কপালটা আজকে নেহাত মন্দই বলতে হবে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ভোরে। ভালরকম রোদটোদ না উঠলেও, ড্রামোসি ছেড়ে বেরোনোর সময়ে, হাওয়াতে গতকালের সেই বেয়াড়া কনকনে ভাবটা পাওয়া যায়নি। তবে দুঃখের বিষয়, ব্রেকফাস্টে ঝুলিয়েছে ড্রামোসি হোটেলটা। ব্যাটারা বলে কিনা সাড়ে আটটার আগে ব্রেকফাস্ট দেওয়ার নিয়ম নেই এই হোটেলে। অগত্যা একটা করে আপেল আর কলা খেয়েই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পরতে হয়েছে আমাদের। তবে বেরিয়েই, আবহাওয়ার এই মুখ চেয়ে তাকানোতে, সকলের মন খুশ। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে পৌঁছনোর কথা ইনভার্ণেস সিটি সেন্টারের বাসস্টেশনে। গতকাল রাতেও ট্র্যাভেলের মেয়েটি পইপই করে মনে করিয়ে দিয়েছে, সিটি সেন্টারের বাস স্টেশনের ছয় নম্বর বে থেকে আইল অফ স্কাই’এর বাস ছেড়ে যাবে একদম কাঁটায়ে কাঁটায়ে আটটায়ে। সুতরাং যে ভাবেই হোক আধঘণ্টা আগে গিয়ে না পৌঁছতে পারলে ব্যাপারটা একটু গণ্ডগোল হয়ে যেতে পারে।
আমাদের সফরসুচীর আজকেই শেষ দিন, আর আজ আমাদের আইল অফ স্কাই বেড়াতে যাওয়ার কথা রায়ানের সঙ্গে। এঁর পুরো নাম রায়ান রেমন্ড। আর এই রায়ান রেমন্ড মানুষটিকে এই এলাকায় মোটামুটি সবাই এক ডাকে চেনেন। ইন্টারনেটে গুগল করলে, এক ক্লিকেই পাওয়া যাচ্ছে এঁর গণ্যমান্য উল্লেখ। ইনভার্ণেস, লখ নেস আর অ্যইল অফ স্কাই চত্বরে রায়ান রেমন্ড’কে একজন সেলিব্রিটি ট্র্যাভেল গাইড বলা চলে। খ্যাতির হিসেবে চার্জ অনেকটাই বেশী করেন রায়ান, কিন্তু রায়ানের সাথে আইল অফ স্কাই বেড়াতে যাওয়ার নাকি অভিজ্ঞতাই আলাদা। আইল অফ স্কাই’এর এমন এমন সব জুতসই জায়গায়ে নাকি নিয়ে যান রায়ান, সেসব জায়গা দর্শন করে, পৃথিবীর সংজ্ঞাই নাকি বদলে যায়! পৌনে আটটা নাগাদ ঝড়ের গতিতে চলে এলেন রায়ান। এসেই ছয় নম্বর বে’তে চোখ বুলিয়ে নিলেন ঝটিতি। হাতে ট্র্যাভেলারদের লিস্ট, না আঁচড়ানো চুল, অল্প দাঁড়ি, পরনে একটা কালো আর মেরুন চেককাটা কিল্ট, কালো স্নিকারস জুতো, ধূসর রঙের একটা গোলগলা গেঞ্জি আর মুখে ইলেকট্রনিক সিগারেট। রায়ানকে দেখেই মনে হল কোমরের বামদিকে একটা তরোয়াল আর ডানে একটা পিস্তল গোঁজা থাকলে জমে যেত আরও বেশী। গত চারপাঁচ দিনে বীর স্কটিশ মানুষের যেসব কাহিনী একটানা শুনে যেতে হয়েছে গিন্নি আর অ্যানড্রুর মুখে, সেসব কেমন যেন মিলে যাচ্ছে রায়ান’কে চাক্ষুষ দেখে। কিন্তু বেয়াড়া বৃষ্টিটা যে শুরু হয়ে গেল আবার। আর সেই সাথে কনকনে জোলো হাওয়াটা। ভেবে রাখা হয়েছিল, সিটি সেন্টারের ফটাফট ছবি তুলে নেওয়া যাবে খানকয়েক, কিন্তু বৃষ্টির ধাক্কায়ে পড়ি কি মরি করে উঠে পরতে হল রায়ানের বাসটিতে।
