যুবকটির বুকের বাঁদিকে স্কটরেল কোম্পানীর যে ব্যাজটি ধারণ করা ছিল, তাতে তাঁর নাম লেখা ছিল ‘অমিত’। অর্থাৎ কিনা নির্ঘাত সে ভারতের লোক। আর তা না হলেও, নামটা তো ভারতীয় হতেই হবে। কারণ, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কায়ে কি কারোর নাম অমিত হতে পারে? অবশ্য ছেলেটি কিন্তু বাংলাদেশী হতেই পারে! তার মানে তো বাঙালী… আরে, সে তো আমরাও বাঙাল। তাহলে কি তখনই এডিনব্র প্ল্যাটফর্মে চিল্লিয়ে বলা উচিত ছিল, অমিত… আমি বাঙাল, একদম খাস ঢাকার বাঙাল! জেলা বিক্রমপুর। এই এতক্ষণে একটা ক্ষীণ আশা জাগছে মনে। ভারতীয় হোক বা বাংলাদেশী, এই অমিতেরই মাধ্যমে স্কটরেলের অসমীচীন নিয়মের একটা জুতসই বদলা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কি চূড়ান্ত আন্তরিকতাহীন কোম্পানী রে বাবা! ফার্স্ট ক্লাসের টিকিটে নাকি কোনরকম সীট নম্বর, কোচ নম্বর থাকবেনা। মামদোবাজির কারবার! মাঝে মাঝে নাকি টুরিস্ট সিজনে, একআধ দিন এমন নিয়ম হতেই পারে! সেই সব দিনে পুরোটাই নাকি ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ ব্যাপার। আগে এসো, আগে বোসো! মুঠোয়ে চারটে টাটকা তাজা টিকিট, ফার্স্ট ক্লাসের! সেই কবে লন্ডন কিংস ক্রস স্টেশন থেকে প্রিন্ট আউট করে সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছিল আমার কম্পিউটার ব্যাগটায়ে! আর এখন কিনা, একটা অপ্রশস্ত সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টের বাথরুমের সামনে চারখানা পেল্লায় সুটকেস নিয়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে একটা ভারতীয় পরিবার। বেচারা আর কাদের বলে? অদূরেই ফার্স্ট ক্লাসের সীটগুলি, আর গদিআঁটা নরম চেয়ারে আরাম করে পায়ের উপর পা তুলে খবরের কাগজ পড়ছেন গোটা বিশেক সাহেব মেমসাহেব!
প্ল্যাটফর্মে গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকার সময়েই এক প্রবীণা মেমসাহেবের সাথে আমার অমার্জিত বাকবিতণ্ডা শুনে এগিয়ে এসেছিলেন অমিত। বৃদ্ধাটি তখন আমাকে স্কটরেলের রাশ – ডে’র নিয়ম বোঝাচ্ছেন আর আমরা চরম ভদ্রতার সাথে ক্রমাগত বলে চলেছি, রাশ-ডে হোক আর যাই হোক না কেন! কোম্পানীর এই নিয়ম চরম অনুচিত। তোমাদের এমন আদবকায়দাদুরস্ত দেশের সভ্য রেলকোম্পানীতে এমন একুশে আইন সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়! পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন গুটিকতক স্কটরেলের কর্মচারী। আর তাদের মধ্যেই ছিলেন অমিত। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরে, এ হেন ন্যায়বিরুদ্ধ দৃশ্য দেখে অমিতও যেন কি একটা বলছিলেন বাকীদের! তখনই আমাদের চিল্লিয়ে ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু বেআক্কেলে ট্রেনটা ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে।
এর থেকেও বিরক্তিকর ট্রেনযাত্রা আগে আমি করেছি। জম্মু যেতে গিয়ে পরপর দুরাত কাটিয়ে দিয়েছি চীনেবাদামের খোলার মাঝে। স্লিপার ক্লাসের মেঝেতে। একবার তো কাটিহার থেকে নর্থ বিহারের সহরসা নামের একটি শহরে যেতে গিয়ে চরম দুর্ভগ পোয়াতে হয়েছিল আমাদের।মাঝরাতে বাঙ্কে শুয়ে পরার মিনিট দশেক পরেই একঝাঁক তীর্থযাত্রী তুলে দিয়েছিল আমাদের। তবে তখন বয়েস ছিল নিতান্তই অল্প। শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্য তেমন গায়ে লাগতনা। তাছাড়া এই কিছুকাল আগেও, সীট রিজার্ভ করে ট্রেনে চেপে, কিছু না হলেও বার দশেক নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে কোন প্রবীণ মানুষকে। তাতে অবশ্য খারাপ লাগার চেয়ে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যেত অনেক বেশী।
আমাদের বাকী তিনজনে বসে রয়েছে কাঠের মতন। বাথরুমের বাইরে তিনটে সীট পাওয়া গিয়েছে। তার একটিতে এক মেমসাহেব আর দুটোটে ভাগাভাগি করে আমরা বাকীরা। পালকির দুটো ভুরুর মাঝখানটা ভয়ানক রকমের কুঁচকে রয়েছে। অন্যদিকে গিন্নির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিরক্ত হয়েছিলেন তিনিও। কিন্তু এখন চোখাচুখি হতেই মুচকি হাসলেন আমার দিকে চেয়ে। বুঝলাম আর কোনরকম বেকার ঝামেলা চাইছেননা শান্তিপ্রিয়া মহিলাটি। চাইছেননা ব্যাপারটার আর কোন পুনরুল্লেখ।
সামনে দিয়ে হেঁটে বাথরুমে গেলেন একজন লালমুখো সাহেব! লোকটাকে দেখতে একটা পশুর মতন। তাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, এই পশুটারই নাম কর্নেল ডায়ার। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, ব্যাটার হাতে এখনও জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্ত লেগে রয়েছে। গিন্নি মুখে স্মিত হাসি বজায় রাখলে, আমার মাথায়ে ঘুরছে চরম বাস্তব। ব্যাটারা তো বাঙলায়ে এসেছিল সাধারণ ব্যবসা করতে। আর তারপরেই কথার খেলাপ করেছে এঁরা। তারপরে পলাশীর খলনায়ক ক্লাইভের হাত ধরে শুরু হয়ে যায় পাইকারি হারে লুঠপাট, নির্যাতন আর দিনেদুপুরে রাহাজানি। নইলে এতো অল্প সময়ের মধ্যে একটা গোটা দেশ ব্যাটাদের পক্ষে দখল করা সম্ভব হতনা! অপমানে আমার বুকের অনেকটা বেশ অবশ মতন লাগে!
