হোটেলের ঘরের বালিশ নিয়ে সমস্যাটা, আমার পারিবারিক সুত্রে পাওয়া। তাছাড়া লক্ষ্য করে দেখা যায়, যতো দামী হোটেল, তাদের বালিশ বুঝি ততো নরম হবে। এমনকি বাজি ধরে বলা যায়, পুরীর স্বর্গদ্বারের মাঝারি হোটেলের বালিশ, স্টেশনের বাইরের হোটেলের বালিশের চেয়ে কোমল হবে বেশী। কেনসিংটনটা সামলে নেওয়া গিয়েছিলো বালিশের উপরে কম্বল মোটা করে পেতে। একটা হালকা ভরসা ছিল যে এডিনব্র’র হোটেলে হয়ত বালিশের সমস্যা অতটা হবেনা। কিন্তু কোথায় কি? এডিনব্র’র এই হোটেলের সবচেয়ে নিরেটতম বালিশটিতে মাথা দিয়েই একটা ভুস করে হাওয়া বেরোনোর আওয়াজ আর মাথার চাপে সে বালিশের দুদিক স্ফীত হয়ে, সে এক বিতিকিচ্ছিরি দমবন্ধ করা পীড়া। টিভি সিরিয়ালের গল্পে, গিন্নি বলেছিলেন, নির্ভীক স্কটিশ মানুষেরা নাকি অনমনীয় গোছের। ভয়ঙ্কর শক্তপোক্ত। তা তারা এমন মোলায়েম বালিশে শুয়ে ঘুমোন কি করে? সামান্য অসন্তোষ প্রকাশ করায়, রিসেপশনের ছেলেটি জানালেন, তিনি নিজে স্কটল্যান্ডর মানুষ নন, বাসিন্দা মাত্র। আর মূলত মার্কিনী পর্যটকদের কথা মাথায় রেখেই নাকি হোটেলের ঘরে রাখা হয় পাখির পালক আর কাপাস মেশানো বিশেষ বালিশ। তাছাড়া ছেলেটিও ঠিক, তেজী স্কটিশ মানুষেরা নিজের দেশে, হোটেলেই বা উঠবেন কেন?
তবে গতকালের এডিনব্র সফরে কিন্তু লন্ডনের মতন এশিয়ান জনতা দেখা যায়নি খুব একটা। মাত্র একটি দুটি ভারতীয় পরিবার দেখা গিয়েছিলো ক্যাসেলে বেড়ানোর সময়ে। প্রবীণ দক্ষিণভারতীয় বাপ মা। সমর্থ মানুষটির একমাথা কাঁচাপাকা চুল, পরনে পুরু জ্যাকেট আর পায়ে সদ্যকেনা ধপধপে সাদা স্নিকার জুতো। দেখেই বোঝা যায়, একটা সময়ে ভীষণ কর্মঠ ছিলেন মানুষটি। নিরলস খেটে গিয়েছেন তাঁর সারাটা কর্মজীবন। সাথে হয় ছেলে-ছেলের বৌ, নয় মেয়ে-জামাই নিয়ে তারা দিব্যি বেড়াচ্ছেন স্কটল্যান্ড। যুবকটিকে জামাই বলেই মনে হচ্ছিল। নয়ত বৃদ্ধার হাঁটতে অসুবিধা হলেও, সে হাত বাড়াচ্ছিল না কেন? নিশ্চয় জামাইটি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। অনসাইটের কাজের ফাঁকে, দেদার বিদেশী মুদ্রা সঞ্চয় হয়ে যাওয়াতে, বউয়ের বাপ-মা’কে বিদেশভ্রমণ করিয়ে দিচ্ছে।
লন্ডনে কিন্তু পর্যটকদের মধ্যে গুজরাটি আর পাঞ্জাবী দেখা গিয়েছিলো অনেক। এডিনব্র’তে তেমন নয়। অ্যানড্রু জানালেন, টুরিস্ট হিসেবে কিন্তু বহুসংখ্যায়ে ভারতীয় আসেন, কিন্তু তাঁদের থাকার জায়গা প্রধানত গ্লাসগোতে। তাছাড়া তাঁদের তো আর আমাদের মতন হোটেলে থাকতে হয়না। তাঁরা থাকবেন তাঁদের কাকা পিসী, মামা মাসীদের সাথে। অ্যানড্রু জানালেন, পঞ্চাশের বা ষাটের দশক থেকে গ্লাসগোতে নাকি যে প্রকার সাম্রাজ্য ভারতীয়দের আছে, সে নাকি না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। সেখানে পথেঘাটে কেবল ভারতীয় আর ভারতীয়। গোটা গ্লাসগো চত্বরটাই যেন তাঁদের দখলে, সাহেব মেমেরা বরং সেখানে সংখ্যালঘু। আর সেখানে নাকি মিলনমেলা গোছের একটা সম্মেলন বসে বছরে একবার করে। সেই মেলায় বম্বের ফিল্মজগতের থেকে তাবড় নামীদামী তারকারা আসেন মেলার উৎকর্ষ বাড়াতে। একটু হড়বড় করেন, নইলে অ্যানড্রু’র গল্পের বিষয়বস্তু কিন্তু ভারী মুগ্ধ করে দিল আমাদের। আনন্দে, একটা সাম্প্রতিক হিন্দি গান চালিয়ে দেওয়া হল গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে। অসাধারণ রোদ উঠেছে আজ আর শীতভাবটা একটু বেড়েছে। আকাশে আজকেও একটা আসমানি নীল রঙের চাদর পাতা। বরং গতকালের থেকে বেশী দীপ্তি তার।
ঘণ্টাখানেক লেগেছে এডিনব্র থেকে। আমাদের লিনলিথগো প্যালেসে নিয়ে এসেছেন অ্যানড্রু। প্যালেসে ঢুকতে পাঁচশো মিটার মতন একটু খাড়াই পথ রয়েছে। গাড়ী যাবে স্বচ্ছন্দে কিন্তু রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবক বালকটি জানাচ্ছে, প্যালেসের পার্কিং আজকে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে আগে থেকেই। খুব আন্তরিক ভাবে সে বলছে, একটু হাঁটতে হবে সকলকে। হাঁটা শুনে আর আগের মতন আতঙ্ক লাগেনা। গত পাঁচদিনে বুঝি হাঁটা হয়ে গিয়েছে প্রায় পাঁচদশ’কে পঞ্চাশ মাইলের মতন। বেশী বই কম নয়! বরং স্কটল্যান্ডে একটা গোটা গাড়ী পেয়ে গিয়ে, একটা ঝোঁক হয়েছে সবকিছু হেঁটে দেখবার আর সে সুযোগ নাকি বারবার কেড়ে নিচ্ছেন অ্যানড্রু!
