হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২৯ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (৪) · জুন ২০১৯

ঘড়ি দেখলে মনে হবে রাত। কিন্তু এডিনব্রর আকাশ এখনও দিব্যি দিনের আলোয় ভরা। আর একদম ঘন নীল এই আকাশ। কেউ যেন আলাদা করে আলগোছে রয়্যাল ব্লু কালি লেপে দিয়েছে আকাশের গায়ে। দুরে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে নর্থ-সি। অতটা স্পষ্ট নয়, তবে আজকের আকাশ যেন নর্থ -সি’এর চেয়েও বেশী নীল। একটু আগে বেশ গরম লাগছিল। কোথা থেকে যেন এখন একটা হাওয়া বইছে। সামান্য শীতভাব লাগছে সকলের। সকলে মিলে রবার্ট ব্রুসের মূর্তির নিচে ছবি তুলেই, গিন্নি ব্যস্ত হয়ে একদল শেতাঙ্গিনীদের সাথে ভিড়ে ক্যাসেলে ঢুকে গেলেন পালকিকে সঙ্গে করে। ছোটটিকে বাপের জিম্মায় রেখে। স্কটল্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে একটা টেলিভিশন সিরিয়াল যে একজনের মনে এতখানি প্রভাব ফেলেছে, সে নিয়ে একটু মস্করা করেই দেখা গেল, ক্যাসেলের ভিতরে একটা হুইস্কির মস্ত প্রদর্শনশালা। এরা অবশ্য ইংরেজদের মতন হুইস্কি বলেন না। এরা বলেন মল্ট। বড়বড় কোম্পানির নামজাদা সব মল্ট, মিনিয়েচার বোতলে পুরে আগুণ দামে বিক্রি করা চলছে। আর তার সাথে পর্যটকদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই মল্ট পান করবার প্রথা। চেখে দেখার জন্য চারদিকে বহু কাউন্টার, আর সেসব কাউন্টারে মাগনায়ে মল্ট পানের জন্যে বেশ গাদাগাদি লক্ষ্য করা গেল। মদ্যপানের বিষয়ে ছোটকন্যার সাথে আমার মতভেদ বিস্তর। সে জানে যে তার বাবার সামান্য এদিক-ওদিক নিয়ে আপত্তি জানাবার কোন কারণ নেই, তবুও এই প্রদর্শনীতে ঢোকার পরেই, অস্থির হয়ে সে বেরিয়ে এল নাকটাক কুঁচকে। মদ্যপায়ী পাপিষ্ঠ মানুষের সাথে এক মুহূর্তও কাটাতে চায়না সে। খিটিমিটি না বাড়িয়ে তাই বেরিয়ে আসাই যথাযথ মনে হল।

যে যাই বলুক, পায়ে হেঁটে না বেড়ালে ব্যাপারটা কিন্তু জমেনা ঠিক। কিছুটা করে হাঁটা, তারপরে পা-টনটন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সাময়িক জিরিয়ে নেওয়া, আর তারই মাঝে দুটো-একটা রাস্তার দোকানে সস্তার কেনাকাটা, কফিপান, এসব ছাড়া জায়গাটা কেমন নিজের বলে বুঝি মনে হয়না। অ্যানড্রু সময় মঞ্জুর করেছিলেন দুঘণ্টা, কিন্তু দেড় ঘণ্টাতেই ক্যাসেল দেখার কাজ মিটে গিয়েছে আমাদের। বেরোনোর রাস্তায় একজন স্কটিশ মানুষ পশমের চেকচেক স্কার্ট পরিধান করে ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছেন। সবুজ গামবুটের মতন এক মোজা আর মাথাতেও এক বিশাল ধড়াচুড়ো পরে রয়েছেন তিনি! এই বসনটি স্কটিশ পুরুষমানুষদের স্বাদেশিক পোশাক। একে স্কটল্যান্ডে বলে কিল্ট। অ্যানড্রু আসতে সময় নেবেন আরও আধঘণ্টা মতন। নিচে এসে, খানিকটা সময় কাটানো গেল একটা মাঝারি দোকানে। সেখানে কিল্ট বিক্রি হচ্ছে সস্তায়।

