ডানপাশটা কিন্তু এবারে বেশ অরণ্য-অরণ্যের মতনই লাগছে। আমাদেরটা ছাড়া আর তেমন কোন যানবাহন আশেপাশে দেখা যাচ্ছেনা। একটা প্রশস্ত কালো রাস্তা আর তার দুপাশে প্রকাণ্ডকায় শাল-সেগুণের গাছ। আবহাওয়ায়ে সামান্য শীতল আঁচ পেয়ে, জানালার কাঁচগুলো ইতিমধ্যে নামিয়ে দিয়েছেন অ্যানড্রু আর তাতে বোধহয় আমাদের ছোটটির গা ছমছম করছে। এই বুঝি একটা মস্ত চিতাবাঘ তার দিকে ঝুপ করে লাফিয়ে পরবে। তবে এই অরণ্য একদমই পাতলা, কোন বন্যপ্রাণী নেই, অ্যানড্রুর মুখে এইরকম খবর শুনে এখন একটু স্বস্তি পেয়েছে সে। আমার আবার কেন জানিনা, সাজানো কোন কিছুই পছন্দ লাগেনা। অরণ্য হলে, সেটা যদি হত পালামৌ’এর মতন! ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া নাম না জানা শয়ে-শয়ে গাছ উপরের দিকে গোল হয়ে ঢেকে দেবে আকাশটাকে, কোমর উঁচু ঘাসের ভিতর দিয়ে অসংযত পায়ে হেঁটে যাব আমরা শৈশবের কয়েকজন মিলে। পায়জামা’য়ে লেগে থাকবে বনকাঁটা, সূর্য ডুবলে একটা স্টেটসম্যান পত্রিকার বদলে, গুটিকতক আধুনিক মোবাইল ফোন বিনষ্ট করে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, এগিয়ে যাবো একটা মহুয়ার ঠেকের দিকে।
তাল কেটে যাচ্ছে ‘রবার্ট-দ্য-ব্রুস’ এর গল্পে। বিভিন্ন স্কটিশ রাজারানি সমেত স্কটল্যান্ডের হরেক ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত নিয়ে অ্যানড্রু আর গিন্নির আড্ডা বেশ জমে উঠেছে আর ঘড়ি এখন দুপুর পেরিয়ে বিকেলের দিকে। গিন্নির মুখে গেলিক ভাষার প্রসঙ্গ শুনে অ্যানড্রুকে দেখা গেল যারপরনাই উত্তেজিত। বেশ ব্যস্ত হয়ে তিনি আমাদের গেলিক আর ইংরিজির তফাত বোঝাতে বসেছেন। এই বনে বন্যপ্রাণী না থাকলেও, দেখা গেল, পাখি রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। পাখির ডাক শুনতে পেলে আবার আমার সেই সময়টাতে মানুষের কণ্ঠস্বর একেবারে ভাল লাগেনা। কিন্তু কি আর করা যাবে?
লখ লমন্ড পৌঁছনোর আগে অ্যানড্রু আমাদের নিয়ে এসেছেন এক স্থানীয় হুইস্কি ডিস্টিলারি’তে। ডিস্টিলারিটির নাম গ্লেনগয়েন। আমাদের দেশে গ্লেনফিডিখের নাম তো নিয়মিত রূপে শুনেছি। গ্লেনমোরাঞ্জি শুনেছি। শুনেছি গ্লেনলিভেটের নামও। কিন্তু গ্লেনগয়েন নামের এই পানীয়টির নাম শুনিনি দেখে অ্যানড্রু দেখলাম বেশ বিস্মিত হলেন। