অপরিবর্তন

বঙ্গজীবনের সারাবছরের প্রাথমিক বিভাজনটা কিন্তু একটা সময়ে ছিল কেবল ঘটী-বাঙালের। আর নতুবা, ডান বামের। এমনও দেখা গিয়েছে, পাক্কা তিনটে বছর প্রেম করার পরেও ছেলে ও মেয়েটির বিচ্ছেদ হয়ে গেল, যেদিন মেয়েটি তার হবু শাশুড়ির মিষ্টি দেওয়া মুসুরডাল চাখলো অথবা ছেলেটি তার প্রেমিকার কাকার বই’য়ের তাকে হুট করে দেখে ফেলল লেনিনের ছবিটা। নইলে তো রবিঠাকুর, পুরী-দার্জিলিং, নন্দন অথবা দুর্গাপূজো, এইসব সর্বজনীন বিষয়ে জাতিটা ভয়ঙ্কর রকমের মিলিত। তবে দেখা গেছে, পূজো এলেই কিন্তু বাঙালীর মধ্যে এসে পরে একটা বিভাজন। মোটামুটি বাঙালী জাতি তখন মূলত তিনটে ভাগে বিভক্ত হয়ে পরেন।

তার মধ্যে প্রথম দুইভাগে থাকবেন, একদল যারা এইবার পূজোর ছুটিতে বাইরে যাবেন, আর অন্য দল, যারা যাবেননা বা যেতে পারছেন না। এই নিয়ে কিন্তু তর্কবিবাদের শেষ নেই। তা যারা এইবারে বাইরে যাবেন বলে স্থির করেছেন, মানে যাদের ছুটিছাটা জমানো রয়েছে বা পেয়ে গেছেন, তারা বেশ ডাঁটের মাথায়ে বলবেন, “বাবা! আর যাই করি আর তাই করি, পূজোয় কিন্তু আমরা এক্কেবারে টিকতে পারিনা কলকাতায়। কি তোদের ওই ভয়ানক ট্রাফিক, আর সারারাত ধরে লোকজনের প্যাঁপোঁ, যত ফালতু ভিড়ভাট্টা। সেই তো গতবারের আগের বার মুদিয়ালিতে ঝুনুদিটা তো পুরো হারিয়েই গেলো ভিড়ের চাপে! রাত দুটোর সময়ে প্রতাপদার কি ঝক্কিটাই না পোয়াতে হয়েছিল! আর তারপর থেকে আমরা প্রমিস করছি, পূজোর সময়ে আর না! আর কিছুর মধ্যে কিছু না, কোত্থেকে এসে জুটবে যতসব মফঃস্বলের এলোপাথাড়ি পাবলিক। আর ম্যাটাডোর চেপে এসে বেকার হুজুগ করবে শহরটার উপর। কাঁচা-কাঁচা যাচ্ছেতাই চাউমিন আর এগরোল। তার চেয়ে বাবা একদম ওই লক্ষী পুজো-ফুজো কাটিয়ে ফিরব এবার”!

আর অন্যদিকে আরেক দল, মানে যারা এবারে কোনো কারণে যেতে পারছেননা বাইরে! সে হয়ত তাদের ছেলের আগামী মার্চে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা-টরীক্ষা রয়েছে, বা কত্তা ভদ্রলোক হয়ত ছুটিই পাননি ঠিকমতন। অথবা দেখা গেলো, ঠিক একশোকুড়ি দিনের মাথায়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কনফার্ম টিকিটটা পর্যন্ত পেলেননা রেলের, বা বৃদ্ধা শাশুড়িকে দেখার লোকের অভাব! তাঁদের দেখা গেছে, হঠাৎ করে তাঁরা হয়ে পরবেন সাবেকী। একটা যেন নিখাদ বাঙালী বিশুদ্ধতার প্রতীক। তাঁরা বলবেন, “কি বলি বলো তো? তোমার দাদাটি তো ভাই পূজোতে কিছুতেই যেতে চাননা কলকাতা ছেড়ে! বাবু, আমি দুজনেই এইবার অগস্টেই বলেছি, তা চলনা, এবারে কোথাও একটু কাছাকাছির মধ্যে ঘুরে আসি। তা উনি বলেন, কি যে বল তোমরা! বচ্ছরে ওই কটা দিনই তো পাই একটু পাড়ার লোকগুলোর সাথে সময় কাটানোর। ওই সকাল সকাল ধূতিপাঞ্জাবী পরে গিয়ে বসে পরবেন মণ্ডপে। আর কি জানো ভাই? গতবার থেকে তো আমাদের পাড়াতেও থিমের পূজো। জি-বাংলার স্টল বসছে! এবার তো শুনলাম, রানি রাসমণি, মথুর, বকুলকথার মেয়েটা, সব নাকি আসবে সপ্তমীর দিন।

অবশ্য পূজোর বাজারে দেখা যায়, আরও এক ধরণের বাঙালী কিন্তু এখনও বেঁচে আছেন। এঁরা তৃতীয় ভাগে। তারাই, যারা কিনা সত্যিকারের বাঙালীর পূজোটাকে ধরে রেখেছেন বছর-বছর ধরে! যে বিমানদা’কে, শঙ্করকাকাকে, কিমবা ঝুমুর বৌদির টিকির দেখা পাওয়া যাবেনা সারাটা বছর, ঠিক চতুর্থীর সন্ধ্যেয় দেখবেন, ওই বিমানই কিন্তু ঠাকুর আনার সময়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে। রাশভারী টাইপের শঙ্করকাকা নবমীর সন্ধ্যারতিতে ঢাকি’র বাচ্চা ছেলেটার হাত থেকে কাঁসর ঘণ্টাটা ছিনিয়ে নিয়ে ড্যাং-ড্যাড্যাং, ড্যাং-ড্যাড্যাং করে বাজাতে শুরু করে দিয়েছেন। ঘামে ভিজে যাচ্ছে পাঞ্জাবীর আস্তিন, তাও থামবেননা ভদ্রলোক। কাকিমা এদিকে ব্যস্ত হয়ে বলছেন, ওরে তোরা কেউ মানুষটাকে থামতে বল, এবারে একটা যা-নয়-তাই কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে তো! আর এবারেও প্রতিবারের মতন, অষ্টমীর ভোগ রান্না করতে গিয়ে হাতে মস্ত ফোসকা পড়বে ঝুমুর বৌদির। আর ঠিক আসবে মৌ, মুম্বই থেকে ষষ্ঠীর রাতের ফ্লাইটে। সোমনাথের পেছন থেকে তাঁর চোখদুটো চেপে ধরে বলবে, “কিরে! চেনা চেনা ঠেকছে”? মাত্র চারদিনই স্থায়ী হবে সেই প্রেম! নাহ! ফিরতে তো একদিন হবেই। সকলকেই ফিরতে হয়। ছত্রপতি শিবাজী টারমিনাসের রেললাইন ধরে যদি আজই সিধে হাঁটা লাগাই, বোধনের ঠিক আগেই পৌঁছে যাবনা?

– অনির্বাণ দাশগুপ্ত

Leave a comment