হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৩৯ : স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (৩) · জুন ২০১৯

বেপরোয়া রোমাঞ্চের বুঝি এই শুরু হল। লখ নেস আড়ালে চলে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে। আর ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টি এসে পরছে বেহিসেবির মতন, আর সে বৃষ্টি কিন্তু চলেও যাচ্ছে খানিকক্ষণ বাদেই। কেবল শূন্যস্থানে যেন উপহার দিয়ে যাচ্ছে একটা করে আকস্মিক হাসির ঝিলিক। সেই বর্ষণের ত্বরিত রূপ বুঝি এক-এক জায়গায়ে একরকম। এই যেমন মিনিট পনেরো আগে কফি পানের বিরতিতে, ছোট্ট পাথুরে একটা নদীর উপর শ্যাওলা ধরা এক জীর্ণ সেতুর পাশেই গাড়িটিকে দাঁড় করিয়েছেন রায়ান। বোঝাই যাচ্ছে, সামান্য আগেই এখানে হয়ে গিয়েছে এক পশলা বৃষ্টি। এখনও গাছের পাতা থেকে টপটপ করে ঝরে পরছে বড়বড় এক-একটা জলের ফোঁটা। বাতাসটা এখনও বেশ ভেজাভেজা। এদিকে বৃষ্টি থেমে রোদ্দুরটাও বেশ জোরালো হয়ে উঠে গিয়েছে! বৃষ্টিস্নাত আর্দ্র সেতুটির থেকে সূর্যের তীব্র কিরণে এখন বাষ্পের ভাপ উঠছে। উৎসাহিত হয়ে রায়ানকে শুধোলাম , “আচ্ছা, এই নদী কি হেঁটে পার হওয়া যায়”? চোখ টিপলেন রায়ান। “আমরা কি একবার তবে ওপারে গিয়ে দাঁড়াতে পারি?” রায়ান জবাব দিলেন, “না না, বাধা তেমন কিছু নেই! ইচ্ছে করলে তো অনায়াসে যাওয়া যেতেই পারে ওপারে। তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের এলিন ডনান ক্যাসেলে গিয়ে পৌঁছতে হবে কিনা!” গিন্নি দেখলাম রায়ানের সাথে আমার অযৌক্তিক বাক্যালাপে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পরলেন। আবার কি আজেবাজে বলতে শুরু করল মানুষটা! নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছে একটা নিবিড় বনানী আর তার ফাঁকফোকর দিয়ে একটা সুদৃশ্য কুঁড়েঘর। ভাবছিলাম রায়ানকে একবার বলেই দেখি! এদেশে আসা যাবত তো বহুসংখ্যক প্রাসাদ, ক্যাসেল, দুর্গ প্রভৃতি দেখা হয়ে গেল! আহা! ওই নিরিবিলি কুটিরের সামনে যদি বসে, সারাটা দিন এই নদীতে ছিপ ফেলে কিছু স্যামন মাছ শিকার করা যেত! এই অপূর্ব নদীটিকে দেখে আমার ক্যাসেল দেখতে যাওয়ার ইচ্ছেটা একদম উবে গেল। নেহাত দামাল বৃষ্টিটা ফের এসে গেল, অগত্যা কফির গেলাসটা হাতে নিয়েই উঠে পরতে হল রায়ানের বাসে।

অমিত ছেলেটি দেখলাম অনেকটা আমারই মতন। বাঙালী বলেই হয়ত, ছেলেটির আবেগ, অনুভূতি, দেখলাম অনেক সূক্ষ্ম। নিজের মোবাইল ফোনে অনেক’কটি অনবদ্য ছবি তুলে নিয়েছে সে নদীটির। এমনকি তার মধ্যে সেতুর উপরে আমাদের চারজনেরও একটা দুটো ছবি রয়েছে। আর যেটা কেউ লক্ষ্য করেনি, সেই কুঁড়েঘরটিরও বেশ কটা ছবি নিয়ে নিয়েছে সে। গৌণ হলেও, সে অপরূপ দৃশ্যটি চোখ এড়িয়ে যায়নি তাঁর। তাছাড়া দেখলাম কয়েকটি জংলী গাছের পাতাও সন্তর্পণে ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে অমিত। আমাকে পাতাগুলো দেখিয়ে বলল, “এই দ্যাখেন চাচা! কেমন সুন্দর এই পাতাগুলান।” অমিতের বাঙলায়ে একটা অদ্ভুত টান রয়েছে। বাঙাল কথা নয়। তবুও শুনতে যেন আমাদের চলিত বাঙলার চেয়ে অনেকটা অন্যরকম। ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ম্যাচ দেখতে এসেছিল অমিত। গত একবছর ধরে এই জুন মাসের জন্য তিলেতিলে পয়সা জমিয়েছে সে। বিয়েশাদী করেনি সে। কোনকালে সে সব উটকো ঝামেলায়ে নিজেকে জড়াবেনা বলেও স্থির করেছে সে। গত সতেরো তারিখের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে গ্রুপ-স্টেজ থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার একটা হালকা আশা জাগিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তারপরে আবার পরপর অস্ট্রেলিয়া আর ইন্ডিয়ার কাছে হেরে গেলো তার টীম। তাতে অমিত বেচারা বিরক্ত হয়ে শেষমেশ চলে এসেছে ইনভার্ণেস। একগাল হেসে অমিত জানাল, “সারাটা বছর দশটা মাস মন লাগিয়ে কাজকাম করি আর বাকী দুইটা মাস একদম টোটো করে ঘুরি।” ইন্ডিয়াও তো এসেছে সে। “এইতো গেলোবারই আপনেদের মুম্বাই শহর দেখে, ঊটি ফুটি – মাইসুর সব দেখা আসলাম”।