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে, কারখানা টারখানা কিচ্ছু নয়, একটা বড়সড় রকমের গ্রামের বাড়ী, গাঢ় লাল রঙের টালির ছাদ। অনেক রকম গাছপালা দিয়ে সাজানো সে বাড়ী আর বাড়ীর সামনেই একটা বর্ণময় ফুলের বাগান। বেশ কিছু পর্যটক এসেছেন। সকলেই সাহেব মেমসাহেব। ডিস্টিলারি পরিপালন করছেন যারা, তারা সব পর্যটকদের থেকে তমসুক লিখিয়ে রাখছেন, ড্রিঙ্কিং অ্যান্ড ড্রাইভিং’এর আইনের জন্য। ডিস্টিলারিতে ঢুকতে গেলে, টিকিট জনাপ্রতি বারো পাউন্ডের। আর জানা গেল ডিস্টিলারির থেকেই মল্ট-হুইস্কি বা মদ্যপানের অন্য কোনও সামগ্রী খরিদ করলে আরও কিছু-কিছু ছাড় পাওয়া যাবে। যেমন আটান্ন পাউন্ডের একটি সাতশো মিলির বোতল পাওয়া যাবে মাত্র পঁয়তাল্লিশ পাউন্ডে। আর দেখলাম, সামগ্রী রেখেছেনও এঁরা। মল্ট হুইস্কি পান করতে গেলে যে এত রকমের সাজ সরঞ্জাম লাগে, তা আমাদের আগে জানা ছিলোনা।
ডিস্টিলারির ভিতরের থেকে বাইরেটা বেশী মনোরম। তবে বাতাসে একটা কিরকম যেন স্যাঁতস্যাঁতে ভাব রয়েছে আর যেন কেউ কিছু না বলে দিলেও বোঝা যাচ্ছে, কারখানার পেছনেই হয় একটা নদী নয়ত একটা ঝর্না রয়েছে। একটা সদ্য বর্ষা হয়ে যাওয়া সোঁদা গন্ধ, আর তার মধ্যে কয়েকটা অতীব সুন্দর বসবার জায়গা। গাছের গুঁড়ি কেটে বানানো হয়েছে পর্যটকদের জন্য। আয়ত্তের মধ্যে হলেই, এইখান থেকেই হয়ত একটা মল্ট হুইস্কির বোতল কিনে দু পাত্তর পান করে নেওয়া যেত। মিশিয়ে নেওয়া যেত ওই ঝর্নার থেকেই খানিকটা জল। কিন্তু আমাদের গোটা পরিবার এইসব বিষয়ে বেশ বাতিকগ্রস্ত, সেই কারণে এই মতলব মাথায়ে এলেও, একটু মুচকি হেসে এগিয়ে গেলাম গাড়ির দিকে। মাথার উপর দিয়ে হুশ করে উড়ে গেল কয়েকটি সারস ধরনের সাদা পাখি। আর আমি সতৃষ্ণ চোখে তাঁদের দেখে নিলাম একবার।
লখ লমন্ডের সঙ্গে আমার ছেলেবেলার সম্পর্ক রয়েছে। আর গাড়ীতে উঠে সেই গল্পই শোনানো হচ্ছিল অ্যানড্রু’কে। অ্যানড্রুর সাথে এই এলাকার সংযোগ অনেকদিনের। তাছাড়া পর্যটনের ব্যবসা করে পেট চালান ভদ্রলোক, এখানকার ভূগোল ইতিহাস ছাড়াও সবরকম স্থানীয় খোঁজখবর নখদর্পণে তাঁর। লখ লমন্ডের যত গল্পই অ্যানড্রু শোনান না কেন, যতই বিস্তারিত করে বলুন না আমাদেরকে, লখ নেসের সাথে লখ লমন্ডের গরমিলের কাহিনী, আমার স্মৃতি কিন্তু তখন দৌড়চ্ছে আনন্দমেলার পাতায়। চোখের সামনে ভাসছে ক্যাপ্টেন হ্যাডক লখ লমন্ড নামের এক পাত্র হুইস্কি পান করছেন, আর কুট্টুস ব্যাটা ক্যাপ্টেনের অসাবধানী গেলাস থেকে ছলকে পরা খানিকটা পানীয় চেটে নিয়ে, অসংলগ্ন ব্যাবহার শুরু করছে। কিন্তু যতদূর মনে পরছে, অনুবাদক লখ’এর জায়গায়, বাঙলায়ে বোধহয় লিখেছিলেন লচ। লচ-লমন্ড। অ্যানড্রু’কে আসল উচ্চারণ লখ না লচ, সামান্য এটুকু জিজ্ঞাসা করাতেই, খেঁকিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। উনি তো আর জানেননা, ওঁদের গেলিক ভাষা নিয়ে আড্ডাটা পুরোটা উপেক্ষা করে গিয়েছিলাম আমি। তাহলে ‘চ’ আর খ’য়ের তফাতটা আর ধরব কি ভাবে ভাই?
চলবে…
Leave a comment