ফোনে আনানো হয়েছিল ডিনার আর তারপরে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছি। এই সময়টা এখন আমার কেবল একলা ভাবার সময়! সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি নেমে গিয়েছে, ঘন কালো ছায়া নেমে এসেছে নির্জন ইনভার্ণেসের বুকে। আকাশে কিছু বিক্ষিপ্ত নক্ষত্র দেখা গেলেও, বর্ষাভাবটা কিন্তু পুরো কাটেনি এখনও। নিরিবিলি ড্রামোসি হোটেলের কিছুটা দূরে কয়েকটা গাছের মাথায় ধোঁয়া-ধোঁয়া খানিক অগভীর কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। বাইরের গাড়ীবারান্দার হলুদ আলোটার চারপাশে কয়েকটা রাতপোকার উপদ্রব শুরু হয়েছে। পোকাদের লম্ফঝম্প আর এই গাছগুলি ছাড়া জ্যান্ত প্রাণের সাড়া নেই এখানে। এমনই একটা উপযুক্ত সময়ে ঘরে ফেরার প্রবল ইচ্ছেটা কিন্তু ভীষণ ভাল। ক্ষ্যাপা মনটা কেমন যেন শান্ত ভোলা মন হয়ে যায়। মাত্র দশ এগারো দিন বিলেতে কাটিয়েই যে মন আমাদের হাঁপিয়ে উঠেছে, এ কথা হয়ত বলা যাবেনা কোনমতেই, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, মাংশপেশীগুলো বড্ড ঠান্ডা মেরে গিয়েছে এই ক’দিন টানা ঘুরে বেরিয়ে। আমার ওই কলেরা ম্যালেরিয়ার ভিড়ভাট্টার দেশটার কথা মনে পড়ে, এখন মনটা একটু হু-হু করছে বৈকি! গত ক’দিনে তো একবারও মনে আসেনি, হঠাৎ আজ এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কেন, কোথাকার মানুষ, কোন এক অজ্ঞাত জায়গায়ে পরে রয়েছি আমি?
আগে কি জানতাম কোনদিন, এত ভালবাসি দরিদ্র ভারতবর্ষকে? কোনদিন তো কাউকে তেমনভাবে বলিনি এ কথা। বড় কষ্ট হয়, ভীষণ মায়া হয় আমার সরল গরীব দেশটার কথা ভেবে। অফিসপাড়ার যে মুসলিম যুবকটির থেকে রোজ বিকেলে এক পেয়ালা করে চা পান করি, চায়ে আমি চিনি নেই’না বলে, সেই ব্যাটা আমার থেকে সাতটাকার বদলে ছয় করে নেয়। প্রতিবারই মনে হয়, একটা টাকায় কি এমন হাতিঘোড়া আসে যায়? মাসে কুড়িদিনের জন্য তো মাত্র কুড়িটা টাকা। বলেছিলাম কয়েকবার ছেলেটিকে, কিন্তু ফ্যালফ্যাল করে তাকায় সে, সামান্য হেসে আবার চা ছাঁকায় মন দেয়। আমাকে বলে, নেহি সাব্! বিনা শক্কর’কা রেট তো মেরা ওহি হ্যাঁয়। আপকো উতনাহি দেনেকা! জাদা পয়সা লেকে ম্যায় করেগা কেয়া? যেখানে দোকান বসাতে সরকারের পেয়াদাকে সেলামী গুনতে হয় বেশ কিছু টাকা, সেখানেই একটাকা একটাকা করে কত হয়ে যায় তার লোকসান! সারল্য বাড়িয়েছে দারিদ্র নাকি দারিদ্রই বুঝি সারল্য বাড়িয়েছে ভারতবর্ষের?
