু হয়েছে, তাতে তো এইটুকু হেঁটে যাওয়াটাও দেখা যাচ্ছে যথেষ্ট দুষ্কর। এই দামাল হাওয়ার দাপট এমনই যে ঠিকমতন একজায়গায়ে দাঁড়াতে পারছেননা কেউই। একবার মাটিতে পা রেখেই ক্যামেরাদাদা তাঁর বউকে নিয়ে ফের পালিয়ে গেলেন গাড়ীতে, ওঁরা নাকি ভেতরেই বসে থাকবেন। পালকিরাও এই ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে যেতে চায়না ক্যাসেলে, তাছাড়া বলল তার ছোটবোনের খিদে পেয়ে গিয়েছে, তাকে নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করবে সামনের ক্যাফেতে। ক্যানাডিয়ান যুগলকে দেখলাম বাসের থেকে লাফ মেরে নেমেই পড়িমরি করে একছুট লাগিয়েছেন ডান – বাঁ কিছু না দেখেই। আর এদিকে ফরাসী দম্পতিটিকে দেখে আমাদের তো একরকম হাসিই পেয়ে গেলো। পুরুষটির জ্যাকেটের মধ্যে তাঁর পুরো শরীরটাকে কৃপণের মতন বেঁকিয়ে-চুরিয়ে ঢুকিয়ে নিতে চাইছেন ফরাসী নারীটি। আর সেইভাবেই উষ্ণ আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে নাকি দুজনে হেঁটে যাবেন এলিন – ডনান ক্যাসেলে। তাঁদের দেখে মনে হল, এভাবে এতটা পথ হেঁটে যাওয়া তো ভারী অসুবিধাজনক, বেশ দুর্বহ একটা ব্যাপার। আমি স্বভাবসুলভ ফচকেমি করে দাঁতে দাঁত চেপে বাংলায়ে বললাম, “দুগগা দুগগা! দেখেশুনে যেও বাবা তোমরা! আবার পা-ফা জড়িয়ে লখের জলে হড়কে পরে যেওনা যেন”। হঠাৎ পেছনে শুনতে পেলাম অমিত বোধহয় শুনতে পেয়েছে সেই কথা, সে হাসছে খিকখিক করে, তাঁর চাচার মাতৃভাষায় রসিকতা শুনে। আমরা কত্তা গিন্নি মন্থরগতিতে পা বাড়ালাম এলিন – ডনানের দিকে! সঙ্গে আমাদের অমিত। গিন্নি পালকিদেরও পীড়াপীড়ি করলেন একটু। কিন্তু তাদের নিয়ম বুঝি আজকাল তারাই ভালো বুঝতে পারে।

স্লেট রঙের আকাশ। যেন কালপুরুষ দেখা যাবে এই মুহূর্তেই। তিনপাশে গাঢ় নীলবর্ণ লখের জল আর একটা সেতু পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম কালচে হলুদ রঙের এলিন ডনান ক্যাসেলের দিকে। সেতুর উপরে বাতাসের বেগ বুঝি এবার বাড়ল আরও খানিকটা। হাওয়াটা এখন প্রায় অসহনীয় অবস্থায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কালো আকাশটাতে ডানা ঝাপটে উড়ে পালাচ্ছে কয়েকটা বকপাখি। দূর থেকে মনে হয় যেন একথোকা সাদা ফুল। বড় দুর্লভ লাগছে বুঝি এই দৃশ্যটাকে! আচ্ছা আমরা কি কোনকালে এমন একটা অতিরিক্ত রংচঙে দৃশ্য দেখতে পেয়েছি? কেবল বাতাসটা আজ একটু কোমল হলে, এখানেই তুলে নেওয়া যেতো বেশ কয়েকটা ছবি! কিন্তু এই তীব্র নির্দয় বাতাসে সে বুঝি এখন সম্ভব নয়। গিন্নি ভয়ের চোটে আমার হাত চেপে ধরেছেন। ধরারই কথা, নইলে এরকম পাশব ঝঞ্ঝায় কারো সাহায্য ছাড়া সঙ্গীহীন হেঁটে চলা কিন্তু বেশ দুরূহ ব্যাপার। অমিত হাঁটছে আমাদের একটু আগে-আগে, যেন একটা সম্মানসূচক দূরত্ব বজায় রাখতে চায় সে। এরই মধ্যে উদ্দীপনা দেখিয়ে আমাদের একটা দুটো ছবিও তুলে নিচ্ছে সে। অন্য পর্যটকদের মধ্যে কেউ না দাঁড়ালেও, আমরাও সেই উগ্র হাওয়াতেই ক্ষণেক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়ছি বীরের মতন। অমিত যেন আজ বোঝাতে চায়, ফরাসী দেশ বা ক্যানাডার মানুষের তুলনায় বাঙালীর কলজের দম যেন অনেক বেশী। পাতলা একটা জ্যাকেট পরিহিত শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারার এই বাঙালী’র সরল বাহাদুরি কিন্তু সত্যি সত্যিই দেখার মতন। কেন জানিনা, ভারী ভালো লেগে গেলো আমার অমিতকে। ক্যাসেলে পৌঁছে একবুক নিঃশ্বাস ছাড়লাম আমরা। জল পিপাসা পেয়ে গিয়েছে ভয়ানক রকমের। পরিশ্রান্ত শরীরের সমস্ত রক্ত যেন একরকম শুকিয়েই গিয়েছিল এই দেড়শ মিটার হাঁটাতেই। বাপরে বাপ! সকাল সাড়ে দশটাতেই এমন একটা নিস্তব্ধ অন্ধকার আকাশ, আর তার সাথে এমন একটা বেপরোয়া বেখাপ্পা বাতাস। ভয়মিশ্রিত অদ্ভুত একটা অপার্থিব অনুভূতি হতে লাগল আমার। এই তাজ্জব উপলব্ধি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ না করলে বুঝি লিখে বোঝানো যাবেনা। ভাগ্যিস অমিত ছিল আমাদের সঙ্গে!

