হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৪২ : স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (৬) · জুন ২০১৯

আমাদের ছোটকন্যা অবশেষে ভারী মজা পেয়েছে। এবারে দিব্যি মুখ তুলে ইতিউতি চেয়ে দেখছে সে। তবে বেচারাকে তেমন দোষ দিয়েও লাভ নেই। টানা একঘণ্টা যাবত মাথার উপরে ধূসর আকাশ, টিপটিপ করে বৃষ্টি আর আশেপাশের সারিবাঁধা নির্জন নিরাকার পাহাড় দেখে, সে বুঝি ভেবে ফেলেছিল, এই প্রাগৈতিহাসিক দেশে আমরা এবারে একদম একাকী হয়ে পরলাম। শুধু সে কেন, প্রকৃতির এমন বিস্ময়কর শুনশান রূপ তো আগে কোনদিন আমাদের কারোরই চোখে পড়েনি, আর আগামী কোনদিন পরবে বলেও তো মনে হয়না। এইতো মিনিট কুড়ি আগে, যতদূর অবধি দৃষ্টি যাচ্ছিল সকলের, চারিপাশে একটা জনহীন অদ্ভুতুড়ে নির্জনতা। এমন নির্জনতায় ফটোগ্রাফ তোলা হয়ে গিয়েছে হয়ত রাশিরাশি, কিন্তু সব ছবিতেই প্রত্যেকের ভুরু ছিল কুঁচকনো। একটা যেন, কি-হয় কি-হয় গোছের আতঙ্কের প্রশ্নচিহ্ন পরিস্ফুট হচ্ছিল সকলের মুখে! ভয় করছিল বললে হয়ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, তবে কোথায় একটা যেন অজানা ত্রাস কাজ করছিল আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই। পুরী হোক বা দিঘা দার্জিলিং, প্রকৃতির সামনে এলেই দেখেছি আমার নিজের কল্পনা সামান্য অপরিমিত হয়ে ওঠে, একটু একাবেঁকা আর সে জিনিষ তো বাঙালীর মজ্জাগত, তবে আয়েল অফ স্কাই’য়ের এই নিষ্ঠুর সৌন্দর্য কিন্তু এককথায়ে ব্রহ্মতালু তটস্থ করে রেখেছিল আমাদের।

ক্যানাডিয়ান বা ফরাসিদের কথা জানিনা। পিছনের সীটে জোড়ায় জোড়ায় বসে, এই অভিনব দৃশ্যাবলী দেখে, তাঁরা কেমন বোধ করছেন, কিরকম তাঁদের অনুভূতি, অলৌকিক না মনোরম, সে আমার জানা নেই। আর এমনকি জানার আগ্রহও তেমন নেই! তবে এটুকু বলতে পারি, মাঝে পাঁচ মাইল মতন, একটা এক্কেবারে ফাঁকা জায়গা মতন এসেছিল। সামান্য অসমতল, খয়েরি মাটি! জায়গাটার কি একটা নামও বলেছিলেন রায়ান! সে জায়গায়ে না দেখা গিয়েছিল মানুষ, না ছিল একটাও ঘরবাড়ি। এমনকি টানা ওই উঁচুনিচু মাঠে দেখা যায়নি একটিও ভেড়া, না ছিল কোন বৃক্ষ, বা একফোঁটা জল। এমনকি দুরে তাকিয়ে পাহাড়ও দেখা যায়নি একটিও। ফাঁকা পথঘাট তো আগে দেখেছি অনেক। এই স্কটল্যান্ডেই দেখা গিয়েছে প্রচুর। এডিনব্র থাকার দ্বিতীয় দিনটা তো মনে করিয়ে দিয়েছিল আমাদের নব্বইয়ের দশকের বাংলা বন্ধের দুপুরগুলি। যেন এখুনি একটা বোমা পরেছে হাজরা মোড়ে। কিমবা এখনই বুঝি ইন্ডিয়া পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ শুরু হবে, সকলে তাই বাড়ী ঢুকে গিয়েছেন একটু আগেভাগে।

তবে ওই পাঁচ মাইলের গোটা দূরত্বটাই কেমন যেন মনে হচ্ছিল, শান্তির চেয়ে বুঝি যুদ্ধ অনেক ভালো। কিছু না হলেও দুটো মানুষের মুখ তো দেখা যাবে! আসল ব্যাপার হল, আমরা তো বেড়াতে এসেছি খোদ হকারদের দেশ থেকে। আর সে দেশ আবার একটা নতমুখী ধার্মিক দেশ! কিছু না হলেও, বেড়াতে গিয়ে যদি একটা জায়গায়ে গোটাচারেক চায়ের দোকান, প্লাস্টিকের খেলনাবাটি, সিঙ্গারা জিলিপি, মোষের শিঙের ছুরি আর কাঁদুনে চারটে বাচ্চা না রইল, তবে বাঙালীর আর বেরিয়ে মজা কোথায়? বাঁশের বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে লাইন দিয়ে ঢোকা, লাইন দিয়ে দর্শন, ধুলো ওড়ানো অটোরিকশা, ঘামের গন্ধ আর জনাকয়েক ভিখিরি, এই না থাকলে তো বেড়ানোটাই নিরর্থক হয়ে যাবে।

