এমনই একটা দিন বুঝি প্রত্যেক মানুষ চান আসুক তার জীবনে। লিনলিথগো সেরে স্টারলিং যাওয়ার পথে, চতুর্দিকে ঢেউখেলানো সবুজের সমারোহ। মেঘহীন আকাশে কোমল রোদ্দুর। আজকের তাপমান খুব বেশী হলে, হয়ত হবে বাইশ থেকে পঁচিশের ঘরে। বাতাসে সামান্য শীতশীত ভাব। সমতল এক সড়ক ধরে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে এলেন অ্যানড্রু। বড়সড় হাইওয়ে কিছু নয় এটি। তবু এই স্টারলিং পৌঁছনোর রাস্তাটি এত মসৃণ আর ট্রাফিকবিহীন, পঞ্চাশ মাইল বেগে চলা গাড়ীতে কফিপান করে নেওয়া গেল অনায়াসে। অদ্ভুত ভাল স্কটিশ কফি। মার্কিন দেশের মতন অতিরিক্ত তিতকুটে কিছু নয় বা অত্যধিক দামীও নয় ইতালিয়ান ক্যাপুচিনো’র মতন। আগেকার দিনে, বিয়েবাড়িতে বরযাত্রীরা এলে, স্টিম মেশিনে বানানো যেমন কফি পরিবেশন করা হত, এই পানীয়টিও যেন অনেকটা ওরকম স্বাদের।
স্কটল্যান্ডে এসে, সেরকম কোন বিশেষ স্কটিশ খাবার এখনও অবধি চেখে দেখা হয়নি। লন্ডনে অবশ্য সে সুযোগ হয়ে গিয়েছিলো প্রতিদিন। শরীরের কথা একরকম ভুলে গিয়ে, পুরু কড মাছের সুবিশাল ভাজা, আলুর মোটামোটা তেলে চোবানো ফ্রাই আর কড়াইশুঁটির সেদ্ধ দিয়ে বিকেলের খাওয়া সারা হচ্ছিল প্রায় প্রত্যেকদিন। কিন্তু গতকাল স্কটল্যান্ডের হ্যাগিস পুডিং কোনক্রমে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তার বিপজ্জনক উপাদানের গল্প শুনে। স্টারলিং ক্যাসেলে ঢোকার চড়াই রাস্তাটার মুখে, ঠিক যেখান দিয়ে ক্যাসেলের প্রাচীর শুরু হয়েছে, সেখানেই একটা সাবেকি স্কটিশ রেস্তরাঁ। চোখ ধাঁধানো কিচ্ছু নয়, বাইরে থেকে খুব ম্লান চেহারা তার, দোতলা বাড়ীটি কালচে ইটের তৈরি। নাম তার পোর্টকুলিস। অ্যানড্রু জানালেন, পোর্টকুলিস রেস্তরাঁটি নাকি খুব প্রসিদ্ধ। তবে সাধারণ খাবার জায়গার তুলনায় অপেক্ষাকৃত দামী। জানা গেল, পোর্টকুলিসে এক একজনের খাবার খেতে পরবে গড়ে পঁচিশ থেকে তিরিশ পাউন্ডের মতন। তবে অ্যানড্রু তার সাথে এ’ও জানালেন, পোর্টকুলিসের হ্যাডক মাছের রুটির গুঁড়ো মাখিয়ে ভাজা আর মাশরুম সহযোগে হ্যাডক পাস্তার নাকি স্বর্গীয় স্বাদ। আর তার সাথে দুপুর-দুপুর একগেলাস স্থানীয় বিয়ার পান করে নিলে তো কথাই হবেনা কোন।
এমন এক শীতল সুন্দর অপরাহ্ণে বাঙালী হয় ময়দানের মেলায় ঘুরে বেড়ায়, নইলে মাংস ভাতের চড়ুইভাতি করে। অথবা আলসেমি করে, বাড়ির ন্যাড়া ছাদে মাদুর পেতে বসে লুডো খেলতে খেলতে কমলালেবু খায় আর নইলে স্রেফ লেপমুড়ি দিয়ে জব্বর একটা ভাতঘুম। আর আমরা কিনা এমন এক সময়ে, একের পর এক বিলিতি প্যালেস আর ক্যাসেল দেখে চলেছি! বাকী ক্যাসেলের থেকে স্টারলিংটা ছোট হলেও, এখানে কোনকারণে কিন্তু দেখা গেল সিকিউরিটি’র বেশ কড়াকড়ি। তবে সে গার্ডদের সৌজন্যবোধ লক্ষ্য করার মতন। আমাদের দেশের শপিংমলের গার্ডদের মতন অতিরিক্ত রকমের ভদ্রতা করে বিনাবাধায় ছেড়ে দেওয়ার মতন বিনয়ী তারা নন। আবার মুম্বই বিমানবন্দরের মতন অযথা কঠোর মানুষও নন।