রাত মাত্র পৌনে এগারোটা বেজেছে এখন, কিন্তু এমন বেখাপ্পা রকমের শুনশান হয়ে গিয়েছে ড্রামোসি হোটেলটা, আমার গা ছমছম করে ওঠে সামান্য। ঘরে ফিরে দেখা গেলো, গিন্নি এখনও জেগে। অতি যত্ন সহকারে তাঁর বান্ধবীদের গিফট গুছোনো চলছে। নামে নামে ছোট খামে বা প্লাস্টিকের ব্যাগে জিনিষ ঢোকাচ্ছেন তিনি! গিফট বলতে তো ওই ফ্রিজে লাগানোর চুম্বক, গোলগলা সস্তার গেঞ্জি আর ছোটোখাটো কয়েকটা স্মারক গোছের টুকটাক। ইতিমধ্যে পালকি তার বোনকে নিয়ে চলে গিয়েছে পাশের ঘরে। দুই বোনই এখন ঘুমিয়ে কাদা! অনেককাল পরে এমন একটা নিবিড় রাত দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে আমাদের। বারোটা তো বাজেনি এখনও। গিন্নিকে শুধোলাম, কি গো একটু হোটেলের বাইরেটা পায়চারি করে আসবে নাকি? আজকেই তো বেড়ানোর শেষ রাত! কিছু না হলেও কত্তাগিন্নি মিলে ইনভার্ণেসের অস্পষ্ট আকাশটা একটু দেখে আসতে পারতাম। কিছু মেঘ গিলে নিতে পারতাম নিঃশ্বাস করে। ফ্রিজে লাগানোর স্মারক না থাকলেও, সেই মেঘটুকুনই না হয় ফুসফুসে বয়ে বেড়াতাম বাকীটা জীবন! গিন্নি আমার সব কথাই প্রথমে অবিশ্বাস করেন আর এবারেও তিনি রাজী হলেননা! বেরসিকের মতন জানালেন, রাতের পোষাক পরে নিয়েছেন, এর মধ্যে আবার সুটকেশ খোলাবন্ধ, সে ফালতু ঝামেলা আর পোষাবেনা তাঁর। তবে ভালই বোঝা গেলো স্বামীর সাথে এই গহিন রাতে ইনভার্ণেসের পেত্নী বা অলৌকিক অস্তিত্বের সান্নিধ্য পাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই তাঁর। এই শীতে তবে রাতে আমার ঘুম এসেছিল অনেক দেরীতে। জানালা খুলে একটু শেষ আলাপ সেরে নেওয়া হচ্ছিল অচেনা থেকে যাওয়া ইনভার্ণেস শহরের সঙ্গে। মালকোষ রাগের আলাপ! মনকে আর্দ্র করে তুলতে মালকোষের জুড়ি নেই কিনা!
পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টা থেকেই চরম ব্যস্ততা। সুটকেশ টুটকেস বাঁধাছাদা সব শেষ। দশটায়ে ছাড়বে আমাদের বিমান। জন’ও তাঁর ট্যাক্সি নিয়ে সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছেন ড্রামোসি হোটেলের চত্বরে। এখান থেকে সোজা ইনভার্ণেস এয়ারপোর্ট। ড্রামোসি থেকে মিনিট পঁচিশেক লাগবে আর তারপরে ‘ফ্লাইবি’ নামের এক ডোমেস্টিক বিমানে চেপে, আমাদের পরের গন্তব্য বার্মিংহ্যাম। তবে সেখানে পৌঁছে শহরের বাইরে বেরোনো সম্ভব হবেনা হয়ত। তবে সুযোগ পেলে ক্যাডবেরি কোম্পানির কারখানাটা দেখে আসা যাবে টুক করে! বার্মিংহ্যামে রয়েছে পাঁচঘন্টা মতন অপেক্ষা, আর তারপরে সেখান থেকে এমিরেটসের বিমানে পৌঁছনো হবে দুবাই! দুবাইয়ের বিমানবন্দরে টানা আটঘন্টা অপেক্ষার পর অবশেষে পাওয়া যাবে মুম্বইয়ের বিমান। হিসেব মতন বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে আগামীকাল রাত দশটা এগারোটা তো বাজবেই।
