আপাতদৃষ্টিতে কথাটা শুনতে খারাপ লাগবে আর অনেকেই হয়ত ভিন্নমত হবেন। তবে এখনও অবধি সব দেখেশুনে, যা মনে হচ্ছে, ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ড মিলিয়ে গোটা বিলেত দেশটার কিন্তু ঐতিহ্যের পিছনে একটা অদ্ভুত রকমের লোভ রয়েছে। সারা বিশ্বের কাছে একটা যেন নাম কিনে নেওয়ার খিদে। হ্যাঁ, আছে ওঁদের অনেক কিছুই। সবই ভীষণ সুদৃশ্য আর বনেদিয়ানার ছাপ সুস্পষ্ট। কিন্তু তাই বলে সেই চমৎকারিত্ব, সমস্ত কিছুতে বিদ্যমান নয়। নইলে অ্যানড্রু’র মতন ঝাড়াঝাপটা লোকের, কিন্তু লখ লমন্ডের মতন একটা অতি সাধারণ দীঘিকে এমন অত্যুক্তি করে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে না বললেও চলত। কই, চিল্কা হ্রদ দেখাতে নিয়ে যাওয়ার সময় তো ওড়িয়া গাইড লোকটি কোনদিন ক্যস্পিয়ান সাগর, মিশিগ্যান বা অন্টারিও লেকের সাথে চিল্কার অকারণ তুলনা টানেননা। এদিকে গতকাল গ্লেনগয়েন থেকে বেরিয়ে, লখ লমন্ডের কাহিনী বর্ণনা করার সময়ে, অ্যানড্রু ভূগোলের ব্যাপারটাকে অনাবশ্যক ভাবে ঐতিহাসিক করে তুলতে গিয়ে, প্রায় নিওলিথিক-চালকোলিথিক করে ছেড়েছিলেন আরকি! গিন্নি তো অ্যানড্রুর মুখে সেই সব শুনে মুখ এমন করে ফেলেছিলেন, যেন স্কটল্যান্ডে বেড়াতে এসে মানস সরোবরটাও মাগনায়ে দেখা হয়ে যাচ্ছে অ্যানড্রুর দৌলতে। বিরক্তি লেগেছিল আমার। কিন্তু তাও ভেবে দেখেছিলাম, কাল সকালেই তো এডিনব্র ছেড়ে চলে যাচ্ছি ইনভার্ণেস। নইলে গুগল-টুগল ঘেঁটে একটা মুখের মতন জবাব দিয়ে দেওয়া যেত ভদ্রলোককে।
আসলে মানুষ হিসেবে আমরা ভারতীয়রা বুঝি বড্ড বেশী লাজুক। কিসের জন্য, কোন অজানা কারণে যে সাহেব-মেম দেখলে আমরা এত আমতা – আমতা করি, তার কোনও যুক্তি আসেনা আমার মাথায়। নইলে কোনও সাধারণ বিষয়কে মেলোড্রামাটিক করে তুলতে বাঙালীর তো বিশেষ কসরত করার কথা নয়। একটা ক্ষয়াটে চেহারার দীঘি। শান্ত আর যথেষ্ট মনোরম। লম্বা অনেকটাই। তাতে মিশমিশে কালো জল আর তার চারপাশটা আগাগোড়া পাথরে বাঁধানো। কয়েকটি পরিবার চড়ুইভাতি মতন করছিলেন দীঘিটির আশেপাশে। অবশ্য রান্নাবান্না কাউকে সেরকম করতে দেখা যায়নি। বরং লোকজন, ছেলেপিলেরা খেলাধুলা করছিল বেশী। এমনকি অনেকেই তাঁদের পোষা কুকুরটিকে পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছেন। তারাও লমন্ডের হাড়হিম করা জলে, শরীরটা কিঞ্চিত ডুবিয়েই, ঝাঁকিয়ে জল ঝেড়ে ফেলছে। আমরা যেদিকটা দাঁড়িয়েছিলাম, লমন্ড হ্রদের সেই পাড়ে অনেক ঝোপঝাড় আর তারই মাঝে লুকিয়ে একটা ক্যাফে। সকলেই সেখানে খোলা আকাশের নিচে বসে বীয়ার বা কফি পান করছে। এই দৃশ্য দেখে, আর যাই হোক, হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি বেড়ে যায়না।
তাছাড়া লখ লমন্ড চত্বরে পা রেখেই আমার কেন জানিনা মনে হয়েছিল, আরে! এই জায়গাটা তো আমার ভীষণ চেনা। একদম যেন আমাদের রবীন্দ্র সরোবরের মতন। ওই ঝোপঝাড়ের মধ্যেই কয়েকটি বেঁটে গাছ তাদের শাখা নুইয়ে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পরেছে। লন্ডন বা এডিনব্র শহরের সব কিছু দেখেশুনে যেমন ভারত ভারত বলে মনে হয়না, লখ লমন্ড কিন্তু আহামরি তেমন কিছুই নয়। বিলেতের সমগ্র সভ্য মানুষ যদি ভেবে নিয়ে থাকেন ভগবান তাঁদেরকে, আর একমাত্র তাঁদেরকেই নিজের সব ধনসম্পত্তি উজার করে দিয়ে দিয়েছেন, তবে কিন্তু তারা ভুল। সাধারণ, অসাধারণ আর অনন্যসাধারণ মিলিয়েই তো ঈশ্বরের সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ হয়ত বাঙালির তথা ভারতের সবচাইতে নামীদামী লেখক, এমনকি বিশ্বের দরবারেও তিনি সুবিখ্যাত! কিন্তু তাই বলেই কি রবীন্দ্রনাথ একটা শরৎবাবুর মতন উপন্যাস লিখে ফেলবেন? অথবা শেক্সপিয়ার সাহেবের মতন একটা নাটক?
