হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৪০ : স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (৪) · জুন ২০১৯

আকাশটা কালো করে এসেছে, একদম যেন একটা স্লেটের রং। কেবল একটা চকখড়ি দিয়ে তার উপর কিছু একটা লিখে দিলেই হয়। আর খুব মিহি করে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে এবার। এমন কোমল বৃষ্টিতে মাত্র একশো-দেড়শো মিটার হেঁটে যেতে কারো কোন অসুবিধাই হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এদিকে যেরকম সবেগে বাতাস বওয়া শুরু হয়েছে, তাতে তো এইটুকু হেঁটে যাওয়াটাও দেখা যাচ্ছে যথেষ্ট দুষ্কর। এই দামাল হাওয়ার দাপট এমনই যে ঠিকমতন একজায়গায়ে দাঁড়াতে পারছেননা কেউ। একবার মাটিতে পা রেখেই kya তাঁর বউকে নিয়ে ফের পালিয়ে গেলেন গাড়ীতে, ওঁরা নাকি ভেতরেই বসে থাকবেন। পালকিরাও যেতে চায়না ক্যাসেলে, ছোটবোনের খিদে পেয়ে গিয়েছে, তাকে নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করবে সামনের ক্যাফেতে। ক্যানাডিয়ান যুগলকে দেখলাম বাসের থেকে লাফ মেরে নেমেই পড়িমরি করে একছুট লাগিয়েছেন ডান – বাঁ কিছু না দেখেই। আর এদিকে ফরাসী দম্পতিটিকে দেখে আমাদের তো একরকম হাসিই পেয়ে গেলো। পুরুষটির জ্যাকেটের মধ্যে তাঁর পুরো শরীরটাকে কৃপণের মতন বেঁকিয়ে-চুরিয়ে ঢুকিয়ে নিতে চাইছেন ফরাসী নারীটি। আর সেইভাবেই উষ্ণ আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে নাকি দুজনে হেঁটে যাবেন এলিন – ডনান ক্যাসেলে। তাঁদের দেখে মনে হল, এভাবে এতটা পথ হেঁটে যাওয়া তো ভারী অসুবিধাজনক, বেশ দুর্বহ একটা ব্যাপার। আমি স্বভাবসুলভ ফচকেমি করে দাঁতে দাঁত চেপে বাংলায়ে বললাম, “দুগগা দুগগা! দেখেশুনে যেও বাবা তোমরা! আবার পা-টা জড়িয়ে লখের জলে হড়কে পরে যেওনা যেন”। হঠাৎ পেছনে শুনতে পেলাম অমিত বোধহয় শুনতে পেয়েছে সেই কথা, সে হাসছে খিকখিক করে, তাঁর চাচার মাতৃভাষায় রসিকতা শুনে। আমরা কত্তা গিন্নি মন্থরগতিতে পা বাড়ালাম এলিন – ডনানের দিকে! সঙ্গে আমাদের অমিত। গিন্নি পালকিদেরও পীড়াপীড়ি করলেন একটু। কিন্তু তাঁদের নিয়ম বুঝি তারাই ভালো বুঝতে পারে।

