অপিরিচিত জনসমষ্টিতে একটানা কথা বলে যাওয়ার জন্য একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম এলেম লাগে। প্রবীণ মর্ছালে’র সেটি রয়েছে। প্রথমে ভাবছিলাম, সকাল-সকাল বুঝি পেটে পরেছে বলে একটু বেশী কথা বলছেন ভদ্রলোক। যাকে চলিত ভাষায়ে আমরা বলি, ভাঁট করা। তাছাড়া ভাবলাম ফিল্মমেকার মানুষ, ওদের কারিকরি তো আমাদের মতন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হতেই পারে। কিন্তু যত আলাপ হচ্ছে ভদ্রলোকের সাথে, ততো যেন বোঝা যাচ্ছে, লোকটা কিন্তু জীবনটাকে দেখেন একদম অন্যভাবে। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বলে চলেছেন অনর্গল। কে শুনল, কে বিরক্ত হল, কোন পরোয়া নেই! তাছাড়া কোনটাই তাত্ত্বিক তেমন কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে এতো গল্প? ভেবে দেখলাম, একজন চিত্র পরিচালকের মিথ্যে কথা বলার মতন কল্পনাশক্তি বা রসদ হয়ত প্রচুর রয়েছে, তবুও প্রবীণের কোন গল্পই আমার এই পরিবেশে মিথ্যে বলে মনে হচ্ছেনা। এই এখুনি আরেক ঢোঁক হুইস্কি পান করে প্রবীণ শুরু যেটা শুরু করলেন, সেটা তাঁর কৈশোরের হোস্টেল থাকার গল্প। আর বেশ মজার সেই গল্পের শুরুটা। এটা তো মানতে হবে যে অভিজ্ঞতা আছে বটে মানুষটার! পিছনের সীটে বসে অমিত দেখলাম একটা চটকা মেরে নিচ্ছে, বাকীরা নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে, আর অন্যদিকে প্রবীণের সাথে আমার দেদার আড্ডায়ে গিন্নির মুখ কিন্তু বেশ বিরক্ত! মানুষের কণ্ঠস্বর বুঝি তাঁর এই পরিবেশে ভালো লাগছেনা। আর পরিবেশটাও অনুচ্চ রাখার জন্য রায়ানও কথা বলছেননা প্রয়োজন না হলে। মাঝে-মাঝে ওই একটা দুটো মন্তব্য করছেন, দুটো একটা চুটকি, ভালো ফটোগ্রাফ তোলার মতন কোন জায়গায়ে এলে, দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর বাসটিকে।
গিন্নির মুখ দেখে ভাবছি, এবার কোনদিকে মনোযোগ দেবো? মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনে যাবো প্রবীণের মজার মজার গল্প, নাকি বাইরে রাস্তার দিকে রাখব আমার নজর? মনকে অবিরত বোঝাচ্ছি, ধুর! এখনও তো সেই ইনভার্ণেসের আশেপাশেই রয়েছি আমরা। আর তার মানে তো সেই একই প্রথাগত দৃশ্য। আদিগন্ত গাছের পর গাছ, মাঠের পর আরও একটা মাঠ, অদ্ভুত রকমের সুন্দর এক ধাঁচের ছবির মতন গ্রাম। তাও পালামৌ টালামৌ হলে একটা অন্যরকমের অনুভব হত নিশ্চয়ই। তবে মিথ্যে বলবনা, একঘেয়েমির মধ্যে কিন্তু ম্যাজিকের মতন এসে যাচ্ছে একটা আধটা নদী বা জলাশয়। আর হঠাৎ করে চোখে পরছে মাঠে চরতে থাকা কিছু মেটে রঙের ভেড়া। পালকি কোনদিন ভেড়া দেখেনি তাই একটানা বাইরের জানালার দিকে চোখ রেখে দিয়েছে। ভেড়া দেখলেই বিস্মিত হয়ে, ঘুম থেকে জাগিয়ে দিচ্ছে তাঁর ছোটবোনকে। এখন সামান্য ক্লান্ত লাগছে। তবে এলিন – ডনান’টা কিন্তু দেখার মতন একটা জায়গা ছিল বটে। দুটি লখের জল সেখানে মিশেছে, আর তার মাঝখানে অমন একটা সাঙ্ঘাতিক প্রাসাদ। আমাদের দেশ তো দূরের কথা, সচরাচর হয়ত এই দেশেই দেখা পাওয়া যাবেনা অমন আর একটা ক্যাসেলের। তাছাড়া ওই লখের উপর সেতু দিয়ে ক্যাসেলে পৌঁছনোর সময়ে বাতাসের যা স্পর্ধা দেখা গিয়েছিলো, তা হয়ত আগে কোনদিন দেখিনি আমরা। যেন পৃথিবীর পুরো বায়ুমণ্ডল অভ্যর্থনা করতে এসেছিল আমাদেরকে।
