হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২৭ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (২) · জুন ২০১৯

উঠল প্রথম ছোটজনই। বোধহয় বাথরুমের খোঁজে। এই আড়াইঘণ্টায়ে  দুইজনের কেউই ওঠেনি সীট ছেড়ে। গ্যাঁট হয়ে বসে ছিল, যদি সাধের জানালার ধারটা চলে যায়। সেই ভয়ে। গিন্নির আবার থেকে থেকে কেবলই নাকি মনে হচ্ছে, আমাদের দিকটা অতটা ভাল নয়। ওই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দিকের সিনারিটাই নাকি অনেক বেশি নয়নাভিরাম। একদিক থেকে ব্যাপারটা কিন্তু তেমন ভুল কিছু নয়। যেমন যদি ধরা যায় ট্রেনটা দক্ষিণ থেকে উপকুল ধরে উত্তর-পুর্বে চলেছে, তাহলে হিসেবমতন নর্থ-সি টা কিন্তু ওঁদের দিকেই আসার কথা। কিন্তু তখন তো আবার ভদ্রতার মাথা খেয়ে, ওদের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পরা যাবেনা! সে কারণেই যা একটু খেদ থেকে যাচ্ছে।

মিনিটখানেক বাদেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফিরে এল আমাদের ছোটোকন্যা। মনমরা হয়ে ফিসফিস করে জানাচ্ছে, এই ট্রেনে নাকি বাথরুম নেই! বলে কি সে? গত দুদিনের গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানির কোচে একটা গোটা বাথরুম থাকলেও, এমন অত্যাধুনিক দূরপাল্লার বিলিতি ট্রেন বাথরুমহীন? সাহেব মেমরা কি তবে ট্রেনে বেগটেগ এলে, সেসব বেমালুম চেপে রাখেন নাকি? সমাধান বের করল শেষ অবধি আমাদের পালকিই। বোনকে বাঁচাবার তাগিদে, একবার পায়চারি করেই বাথরুম সনাক্ত করে ফেলেছে সে। দুটি কামরার মাঝে একটা অর্ধবৃত্ত গোছের দরজার মতন। একেবারে রঙে রং মেলানো। এসব এলাকার চলতি নিয়ম জানা না থাকলে, বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। অগোচরেই থেকে যাবে সেই দরজা। সন্মুখভাগে নির্দেশ লেখা একটা ছোট্ট বোতাম আর সেই বোতামেই হালকা হুঁশিয়ার চাপ দিলে খুলবে বাথরুমের দরজা। দেখা গেল, কেবল দরজা নয়। ভিতরের বাকী সব যন্ত্রপাতিও মাত্রাতিরিক্তভাবে যান্ত্রিক। দুই কন্যার মুখে বাথরুমের এহেন বিবরণে, গিন্নি বুঝি আর বাকী ফলের রসটুকু পান করলেন না। অবশ্য বাথরুম খুঁজে পেয়েও, ছোটোটির তখনও মুখভার। তার জানালার ধারটা বিনা নোটিসে দখল করে নিয়েছে তার মা।

বাইরের দৃশ্য অসাধারণ থেকে ক্রমান্বয়ে অনন্যসাধারণ হয়ে উঠছে। সেই দৃশ্যে অভিভূত হয়ে, চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়েই লজ্জার মাথা খেয়ে ক্ষণে ক্ষণে তুলে নেওয়া হচ্ছে ছবি। মিনিট পনেরো বাদে বাদে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কোন একটা ছোটো স্টেশনে। মোরাম বিছনো প্ল্যাটফর্ম, একটা ফোয়ারা, কিছু ফুলের চারাগাছ, আর ছোটো একটা খয়েরি রঙের গ্র্যানাইটের অফিসঘর  আর সেই অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে স্টেশনমাস্টার সবুজ পতাকা নাড়িয়ে আমাদের যেন অনুমতিদান করছেন ইংল্যান্ড পেরিয়ে স্কটল্যান্ডে ঢোকার জন্যে। মজার কথা, ট্রেনটির গতিও এমন কিছু নয়। যেন আমাদের ছুটির মেজাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সে আজ একটু ঢিমে তালে ছুটছে এডিনব্র’র দিকে। আর আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করা যায়, কোন স্টেশনেই সেরকম কেউ কিন্তু ওঠানামা করছেন না। এমনকি, কয়েকটা ছোটো স্টেশন তো দেখা গেল একেবারে জনমানবহীন। এমনকি স্টেশনমাস্টারও পর্যন্ত উপস্থিত নেই সেখানে।