ক্যাসেলের মোহ আমার কেটে গেলেও, গিন্নির দেখলাম ক্যাসেল দেখলেই কেমন একটা মুগ্ধ হয়ে পড়েন। যেন এক রূপকথার দেশে এসে পরেছেন। তাঁর এই বিস্মিত মুখশ্রী আমি এডিনব্র’তে বা উইন্ডসরে দেখেছি, ওয়ারউইকেও দেখা গিয়েছে তাঁর এই কৌতূহলী মুখ। এমনকি স্ট্র্যাটফোর্ডে শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে ঢুকেও, গিন্নিকে দেখে মনে হয়েছিল রমেশচন্দ্র মজুমদার যেন নতুন এক কোন অজানা ইতিহাসের সন্ধান পেলেন! ক্যাসেলে ঢুকে আমার ক্যাসেল দেখার ইচ্ছেই হয়না। চারিধারে থরেথরে সাজানো থাকে যতরকম অস্ত্রশস্ত্র, তরোয়াল। রাজারাজড়াদের পোশাক – আশাক ইত্যাদি! এগুলো মানুষ দেখেন কেন? গিন্নির মুখে জানলাম এই ক্যাসেল নাকি তৈরি হয়েছে তেরোশো শতাব্দীতে। কে এলিন আর কেই বা ডনান, জিজ্ঞাসা করতে জানালেন এলিন মানে দ্বীপ আর ডনান খুব সম্ভবত কোন রাজবংশের পদবী। এই এলিন ডনানের অনেক উল্লেখ নাকি রয়েছে আউটল্যান্ডার সিরিয়ালে। জ্যাকোবাইট মুভমেন্টের অনেক সব যুদ্ধটুদ্ধ হয়ে গিয়েছে এরই কাছেপিঠে। আর এই যে লখ, এই লখের নাম আসলে লখঅ্যালশ। অন্যদিকটা লখ নেসের দিক। ডনানরা ক্যাসেল বানিয়েছেন এমনই একটা সুকৌশলী দ্বীপে।

এরই মধ্যে পকেট থাবড়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা দেশলাইটা। কিন্তু মগজে ধোঁয়া না ঢুকলে বুঝি এইসব ইতিহাসও বুঝতে পারা যাবেনা। ঈশ! এই সময়ে আবার অমিতটা যে কোথায় নিখোঁজ হয়ে গেলো এরই মধ্যে? দেশলাইটা বুঝি ওই নিলো একটু আগেই! বাইরে বাতাসের বহর অনেকটা কম এখন। একটু রোদও বুঝি উঠেছে। বাঁদিকে তাকাতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম! জলের মধ্যেই অনেকগুলি উঁচুউঁচু পাথর! আর তারই পাশ ঘেঁষে একঝাঁক সাদা রাজহংসী জলে নেমে সাঁতরে বেড়াচ্ছে অবলীলায়। আচ্ছা এই শীতেও ঠাণ্ডা লাগেনা বুঝি এঁদের?

************************************************************************************

৪১ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (ঙ)

অপিরিচিত জনসমষ্টিতে একটানা কথা বলে যাওয়ার জন্য একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম এলেম লাগে। প্রবীণ মর্ছালে’র সেটি রয়েছে। প্রথমে ভাবছিলাম, সকাল-সকাল বুঝি পেটে পরেছে বলে একটু বেশী কথা বলছেন ভদ্রলোক। যাকে চলিত ভাষায়ে আমরা বলি, ভাঁট করা। তাছাড়া ভাবলাম ফিল্মমেকার মানুষ, ওদের কারিকরি তো আমাদের মতন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হতেই পারে। কিন্তু যত আলাপ হচ্ছে ভদ্রলোকের সাথে, ততো যেন বোঝা যাচ্ছে, লোকটা কিন্তু জীবনটাকে দেখেন একদম অন্যভাবে। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বলে চলেছেন অনর্গল। কে শুনল, কে বিরক্ত হল, কোন পরোয়া নেই! তাছাড়া কোনটাই তাত্ত্বিক তেমন কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে এতো গল্প? ভেবে দেখলাম, একজন চিত্র পরিচালকের মিথ্যে কথা বলার মতন কল্পনাশক্তি বা রসদ হয়ত প্রচুর রয়েছে, তবুও প্রবীণের কোন গল্পই আমার এই পরিবেশে মিথ্যে বলে মনে হচ্ছেনা। এই এক্ষুনি আরেক ঢোঁক হুইস্কি পান করে প্রবীণ শুরু যেটা শুরু করলেন, সেটা তাঁর কৈশোরের হোস্টেল থাকার গল্প। আর বেশ মজার সেই গল্পের শুরুটা। এটা তো মানতে হবে যে অভিজ্ঞতা আছে বটে মানুষটার! পিছনের সীটে বসে অমিত দেখলাম একটা চটকা মেরে নিচ্ছে, বাকীরা নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে, আর অন্যদিকে প্রবীণের সাথে আমার দেদার আড্ডায়ে গিন্নির মুখ কিন্তু বেশ বিরক্ত! মানুষের কণ্ঠস্বর বুঝি তাঁর এই পরিবেশে ভালো লাগছেনা। আর পরিবেশটাও অনুচ্চ রাখার জন্য রায়ানও কথা বলছেনা প্রয়োজন না হলে। মাঝে-মাঝে ওই একটা দুটো মন্তব্য করছে, দুটো একটা চুটকি, ভালো ফটোগ্রাফ তোলার মতন কোন জায়গায়ে এলে, দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে তাঁর বাসটাকে।

গিন্নির মুখ দেখে ভাবছি, এবার কোনদিকে মনোযোগ দেব? মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনে যাব প্রবীণের মজার মজার গল্প, নাকি বাইরে রাস্তার দিকে রাখব আমার নজর? মনকে অবিরত বোঝাচ্ছি, ধুর! এখনও তো সেই ইনভার্ণেসের আশেপাশেই রয়েছি আমরা। আর তার মানে তো সেই একই প্রথাগত দৃশ্য। আদিগন্ত গাছের পর গাছ, মাঠের পর আরও একটা মাঠ, অদ্ভুত রকমের সুন্দর এক ধাঁচের ছবির মতন গ্রাম। তা’ও পালামৌ টালামৌ হলে একটা অন্যরকমের অনুভব হত নিশ্চয়ই। তবে মিথ্যে বলবনা, একঘেয়েমির মধ্যে কিন্তু ম্যাজিকের মতন এসে যাচ্ছে একটা আধটা নদী বা জলাশয়। আর হঠাৎ করে চোখে পরছে মাঠে চরতে থাকা কিছু মেটে রঙের ভেড়া। পালকি কোনদিন ভেড়া দেখেনি তাই একটানা বাইরের জানালার দিকে চোখ রেখে দিয়েছে। ভেড়া দেখলেই বিস্মিত হয়ে, ঘুম থেকে জাগিয়ে দিচ্ছে তাঁর ছোটবোনকে। এখন সামান্য ক্লান্ত লাগছে। তবে এলিন – ডনান’টা কিন্তু দেখার মতন একটা জায়গা ছিল বটে। দুটি লখের জল সেখানে মিশেছে, আর তার মাঝখানে অমন একটা সাঙ্ঘাতিক প্রাসাদ। আমাদের দেশ তো দূরের কথা, সচরাচর হয়ত এই দেশেই দেখা পাওয়া যাবেনা অমন আর একটা ক্যাসেলের। তাছাড়া ওই লখের উপর সেতু দিয়ে ক্যাসেলে পৌঁছনোর সময়ে বাতাসের যা স্পর্ধা দেখা গিয়েছিলো, তা হয়ত আগে কোনদিন দেখিনি আমরা। যেন পৃথিবীর পুরো বায়ুমণ্ডল অভ্যর্থনা করতে এসেছিল আমাদেরকে।

