হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৩৮ : স্কটল্যান্ড চতুর্থ দিন (২) · জুন ২০১৯

আশ্চর্য এক রূপকথার মতন মনে হচ্ছে ইনভার্ণেস শহর ছাড়ার পরেই। শহর ছেড়ে বেরিয়েই কুড়ি পঁচিশ মাইল অতিক্রম করে, বাঁদিকে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে রূপবান লখ নেস আর ডানপাশের ঘন সবুজ বনানী। ধূসর আকাশ, কালচে নীল রঙের এই নেসের বাহ্য রূপ আর ডানপাশের সবুজ একসাথে মিলে বেশ একটা মানানসই ব্যাপার প্রতিভাত হচ্ছে। তাঁর বাহারের বাঁকানো মাইক্রোফোনে, যাত্রার টুকটাক বর্ণনা করছেন রায়ান। বেশ দীর্ঘ সুরেলা আর ভারী তাঁর গলাখানি। আর তাঁর বাচনভঙ্গীতেও একটা বেশ আলসে উদাসীন ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন প্রদীপ ঘোষ একটা প্রেমের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন। রায়ান কিন্তু শোনাচ্ছেন লখ নেসের মনস্টারের গল্প। দেখা যাচ্ছে গিন্নি তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে বিভোর হয়ে শুনছেন সেই নেসদত্যির অলীক গল্প। আর আমি ইতিমধ্যেই চলে গিয়েছি ফ্ল্যাশব্যাকে। বোধহয় বছর দশেক পেরিয়ে গিয়েছে এতোদিনে। একবার গাড়ি করে সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার সময়ে একটা জায়গা এসেছিল। সে জায়গাটির নাম বোধহয় সুন্দরনগর। মনে আছে, সেই সুন্দরনগর জনপদটিতে পৌঁছনোর আগে একের পর এক সিমেন্টের কারখানা আর সেসব কারখানার ধুলো মিশ্রিত বাতাসে হাঁপিয়ে উঠতে হয়েছিল আমাদের। আমাদেরই মধ্যে কে একজন যেন, একটা ধাবায়ে চা-পান করতে করতে ড্রাইভার ছেলেটিকে নাক কুঁচকে বলে উঠেছিলেন, “ভারী খারাপ তোমাদের সুন্দরনগর! তোমাদের দেশে এমন অসুন্দর জায়গা কোনোকালে দেখিনি বাপু। এই নাকি তোমাদের মানালি”? জাঠ ড্রাইভারটি মুচকি হেসেছিল। হয়ত কিছু না বুঝেই। কিন্তু চমক বুঝি আমাদের জন্যে ধরা ছিল তারপরেই। সুন্দরনগর ছাড়ার পরে মিনিট পনেরোর মধ্যেই এসে গিয়েছিলো মান্ডি আর মান্ডি থেকে টানা প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পাশে পাওয়া গিয়েছিল রূপসী বিপাশা নদীকে। হিমাচলে বিপাশাকে বলে বিয়াস। বিপাশার সেই অনাবৃত রূপ ছিল ভয়ঙ্কর রকমের সুন্দর। নিরাভরণ আদুর গায়ে যেন গাঁয়ের জলাশয়ে স্নানে নেমেছেন সুন্দরী এক যুবতী। তার সাথে আজ এই নিকষিত পালিশ করা লখ নেসের অনধিকার উপমা হয়ত টানবেন না কেউই।কিন্তু সেই সাদৃশ্য যদি দৈবাৎ কারোর প্রবল আবেগপূর্ণ চোখে ধরা পরে যায়, সেই অধীরতা তো চেপে রাখা পাপ।

লখ নেসের তীরে ছবি তুলে নেওয়ার জন্য একটা ছোট্ট পাঁচ মিনিটের স্টপ দিয়েছেন রায়ান। ইলেকট্রনিক সিগারেটে ভুরভুর করে টান মারছেন আর একটা ঢিপির মতন জায়গায়ে উঠে হালকা রসিকতার সুরে বললেন, খুব মনঃসংযোগ করে দেখুন সকলে, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, এই সেই নেসির ভয়াবহ উপকুল। এইখান থেকেই মাঝেমধ্যে নেসি’কে দেখা যায়। দিনে দুপুর রাত কিছুই মানেনা নেসি। আমাদের ছোটটির দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, “ওই যে দেখতে পাচ্ছো, খুকি? খানিক দুরে জলের মধ্যে যে বুড়বুড়ি দেখতে পাচ্ছো, ওইতেই তো চিহ্ন দেখাচ্ছে নেসির উপস্থিতি’র। স্কটল্যান্ডের কিংবদন্তী উপকথার নিরিখে লখ নেসের দত্যির নাম আদর করে রাখা হয়েছে ‘নেসি’। আর নেসির আতঙ্কে আমাদের কনিষ্ঠাটি তার মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো বুঝি খানিকটা। তার মায়ের মুখ দেখেও মনে হচ্ছে তাঁরও বুঝি সামান্য অসোয়াস্তি হচ্ছে যেন। তবে নেসের তীরে দাঁড়িয়ে আমার এই মুহূর্তে মনে হল, জল বুঝি কেবল জলের মতন দেখতেই হয়। সে নেসের জলই হোক, বা বিপাশা নদীর।

