হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৩৬ : স্কটল্যান্ড তৃতীয় দিন (৩) · জুন ২০১৯

ইনভার্ণেসে আমাদের হোটেলের নামটা বেশ গালভরা। ম্যাকডোনাল্ড ড্রামোসি হোটেল। জায়গাটা শহরের একটু বাইরের দিকে। ইন্টারনেটের দৌলতে জানা গিয়েছিলো, হোটেলটা খুব বড় আর নাকি প্রায় দশ একর জমি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। রেল স্টেশন থেকে মিনিট পঁচিশেক লেগে গেল ট্যাক্সিতে চেপে সেখানে পোঁছতে। হোটেল তো নয়, যেন খাঁখাঁ এক বিস্তৃত প্রান্তরে, একটা ছোটোখাটো প্রাসাদ গোছের বাড়ীখানা। ঠিক বাঙলা ভাষায়ে বর্ণনা করে বোঝানো যাবেনা জায়গাটার মধ্যে কতটা পরিমাণে শূন্যতা রয়েছে! যতদূর চোখ যাচ্ছে, দুপাশটা ঘন সবুজ অঞ্চল। ঝিরঝির করে একটানা একঘেয়ে বর্ষা হয়ে চলেছে। আর তার সাথে চলছে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। ট্যাক্সিচালক জন জানালেন, ইনভার্ণেসের এরকম আবহাওয়া নাকি চলবে আরও তিন থেকে চার দিন। মাঝখান থেকে একমাত্র ভাল খবর হচ্ছে, কাজে লেগে যাচ্ছে ধার করে আনা ইয়েতিমার্কা নীল জ্যাকেটটা। এমন বেয়াড়া আবহাওয়া এ’মুলুকে আসা ইস্তক পাইনি আমরা। হোটেলটার মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে, একশো মিটার মতন ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে একটা গাড়িবারান্দায়ে এসে থেমেছে আমাদের ট্যাক্সিক্যাব। দুপাশের সবুজ লনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটি বিশালকার শিংওয়ালা হরিণের তাগড়াই মূর্তি! এগুলিকেই বোধহয় বলে স্ট্যাগ। আরও এদিক ওদিক কিছু অন্য মর্মরমূর্তি। স্কটল্যান্ডীয় রাজপুরুষদের হবে হয়তো।

তবে এখনও অবধি ইনভার্ণেস পৌঁছে অবধি যা দেখা গেল, সব আছে এখানে। স্টাগের মূর্তি, প্রাসাদোপম হোটেল, কনকনে বাতাস, কেবল জ্যান্ত প্রাণী নেই একটিও। কেউ বললে বিশ্বাস করবেনা, স্টেশন থেকে নেমে হোটেলে আসার রাস্তায়ে এখনও পর্যন্ত মানুষ দেখিনি একটিও। হেঁচড়ে-পেঁচরে মালপত্তর নিয়ে হোটেলের রিভলভিং দরজা খুলে ঢুকেও কারোর টিকি দেখতে পাওয়া গেলনা। লবিটি রীতিমতন বড় হলেও, রিসেপশন কাউন্টারটি ছোট। এককোনায়ে দুটো চেয়ার টেবিল আর কম্পিউটার দিয়ে যথেষ্ট অত্যাধুনিক ভাবেই সাজানো। কিন্তু সেই চেয়ার টেবিলে বসার লোকটি যেন কোনো এক ছুমন্তরে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। গোটা লবিটির দামী নরম গালিচার উপরে বিভিন্ন কারুকাজের সোফা আর আরামকেদারা দিয়ে সৌন্দর্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। আর নিভু-নিভু কোমল কিছু ল্যাম্পশেডের আলোয়ে সে কেমন একটা রহস্যময় রূপ ধারণ করেছে। টেবিলগুলিতে কয়েকটি ওয়াইনের খালি গেলাস আর গোটা লবিতে খেলে বেড়াচ্ছে দুটি শিশু।

আউটল্যান্ডার টিভি সিরিয়ালের দৌলতে ইনভার্ণেসের নাম আমার গিন্নির অজানা না থাকলেও, এই শহরের নাম আমি প্রথম শুনি আমাদের ট্র্যাভেল এজেন্ট মেয়েটির মুখে। অর্থাৎ এই বছরেরই মার্চ-এপ্রিল মাসে। তারপরে বারকয়েক গুগল-টুগল করে দেখলেও, এর আগে ইতিহাস বা ভূগোলের কোন বই বা ভ্রমণকাহিনীতে, ইনভার্ণেস নামক স্কটল্যান্ডের কোন শহরের নাম আমার শোনা হয়ে ওঠেনি। ট্র্যাভেলের মেয়েটির কাছে যখন মুখ ফুটে জানতে চেয়েছিলাম, ইনভার্ণেসটা কি? খায় না মাথায় মাখে? সে জায়গাটিতে কি বেকার কিছু খরচা বাড়িয়ে, না গেলেই নয়? মেয়েটি তখন প্রায় টানা আধমিনিট কোন কথা বলতে পারেনি! নিঃশব্দ বিস্ময়ে তাকিয়েছিল আমার দিকে। গিন্নিই তখন কোনওরকমে সামলে দিয়েছিলেন আমার অজ্ঞানতা। মেয়েটি জানিয়েছিল, পর্যটকরা মূলত ইনভার্ণেস শহরে আসে স্কটল্যান্ডের নৈসর্গিক শোভা দেখতে। এছাড়া আজকে সকালে ট্রেনে আসার সময়ে গিন্নি জানিয়েছিলেন, আউটল্যান্ডার সিরিয়ালের বিখ্যাত সেই কুলোডন ব্যাটেলফিল্ডটি নাকি এই আমাদের ড্রামোসি হোটেলের থেকে গাড়ীতে মিনিট পনেরো কুড়ি। ট্যাক্সি ড্রাইভার জন’কে নাকি বলে দেওয়া রয়েছে, আজকে বিকেলের দিকে সময় পেলে, দেখে আসা যাবে সেই যুদ্ধক্ষেত্রটি। অবশ্য জন নাকি এ’ও জানিয়েছেন, যে সেই যুদ্ধক্ষেত্রটি এখন এত সুন্দর সবুজ মাঠ যে, কল্পনাও করা যাবেনা এই মাঠে এমন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ইতিহাসে ঘটে গিয়েছে।