উঁকি মেরে দেখলাম, বাইরে এখন ঘোরতর অন্ধকার। রায়ানের বাসের কাঁচটা একটু ঘোলাটে রঙের, কিন্তু আলো কমে এসেছে অনেক। দুরে কিছু গম্ভীর পর্বত আর তারই মাঝে মাঝে একটা বুঝি জলের রেখা চকচক করে উঠছে। শাল সেগুণের বনানী তো উধাও হয়ে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হল। আর একটু আগে দুপাশের সব বেঁটে বেঁটে ঝোপঝাড়গুলি, সেগুলি আর চোখে পরছেনা। আমি প্রবীণের গল্পের তোড়টাকে একটু হালকা ব্যাঘাত ঘটাতেই বলে উঠলাম, “দ্যাখো দ্যাখো, কেমন যেন একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হচ্ছে না?” সেই শুনে গিন্নি একটু জড়সড় হয়ে বসলেন আমার কাছ ঘেঁষে। ছোটজনও চোখটোখ কচলে উঠে পরল। গাড়ীটা পাকা রাস্তা ছেড়ে এবারে নেমেছে একটা পাহাড়ী সড়কে। আর যেখান দিয়ে গাড়ীটা নিয়ে চলেছেন রায়ান, কেমন যেন মনে হচ্ছে একটা ঘন সবুজ রঙের উঁচুনিচু নীরব মরুভূমিতে এসে পরেছি আমরা। আর এই মরুভূমির আশপাশ ঢেউহীন সমুদ্রের জল দিয়ে ঘেরা। আর খয়েরি কিছু এলোমেলো প্রাচীন পাহাড়। যেন একটানা অনেকবছর খাটুনির পর সব পাহাড়গুলি একসাথে উপদ্রবশূন্য বিশ্রাম নিতে এসেছেন এখানে। পালকিরা নির্ঘাত ভয় পেয়েছে। গত এক ঘণ্টায়ে, ভেড়া কিছু দেখতে পেলেও, মানুষ দেখা যায়নি একটিও। ঘড়িতে দুপুর বারোটা বেজেছে, কিন্তু বাইরে এখনও চলছে একটা অন্ধকার অন্ধকার ভাব। এমন জনমানবহীন প্রান্তরে তো কোনদিন আসা হয়নি আগে।

মানুষের অনাধিক্য তো আগেও দেখলাম স্কটল্যান্ডের অনেক জায়গায়ে। কিন্তু এমন নিথর একটি জায়গা বুঝি গত সাত-দশ দিনে আমাদের চোখে পড়েনি। এ যেন এক অন্য ঘুমের দেশ আর বহির্বিশ্বের সাথে আর আমাদের কোন যোগাযোগ আর নেই। তবে এটাই কি আসল পৃথিবীর রূপ? আমরা যেখানে বসবাস করি, সেটা কি তবে বিজ্ঞানের দাপটে কৃত্রিম বেশী? কোনো এক অজানা মহাসাগরের এক পরিত্যক্ত দ্বীপে কি এসে পরলাম আমরা রবিন্সন ক্রুসোর মতন? কোন একটা জায়গায়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, আবার কোন জায়গায় একদম খটখটে শুকনো। প্রবীণের বকবকানির পরে, এমন এক আকস্মিক নিস্তব্ধ অভিজ্ঞতা কিন্তু কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। বাসের বাকী সকলেই আমাদের মতন অবাক হয়ে দেখছে বাইরের দিকে। এমনকি প্রবীণও এখন চুপ। প্রবীণকে বললাম, “জানো প্রবীণ, রবীন্দ্রনাথ একটা গান লিখেছিলেন – “আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া”, দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমাকে না হয় একটু বাদে অনুবাদ করে বলে দিচ্ছি।”

দুধারে বিহ্বল হয়ে তাকাচ্ছি আর খালি মনে হচ্ছে, লোকালয় থেকে অনেক দুরে এসে বুঝি আমরা এখানে পথ হারিয়ে ফেললাম। এবারে একটা জায়গায়ে রায়ান একটু চওড়া রাস্তা পেয়ে, দাঁড় করালেন গাড়ী। যত দুরে এখান থেকে চোখ যাচ্ছে, একটা সমুদ্রের মতন সুবিশাল নীলবর্ণ লখ, আর আমরা তারই মাঝে একটা ডাঙ্গায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা! পাশেই একটা বড় ঝুপ্সি গাছ! যেন এক সৈনিক পাহারা দিচ্ছে তার অদূষিত দেশ আর এই মায়ালোকে এখুনি যেন একটা জীনপরী ওই গাছটার থেকে নেমে আসতে পারে। বাতাস এখানেও বইছে বেশ জোরে, অতর্কিতে রায়ান পিছন থেকে এসে বলল, ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাগণ, আপনাদের সকলকে স্বাগতম জানাই, আয়েল অফ স্কাই’তে। রায়ানের ভাষ্য শুনে, সকলেই কেমন একটা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে! আমি এরই মধ্যে শান্ত উদাসীন ভাবে অমিতকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাই, তুমি কি বাংলাদেশের কোন পল্লীগান জানো? দীনদুনিয়ার মালিক খোদার গান?”