সিটি সেন্টারের কোন দোকানপাট এখনও খোলেনি। নইলে রায়ানের আসবার আগেই সামান্য কিছু খাবার আর কফি কিনে রাখা যেত। সকালে একটা করে আপেল আর কলা, পেটের কোন কোনায় এতক্ষণে সেসব সেঁধিয়ে গিয়েছে। অদূরেই বইয়ের দোকান আছে একটি, সেটিই দেখা গেল একমাত্র খোলা। কেবলমাত্র সংবাদপত্র বিক্রি হচ্ছে সেই দোকানে। বাঁপাশেই ভিক্টোরিয়ান মার্কেট, রায়ান জানালেন এই জায়গাটাকেই বলে কুইন্সগেট। রায়ানের বাসটিকে, বাস না বলে বড়সর একখানা গাড়ি বলাই শ্রেয়। কারণ এই বাসটিতে বসার জায়গা মাত্র ষোলো জনের। রায়ান বসেছেন স্টিয়ারিং’এ। ইলেকট্রনিক সিগারেট পাশে রেখে এখন তাঁর মুখে একটা বাঁকানো মাইক্রোফোন। বাসে এসে পরেছেন বাকী যাত্রীরাও। আমাদের চারজন ছাড়াও রয়েছেন, ক্যানাডা ও ফরাসী দেশের এক এক জোড়া নারী পুরুষ। আমরা চার আর এই দুই যুগল মিলিয়ে – মোট আটটি প্রাণী। আর রায়ান।
কিন্তু রায়ানের হিসেব নাকি বলছে এখনও আসা বাকী রয়ে গিয়েছে আরও তিনজনের। ঘড়িতে আটটা বেজে দশ মিনিট। ফরাসী নারীটির সাথে ক্যানাডিয়ান মহিলাটির আলাপ পর্ব এতক্ষণে শেষ। অন্যদিকে পুরুষ দুজন কেমন সুন্দর নিজেদের মধ্যে বিড়বিড় করে গল্প শুরু করে দিয়েছেন। এঁরা কিরকম সহজেই একে অন্যের সাথে আলাপ জমিয়ে ফেলতে পারেন! সাত নম্বর বে’তে এসে দাঁড়িয়েছে আরও একটি গাড়ি। সে গাড়ির চালক একজন ক্ষীণকায় বৃদ্ধ। সাত নম্বরের অপেক্ষমাণ কিছু পর্যটক উঠে পরলেন সেই গাড়িটিতেই। আমাদের গাড়ির বিদেশিনী দুজন সেই বৃদ্ধকে দেখে বুঝি হেসে কুটোপাটি হলেন। অন্যদিকে আমরা চারজন চুপচাপ, মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছি।
এবারে ব্যস্ত হয়ে পরেছেন রায়ান নিজেই। আমাদেরও বেশ রাগ হচ্ছিল, বাকী তিন জনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেখে। মাইক্রোফোনটোন খুলে রেখে রায়ান নেমে পরলেন গাড়ি থেকে আর আমিও সেই সুযোগে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলাম। ঘনঘন ঘড়ি দেখছেন রায়ান। এই বাজারে লোকটার সাথে একটু ভাব জমানোর খাতিরেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কি আমার ভারতীয় সিগারেট একটা খাবে”? রায়ান আমার কথার জবাব আর দিতে পারলেন না। কারণ কোত্থেকে যেন ভোজবাজির মতন তাঁর বাকী তিনজন অতিথি পৌঁছে গিয়েছেন ছয় নম্বরে। আর আরও মজার কথা হল, দেখা গেল তিনজনেই দেশী। একটি মধ্যবয়েসি দম্পতি। তাদের মধ্যে নারীটি বেশ স্থূলকায় ঢোসকা চেহারার, একটা বেঢপ রকমের জিনসের পেন্টুলুন পরেছেন। পুরুষটির একটু বেশীই কেতাদুরস্ত চলনবলন আর একটি পুঁচকে ছোকরা গোছের যুবক। তবে এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, এঁরা ভারতীয়, নাকি পাকিস্তানের বাংলাদেশের মানুষ? বিদেশ বিভূঁইয়ে নিজের লোক দেখে, আমার রাগ মুহূর্তে জল হয়ে গেল! তারপরে দেখলাম রায়ানও মিটিমিটি হাসছেন। কারণ, যুবকটি লাজুক মুখে বাসে উঠে পরলেও, অন্য পুরুষটি রায়ানের দুর্বিনীত মুখচোখ দেখে, ক্ষমাভিক্ষা করতে গিয়ে, একদম সটান জাপটে ধরেছেন রায়ানকে।
চলবে…
Leave a comment