স্লেট রঙের আকাশ। যেন কালপুরুষ দেখা যাবে এই মুহূর্তেই। তিনপাশে গাঢ় নীলবর্ণ লখের জল আর একটা সেতু পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম কালচে হলুদ রঙের এলিন ডনান ক্যাসেলের দিকে। সেতুর উপরে বাতাসের বেগ বুঝি বাড়ল আরও খানিকটা। হাওয়াটা এখন প্রায় অসহনীয় অবস্থায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কালো আকাশটাতে ডানা ঝাপটে উড়ে পালাচ্ছে কয়েকটি বকপাখি। দূর থেকে মনে হয় যেন একথোকা সাদা ফুল। বড় দুর্লভ লাগছে বুঝি এই দৃশ্যটিকে! আচ্ছা আমরা কি কোনকালে এমন একটা অতিরিক্ত রংচঙে দৃশ্য দেখতে পেয়েছি? কেবল বাতাসটা আজ একটু কোমল হলে, এখানেই তুলে নেওয়া যেতো বেশ কয়েকটি ছবি! কিন্তু এই তীব্র নির্দয় বাতাসে সে বুঝি এখন সম্ভব নয়। গিন্নি আমার হাত চেপে ধরেছেন। ধরারই কথা, নইলে এরকম পাশব ঝঞ্ঝায় কারো সাহায্য ছাড়া সঙ্গীহীন হেঁটে চলা কিন্তু বেশ দুরূহ ব্যাপার। অমিত হাঁটছে আমাদের একটু আগে-আগে, যেন একটা সম্মানসূচক দূরত্ব বজায় রাখতে চায় সে। এরই মধ্যে উদ্দীপনা দেখিয়ে আমাদের একটা দুটো ছবিও তুলে নিচ্ছে সে। অন্য পর্যটকদের মধ্যে কেউ না দাঁড়ালেও, আমরাও সেই উগ্র হাওয়াতেই ক্ষণেক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়ছি বীরের মতন। অমিত যেন আজ বোঝাতে চায়, ফরাসী দেশ বা ক্যানাডার মানুষের তুলনায় বাঙালীর কলজের দম অনেকটা বেশী। সামান্য পাতলা একটা জ্যাকেট পরিহিত শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারার এই বাঙালী’র সরল বাহাদুরি কিন্তু সত্যি সত্যিই দেখার মতন। কেন জানিনা, ভারী ভালো লেগে গেলো আমার অমিতকে। ক্যাসেলে পৌঁছে একবুক নিঃশ্বাস ছাড়লাম আমরা। জল পিপাসা পেয়ে গিয়েছে ভয়ানক রকমের। পরিশ্রান্ত শরীরের সমস্ত রক্ত যেন একরকম শুকিয়েই গিয়েছিলো এই দেড়শ মিটার হাঁটাতেই। বাপরে বাপ! সকাল সাড়ে দশটাতেই এমন একটা নিস্তব্ধ অন্ধকার আকাশ, আর তার সাথে এমন একটা বেপরোয়া বেখাপ্পা বাতাস। ভয়মিশ্রিত অদ্ভুত একটা অপার্থিব অনুভূতি হতে লাগল আমার। এই তাজ্জব উপলব্ধি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ না করলে বুঝি লিখে বোঝানো যাবেনা। ভাগ্যিস অমিত ছিল আমাদের সঙ্গে!

ক্যাসেলের মোহ আমার কেটে গেলেও, গিন্নির দেখলাম ক্যাসেল দেখলেই কেমন একটা মুগ্ধ হয়ে পরেন। যেন এক রূপকথার দেশে এসে পরেছেন। তাঁর এই বিস্মিত মুখশ্রী আমি এডিনব্র’তে বা উইন্ডসরে দেখেছি, ওয়ারউইকেও দেখা গিয়েছে তাঁর এই কৌতূহলী মুখ। এমনকি স্ট্র্যাটফোর্ডে শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে ঢুকেও, গিন্নিকে দেখে মনে হয়েছিল রমেশচন্দ্র মজুমদার যেন নতুন এক কোন অজানা ইতিহাসের সন্ধান পেলেন! ক্যাসেলে ঢুকে আমার ক্যাসেল দেখার ইচ্ছেই হয়না। চারিধারে থরেথরে সাজানো থাকে যতরকম অস্ত্রশস্ত্র, তরোয়াল। রাজারাজড়াদের পোশাক – আশাক ইত্যাদি! এগুলো মানুষ দেখেন কেন? গিন্নির মুখে জানলাম এই ক্যাসেল নাকি তৈরি হয়েছে তেরোশো শতাব্দীতে। কে এলিন আর কেই বা ডনান, জিজ্ঞাসা করতে জানালেন এলিন মানে দ্বীপ আর ডনান খুব সম্ভবত কোন রাজবংশের পদবী। এই এলিন ডনানের অনেক উল্লেখ নাকি রয়েছে আউতল্যান্ডার সিরিয়ালে। জ্যাকোবাইট মুভমেন্টের অনেক সব যুদ্ধটুদ্ধ হয়ে গিয়েছে এরই কাছেপিঠে। আর এই যে লখ, এই লখের নাম আসলে লখঅ্যালশ। অন্যদিকটা লখ নেসের দিক। ডনানরা ক্যাসেল বানিয়েছেন এমনই একটা সুকৌশলী দ্বীপে।

এরই মধ্যে পকেট থাবড়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা দেশলাইটা। কিন্তু মগজে ধোঁয়া না ঢুকলে বুঝি এইসব ইতিহাসও বুঝতে পারা যাবেনা। ঈশ! এই সময়ে আবার অমিতটা যে কোথায় নিখোঁজ হয়ে গেলো এরই মধ্যে? দেশলাইটা বুঝি ওই নিলো একটু আগেই! বাইরে বাতাসের বহর অনেকটা কম এখন। একটু রোদও বুঝি উঠেছে। বাঁদিকে তাকাতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম! জলের মধ্যেই অনেকগুলি উঁচুউঁচু পাথর! আর তারই পাশ ঘেঁষে একঝাঁক সাদা রাজহংসী জলে নেমে সাঁতরে বেড়াচ্ছে অবলীলায়। আচ্ছা এই শীতেও ঠাণ্ডা লাগেনা বুঝি এঁদের?

চলবে…

Leave a comment