************************************************************************************

৪২ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (চ)

আমাদের ছোটকন্যা অবশেষে ভারী মজা পেয়েছে। এবারে দিব্যি মুখ তুলে ইতিউতি চেয়ে দেখছে সে। তবে বেচারাকে তেমন দোষ দিয়েও লাভ নেই। টানা একঘণ্টা যাবত মাথার উপরে ধূসর আকাশ, টিপটিপ করে বৃষ্টি আর আশেপাশের সারিবাঁধা নির্জন নিরাকার পাহাড় দেখে, সে বুঝি ভেবে ফেলেছিল, এই প্রাগৈতিহাসিক দেশে আমরা এবারে একদম একাকী হয়ে পরলাম। শুধু সে কেন, প্রকৃতির এমন বিস্ময়কর শুনশান রূপ তো আগে কোনদিন আমাদের কারোরই চোখে পড়েনি, আর আগামী কোনদিন পরবে বলেও তো মনে হয়না। এইতো মিনিট কুড়ি আগে, যতদূর অবধি দৃষ্টি যাচ্ছিল সকলের, চারিপাশে একটা জনহীন অদ্ভুতুড়ে নির্জনতা। এমন নির্জনতায় ফটোগ্রাফ তোলা হয়ে গিয়েছে হয়ত রাশিরাশি, কিন্তু সব ছবিতেই প্রত্যেকের ভুরু ছিল কুঁচকনো। একটা যেন, কি-হয় কি-হয় গোছের আতঙ্কের প্রশ্নচিহ্ন পরিস্ফুট হচ্ছিল সকলের মুখে! ভয় করছিল বললে হয়ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, তবে কোথায় একটা যেন অজানা ত্রাস কাজ করছিল আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই। পুরী হোক বা দিঘা দার্জিলিং, প্রকৃতির সামনে এলেই দেখেছি আমার নিজের কল্পনা সামান্য অপরিমিত হয়ে ওঠে, একটু একাবেঁকা আর সে জিনিষ তো বাঙালীর মজ্জাগত, তবে আয়েল অফ স্কাই’য়ের এই নিষ্ঠুর সৌন্দর্য কিন্তু এককথায়ে ব্রহ্মতালু তটস্থ করে রেখেছিল আমাদের।

ক্যানাডিয়ান বা ফরাসিদের কথা জানিনা। পিছনের সীটে জোড়ায় জোড়ায় বসে, এই অভিনব দৃশ্যাবলী দেখে, তাঁরা কেমন বোধ করছেন, কিরকম তাঁদের অনুভূতি, অলৌকিক না মনোরম, সে আমার জানা নেই। আর এমনকি জানার আগ্রহও তেমন নেই! তবে এটুকু বলতে পারি, মাঝে পাঁচ মাইল মতন, একটা এক্কেবারে ফাঁকা জায়গা মতন এসেছিল। সামান্য অসমতল, খয়েরি মাটি! জায়গাটার কি একটা নামও বলেছিল রায়ান! সে জায়গায়ে না দেখা গিয়েছিল মানুষ, না ছিল একটাও ঘরবাড়ি। এমনকি টানা ওই উঁচুনিচু মাঠে দেখা যায়নি একটিও ভেড়া, না ছিল কোন বৃক্ষ, বা একফোঁটা জল। এমনকি দুরে তাকিয়ে পাহাড়ও দেখা যায়নি একটিও। ফাঁকা পথঘাট তো আগে দেখেছি অনেক। এই স্কটল্যান্ডেই দেখা গিয়েছে প্রচুর। এডিনব্র থাকার দ্বিতীয় দিনটা তো মনে করিয়ে দিয়েছিল আমাদের নব্বইয়ের দশকের বাংলা বন্ধের দুপুরগুলি। যেন এখুনি একটা বোমা পরেছে হাজরা মোড়ে। কিমবা এখনই বুঝি ইন্ডিয়া পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ শুরু হবে, সকলে তাই বাড়ী ঢুকে গিয়েছেন একটু আগেভাগে।

তবে ওই পাঁচ মাইলের গোটা দূরত্বটাই কেমন যেন মনে হচ্ছিল, শান্তির চেয়ে বুঝি যুদ্ধ অনেক ভালো। কিছু না হলেও দুটো মানুষের মুখ তো দেখা যাবে! আসল ব্যাপার হল, আমরা তো বেড়াতে এসেছি খোদ হকারদের দেশ থেকে। আর সে দেশ আবার একটা নতমুখী ধার্মিক দেশ! কিছু না হলেও, বেড়াতে গিয়ে যদি একটা জায়গায়ে গোটাচারেক চায়ের দোকান, প্লাস্টিকের খেলনাবাটি, সিঙ্গারা জিলিপি, মোষের শিঙের ছুরি আর কাঁদুনে চারটে বাচ্চা না রইল, তবে বাঙালীর আর বেরিয়ে মজা কোথায়? বাঁশের বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে লাইন দিয়ে ঢোকা, লাইন দিয়ে দর্শন, ধুলো ওড়ানো অটোরিকশা, ঘামের গন্ধ আর জনাকয়েক ভিখিরি, এই না থাকলে তো বেড়ানোটাই নিরর্থক হয়ে যাবে।

ছোটটির মুখ পুলকিত হওয়ার আর কোন কারণ নেই, সামনেই গোটা পাঁচেক বাড়ীঘর আর দু’টি খাবারের দোকান দেখা গিয়েছে। অবশ্য দুটি দোকানেরই ঝাঁপ ফেলা রয়েছে এই সময়ে। আর ছোটবোনের এ’হেন আবিষ্কারে পালকিও দেখলাম বেশ উৎফুল্ল আর সেই অজুহাতে তাঁদের মা’কেও দেখা গেলো বেশ উৎসাহ পেয়ে গিয়েছেন মহিলা। আমাকে কনুই দিয়ে একটা ছোট্ট ঠেলা মেরে বুঝিয়ে দিলেন ভয়ডর কেটে গিয়েছে তাঁর। কারণ আর কিছুই না, কারণ মানবসভ্যতার দেখা পাওয়া গিয়েছে। আমাকে অবশ্য নিয়ম করে অভদ্রের মতন চোখবন্ধ রাখতে হচ্ছে গত প্রায় একঘণ্টা যাবত। চকিতে প্রবীণ মর্ছালে’র সাথে চোখাচুখি হয়ে গেলেই লোকটা আবার চাবি দেওয়া পুতুলের মতন শুরু করে দিচ্ছেন। আমার আবার ধারণা ছিল, খারাপ ভালো যেকোনো সমস্যারই আমি সুরাহা করতে পারি অনায়াসেই! কিছুই নয়, কেবল সমস্যাটির মূলে পৌঁছতে হবে আর সেই মূল থেকে বের করে আনতে হবে তার সমাধান! এলিন ডনানেই ভেবে দেখেছিলাম প্রবীণের এই অতিভাষীতার মূলে হয়ত রয়েছে তাঁর একাকীত্ব! কারণ লোকটি তো বাঙালী বাচালদের মতন জ্যাঠা গোছের একদম নন, ফচকে ফাজিলও নন একেবারে, বরং আমার তো মনে হচ্ছিল বেশ শিশুসুলভ মানুষ এই প্রবীণ মর্ছালে। তাই ভেবেছিলাম, যদি একটু মাথা ঠাণ্ডা রেখে তার অযুত নিযুত গল্পের ভাণ্ডার একটু শুনে নেই, তাহলে ষ্টক ফুরোলেই, লোকটা নীরব হয়ে যাবে এমনিতেই! কিন্তু কোথায় কি? মানুষ তো ভাবে এক আর বিধাতা ব্যবস্থা করেন আরেক!