লিনলিথগো প্যালেসে জন্মগ্রহণ করেছেন স্কটল্যান্ডের গৌরব – জেমস ভি আর মেরী কুইন। এদিকে গিন্নি ভেবেছিলেন স্কটল্যান্ডের আগাপাশতলা সব জেনে গিয়েছেন। আউটল্যান্ডার সিরিয়াল দেখে জ্ঞান আহরণ হয়ে গিয়েছে পুরোটা। কিন্তু হায়! বেহালার কোচিং সেন্টার সাজেশন দেয় এক, আর পরীক্ষায়ে প্রশ্ন আসে আরেক। কারা এই জেমস ভি আর মেরী কুইন? তাঁরা কি স্কটল্যান্ডের বিগতদিনের রাজারানি নাকি লেখক লেখিকা নাকি কোন বৈজ্ঞানিক? আর এই সব ইতিহাস যারা জানেননা বা সেরকম কোন অযথা আগ্রহ নেই, লিনলিথগো প্যালেস দেখে তাঁদের মনে হবে একটা আদ্যিকালের ভুতুড়ে বাড়ী। সেই মোটামুটি একই রকমের। হলদেটে রঙের এক বিশাল রাজপ্রাসাদ। তবে গাঢ় নীল আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রাসাদটাকে কিন্তু মানিয়েছে জব্বর। আয়তনে নেহাত ছোট হওয়ার দরুন কেল্লা বা দুর্গ বলা যাবেনা লিনলিথগো প্যালেসকে। আউটল্যান্ডারে এঁদের কথা আছে কিনা বিশদে না জেনে, সাত পাউন্ড করে এক একটি টিকিট কেটে নেওয়াটা কি যথার্থ হল?
তবে ঢুকে দেখা গেল, প্যালেসের রাজারানিদের বংশানুক্রমিক তথ্য লেখা রয়েছে বিভিন্ন ফলকে ফলকে। কাঁচের বাক্সে সাজিয়ে রাখা আছে বিভিন্ন স্মারক। পর্যটকেরা সেসব তথ্য খুঁটিয়ে পড়ে নিচ্ছেন, অনেকে আবার দেখা গেল, খাতায় লিখে নিচ্ছেন নোট করে। তারই মধ্যে অবাক করলেন আমার গিন্নি। কোন একটা ফলকে জ্যাকোবাইট-ফাইট গোছের কি একটা লেখা দেখে, কেমন একটা বদলে গেলেন মুহূর্তের মধ্যে! অদ্ভুত মনোযোগী মুখ বানিয়ে হঠাৎ একাগ্রতা সহকারে দেখা শুরু করলেন ঘুরে ঘুরে। প্যালেসের ভিতরটা বেশ জটিল, গোলকধাঁধার মতন। এই সিঁড়ি, ওই গলি, সঙ্কীর্ণ বারান্দা দালান পেরিয়ে একটা বড় হলঘর। সেখান থেকে দুরে দেখা যাচ্ছে প্যালেসের প্রাচীর। আরও দুরে কিছু পাহাড়, আর সেখানে আকাশের নীল রেখাটা মিলিয়ে গিয়েছে আস্তে আস্তে। কিন্তু অত কিছুর আগে একটা ঢালু সবুজ মাঠ আর মাঠের ওপারেই একটা শান্ত দীঘি, এঁরা যাকে বলেন লখ। সেই লখে নিশ্চিন্তে সাঁতরে বেড়াচ্ছে দুটি মাত্র রাজহংসী। এঁরা বলছেন লখ লিনলিথগো। এই ভুতুড়ে প্যালেসে ঘুরে বেড়ানোর আর কোন মানে হয়না। বরং ওই নিস্তব্ধ লখে গিয়ে এক আঁজলা জলপান করে নিলে কেমন হয়?
চলবে…
Leave a comment