বার্মিংহ্যামের বিমানবন্দরে বসে খুব আয়েস করে এন্তার খাওয়াদাওয়া করা হচ্ছে! ফিস অ্যান্ড চিপস তো আছেই, তার সাথে গিন্নি আজ মন খুলে অর্ডার করেছেন। যা যা বিলিতি খাবার বাদ পড়ে গেছিল, সবই চেখে দেখা হচ্ছে অল্প অল্প করে! এদিকে আমাদের ছোটটির ধারণা, পাউন্ড শিলিং পেন্স তো আর ভারতবর্ষে বা দুবাই’য়ে চলবেনা। সুতরাং আমাদের ট্র্যাভেল কার্ডে বেঁচে থাকা উনআশি পাউন্ড আজকেই, এই মুহূর্তেই আর এই বারমিংহ্যাম বিমানবন্দরেই সব নিঃশেষ করে ফিরতে হবে! তাই বিমানবন্দরে সস্তার হরেক জিনিষ কিনে নিতে চাইছে সে! যেন রথের মেলা! তাতে কান খোঁচাবার ইয়ারবাড, ছোট খেলনা পুতুল, বা হরেকরকমের চুইংগাম রয়েছে! তবে এবার কাজের কথা পাড়লেন গিন্নি! মুম্বইয়ে ওই রাত এগারোটায়ে নেমে কি আমরা সোজা কোনো রেঁস্তোরায় ডিনার সেরে বাড়ী ঢুকব নাকি বাড়ীতেই কিছু রান্না করে রাখতে বলা উচিৎ কাজের মেয়েটিকে? সে প্রশ্ন শুনেই খুব জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে আমাদের ছোটকন্যা জানালো, না না তার কোন প্রয়োজন নেই! রেঁস্তোরা ফেস্তোরা অনেক হয়েছে এই কদিনে। বাড়ি ফিরে আমরা খাব, স্রেফ ভাত, পাতলা মাছের ঝোল, আর নরম নরম আলুভাজা! বুঝলাম ঠিক সময়েই বাড়ি ফিরতে চলেছি আমরা।
এই গল্পের উপসংহার উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। ঘন্টাতিনেক হল দুবাই থেকে মুম্বইয়ের বিমানে চেপেছি আমরা। বিমান নামতে শুরু করেছে। সীট বেল্ট সাইন অন করে ক্যাপ্টেন জানালেন, জমিয়ে বর্ষা নেমেছে হচ্ছে মুম্বইয়ে। এদিকে ওঁসব কথা আর মাথায়ে ঢুকছেনা কারোরই! বড্ড বেশী রকম পরিশ্রান্ত আমরা সকলেই। কিছু না হলেও প্রায় বারো তেরো ঘন্টার বিমানসফর আর পনেরো কুড়ি ঘন্টার উপরে অপেক্ষা, হাঁটা চলা, ফিরতি ইমিগ্রেসন, সব মিলিয়ে বেশ ভালোরকম কাবু করে ফেলেছে আমাদের সকলকেই। বিলেত দেশটাকে তো অনেক রকম রূপেই দেখা হল। কোথাও বহুতল বাড়ি, কোথাও ঐতিহাসিক প্রাসাদ, ঝকঝকে চওড়া রাস্তা বা সুশৃঙ্খল ট্রাফিক! মাঝে মাঝেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছি সুন্দরী নারীর মতন প্রকৃতি দেখে, আবিষ্ট অরণ্য, বা লখ দেখে। আমরা কত্তা গিন্নি তো বেশ সুখানুভূতি নিয়েই ফিরছি! বিমান থেকে এবারে নিচে দেখা যাচ্ছে মুম্বই! খুব ঘন মেঘ আছে। মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছে আমার শহর! বিমানে বসেই, পালকিকে এবারে তাঁর মা মোক্ষম শেষ প্রশ্নটা করেই বসলেন! তা কেমন লাগলো বলো তোমার লন্ডন স্কটল্যান্ডে ছুটি কাটানোটা? সবকিছু ঠিকঠাক? তোমাদের মনমতন হয়েছে? খানিকটা নির্বাক চোখে দেখছে সে তার মায়ের দিকে চেয়ে, মুখে কথা নেই এখনও! পুনের মতনই রয়ে গেলো বুঝি সে! খানিক বাদে তার মা’কে জড়িয়ে ধরল পালকি ! ছোটটি আলিঙ্গন করেছে অন্যদিক থেকে! স্যান্টাক্রুজ ইস্টের বস্তিখানা পেরিয়ে আমাদের বিমান অবতরণ করছে মুম্বইয়ে। এমন মধুর দৃশ্য তো আমি গোটা বিলেতে দেখতে পাইনি কোথাও। আমি চোখ অবনত করে বুক ভরে একটা বড় শ্বাস নিয়ে নিলাম।
শেষ…
Leave a comment