বাঙালী কবিরা জন্ম রোমান্টিক। তাছাড়া শুধু কবি কেন, সব বাঙালী পুরুষ নারীরাই জীবনের কোন না কোন একটা সময়ে, এন্তার পদ্য লেখেন! মুখ্যমন্ত্রীর মতন রাজনীতির জগতের নিয়ন্ত্রিত মানুষেরাও বাদ পরেননা সেই অভ্যাস থেকে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যে কোন ধরণের চরম বিতর্ক বিপদেও বাঙালী কিন্তু নিজের অজান্তে এনে ফেলতে পারেন আকাশ, চাঁদ, বৃষ্টি বা নদীর গল্প। স্কটল্যান্ডের মতন নির্জন তন্ময় সৌন্দর্য আমরা ইহজীবনে দেখিনি। হয়ত ব্রহ্মপুত্রের মতন পুরুষোচিত নয় এই রূপ, হয়ত বা এই রূপ অনেকটাই মেয়েলী! তবুও জীবনানন্দ বা বিভূতিভূষণ এই সযত্নে রাখা মাঠঘাট, প্রান্তর বা এই রাস্তা, এই ঘাস, ধাপধাপ করা চিত্রানুগ ফুলের বাগান, বা এমন একটা নির্মেঘ আকাশ দেখলে কিসের সাথে যে এই প্রকৃতির আদল খুঁজতেন, সে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে বেশ। অন্যদিকে গিন্নি একটু আধটু, বিলেতের ইতিহাস আর মধ্যযুগীয় রোমান সভ্যতা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেললেও, ছোট নদীর উপরে একটা নীরব সেতু বা একটা স্বচ্ছ জলাশয় দেখে কিন্তু সরল বালিকার মতনই ব্যাকুল হয়ে পরছেন থেকে থেকেই।
কাগজে লেখা রয়েছে স্টারলিং’এর পর গ্লাসগো। আর সে জায়গা তো এখান থেকে মাত্র ছাব্বিশ মাইল দুরে। সময় লাগবে একঘণ্টারও কম! কিন্তু গ্লাসগো মানে তো আবার একটা সভ্য শহর। লন্ডন এডিনব্র’র মতন। তার মানে কি আবার কিছু কালচে হলুদ রঙের অট্টালিকা? ঐতিহাসিক স্থাপত্য, পাথরে বাঁধানো রাস্তা, থমথমে গির্জা আর নামজাদা কয়েকটা রেস্তরাঁ? হ্যাঁ, দেশে ফিরে এসে হয়ত, সপ্তাহান্তের আড্ডায়ে জামার কলার উঁচিয়ে বলা চলবে, স্কটল্যান্ডের মুখ্য দুটো শহর দেখে এলুম – এডিনব্র আর গ্লাসগো! কিন্তু মন? মন কি ভরবে আরও একটা ইটের সভ্যতা দেখে? পোর্টকুলিসে বসে হ্যাডক মাছের মধ্যাহ্নভোজন সারতে সারতে এই কথাই কেবল ঘুরছে মাথার মধ্যে। ইশ! কেন যে তখন সাহস করে নিজেরা গাড়ী চালিয়ে এলাম না? আর কিছু না হোক, কারোর অধীনে তো বেড়াতে হতনা। এখন গ্লাসগো না গিয়ে, ইচ্ছেমতন চলে যাওয়া যেত ওই ডানদিকের সবুজ বনানীর দিকে। কিমবা এই রাস্তা ধরেই চলে যাওয়া যেত নাক বরাবর, বেপরোয়া গাড়ী চালিয়ে! কিমবা হুট করে দাঁড়িয়ে পরা যেত ওই বাঁ হাতের চড়ে বেড়ানো ভেড়াগুলির পাশে! অথবা ফিরে যাওয়া যেত ওই বৃক্ষটির কাছে, যেখানে কুচকুচে কালো টুপিপরা পাখিটি টিউ – টিউ শব্দ করে ডাকছিল? আরে, ট্র্যাভেল এজেন্টের কাগজে লেখা থাকলেই কি সেটা তো আর দেশের আইন হয়ে যেতে পারেনা। কিন্তু গ্লাসগো ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা উথাপন করলে অ্যানড্রু যদি বেঁকে বসেন?