স্কটরেলের এই লাইনটিকে বলে হাইল্যান্ড মেনলাইন। এডিনব্র, গ্লাসগো বা লন্ডন থেকে ফার নর্থ লাইনে পরতে হলে, যেকোনো ট্রেনকেই আগে হাইল্যান্ড লাইন দিয়ে ইনভার্ণেস যেতে হবে। ফার নর্থ আর হাইল্যান্ডের মধ্যে ইনভার্ণেসকে অনায়াসে ‘বর্ধমান’ বলা চলে। সে মেন লাইনই হোক বা কর্ড লাইন, ট্রেন সেই বর্ধমান গিয়ে দাঁড়াবেই দাঁড়াবে! তবে এই হাইল্যান্ড লাইনের অনেকটাই নাকি এখনও সিঙ্গল লাইন। কিন্তু তাতেও কোনরকম অসুবিধা হয়না। কারণ এডিনব্র থেকে ইনভার্ণেসের ট্রেন দিনে মাত্র চারটি। একটু আগেই ডানপাশে চলে গেল, ডালহুইনি নামের একটি স্টেশন। এই ডালহুইনি নামের একটি মল্ট হুইস্কি খুব বিখ্যাত। যে মহিলাটি এডিনব্র প্ল্যাটফর্মে আমাদের বোঝাচ্ছিলেন স্কটরেলের রাশ-ডে’র নিয়ম, দেখলাম তিনি এবার নিজের সীট ছেড়ে এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। ভাবলাম উনি হয়ত বাথরুমে যাবেন! কিন্তু বগলদাবা করে সঙ্গে উনি নিয়ে এসেছেন ফার্স্টক্লাসের একটি পরিচারিকা মেয়েকে। মেয়েটির সাথে একটা কফির পাত্র আর একটা ট্রে’তে হরেক রকম কেক বিস্কুট।
এডিনব্র প্ল্যাটফর্মের বিতণ্ডার বিষাদ এখনও ঠোঁটে টাটকা রয়ে গিয়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের সাথে সাথে এখন আবার আবছা মনে পরে যাচ্ছে রক্ত গরম করা চউরি-চউরা’র ঘটনা। কিন্তু আমাদের ছোটটির ক্ষুধার্ত মুখের দিকে চেয়ে সমস্ত কাতরতা যেন একটা ঢোঁকেই গিলে নিলাম। একচুমুক কফি পান করেই বৃদ্ধা মহিলার সাথে আমরা সকলে নিঃসঙ্কোচে ভাব করে নিলাম। পরের স্টেশন অ্যাভিমোর। নীল সুন্দরী ট্রেনটা গিয়ে সবে দাঁড়িয়েছে প্ল্যাটফর্মে, কোত্থেকে যেন হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের কামরায়ে উঠে এসেছেন অমিত! আমার সর্বাঙ্গে একটা শিহরন হল। কালো রঙের টাইটা খুলে রেখেছেন। বেশ ব্যস্ত হয়ে, পালকির থেকে চারখানি টিকিট নিয়ে সইসাবুদ করে দিয়ে জানালেন, কিছুদিনের মধ্যেই নাকি আমাদের রিফান্ড প্রসেস করে দেওয়া হবে। এই তাঁর সই’টাই নাকি প্রমাণ! গিন্নির দিকে চেয়ে দেখলাম, ওষ্ঠে বেশ একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রেখেছেন। জাদুর মতন এসেছিলেন আবার জাদুর মতন অমিত উধাও হয়ে গেলেন অ্যাভিমোরেই! মনে মনে অমিতের প্রতি একটা প্রবল টান অনুভব করলেও, তাঁকে আর জিজ্ঞাসা করা হলনা… অমিত, তুমি কি বাঙালী?
চলবে…
Leave a comment