হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৪৩ : স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (৭) · জুন ২০১৯

বলেন কি ভদ্রলোক? তিনি যে মহা গুলবাজ, সেটা তো আগে বোঝা যায়নি! এদিকে নিজের দোকানের নাম খুব ঘটা করে দিয়েছেন, ‘টেস্ট অফ ইন্ডিয়া’, আর মেনু কার্ডেও গোটগোট করে লিখে রেখেছেন, কলকাতা স্টাইল বিরিয়ানি, সার্ভড উইথ কিউকাম্বার রায়তা’ – সেভেন্টিন পয়েন্ট ফরটিনাইন পাউন্ডস! প্রথমেই ওইটে দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু ছোটটির করুণ মুখ দেখে আর মন খুলে বলে উঠতে পারিনি তখন! খিদে পেয়ে গিয়েছে বেচারার! নইলে কলকাতার বিরিয়ানি আবার সাতজন্মে কেউ কোনদিন রায়তা সহযোগে খায় নাকি? ভদ্রলোক কি জানেন,বিরিয়ানি ব্যাপারটা এখন কলকাতার একটা অপরিহার্য শিল্পের মধ্যে পরে? নব্বইয়ের দশকে সে ছিল কুটিরশিল্প, আর এখন গত বছর পনেরো হল প্রমোশন পেয়ে সে এখন পুরোপুরি সাবালক! পরিপূর্ন সর্বাগ্রবর্তী এক শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে? তবে ভাগ্যের বিষয়, আমাদের কন্যাদ্বয় এখনও অবধি কলকাতার সেই বিরিয়ানির স্বাদ ও সুবাস পেয়ে ওঠেনি তেমন ভাবে। আর আরও বাঁচোয়া এই যে, আমাদের চারজনেরই এমন হাঁউমাউঁ মার্কা বিপজ্জনক খিদে পেয়ে গিয়েছে যে কলকাতা না হয়ে এখন যদি কেউ বেজিঙ বা রিও-ডি-জেনেইরো’র বিরিয়ানিও এনে দিত, সে জিনিষও নিমেষে পেটে চালান করে দিতে অসুবিধা হতনা কিচ্ছু।

তবে প্রতিবাদ করে বা আঠেরো পাউন্ডের এই বিদঘুটে ‘কলকাতা স্টাইল’ বিরিয়ানি খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাভ নেই, কারণ দেখা গেলো লোকটা বাঙালী। আর শুধু বাঙালী নন, উনি নাকি খাঁটি ময়মনসিংহের লোক। আর সেই শুনেই তো গিন্নির চোখমুখ বদলে গিয়েছে সহসা। হাজার হোক তাঁর মায়ের দেশের মানুষ! আয়েল অফ স্কাইয়ের মতন নিঃসহায় একটা সর্বনেশে জায়গায়ে, কিছু না হোক, লোকটা করে তো খাচ্ছে। আর শুধু করে খাচ্ছে তাই নয়, সাথে করে তিনখানা রান্নার লোক নিয়ে এসেছেন তিনি। বাংলাদেশ থেকেই আর পোরট্রী’র এই রেস্তোরাঁতে তিনি ছাড়াও তাঁর সাথে অংশীদার হয়ে রয়েছেন তাঁর আরও দুই চাচাতো ভাই। গিন্নির কোমল মুখখানা দেখেই আর সাহস করে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করতে পারলামনা যে বাংলাদেশের লোক হয়ে, নিজের রেস্তোরাঁর নাম, ‘টেস্ট অফ ইন্ডিয়া’ রাখতে গেলেন কেন মশাই? নামের মধ্যে ইন্ডিয়া দেখলেই বুঝি যত পর্যটক বেড়াতে আসবেন, তারা সকলেই হামলে পরে আপনার দোকানে খেতে ঢুকবেন? তবে ময়মনসিংহের কলকাতা স্টাইল চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে যে আমাদের বেদম অভক্তি হয়েছে, ভদ্রলোক সেটা বুঝে গেলেন সহজেই! বেরোনোর আগে, বিলের উপরে একটা টেন পারসেন্ট ছাড় দিয়ে বললেন, নেন, একটা স্মল ডিসকাউন্ট দিলাম আমার বইনের জন্যে!