এসব দেশের একটা সুবিধা, কিছুটা ঘুরে বেড়ালেই জায়গাটা তেমন আর অচেনা লাগেনা। হিসেবটা চটজলদি বুঝে নিয়ে, মনের মধ্যে একটা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। তাছাড়া আজকের এই প্রযুক্তির যুগে ম্যাপ ব্যাপারটা তো সকলের মুঠোর মধ্যে। স্টারলিং ছেড়ে গ্লাসগোর রাস্তায়ে এসে, কেন জানিনা মনে হচ্ছে, লখ লমন্ডটা বেশ নিকটেই। ট্র্যাভেল এজেন্টের চুক্তিতে আগামীকালের প্ল্যানে লখ নেস থাকলেও, কোন এক অজানা কারণে বাদ পরে গিয়েছে লমন্ড হ্রদটি। ঠাণ্ডাটা সকালের চেয়ে এখন অনেকটা কম আর বাইরে সুন্দর বাতাস। গাড়ির এয়ার কন্ডিশনিং বন্ধ করার অনুমতি চাইলেন অ্যানড্রু।
আমি মন দিয়ে অ্যানড্রু’কে দেখছিলাম। লোকটি দেখতে পাক্কা জেমস বন্ড মার্কা হলেও, এখন বাইরের বাতাসে তার সোনালি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। বড্ড সাধাসিধা লাগছে তাঁকে। গতকাল থেকে যেটুকু দেখা গেছে, লোকটার একটাই দোষ, বড্ড তড়বড়িয়ে কথা বলেন আর কমা ফুলস্টপ ছাড়া সেই ইংরিজি বোঝা আমাদের পক্ষে একটু দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। আচ্ছা এখন তো লোকটা বেশ খুশি খুশি মেজাজেই আছেন, একবার সরাসরি বলে দেখব নাকি আমাদের গ্লাসগো না গিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে চলুন, অ্যানড্রু? আমার উদ্দেশ্য শুনেই পিছনের সীটে গিন্নির শুরু হয়ে গিয়েছে উদ্বেগ! নারীজাতির এই অকারণ উদ্বেগের কারণ আমি আজ অবধি বুঝে উঠতে পারলাম না! আরে বাবা! বেকার চাপ নিয়ে তো কোন লাভ নেই! বলে দেখাই যাবে একবার, যদি ব্যাটা না যায় তো না যাবে! যদি অতিরিক্ত কিছু টাকা চায়, তাহলে সেটা বাড়াবাড়ি কিছু না হলে সেটাও ব্যবস্থা করা যাবে! বিকেলের চা’টা গ্লাসগোয় পান না করে, যদি লখ লমন্ডের উপরে একটা ডিঙিনৌকোয় বসে পান করা যায়, তাহলে কিন্তু সত্যিই জমে যাবে! পালকি রাস্তার পাশে মাঠের দিকে তাকিয়ে রয়েছে! একটা ছোট্ট টিলা আর গোটা দশেক বাড়ীর একটা গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছি আমরা! কিছু জায়গায়ে চাষ আবাদ হয়েছে ভালমতন! ছোটকন্যাও তার বাবা আর মায়ের কথোপকথনে বেশ চিন্তান্বিত। তবে তাকে দেখেও মনে হচ্ছে সে বুঝি গ্লাসগো যাওয়ার চেয়ে, লখ লমন্ডেই যেতে ইচ্ছুক।
রাস্তার বাঁদিক আর ডানদিকের মধ্যে সবুজের অনেক তফাত। বাঁদিকটা মকাইচাষের ক্ষেত হলেও, ডানদিকটা ঠাসা শাল সেগুণের গাছে। লখ লমন্ড যেতে হলে, আমাদের আর আধমাইল দূরেই ডানদিকে বাঁক নেওয়া উচিত! গিন্নি চোখ কুঁচকে আছেন! ছোটটিরও ভ্রু উপরের দিকেই! পালকি উদাসীন গলায় বলে উঠল, অ্যানড্রু… ক্যান ইয়উ টেক দ্য নেক্সট রাইট? উইল ইয়উ টেক আস টু লখ লমন্ড প্লিজ?
চলবে…
Leave a comment