রায়ান জানাল আমরা এসে পড়েছি পোরট্রী। পোরট্রী আয়েল অফ স্কাইের সবচাইতে বড় শহর এবং বন্দরই শুধু নয়, এখানকার রাজধানীও। পোরট্রী ঢোকার আগে রায়ান শহরের হাজারো তথ্য পেশ করে যাচ্ছেন। গিন্নির মনোজ্ঞ মুখ দেখে মনে হচ্ছে একটা ছোট নোটবই হাতে পেলে খুশী হতেন। উদগ্রীব মুখে হাঁ করে রায়ানের ভাষ্য না গিলে সেটাকে নোট করে নিতে পারতেন। তবে এমন একটা জায়গায় এসে ইতিহাস ভুগোলের কচকচি যেন ভাল ঠেকছেনা আমার। আসলে খিদে পেয়ে গিয়েছে ভয়ঙ্কর রকমের। খাবারের কথা উঠতেই ছোটটি পালকিকে হুড়ো দিচ্ছে আধ মিনিট অন্তর অন্তর! এরই মধ্যে রায়ান আবার কোথায় একটা ছবি তুলতে দাঁড় করাবেন বলছেন, আমি অত্যন্ত বেরসিকের মতন রায়ানকে বললাম, এবারে বাসটা থামিয়ে কিছু একটা লাঞ্চ-টাঞ্চ খেয়ে নিলে হতনা? নাকটাক কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন ফরাসী নারীটি! ভারতের মানুষগুলো ভারী অসভ্য আর বড্ড ঠোঁটকাটা হয়! সারাদিন শুধু খাওয়া আর খাওয়া।

************************************************************************************

৪৩ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (ছ)

বলেন কি ভদ্রলোক? তিনি যে মহা গুলবাজ, সেটা তো আগে বোঝা যায়নি! এদিকে নিজের দোকানের নাম খুব ঘটা করে দিয়েছেন, ‘টেস্ট অফ ইন্ডিয়া’, আর মেনু কার্ডেও গোটগোট করে লিখে রেখেছেন, কলকাতা স্টাইল বিরিয়ানি, সার্ভড উইথ কিউকাম্বার রায়তা’ – সেভেন্টিন পয়েন্ট ফরটিনাইন পাউন্ডস! প্রথমেই ওইটে দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু ছোটটির করুণ মুখ দেখে আর মন খুলে বলে উঠতে পারিনি তখন! খিদে পেয়ে গিয়েছে বেচারার! নইলে কলকাতার বিরিয়ানি আবার সাতজন্মে কেউ কোনদিন রায়তা সহযোগে খায় নাকি? ভদ্রলোক কি জানেন, বিরিয়ানি ব্যাপারটা এখন কলকাতার একটা অপরিহার্য শিল্পের মধ্যে পড়ে? নব্বইয়ের দশকে সে ছিল কুটিরশিল্প, আর এখন গত বছর পনেরো হল প্রমোশন পেয়ে সে এখন পুরোপুরি সাবালক! পরিপূর্ন সর্বাগ্রবর্তী এক শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে? তবে ভাগ্যের বিষয়, আমাদের কন্যাদ্বয় এখনও অবধি কলকাতার সেই বিরিয়ানির স্বাদ ও সুবাস পেয়ে ওঠেনি তেমন ভাবে। আর আরও বাঁচোয়া এই যে, আমাদের চারজনেরই এমন হাঁউমাউঁ মার্কা বিপজ্জনক খিদে পেয়ে গিয়েছে যে কলকাতা না হয়ে এখন যদি কেউ বেজিঙ বা রিও-ডি-জেনেইরো’র বিরিয়ানিও এনে দিত, সে জিনিষও নিমেষে পেটে চালান করে দিতে অসুবিধা হতনা কিচ্ছু।

তবে প্রতিবাদ করে বা আঠেরো পাউন্ডের এই বিদঘুটে ‘কলকাতা স্টাইল’ বিরিয়ানি খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাভ নেই, কারণ দেখা গেলো লোকটা বাঙালী। আর শুধু বাঙালী নন, উনি নাকি খাঁটি ময়মনসিংহের লোক। আর সেই শুনেই তো গিন্নির চোখমুখ বদলে গিয়েছে সহসা। হাজার হোক তাঁর মায়ের দেশের মানুষ! আয়েল অফ স্কাইয়ের মতন নিঃসহায় একটা সর্বনেশে জায়গায়ে, কিছু না হোক, লোকটা করে তো খাচ্ছে। আর শুধু করে খাচ্ছে তাই নয়, সাথে করে তিনখানা রান্নার লোক নিয়ে এসেছেন তিনি। বাংলাদেশ থেকেই আর পোরট্রী’র এই রেস্তোরাঁতে তিনি ছাড়াও তাঁর সাথে অংশীদার হয়ে রয়েছেন তাঁর আরও দুই চাচাতো ভাই। গিন্নির কোমল মুখখানা দেখেই আর সাহস করে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করতে পারলামনা যে বাংলাদেশের লোক হয়ে, নিজের রেস্তোরাঁর নাম, ‘টেস্ট অফ ইন্ডিয়া’ রাখতে গেলেন কেন মশাই? নামের মধ্যে ইন্ডিয়া দেখলেই বুঝি যত পর্যটক বেড়াতে আসবেন, তারা সকলেই হামলে পরে আপনার দোকানে খেতে ঢুকবেন? তবে ময়মনসিংহের কলকাতা স্টাইল চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে যে আমাদের বেদম অভক্তি হয়েছে, ভদ্রলোক সেটা বুঝে গেলেন সহজেই! বেরোনোর আগে, বিলের উপরে একটা টেন পারসেন্ট ছাড় দিয়ে বললেন, ন্যান, একটা স্মল ডিসকাউন্ট দিলাম আমার বইনের জন্যে!