এসব শহরের মধ্যে একটা চিরন্তন ব্যাপার রয়েছে। হয়ত লন্ডনের মতন বনেদী ব্যাপার নয়, তবু অবয়ব দেখে এডিনব্র’র উপরে একটা সহজ ভক্তি জন্মায়। শহরের সমস্ত কিছুতেই একটা বিচার-বিবেচনাপূর্ণ ভারসাম্য, একটা সুষম সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দাঁড়িপাল্লা দিয়ে এত কিছু হিসেবকনিকেশ করে হাজার দুহাজার বছর এই জিনিষ বজায় রাখা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। নীল রঙটায় একটু ফ্যাকাসে ধরেছে, কিন্তু দিনের আলো এখনও রয়েছে পুরোমাত্রায়ে। অ্যানড্রু মানুষটি সত্যিই খুব ভাল, কন্যা দুজনের আর্জিতেই তিনি আমাদের এডিনব্র শহরের আশপাশ ঘুরিয়ে নিয়ে চলেছেন স্কটল্যান্ডের সুবিদিত হ্যাগিস পুডিং খাওয়াতে। তার আগে, অ্যানড্রু নিয়ে যাবেন আর্থারস সীটে, সেখান থেকে নাকি গোটা এডিনব্র দেখা যাবে ছবির মতন। অ্যানড্রু গল্পের মেজাজে আছেন। রেস্তরাঁয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে বড় রাস্তা, সরু পথ দিয়ে গাড়ী অবাধে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন নিজের খেয়ালখুশি মতন। সবই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে, তবুও বাইরে থেকে দেখে নেওয়া হচ্ছে হলিরুড অ্যাবি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ স্কটল্যান্ড ইত্যাদি। সবকটি বাড়ী হলদেটে রঙের, অনবদ্য স্থাপত্য, সামনে ঘাসের লন আর কালো লোহার গ্রিলের বেষ্টনী। আচ্ছা এডিনব্র শহরে প্রোমোটার সম্প্রদায় কেউ থাকেন না? নতুন বাড়ী তৈরি হয়না? এরা নাগরিক সভ্যতার ব্যাপারে এতটা শৃঙ্খলা রাখেন কিভাবে?

ট্রেজার আইল্যান্ডের রচয়িতা রবার্ট লুই স্টিভেন্সনের গল্প শোনাচ্ছিলেন অ্যানড্রু। যে বাড়ীতে লেখক বাস করতেন, তার সামনে ছবি তুলে নেওয়া হল গোটাকয়েক। আর গল্প শোনা হল হলিরুড পার্কের। সেখান থেকেই কিছুটা দূরেই শুরু হচ্ছে আর্থারস সীট। অ্যানড্রু জানালেন, আর্থারস সীট নাকি আর আগের মতন নিরিবিলি নেই। হিলওয়াকিং ব্যাপারটা জনপ্রিয় হয়ে যাওয়াতে, ভিড় বেড়ে গিয়েছে ভয়ঙ্কর। মূলত একটি তৃণাবৃত ঢালু জায়গা। একটা ছোট্ট পুষ্করিণী, অ্যানড্রু জানালেন এটার নাম সেন্ট মার্গারিট লখ। বহু সংখ্যায়ে রাজহংসী সাঁতরে বেড়াচ্ছে তাতে। কোথায় ভিড়? হাজার হাজার মাইল সবুজ জমি পরে আছে সামনে, গিন্নি দেখলাম মিনমিন করে অ্যানড্রু’কে ভিড় কাকে বলে বোঝাচ্ছেন! বিকেল থেকে হ্যাগিস পুডিং খাওয়ার এতো প্ল্যান আঁটা হচ্ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও, খাওয়া সেরে নেওয়া হল, সাবওয়ে’তে। প্রথমত, খিদেয় মাথা ঘুরছে। আর দ্বিতীয়ত, হ্যাগিস পুডিং ব্যাপারটা নাকি তৈরি হয় ভেড়ার হার্ট, লিভার আর ফুসফুস দিয়ে। আমরা বাউল বিবাগীর দেশ থেকে এসেছি, ওই রবার্ট ব্রুস মার্কা খাবার আমাদের পেটে ঢুকলনা শেষ পর্যন্ত। তবে খাওয়ার সময় একটা কথাও বলছেনা আমাদের ছোটজন। সাবওয়ে স্যান্ডুইচেও আঁশটে গন্ধ পেয়েছে সে। কি অসহায়, কি বিষণ্ণ সেই দৃশ্য!

চলবে…

Leave a comment