সুতরাং জায়গাটি সম্পর্কে এতকিছু হৃদয়গ্রাহী গল্প শুনে, প্রত্যাশা তো স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে থাকারই কথা। হোটেলটা বা জায়গাটা যে আমাদের অপছন্দ হয়েছে, তা নয়। কিন্তু এরকম জনশূন্য হোটেলে জীবনে এই প্রথমবার। তাছাড়া ফোর স্টার – ফাইভ স্টার হোটেল এসব। খাবারদাবার কিছু খেতে হলেও তো দেখা যাচ্ছে রুম সার্ভিস ছাড়া কোন গতি নেই। আর বাইরে দশ বারো মাইলের রেডিয়াসে কোনপ্রকার রেস্তরাঁ আছে বলে তো মনে হয়না। বেশ অপ্রসন্ন হয়ে মালপত্তর লবির মাঝখানে রেখে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ট্যাক্সিচালক জনই ধরে আনলেন হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের লোকটিকে। জনের মুখে শুনলাম, আসল ঘটনা আর কিছুই নয়, হোটেলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। ব্যাঙ্কোয়েট হলে। সেই বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতেই নাকি সব কর্মচারীরা ব্যস্ত ছিলেন। জন ভদ্রলোক এই ইনভার্ণেসেরই বাসিন্দা। তিনি জানালেন, ইনভার্ণেস শহরে অনেক বিখ্যাত গির্জা, শপিং প্লাজা, রেস্তরাঁ আর বেশ কয়েকটি মিউজিয়াম রয়েছে। কিন্তু সেগুলি সবই সিটি সেন্টারে। আর সিটি সেন্টার ড্রামোসি হোটেল থেকে কিছু না’হলেও বারো পনেরো মাইল দুরে তো হবেই। মানে আধঘণ্টার মামলা।

তাহলে আমরা দুপুরে খাবটা কি? মনটা খাঁটি প্রকৃতিপ্রেমিক হলেও, পেট তো এদিকে ভালই চুঁইচুঁই করছে। গিন্নি হোটেলের বিছানার নরম গদিটদি যাচাই করে দেখলেও, ছোটটি আমাদের কাঁচুমাচু মুখে, বেঁচে থাকা কেক-বিস্কুটের প্যাকেট খুঁজেপেতে  কিছু টুকরোটাকরা মুখে চালান করছে। পালকি এদিকে খবর দিচ্ছে, রুম সার্ভিসের মেনুতে সব কিছুই নাকি প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ পাউন্ডের কাছাকাছি। অর্থাৎ, নামে নামে চারখানা প্লেট অর্ডার করতে হলে, অন্ততঃপক্ষে শ’খানেক পাউন্ডের ধাক্কা। বৃষ্টিটা বোধহয় একটু কমেছে। তবে বাইরেটা কিন্তু এখনও বেশ ঝাপসা দেখাচ্ছে। গিন্নি রোমাঞ্চিত হয়ে বিছানা থেকে উঠে জানালার কপাটটা খুলে দিতেই ঘরে ঢুকে এলো একটুখানি মেঘ। যেন পোষা বেড়াল একখানা। একটু আবেগকম্পিত হয়েই বলে ফেললেন, একি কাণ্ড গো? একদম ভিজে যাবো যে! ঘরের ভিতর এক পশলা মেঘের উপস্থিতি দেখে, ইনভার্ণেসের উপরে তখন আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছে। অন্যদিকে রুম সার্ভিসের মেনু নিয়ে পরেছে দুই বোন! এক লাইন করে দেখছে আর ঠোঁট উলটোচ্ছে দুজনেই! অকস্মাৎ এরই মধ্যে ছোটটি ভুরু নাচিয়ে বলে উঠল, বাবা! এখানে ডমিনোজ বা সুইগি নেই? রুম সার্ভিস না করে, ফোনে কিছু একটা অর্ডার করে দিলে হয়না? আমাদের কর্তা গিন্নির দুজনেরই নজর মেঘের দিক থেকে মুহূর্তে ঘুরে গেল আমাদের ক্ষুধার্ত দুটি কন্যার উপর।

চলবে…

Leave a comment