বাইরে একটা লালচে রঙের রোদ উঠেছে। বিকেল হয়ে গেলো নাকি? হেঁটে ফিরছি বাসস্টপের দিকে, বাথরুম খুঁজছেন গিন্নি, আর এমনই সময়ে হঠাৎ পথে প্রবীণের সঙ্গে দেখা! ইতিমধ্যে পা টলতে শুরু করেছে লোকটার। কথাবার্তা তাঁর সব জড়িয়ে গিয়েছে। নড়ারও শক্তি বুঝি নেই। প্রবীণের স্ত্রী এবারে বেশ চেঁচামেচি করছেন। প্রবীণ আমাকে বলল, দাদা আমার বহুত নেশা হয়ে গেছে! মনে মনে বললাম, সকাল নটা থেকে একের পর এক অতোগুলো হুইস্কি পান করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! নেশা না হয়ে যাবে কোথায়? আহা, লোকটা এখন আমার থেকে একটা সিগারেট ধার করে, না পারছেন দেশলাই দিয়ে জ্বালাতে, না সে ঠোঁটে ধরে রাখতে পারছে সিগারেটটা। বেচারাকে গাড়ীতে পৌঁছে দিতে গিয়ে আপাতত বদখৎ বিরিয়ানির সমস্ত শোক ভুলে যেতে হল।

পোরট্রী’র বাসস্ট্যান্ড’টা দেখতে অনেকটা ইনভার্ণেসের মতনই , বরং যেন একটু ছোট আর অনেকটা নিঝুম। রায়ান জানালেন এখনও আমাদের দেখার বাকী রয়ে গিয়েছে কুইলিন মাউন্টেনস, ওল্ড ম্যান অফ ষ্টর, কিল্ট রক ওয়াটারফল আর টটেরনিস পেনিন্সুলা! তাঁর মানে অন্ততপক্ষে আরও সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টার মামলা! ইনভার্ণেস ফিরতে ফিরতে বেজে যাবে প্রায় সাড়ে ছটা সাতটা। তারপরে আবার গুছনো আছে! আর আজকেই তো আমাদের শেষ! ব্যস্ত হয়ে কোত্থেকে যেন এইমাত্র ফিরে এসেছে অমিত। ময়মনসিংহের বিরিয়ানি নিয়ে তাঁর কাছে নালিশ জানাতেই ছেলেটি একগাল হেসে বলল, “ওইসব ছাড়েন আঙ্কেল, আমার ছবিগুলো দেখেন”। ঘুরে ঘুরে পোরট্রী শহরের খানকুড়ি বেশ ভালো ভালো ছবি তুলেছে সে। তার মধ্যে গোটা দশেক তো যে’কোন কম্পিটিশনে দেবার মতন। আমার এই সময়ে খুব হিংসে হল অমিতকে। নেহাত সংসার ভেলায় ভেসে পরেছি, নইলে তো বেরিয়ে পরা যেতো ওঁর মতই। গিন্নি আর দুই কন্যা বাথরুমের খোঁজে উধাও হয়েছেন কোথায় যেন! একটা দোকানের সামনে বসে অমিত আর আমি সিগারেট ধরালাম। দোকানটার বাইরে একটা ছোট্ট বেড়া দেওয়া রয়েছে আর তাতে অনেক’কটি ফুলের টব। নানা বর্ণের ফুল, তার মধ্যে গাঁদাও দেখা গেলো রয়েছে কিছু!

এত জোরালো বাতাস আর শীত লাগছে সকলেরই। তবুও অমিতের বুঝি এক্কেবারে শীতবোধ নেই! এদিকে তাঁর শিথিল শরীরটা নিয়ে প্রবীণ এখন একদমই ঘুমিয়ে কাদা। কিছুই তেমন দেখছেন না! বরং তাঁর স্ত্রী’কে দেখা গেলো অনেকটাই সক্রিয়! প্রবীণকে কি একটা যেন ট্যাবলেট গিলিয়ে দিলেন এইমাত্র। আমরা বোধহয় এখন ফেরার পথে, সাড়ে চারটে তো বাজল! রায়ান বলল ফেরার পথে একটা কফি পানের বিরতি দেবে পাঁচটা নাগাদ! সারাদিনের সারাংশ করে যেটুকু দেখলাম কিল্ট রকের ওদিকটা আর পোরট্রী’তে কিছু মানুষের দেখা মিললেও, আয়েল অফ স্কাইের বাকী জায়গাগুলি কিন্তু একদমই ফাঁকা ও জনমানবহীন! এমনকি এমন একটা গোটা দ্বীপ রায়ান দেখালো, যেখানে রয়েছে একটি মাত্র গ্রাম, আর তাতে একটি মাত্র বাড়ি আর জনসংখ্যা মাত্র দুই! কফিপানের আগে, এখন একটা জায়গায়ে ফটোগ্রাফের জন্য গাড়ী দাঁড় করিয়েছেন রায়ান। জায়গাটার নাম আমাদের জানা নেই! একটা অদ্ভুত রকম দৃশ্য চোখে পরে! একটা ফাঁকা মতন জায়গায়ে একটা বিশাল বড় সিংহদরজার সাইজের তোরণ। আর তার পাশে অনেকগুলি বটগাছ! দেখে কিরকম যেন মনে হচ্ছে এখুনি পাণ্ডবদের সকলকে দেখা যেতে পারে! অমিত বলল, আসেন আঙ্কেল, আপনেদের চারজনের একটা ফ্যামিলি ছবি নিয়ে নেই। কিন্তু আমাদের ছোটকন্যা গাড়ী থেকে আর নামবেনা। বেজায় শীত লেগেছে তার আর তার দেখাদেখি পালকিও দেখলাম আসতে নারাজ। পালকির আঙুল মটকানো দেখে খুব ভালই বোঝা যাচ্ছে, সে এখন বেশ উদাস, দেশের জন্য বুঝি মন কেমন করছে তার! একটা দমকা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে জানিয়ে দিলো আমাদের ছুটি এখানেই শেষ। এখনও হয়ত অনেক কিছুই অচেনা রয়ে গেলো, তবু একদিন না একদিন তো ফিরতে হয়ই সকলকে! বাইরে বৃষ্টি নেমেছে আবার।