আমাদের আজকের ইনভার্ণেস যাওয়া আবার সেই ট্রেনেই। এডিনব্র ওয়াভেরলি স্টেশন থেকে সকাল সাড়ে দশটায় স্কটরেলের টিকিট, আর এইবারও সাহস করে সেই ফার্স্ট ক্লাস’এর। তবে এই ফার্স্ট ক্লাসের টিকিটের দাম কিন্তু লন্ডন নর্থ ইস্টার্ন রেলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। কে জানে, কমদামী ফার্স্ট ক্লাসে, খাবার দাবার বা পানীয়, হয়ত স্কটরেলের সেবিকারা বোধহয় মেপেঝুপে দেবেন! ওয়াভেরলি স্টেশনে ন’টার মধ্যে পৌঁছে দিলেন অ্যানড্রুই। ট্রেনে ভালমন্দ কি খেতে পাবো জানা নেই! সেই চিন্তায়, আজকের হোটেলের ব্রেকফাস্টটা একটু বেশী করেই খেয়ে নেওয়া গেল। তবে এই হলিডে ইন হোটেলের ব্রেকফাস্ট’টা একটু কিরকম ধরণের যেন! ধাপে ধাপে প্রচুর খাবার দাবার বুফেতে রাখা রয়েছে। কিন্তু ডিম, দুধ আর পাউরুটি ছাড়া সবকটাই কিরকম একট বদখত দেখতে। সসেজগুলি খুব বেশী রকমের মোটা আর এমনকি বিশাল কাঁচের বাটিতে জমানো দইটাও কেমন যেন একটা হলদেটে রঙের। আসলে বুঝি মাথার মধ্যে এখনও ওই ভেড়ার ফুসফুস দিয়ে তৈরি করা হ্যাগিস পুডিং’এর ছবিটা ভাসছে। গরুর মাংস ছাড়া, খাবারের ব্যাপারে আমার সেরকম কোন বাছবিচার কিছু নেই। তবুও ওই ঘোলাটে দইটা দেখে কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠেছিল।
ওয়াভেরলি স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি দৈর্ঘ্যে বেশ ছোট আর দেখতে খুবই সুন্দরী। ঘন নীল রঙের তার শরীর। আর তার মাঝে মাঝে হালকা ছাই রঙের স্ট্রাইপ। ঘড়িতে দশটা বেজে গিয়েছে। ট্রেনটা স্টেশনে দাড়িয়ে রইলেও, ভিতরে ওঠা যাচ্ছেনা। কারণ দরজাগুলি ভিতর থেকে এখনও কুলুপ আঁটা অবস্থাতেই রয়েছে। আকাশী নীল জামা আর গলায় কালো টাই বাঁধা অনেককটি মানুষ দৌড়োদৌড়ি করছেন প্ল্যাটফর্মে গত মিনিট দশেক ধরে। কিন্তু কেউই আর দরজাটা খুলে দিচ্ছেন না। আর এদিকে আমাদের মালপত্তরও তো খুব কম কিছু নয়। কিংস ক্রস থেকে এডিনব্র’র ট্রেনে চেপে, আমাদের চারখানা ঢাউস সুটকেস সাইজ করে রাখতে গিয়ে কিন্তু কালঘাম বেরিয়ে গিয়েছিলো। আর সেই জন্যই, প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনোর পড় থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছিল, অন্ততঃপক্ষে যেন ফার্স্ট ক্লাস কোচের সামনেটা গিয়ে সটান অপেক্ষা করতে পারি। একটা অসাধারণ সূর্য উঠেছে আর সেই সূর্যালোকে আমি প্ল্যাটফর্মের উলটোদিকের একটা গির্জার ছবি নেওয়ার চেষ্টা করছি। পালকি তার মায়ের সহযোগিতায়ে টিকিটের প্রিন্টার উপরে খোঁজার চেষ্টা করছে কোচ নম্বর আর সীট নম্বর! আর বিপত্তির শুরু সেখানেই।
চলবে…
Leave a comment