অন্যদিকে আসর জমিয়ে দিয়েছেন আমাদের ক্যামেরাদাদা। পায়ের কাছে রাখা জলের বোতল থেকে, অল্প অল্প করে হুইস্কিতে চুমুক মারছেন আর গভীর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে উদ্ভট সব আজগুবি প্রশ্ন করা শুরু করছেন রায়ান কে। একটা মানুষের স্কটিশ হাইল্যান্ডস নিয়ে এতরকম ঔৎসুক্য থাকতে পারে, এঁকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেতোনা। অন্যদিকে তাঁর গিন্নি মহিলাটি দেখলাম ঝিমোচ্ছেন। প্রশ্ন করতে করতে ভদ্রলোক যখন দেখলাম শেষ অবধি রায়ানের মাসিক আয় নিয়ে সওয়াল শুরু করেছেন, তখন আমাকেই প্রসঙ্গ পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে হল। একটা দুটো কথাতেই জানা গেল, এঁদের বাস মুম্বইয়ের গোরেগাঁও’তে। ভদ্রলোক রায়ানের থেকে নজর ঘুরিয়ে এবারে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্রাদার তুমি সিনেমা টিনেমা দেখ? হিন্দি ফিল্ম পছন্দ করো”? ঈশ! কোন কুক্ষণে যে আমি রায়ান কে বাঁচাতে গিয়ে, প্রসঙ্গ বদলাতে গিয়েছিলাম! জবাব দিলাম, “হ্যাঁ স্যার, তা দেখি বৈকি! মাসে দুমাসে তো একটা আধটা দেখা হয়েই যায়!” আমার উত্তর শুনেই, এইবারে চলন্ত বাসে একদম সটান উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন ক্যামেরাদা। একটা জোরালো রকম দাম্ভিক হ্যান্ডসেক করে বললেন, “স্যার! দিস ইজ প্রবীণ মর্ছালে.. উইডো অফ সাইলেন্স ছবিটার একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সিনেমাটোগ্রাফার এবং প্রযোজক। এই’তো গত সপ্তাহেই ক্রোয়েশিয়া আর বুলগেরিয়াতে স্ক্রিনিং ছিল ছবিটার। আরে ভাইয়া, ছবিটা তো সুপার ডুপার হিট করে গেছে না? তাই এবার পাবলিক ডিম্যান্ডে ছবিটাকে নিয়ে এলাম স্কটল্যান্ড।” বলেই নিজের একটা কার্ড বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে।

গিন্নি দেখলাম আমার দিকে চেয়ে ভুরু নাচাচ্ছেন। যেন বলতে চাইলেন, “কেমন? যেমন গায়ে পরে আলাপ জমাতে গিয়েছিলে! এবারে বোঝো ঠ্যালা। আমি যতটা সম্ভব অপরাধীর মতন গলায় প্রবীণকে জানালাম, “দেখে নেব স্যার, নিশ্চয়ই করে দেখে নেব আপনার উইডো অফ সাইলেন্স… আরে! আপনার ছবি বলে কথা। কথা দিচ্ছি, পারলে দাদা, দেশে ফিরেই দেখে নেব! বাইরে দেখলাম বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার, আমাদের তো এদিকে বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডাই লাগছে! বাতাস বইছে খুব শনশনিয়ে… এই শীতের মধ্যেও প্রবীণকে কিন্তু দেখলাম দরদর করে ঘামছেন… আমার দিকে তাঁর জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “থোড়া ট্রাই তো কিজিয়ে স্যার, চাহিয়ে তো মেরা পাস নমকিন ভি হ্যাঁয়,”…

চলবে…

Leave a comment