উঁকি মেরে দেখলাম, বাইরে এখন ঘোরতর অন্ধকার। রায়ানের বাসের কাঁচটা একটু ঘোলাটে রঙের, কিন্তু আলো কমে এসেছে অনেক। দুরে কিছু গম্ভীর পর্বত আর তারই মাঝে মাঝে একটা বুঝি জলের রেখা চকচক করে উঠছে। শাল সেগুণের বনানী তো উধাও হয়ে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হল। আর একটু আগে দুপাশের সব বেঁটে বেঁটে ঝোপঝাড়গুলি, সেগুলি আর চোখে পরছেনা। আমি প্রবীণের গল্পের তোড়টাকে একটু হালকা ব্যাঘাত ঘটাতেই বলে উঠলাম, “দ্যাখো দ্যাখো, কেমন যেন একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হচ্ছে না?” সেই শুনে গিন্নি একটু জড়সড় হয়ে বসলেন আমার কাছ ঘেঁষে। ছোটজনও চোখটোখ কচলে উঠে পরল। গাড়ীটা পাকা রাস্তা ছেড়ে এবারে নেমেছে একটা পাহাড়ী সড়কে। আর যেখান দিয়ে গাড়ীটা নিয়ে চলেছেন রায়ান, কেমন যেন মনে হচ্ছে একটা ঘন সবুজ রঙের উঁচুনিচু নীরব মরুভূমিতে এসে পরেছি আমরা। আর এই মরুভূমির আশপাশ ঢেউহীন সমুদ্রের জল দিয়ে ঘেরা। আর খয়েরি কিছু এলোমেলো প্রাচীন পাহাড়। যেন একটানা অনেকবছর খাটুনির পর সব পাহাড়গুলি একসাথে উপদ্রবশূন্য বিশ্রাম নিতে এসেছেন এখানে। পালকিরা নির্ঘাত ভয় পেয়েছে। গত এক ঘণ্টায়ে, ভেড়া কিছু দেখতে পেলেও, মানুষ দেখা যায়নি একটিও। ঘড়িতে দুপুর বারোটা বেজেছে, কিন্তু বাইরে এখনও চলছে একটা অন্ধকার অন্ধকার ভাব। এমন জনমানবহীন প্রান্তরে তো কোনদিন আসা হয়নি আগে।
মানুষের অনাধিক্য তো আগেও দেখলাম স্কটল্যান্ডের অনেক জায়গায়ে। কিন্তু এমন নিথর একটি জায়গা বুঝি গত সাত-দশ দিনে আমাদের চোখে পড়েনি। এ যেন এক অন্য ঘুমের দেশ আর বহির্বিশ্বের সাথে আর আমাদের কোন যোগাযোগ আর নেই। তবে এটাই কি আসল পৃথিবীর রূপ? আমরা যেখানে বসবাস করি, সেটা কি তবে বিজ্ঞানের দাপটে কৃত্রিম বেশী? কোনো এক অজানা মহাসাগরের এক পরিত্যক্ত দ্বীপে কি এসে পরলাম আমরা রবিন্সন ক্রুসোর মতন? কোন একটা জায়গায়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, আবার কোন জায়গায় একদম খটখটে শুকনো। প্রবীণের বকবকানির পরে, এমন এক আকস্মিক নিস্তব্ধ অভিজ্ঞতা কিন্তু কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। বাসের বাকী সকলেই আমাদের মতন অবাক হয়ে দেখছে বাইরের দিকে। এমনকি প্রবীণও এখন চুপ। প্রবীণকে বললাম, “জানো প্রবীণ, রবীন্দ্রনাথ একটা গান লিখেছিলেন – “আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া”, দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমাকে না হয় একটু বাদে অনুবাদ করে বলে দিচ্ছি।”
দুধারে বিহ্বল হয়ে তাকাচ্ছি আর খালি মনে হচ্ছে, লোকালয় থেকে অনেক দুরে এসে বুঝি আমরা এখানে পথ হারিয়ে ফেললাম। এবারে একটা জায়গায়ে রায়ান একটু চওড়া রাস্তা পেয়ে, দাঁড় করালেন গাড়ী। যত দুরে এখান থেকে চোখ যাচ্ছে, একটা সমুদ্রের মতন সুবিশাল নীলবর্ণ লখ, আর আমরা তারই মাঝে একটা ডাঙ্গায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা! পাশেই একটা বড় ঝুপ্সি গাছ! যেন এক সৈনিক পাহারা দিচ্ছে তার অদূষিত দেশ আর এই মায়ালোকে এখুনি যেন একটা জীনপরী ওই গাছটার থেকে নেমে আসতে পারে। বাতাস এখানেও বইছে বেশ জোরে, অতর্কিতে রায়ান পিছন থেকে এসে বললেন, ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাগণ, আপনাদের সকলকে স্বাগতম জানাই, আয়েল অফ স্কাই’তে। রায়ানের ভাষ্য শুনে, সকলেই কেমন একটা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে! আমি এরই মধ্যে শান্ত উদাসীন ভাবে অমিতকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাই, তুমি কি বাংলাদেশের কোন পল্লীগান জানো? দীনদুনিয়ার মালিক খোদার গান?”
চলবে…
Leave a comment