ছোটটির মুখ পুলকিত হওয়ার আর কোন কারণ নেই, সামনেই গোটা পাঁচেক বাড়ীঘর আর দু’টি খাবারের দোকান দেখা গিয়েছে। অবশ্য দুটি দোকানেরই ঝাঁপ ফেলা রয়েছে এই সময়ে। আর ছোটবোনের এ’হেন আবিষ্কারে পালকিও দেখলাম বেশ উৎফুল্ল আর সেই অজুহাতে তাঁদের মা’কেও দেখা গেলো বেশ উৎসাহ পেয়ে গিয়েছেন মহিলা। আমাকে কনুই দিয়ে একটা ছোট্ট ঠেলা মেরে বুঝিয়ে দিলেন ভয়ডর কেটে গিয়েছে তাঁর। কারণ আর কিছুই না, কারণ মানবসভ্যতার দেখা পাওয়া গিয়েছে। আমাকে অবশ্য নিয়ম করে অভদ্রের মতন চোখবন্ধ রাখতে হচ্ছে গত প্রায় একঘণ্টা যাবত। চকিতে প্রবীণ মর্ছালে’র সাথে চোখাচুখি হয়ে গেলেই লোকটা আবার চাবি দেওয়া পুতুলের মতন শুরু করে দিচ্ছেন। আমার আবার ধারণা ছিল, খারাপ ভালো যেকোনো সমস্যারই আমি সুরাহা করতে পারি অনায়াসেই! কিছুই নয়, কেবল সমস্যাটির মূলে পৌঁছতে হবে আর সেই মূল থেকে বের করে আনতে হবে তার সমাধান! এলিন ডনানেই ভেবে দেখেছিলাম প্রবীণের এই অতিভাষীতার মূলে হয়ত রয়েছে তাঁর একাকীত্ব! কারণ লোকটি তো বাঙালী বাচালদের মতন জ্যাঠা গোছের একদম নন, ফচকে ফাজিলও নন একেবারে, বরং আমার তো মনে হচ্ছিল বেশ শিশুসুলভ মানুষ এই প্রবীণ মর্ছালে। তাই ভেবেছিলাম, যদি একটু মাথা ঠাণ্ডা রেখে তার অযুত নিযুত গল্পের ভাণ্ডার একটু শুনে নেই, তাহলে ষ্টক ফুরোলেই, লোকটা নীরব হয়ে যাবে এমনিতেই! কিন্তু কোথায় কি? মানুষ তো ভাবে এক আর বিধাতা ব্যবস্থা করেন আরেক!

রায়ান জানালেন আমরা এসে পড়েছি পোরট্রী। পোরট্রী আয়েল অফ স্কাইের সবচাইতে বড় শহর এবং বন্দরই শুধু নয়, এখানকার রাজধানীও। পোরট্রী ঢোকার আগে রায়ান শহরের হাজারো তথ্য পেশ করে যাচ্ছেন। গিন্নির মনোজ্ঞ মুখ দেখে মনে হচ্ছে একটা ছোট নোটবই হাতে পেলে খুশী হতেন। উদগ্রীব মুখে হাঁ করে রায়ানের ভাষ্য না গিলে সেটাকে নোট করে নিতে পারতেন। তবে এমন একটা জায়গায় এসে ইতিহাস ভুগোলের কচকচি যেন ভাল ঠেকছেনা আমার। আসলে খিদে পেয়ে গিয়েছে ভয়ঙ্কর রকমের। খাবারের কথা উঠতেই ছোটটি পালকিকে হুড়ো দিচ্ছে আধ মিনিট অন্তর অন্তর! এরই মধ্যে রায়ান আবার কোথায় একটা ছবি তুলতে দাঁড় করাবেন বলছেন, আমি অত্যন্ত বেরসিকের মতন রায়ানকে বললাম, এবারে বাসটা থামিয়ে কিছু একটা লাঞ্চ-টাঞ্চ খেয়ে নিলে হতনা? নাকটাক কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন ফরাসী নারীটি! ভারতের নিন্দুকে মানুষগুলো ভারী অসভ্য আর বড্ড ঠোঁটকাটা হয়!

চলবে…

Leave a comment