সকলেই গাড়ি থেকে নেমে এসেছেন। নিজেদের ছবি তুলে রাখছেন বিভিন্ন ভঙ্গিমায়ে। তবে দেখছি আমাদের দেশী দম্পতিটির কিন্তু সাহসের বলিহারি। রায়ান যে ঢিপিতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর চেয়েও উঁচু আরেকটি ঢিপিতে গিয়ে চড়েছেন পৃথুলা মহিলাটি। একটা সাদা ফুলগাছের পাশে বেশ ঠমক নিয়ে দাঁড়িয়েছেন হাসি হাসি মুখে আর পুরুষ মানুষটি একটা অতিকায় ক্যানন ক্যামেরায়ে তুলে রাখছেন সেই ছবি। আজকাল কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বেশীর ভাগ মানুষই মোবাইল ফোনে ছবিটবি তুললেও, কিছু অতিশৌখিন জনতা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কিন্তু ইদানীং ফটোগ্রাফির বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। রাক্ষুসে সব অতিকায় জাপানী ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে দিনরাত্তির জলফড়িঙের আর পিঁপড়ের ছবি তুলে ফেসবুকের লাইক কুড়োচ্ছেন। এঁরাও কি তবে ওই দলেই পরছেন?

পালকি এসে জানাল, অন্য দেশী যুবকটি বাংলাদেশের লোক এবং আরও মজার ব্যাপার হোল, এর নামও নাকি অমিত। মোহাম্মাদ মনিরুল অমিত। যাক স্কটরেলের অমিত বাঙালী না হলেও, এই বঙ্গসন্তানের সাথে এবারে মন খুলে আড্ডা মারা যাবে। গিন্নি বিশ্বাস করলেন না, আমার কিন্তু কেন জানিনা ছেলেটিকে প্রথম থেকে দেখেই মনে হয়েছিল ব্যাটা খাঁটি বাঙালী। এক তো তাঁর মুখের আদল, অল্প অল্প ছাগলদাঁড়ি, পাতলা চূল, মৃদু একটা বিজ্ঞ ধাঁচের হাসি – সবই প্রায় পাক্কা বাঙালীদের মতন। তারপরে যখন দেখলাম, ছেলেটি আমাকে দূর থেকে দেখতে পেয়েই হাতের সিগারেটখানা ঝটিতি ছুঁড়ে সামনের ঝোপে ফেলে দিলো, তখনই বুঝতে পেরেছি এ জিনিষ বাঙালী ছাড়া হয়না।

এবারে ক্যামেরা গলায় এগিয়ে এলেন দেশী ভদ্রলোকটি! বেশ ভাল তাঁর স্বাস্থ্যখানা। আর যতক্ষণ তাঁকে দেখলাম, সর্বক্ষণ ভদ্রলোক উৎসাহে টগবগ করছেন। তাঁর দিকে চেয়ে আমি একটু হাসতেই বললেন খাঁটি মুম্বইয়া হিন্দিতে শুধোলেন, “মদ পান করবেন? ভাল হুইস্কি আছে আমার কাছে। এই শীতল আবহাওয়াতে, সকাল থেকেই একটু করে করে হুইস্কি পান করছি আমরা কত্তা গিন্নি! যাক, এতক্ষণে এদের উৎসাহের কারণটা বোঝা গেল! সবিনয়ে ভদ্রলোকটির প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে রায়ানের গাড়ীতে চেপে বসলাম আমরা। আর একটু বাদেই এলিন ডনান ক্যাসেলে পৌঁছে যাবো। নেস এখনও আমাদের সঙ্গ ছাড়েনি। বরং আরও নয়নশোভন হয়ে সে দেখা দিচ্ছে মাঝে মাঝেই। যে রাস্তাটি দিয়ে রায়ান নিয়ে চলেছেন, সেই সড়কটি আরও নির্জন, আরও ছমছমে! বৃষ্টি কমে গিয়েছে এখন আর নেসের ওপাড়ের আকাশে নরম সূর্যটা দেখে মনে হল, ভাগ্যিস বেঁচে রয়েছি! নইলে এমন একটা বিরল দৃশ্য কি দেখতে পেতাম?

চলবে…

Leave a comment