ট্রেনের সাথে আমার ব্যক্তিগত রোম্যান্স ছিল ছেলেবেলায়। কু-ঝিকঝিক আওয়াজ আর দুলুনি, ঘাম আর তামাক মেশানো গন্ধ, খোলা জানালা দিয়ে অপরিমেয় বাতাস আর কয়লার কুঁচি। লিলুয়া পেরোলে ওই চাষাড়ে ভিড়েও, স্লিপার ক্লাসের যাত্রীদের সবাইকে কেমন এক পরিবারের বলে মনে হতো। জমে যাওয়া চিনেবাদামের খোলা, পানের পিক, অপরিছন্ন বাথরুমের দুর্গন্ধের মধ্যে হয়ে যেত কত বিয়ের সম্বন্ধ, কত প্রেম। এই ট্রেনটা তাই বুঝি অচেনা। নিউক্যাসেল ছাড়ার পর, ডানহাতে মাঝে মাঝে দেখা দিচ্ছে নর্থ-সি আর গোটা কামরা তখন ফাঁকা। ছোটটি আধশোয়া হয়ে পরেছে তার জায়গায়ে আর কাঁচে নাক ঠেকিয়ে দেখে নেওয়া হচ্ছে বাইরের ঘন সবুজ মাঠ, নদীর উপরে সেতুগুলি। রাস্তা বেঁকেছে মাঝেমধ্যে, কোথাও কোথাও একটু যেন ওঠাপড়া আর মেঘহীন আকাশে মাঝে মাঝে হয়ে যাচ্ছে একপশলা করে বৃষ্টি। সবই ভয়ঙ্কর রকমের অভিরাম, কিন্তু তবুও মেলানো যাচ্ছেনা শৈশবের অঙ্কের সাথে।
এ যেন অনেকটা গোপাল ভাঁড়ের গল্পের মতন। টাক চুলকে গোপাল বলে, আমি আপনার ওই টাকাটাই নেব রাজামশায়, জ্ঞান ট্যান নয়। কি জানেন, যার যেইটা নাই, সেইটাই তো সেই ব্যাটা চায়। মানুষের চরিত্র ঠিক তাই। যার কাছে যেটা নেই, সেটাতে যেন তার ততোধিক আসক্তি। নামজাদা গায়কের দল টানা তিনমাস এসে কাটিয়ে যায় ঋষিকেশের সাধুর আখড়ায়ে, পাঁচখানা বিদেশী গাড়ীর মালিক সকাল সকাল হাঁটতে বেরোয় ডাক্তারের কথা মেনে, আর অন্যদিকে আশৈশব রেললাইনের ধারের বদ্ধ বসতির মেয়ে শিবরাত্রিতে মানত করে, তার যেন একটা বারান্দাওয়ালা দোতলা বাড়ীতে বিয়ে হয়। আমাদের অবস্থা বুঝি অনেকটা সেইরকমের। ক্ষুধার্ত চোখে বাইরের বিচিত্র দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা এসে পরলাম এডিনব্র ওয়েভারলি।
ওয়েভারলি রেলস্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই দেখা হয়ে গেল ড্যানিয়েল ক্রেইগের সঙ্গে। আলির মতনই একটা মস্ত মার্সিডিজ ভ্যান নিয়ে প্রতীক্ষায়ে আছেন আমাদের। তবে এ গাড়ির রং দুধসাদা, আলির মতন কালো নয়। আমাদের দেখেই লোকটার একগাল একটা হাসি। আর তার অকৃত্রিম হাসিতে বোঝা গেল, নাহ! এ জেমস বন্ড ড্যানিয়েল ক্রেইগ নয়। আলির টিমের অ্যানড্রু। নচেৎ আর কোন তারতম্য নেই। আর কেবল আদল নয়, গঠনে, পরিধানে, চালচলনে বা অঙ্গভঙ্গিতে, লোকটা একদম বসানো ড্যানিয়েল ক্রেইগ। দেখা গেল, অ্যানড্রু কিন্তু নিজেও ভালমতন জানেন ব্যাপারটা আর সে বিষয়ে যথেষ্ট আত্মসচেতন তিনি। কিন্তু লোকটার ধাত জানা নেই। মাত্র মিনিট পাঁচেকের আলাপে, জেমস বন্ডের সাথে তাঁর সাদৃশ্য নিয়ে, বেশি বলাবলি করলে, যদি বিগড়ে যায় তার মেজাজ?