বাইরে একটা লালচে রঙের রোদ উঠেছে। বিকেল হয়ে গেলো নাকি? হেঁটে ফিরছি বাসস্টপের দিকে, বাথরুম খুঁজছেন গিন্নি, আর এমনই সময়ে হঠাৎ পথে প্রবীণের সঙ্গে দেখা! ইতিমধ্যে পা টলতে শুরু করেছে লোকটার। কথাবার্তা তাঁর সব জড়িয়ে গিয়েছে। নড়ারও শক্তি বুঝি নেই।  প্রবীণের স্ত্রী বেশ চেঁচামেচি করছেন। প্রবীণ আমাকে বলল, দাদা আমার ভীষণ নেশা হয়ে গেছে! মনে মনে বললাম, সকাল নটা থেকে অতোগুলো হুইস্কি পান করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! নেশা না হয়ে যাবে কোথায়? আহা, লোকটা এখন আমার থেকে একটা সিগারেট ধার করে, না পারছেন দেশলাই দিয়ে জ্বালাতে, না সে ঠোঁটে ধরে রাখতে পারছে সিগারেটটা। বেচারাকে গাড়ীতে পৌঁছে দিতে গিয়ে আপাতত বদখৎ বিরিয়ানির সমস্ত শোক ভুলে যেতে হল। পোরট্রী’র বাসস্ট্যান্ড’টা দেখতে অনেকটা ইনভার্ণেসের মতনই , বরং যেন একটু ছোট আর অনেকটা নিঝুম। রায়ান জানালেন এখনও আমাদের দেখার বাকী রয়ে গিয়েছে কুইলিন মাউন্টেনস, ওল্ড ম্যান অফ ষ্টর,  কিল্ট রক ওয়াটারফল আর টটেরনিস পেনিন্সুলা! তাঁর মানে অন্ততপক্ষে আরও সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টার মামলা! ইনভার্ণেস ফিরতে ফিরতে বেজে যাবে প্রায় সাড়ে ছটা সাতটা। তারপরে আবার গুছনো আছে! আর আজকেই তো আমাদের শেষ! ব্যস্ত হয়ে কোত্থেকে যেন এইমাত্র ফিরে এসেছে অমিত। ময়মনসিংহের বিরিয়ানি নিয়ে তাঁর কাছে নালিশ জানাতেই ছেলেটি একগাল হেসে বলল, “ওইসব ছাড়েন আঙ্কেল, আমার ছবিগুলো দেখেন”। ঘুরে ঘুরে পোরট্রী শহরের খানকুড়ি বেশ ভালো ভালো ছবি তুলেছে সে। তার মধ্যে গোটা দশেক তো যে’কোন কম্পিটিশনে দেবার মতন। আমার এই সময়ে খুব হিংসে হল অমিতকে। নেহাত সংসার ভেলায় ভেসে পরেছি, নইলে তো বেরিয়ে পরা যেতো ওঁর মতই। গিন্নি আর দুই কন্যা বাথরুমের খোঁজে উধাও হয়েছেন কোথায় যেন! একটা দোকানের সামনে বসে অমিত আর আমি সিগারেট ধরালাম। দোকানটার বাইরে একটা ছোট্ট বেড়া দেওয়া রয়েছে আর তাতে অনেক’কটি ফুলের টব। নানা বর্ণের ফুল, তার মধ্যে গাঁদাও দেখা গেলো রয়েছে কিছু!

এত জোরালো বাতাস আর শীত লাগছে সকলেরই। তবুও অমিতের বুঝি এক্কেবারে শীতবোধ নেই! এদিকে তাঁর শিথিল শরীরটা নিয়ে প্রবীণ এখন একদমই ঘুমিয়ে কাদা। কিছুই তেমন দেখছেন না! বরং তাঁর স্ত্রী’কে দেখা গেলো অনেকটাই সক্রিয়! প্রবীণকে কি একটা যেন ট্যাবলেট গিলিয়ে দিলেন এইমাত্র। আমরা বোধহয় এখন ফেরার পথে, সাড়ে চারটে তো বাজল! রায়ান বললেন ফেরার পথে একটা কফি পানের বিরতি দেবেন পাঁচটা নাগাদ! সারাদিনের সারাংশ করে যেটুকু দেখলাম কিল্ট রকের ওদিকটা আর পোরট্রী’তে কিছু মানুষের দেখা মিললেও, আয়েল অফ স্কাইের বাকী জায়গাগুলি কিন্তু একদমই ফাঁকা ও জনমানবহীন! এমনকি এমন একটা গোটা দ্বীপ রায়ান দেখালেন, যেখানে রয়েছে একটি মাত্র গ্রাম, আর তাতে একটি মাত্র বাড়ি আর জনসংখ্যা মাত্র দুই! কফিপানের আগে, এখন একটা জায়গায়ে ফটোগ্রাফের জন্য গাড়ী দাঁড় করিয়েছেন রায়ান। জায়গাটার নাম আমাদের জানা নেই! একটা অদ্ভুত রকম দৃশ্য চোখে পরে! একটা ফাঁকা মতন জায়গায়ে একটা বিশাল বড় সিংহদরজার সাইজের তোরণ। আর তার পাশে অনেকগুলি বটগাছ! দেখে কিরকম যেন মনে হচ্ছে এখুনি পাণ্ডবদের সকলকে দেখা যেতে পারে! অমিত বলল, আসেন আঙ্কেল, আপনেদের চারজনের একটা ফ্যামিলি ছবি নিয়ে নেই। কিন্তু আমাদের ছোটকন্যা গাড়ী থেকে আর নামবেনা। বেজায় শীত লেগেছে তার আর তার দেখাদেখি পালকিও দেখলাম আসতে নারাজ। পালকির আঙুল মটকানো দেখে খুব ভালই বোঝা যাচ্ছে, সে এখন বেশ উদাস, দেশের জন্য বুঝি মন কেমন করছে তার! একটা দমকা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে জানিয়ে দিলো আমাদের ছুটি এখানেই শেষ। এখনও হয়ত অনেক কিছুই অচেনা রয়ে গেলো, তবু একদিন না একদিন তো ফিরতে হয়ই সকলকে! বাইরে বৃষ্টি নেমেছে আবার।

চলবে..

2 responses to “হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৪৩ : স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (৭) · জুন ২০১৯”

  1. Kausik Sengupta Avatar
    Kausik Sengupta

    Thanks to the author for penning down such a wonderful and witty travelogue. May he go places and keep writing such diaries at regular intervals….

    Like

    1. কি যে বলেন স্যার!

      Like

Leave a comment