স্টারলিং ক্যাসেলে ঢোকার মুখেই একটা ঘাসে ঢাকা সুবিস্তৃত লন আর তার বাঁহাতে নিচেই একটা মস্ত সমাধিক্ষেত্র। সারি দিয়ে কবর আর তার মধ্যে দুটো বেশ বড় ঝুপসি গাছ। আগুপিছু না বুঝে সেই গোরস্থানকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে একটা ছবি তুলে নিতে পাশের মেমটি দেখা গেল নাকটাক কুঁচকে তার হোমরা চোমরা চেহারার স্বামীটিকে কি যেন একটা বলছেন! খুব ভালই বোঝা গেল, ভারতীয় টুরিস্টের এই মৃত্যুর ছবি নেওয়ার ব্যাপারটা তাঁদের না পসন্দ। কবরখানা বুঝি তাঁদের কাছে পবিত্র হয়! আহা, তোমরা আমাদের দেশে এসে রেলবস্তি’র টেপফ্রক পরা নাকে সিকনি গড়ানো বাচ্চার ছবি নিতে পারো, রাস্তার টিপকলে স্নান করছেন রুগ্ন বৃদ্ধ, সেই ছবি বেমালুম ছাপিয়ে দিতে পারো তোমাদের নামজাদা ম্যাগাজিনে, আর আমরা তোমাদের একটা কবরখানার ছবি নিলেই, তাতে কি এমন পাপ হয়ে গেল, তা কেবল তারাই জানবেন। সকাল থেকে এমন একটা মনোরম দিনে, মনের মধ্যে একটা ফালতু খিঁচ ঢুকে গেল।
প্রথম সিকিউরিটি চেকের পর কিন্তু প্রবেশ সবজায়গায় অবাধ। কাঠের একটা সেতু পেরিয়ে, টিকিট কাটার পর দেখা গেল, ক্যাসেলের ভিতরে মানুষ অনেক, কিন্তু ভিড় তেমন নেই। দেখা গেল, ক্যাসেলে ঢুকেই গিন্নির চোখমুখ কেমন বদলে গেছে! মুখের মধ্যে সেই পরিচিত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জেদটা দেখা যাচ্ছে, যেটা দেখা গিয়েছিল উইন্ডসরের দিন বা গতকালের এডিনব্র’তে। সব ইন্দ্রিয়গুলো তাঁর সজাগ, বোঝা গেল, গত তিন চারদিনে ক্যাসেলের পর ক্যাসেল দেখতে দেখতে গিন্নির কেমন একটা নেশার মতন হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে আমার নজর আশেপাশের প্রকৃতির দিকে হলেও, স্কটল্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে আমার নিকট পরিবারের এরকম কৌতূহল ছিল, সেটা আগে থেকে জানা ছিলোনা। হঠাৎ মনে হয়, আমি ক্যাসেলে ঢুকতে যাবো কেন? স্টারলিং’এর রাজা রানিদের কথা না জানলে আমার কোন মহাভারতটা অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
ঢুকতে চাইনা আমি এই ক্যাসেলে। ইটে গড়া মধ্যযুগীয় সভ্যতার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি দেখতে চাই ওই দূরের নদীটার পাশের স্তব্ধ অরণ্যটিকে। আর আমি পোর্টকুলিসে বিয়ার পান করে হ্যাডক মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে চাই। ওরা সকলে আমাকে ছেড়ে ঢুকে গেল স্টারলিং ক্যাসেলে। আমি একা হয়ে গেলাম। বড় দুর্লভ সেই একাকীত্ব।
চলবে…
Leave a comment