অ্যানড্রু কিন্তু ঝানু লোক। সারা পৃথিবীর হাজার ট্যুরিস্ট ঘেঁটে যার রুজি রোজগার, তার তো সুবক্তা আর সেয়ানা হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই। প্রথম থেকেই আমাদের সাথে এমন অমায়িক ব্যবহার শুরু করেছেন, যেন আমরা তাঁর অনেককালের আত্মীয়। তাঁর গাড়িতে চালিয়ে রেখেছেন অরিজিত সিংহের সুপরিচিত বলিউডি গান। আর তাতে আমাদের ছোটজন একটা অদ্ভুত কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে অ্যানড্রুর দিকে! একটু আগেই বোধহয় এখানেও ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, তাই বাতাসটা সামান্য শীতল। রাস্তাও ভেজা।
লন্ডনের মতন এডিনব্র’র হোটেল’টাও সিটি সেন্টারে, ওয়েভারলি রেলস্টেশন থেকে গাড়িতে লাগল মিনিট পাঁচেকের মতন। উলটোদিকেই এডিনব্র শহরের খ্যাতনামা থিয়েটার হল – প্লেহাউস থিয়েটার। আর বাইরেই বড়বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে – ফ্রাইডে, টুয়েন্টি এইটথ জুন – দ্য পিঙ্ক ফ্লয়েড এক্সপিরিয়েন্স। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায়ে। তবে এখন শুধু হোটেলে ঢুকে পোঁটলাপুঁটলি রাখা আর তারপর এডিনব্র ক্যাসেল। হাতে মাত্র মিনিট কুড়ি সময় কারণ অ্যানড্রু জানালেন ক্যাসেল নাকি বন্ধ হয়ে যায় পাঁচটায়ে।
ডেভিডের মতন না হলেও, দেখা গেল অ্যানড্রু বেশ জ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ। আর তার সাথে আজ জুটে গিয়েছেন গিন্নি। স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের বিরাগ বিরুদ্ধতা নিয়ে আউটল্যান্ডার নামের কোন এক টিভি সিরিয়াল দেখার সুবাদে, তিনি আজ বেশ সক্রিয়। কথায় কথায় অ্যানড্রু’র দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন বেয়াড়া প্রশ্ন, বাক্যালাপের মাঝে নিয়ে আসছেন কিং ডেভিড ওয়ান, কিং ম্যালকম টু, আর হলিরুড অ্যাবির গল্প। আর তখন আমি চারপাশ মিলিয়ে নিচ্ছি আমার ইশকুলের বন্ধু ভাস্করের বাবা রসায়নের সুপরিচিত অধ্যাপক ডক্টর পার্থসারথি চক্রবর্তী’র গল্পের সাথে। খুব সম্ভব ক্লাস ফোরে বা ফাইভে পড়ার সময়ে, ভাস্করদের নিউ আলিপুরের কোয়ার্টারে ওঁর মুখে শুনেছিলাম এডিনব্র ইউনিভার্সিটি’র গল্প, এডিনব্র’র বোটানিক্যাল গার্ডেন আর চিড়িয়াখানার সবিস্তার বর্ণনা। সেই ছবি ঠিক মাথায় আসছেনা কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছে, এই নগরী একটি অত্যন্ত সুন্দরী স্থান। একটা অদ্ভুত নির্জনতা, স্থাপত্য, ইতিহাস আর চমৎকার আবহাওয়া নিয়ে লন্ডনের মতন চোখ ধাঁধানো না হলেও, বহিরঙ্গ রূপ কিন্তু অনেকটা একই। দেখা গেল, মাঝে মাঝে ছেলেবেলার কল্পনা কিন্তু বাস্তবের থেকে অধিকতর মন্দ হতেই পারে।
এডিনব্র ক্যসেলে ঢোকার রাস্তায়ে, অ্যানড্রু যেখানে ছাড়লেন, তার থেকে একটা খাড়াই মতন রাস্তা উঠে গিয়েছে ক্যসেলের দিকে। রাস্তাটি যথেষ্ট জনবহুল আর অনেকটা যেন অক্সফোর্ডের পাথরে বাঁধানো রাস্তার মতনই। তবে এটি বেশ এবড়োখেবড়ো। ক্যসেলটি উইন্ডসর বা ওয়ারউইকের তুলনায় অনেক ছোটো। তবে শহরের একদম টঙে বলে, পুরো শহরটার একটা অপরূপ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। আচ্ছা ক্যাসেলে ঢুকলেই কি পুরোটা ঘুরে দেখতে হবে? ওই ক্যাফেটাতে এক কাপ চা নিয়ে বসে থাকা যায়না ঘণ্টার পর ঘণ্টা? এখানে তো কম পয়সার খদ্দেরকেও খেদিয়ে দেওয়ার নিয়ম নেই।
চলবে…
Leave a comment