************************************************************************************

৪৪ স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (জ)

ফোনে আনানো হয়েছিল ডিনার আর তারপরে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছি। এই সময়টা এখন আমার কেবল একলা ভাবার সময়! সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি নেমে গিয়েছে, ঘন কালো ছায়া নেমে এসেছে নির্জন ইনভার্ণেসের বুকে। আকাশে কিছু বিক্ষিপ্ত নক্ষত্র দেখা গেলেও, বর্ষাভাবটা কিন্তু পুরো কাটেনি এখনও। নিরিবিলি ড্রামোসি হোটেলের কিছুটা দূরে কয়েকটা গাছের মাথায় ধোঁয়া-ধোঁয়া খানিক অগভীর কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। বাইরের গাড়ীবারান্দার হলুদ আলোটার চারপাশে কয়েকটা রাতপোকার উপদ্রব শুরু হল এইমাত্র। পোকাদের লম্ফঝম্প আর এই গাছগুলো ছাড়া জ্যান্ত প্রাণের সাড়া নেই এখানে। এমনই একটা উপযুক্ত সময়ে ঘরে ফেরার প্রবল ইচ্ছেটা কিন্তু ভীষণ ভাল। ক্ষ্যাপা মনটা কেমন যেন শান্ত ভোলা মন হয়ে যায়। মাত্র দশ এগারো দিন বিলেতে কাটিয়েই যে মন আমাদের হাঁপিয়ে উঠেছে, এ কথা হয়ত বলা যাবেনা কোনমতেই, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, মাংশপেশীগুলো বড্ড ঠান্ডা মেরে গিয়েছে এই ক’দিন টানা ঘুরে বেরিয়ে। আমার ওই কলেরা ম্যালেরিয়ার ভিড়ভাট্টার দেশটার কথা মনে পড়ে, এখন মনটা একটু হু-হু করছে বৈকি! গত ক’দিনে তো একবারও মনে আসেনি, হঠাৎ আজ এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কেন, কোথাকার মানুষ, কোন এক অজ্ঞাত জায়গায়ে পরে রয়েছি আমি?

ভাবতে ভাবতে গলা ব্যাথা করে ওঠে। আগে কি জানতাম কোনদিন, এত ভালবাসি আমার দরিদ্র ভারতবর্ষকে? কোনদিন তো কাউকে তেমনভাবে বলিনি এ কথা। বড় কষ্ট হয়, ভীষণ মায়া হয় আমার সরল গরীব দেশটার কথা ভেবে। অফিসপাড়ার যে মুসলিম যুবকটার থেকে রোজ বিকেলে এক পেয়ালা করে চা পান করি, চায়ে আমি চিনি নেই’না বলে, সেই ব্যাটা আমার থেকে সাতটাকার বদলে ছয় করে নেয়। প্রতিবারই মনে হয়, একটা টাকায় কি এমন হাতিঘোড়া আসে যায়? মাসে কুড়িদিনের জন্য তো মাত্র কুড়িটা টাকা। বলেছিলাম কয়েকবার ছেলেটিকে, কিন্তু ফ্যালফ্যাল করে তাকায় সে, সামান্য হেসে আবার চা ছাঁকায় মন দেয়। আমাকে বলে, নেহি সাব্! বিনা শক্কর’কা রেট তো মেরা ওহি হ্যাঁয়। আপকো উতনাহি দেনেকা! জাদা পয়সা লেকে ম্যায় করেগা কেয়া? যেখানে দোকান বসাতে সরকারের পেয়াদাকে সেলামী গুনতে হয় বেশ কিছু টাকা, সেখানেই একটাকা একটাকা করে কত হয়ে যায় তার লোকসান! সারল্য বাড়িয়েছে দারিদ্র নাকি দারিদ্রই বুঝি সারল্য বাড়িয়েছে ভারতবর্ষের?

রাত মাত্র পৌনে এগারোটা বেজেছে এখন, কিন্তু এমন বেখাপ্পা রকমের শুনশান হয়ে গিয়েছে ড্রামোসি হোটেলটা, আমার গা ছমছম করে ওঠে সামান্য। ঘরে ফিরে দেখা গেলো, গিন্নি এখনও জেগে। অতি যত্ন সহকারে তাঁর বান্ধবীদের গিফট গুছোনো চলছে। নামে নামে ছোট খামে বা প্লাস্টিকের ব্যাগে জিনিষ ঢোকাচ্ছেন তিনি! গিফট বলতে তো ওই ফ্রিজে লাগানোর চুম্বক, গোলগলা সস্তার গেঞ্জি আর ছোটোখাটো কয়েকটা স্মারক গোছের টুকটাক। ইতিমধ্যে পালকি তার বোনকে নিয়ে চলে গিয়েছে পাশের ঘরে। দুই বোনই এখন ঘুমিয়ে কাদা! অনেককাল পরে এমন একটা নিবিড় রাত দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে আমাদের। বারোটা তো বাজেনি এখনও। গিন্নিকে শুধোলাম, কি গো একটু হোটেলের বাইরেটা পায়চারি করে আসবে নাকি? আজকেই তো বেড়ানোর শেষ রাত! কিছু না হলেও কত্তাগিন্নি মিলে ইনভার্ণেসের অস্পষ্ট আকাশটা একটু দেখে আসতে পারতাম। কিছু মেঘ গিলে নিতে পারতাম নিঃশ্বাস করে। ফ্রিজে লাগানোর স্মারক না থাকলেও, সেই মেঘটুকুনই না হয় ফুসফুসে বয়ে বেড়াতাম বাকীটা জীবন! গিন্নি আমার সব কথাই প্রথমে অবিশ্বাস করেন আর এবারেও তিনি রাজী হলেননা! বেরসিকের মতন জানালেন, রাতের পোষাক পরে নিয়েছেন, এর মধ্যে আবার সুটকেশ খোলাবন্ধ, সে ফালতু ঝামেলা আর পোষাবেনা তাঁর। তবে ভালই বোঝা গেলো স্বামীর সাথে এই গহিন রাতে ইনভার্ণেসের পেত্নী বা অলৌকিক অস্তিত্বের সান্নিধ্য পাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই তাঁর। এই শীতে তবে রাতে আমার ঘুম এসেছিল অনেক দেরীতে। জানালা খুলে একটু শেষ আলাপ সেরে নেওয়া হচ্ছিল অচেনা থেকে যাওয়া ইনভার্ণেস শহরের সঙ্গে। মালকোষ রাগের আলাপ! মনকে আর্দ্র করে তুলতে মালকোষের জুড়ি নেই কিনা!

পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টা থেকেই চরম ব্যস্ততা। সুটকেশ টুটকেস বাঁধাছাদা সব শেষ। দশটায়ে ছাড়বে আমাদের বিমান। জন’ও তাঁর ট্যাক্সি নিয়ে সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছে ড্রামোসি হোটেলের চত্বরে। এখান থেকে সোজা ইনভার্ণেস এয়ারপোর্ট। ড্রামোসি থেকে মিনিট পঁচিশেক লাগবে আর তারপরে ‘ফ্লাইবি’ নামের এক ডোমেস্টিক বিমানে চেপে, আমাদের পরের গন্তব্য বার্মিংহ্যাম। তবে সেখানে পৌঁছে শহরের বাইরে বেরোনো সম্ভব হবেনা হয়ত। তবে সুযোগ পেলে ক্যাডবেরি কোম্পানির কারখানাটা দেখে আসা যাবে টুক করে! বার্মিংহ্যামে রয়েছে পাঁচঘন্টা মতন অপেক্ষা, আর তারপরে সেখান থেকে এমিরেটসের বিমানে পৌঁছনো হবে দুবাই! দুবাইয়ের বিমানবন্দরে টানা আটঘন্টা অপেক্ষার পর অবশেষে পাওয়া যাবে মুম্বইয়ের বিমান। হিসেব মতন বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে আগামীকাল রাত দশটা এগারোটা তো বাজবেই।

এখন বার্মিংহ্যামের বিমানবন্দরে বসে খুব আয়েস করে এন্তার খাওয়াদাওয়া করা হচ্ছে! শেষ বারের মতন বিলিতি ফিস অ্যান্ড চিপস তো আছেই, তার সাথে গিন্নি আজ মন খুলে না খুশী অর্ডার করেছেন। যা যা বিলিতি খাবার বাদ পড়ে গেছিল, সবই আজ চেখে দেখা হচ্ছে অল্প অল্প করে! এদিকে আমাদের ছোটটির ধারণা, পাউন্ড শিলিং পেন্স তো আর ভারতবর্ষে বা দুবাই’য়ে চলবেনা। সুতরাং আমাদের ট্র্যাভেল কার্ডে বেঁচে থাকা উনআশি পাউন্ড আজকেই, এই মুহূর্তেই আর এই বার্মিংহ্যাম বিমানবন্দরেই সব নিঃশেষ করে ফিরতে হবে! তাই বিমানবন্দরে সস্তার হরেক জিনিষ কিনে নিতে চাইছে সে! যেন রথের মেলা! তাতে কান খোঁচাবার ইয়ারবাড, ছোট খেলনা পুতুল, বা হরেকরকমের চুইংগাম রয়েছে! তবে এবার কাজের কথা পাড়লেন গিন্নি! মুম্বইয়ে ওই রাত এগারোটায়ে নেমে কি আমরা সোজা কোনো রেঁস্তোরায় ডিনার সেরে বাড়ী ঢুকব নাকি বাড়ীতেই কিছু রান্না করে রাখতে বলা উচিৎ কাজের মেয়েটিকে? সে প্রশ্ন শুনেই খুব জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে আমাদের ছোটকন্যা জানালো, না না তার কোন প্রয়োজন নেই! রেঁস্তোরা ফেস্তোরা অনেক হয়েছে এই কদিনে। বাড়ি ফিরে আমরা খাব, স্রেফ ভাত, পাতলা মাছের ঝোল, আর নরম নরম আলুভাজা! বুঝলাম ঠিক সময়েই বাড়ি ফিরতে চলেছি আমরা।

এই গল্পের উপসংহার উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। এই তো ঘন্টাতিনেক হল দুবাই থেকে মুম্বইয়ের বিমানে চেপেছি আমরা। বিমান নামতে শুরু করেছে। সীট বেল্ট সাইন অন করে ক্যাপ্টেন জানালেন, জমিয়ে বর্ষা নেমেছে মুম্বইয়ে। এদিকে ওঁসব কথা আর মাথায়ে ঢুকছেনা কারোরই! বড্ড বেশী রকম পরিশ্রান্ত আমরা সকলেই। কিছু না হলেও প্রায় বারো তেরো ঘন্টার বিমানসফর আর পনেরো কুড়ি ঘন্টার উপরে অপেক্ষা, হাঁটা চলা, ফিরতি ইমিগ্রেসন, সব মিলিয়ে বেশ ভালোরকম কাবু করে ফেলেছে আমাদের সকলকেই। বিলেত দেশটাকে তো অনেক রকম রূপেই দেখা হল। কোথাও বহুতল বাড়ি, কোথাও ঐতিহাসিক প্রাসাদ, ঝকঝকে চওড়া রাস্তা বা সুশৃঙ্খল ট্রাফিক! মাঝে মাঝেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছি সুন্দরী নারীর মতন প্রকৃতি দেখে, আবিষ্ট অরণ্য, বা লখ দেখে। আমরা কত্তা গিন্নি তো বেশ সুখানুভূতি নিয়েই ফিরছি! বিমান থেকে এবারে নিচে দেখা যাচ্ছে মুম্বই! খুব ঘন মেঘ আছে। মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছে আমার শহর! বিমানে বসেই, পালকিকে এবারে তাঁর মা মোক্ষম শেষ প্রশ্নটা করেই বসলেন! তা কেমন লাগলো বলো তোমার লন্ডন স্কটল্যান্ডে ছুটি কাটানোটা? সবকিছু ঠিকঠাক? তোমাদের মনমতন হয়েছে? খানিকটা নির্বাক চোখে দেখছে সে তার মায়ের দিকে চেয়ে, মুখে কথা নেই এখনও! ওই পুনের মতনই রয়ে গেলো বুঝি সে! খানিক বাদে কিচ্ছু না বলে এবার তার মা’কে জড়িয়ে ধরল পালকি ! দেখাদেখি ছোটটি আলিঙ্গন করেছে অন্যদিক থেকে! স্যান্টাক্রুজ ইস্টের বস্তিগুলো পেরিয়ে আমাদের বিমান অবতরণ করছে মুম্বইয়ে। এমন মধুর দৃশ্য তো আমি গোটা বিলেতে দেখতে পাইনি কোথাও। আমি চোখ অবনত করে বুক ভরে একটা বড় শ্বাস নিয়ে নিলাম।

শেষ

************************************************************************************

Leave a comment