ইংল্যান্ড ক্রমাগত চলে যাচ্ছে চোখের আড়ালে। ইয়র্ক, ডার্লিংটন তো চলে গিয়েছে খানিকক্ষণ আগেই। এবারে বোধহয় ডারহ্যাম আসবে একটু পরেই। পেছনে যারা বসে আছেন, তাদের একদল নামবেন ডারহ্যাম আর অন্যদল বোধহয় নিউক্যাসেল। পাশের বৃদ্ধাটির সাথে চোখাচুখি হয়েছে বেশ কয়েকবার। একবার তো আমাদের দিকে চেয়ে হাসলেন বলেই মনে হল। উল্টোদিকের বৃদ্ধটি গুরুতর রকমের গম্ভীর। তবে দেখা গেল গিন্নির কথাই ঠিক। দৃশ্য এদিকেও মনোরম, তবে এদিকে যেন একটু ঝোপঝাড় বেশি চোখে পরছে বলে মনে হচ্ছে। ভাল দৃশ্যগুলো সব ওদিকেই। কিন্তু তাই বলে তো চোখের মাথা খেয়ে ওদিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকাও যায়না। যদি কোন কারণে ওঁরা মনে করেন আমরা ওঁদেরকে প্রচ্ছন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করছি? এদিকে আমরা যে ট্রেনে চেপে এমন মনোরম দৃশ্য আগে কোনদিন দেখিনি, সেটা তো এরা নাও জানতে পারেন। এরকম প্রবীণ কেউ আমার সামনে সটান বসে থাকলে, আমি কিন্তু তাদের সাথে এতক্ষণে গল্প জুড়ে দিতাম। তবে এখন কেন অস্বস্তি হচ্ছে? এই যেমন এঁকে বুঝিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে, এই এখুনি উইয়ার নামের যে নদীটি পেরিয়ে গেল ট্রেনটা, সেটা আদপে কোন নদীই নয়। আমাদের দেশের অনুপাতে সেটা বড়জোর একটা নালা। এঁদের তো আমাদের সাথে গল্পগুজব করে জেনে নেওয়া উচিত ব্রহ্মপুত্র বা মহানদী কতটা বড়? আরে, অন্যান্য পশ্চিমী দেশগুলোতে আর কিছু না হলেও, ভারতের আধ্যাত্মিকতা, যোগব্যায়াম বা টেররিসম ইত্যাদি নিয়ে অনেক কৌতূহল রয়েছে। আমেরিকায়ে তো প্রায়শই রবীন্দ্রনাথ আর রবিশঙ্কর নিয়ে গড়বড় করে ফেলতেন মার্কিনীরা। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেও, প্রতিবার ব্যাখ্যা করতে আমার কেমন একটা অদ্ভুত তৃপ্তি হত মনে। এই বৃদ্ধটি কি তবে বোবা?

ডারহ্যাম ছেড়ে গেল ট্রেন। লাঞ্চে স্যান্ডুইচ আর চা দিয়ে গেছে রেলকোম্পানির সেবিকারা। স্যান্ডুইচটা স্যমন মাছের শুনে মেয়েরা আর নিলনা সেই খাবার। ট্রেনের গতি বেশ মন্থর, পিছনে বসা পুরুষটি উঠে দাঁড়িয়ে মালপত্তর নামিয়ে নিচ্ছেন। নিউক্যাসেলে নামবেন বোধহয়। প্যান্ট ঝেড়ে, লোকটি উঠে দাঁড়াতেই, তার পাশের মহিলাটি তাঁকে চকাস চকাস করে দু গালে দু খানা মোক্ষম চুমো খেলেন। আরে! যাদের এতক্ষণ ভাবছিলাম, এক অফিসে কাজ করেন, কম্পিউটার আর খাতাপত্তর খুলে মনোযোগ দিয়ে হিসেবনিকেশ করছিলেন, তারাও বিনাবাক্যব্যয়ে একে অন্যকে মাগনায়ে এমন চুমো দেন? আমি যখন সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি, গিন্নির দেখা গেল ভুরু কুঁচকে গেছে! কিছু একটা বাজে সন্দেহ করছে বুঝি সে!

চকিতে তার দিকে তাকাতেই, বেশ জোরেই সে বলল, এই চা-টাও বেশ ট্যালটেলে, স্যান্ডুইচটা বিস্বাদ। ওগুলো খেতে হবেনা আর! বৃদ্ধরও দেখলাম চোখে পরেছে ব্যাপারটা।

চলবে…

Leave a comment