হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২৬ স্কটল্যান্ড প্রথম দিন (১) · জুন ২০১৯

সকালটা খুব সুন্দর আজকে। একটা ঝলমলে রকম রোদ উঠেছে। চেক আউটের পর মালপত্তর নিয়ে পৌঁছে যাওয়া হয়েছে লন্ডনের কিংসক্রস রেলস্টেশনে। ইউরো-স্টার ট্রেনগুলো লন্ডন প্যানক্র্যাস স্টেশন থেকে ছাড়লেও, এডিনব্র বা অন্য নর্থ বাউন্ড ট্রেন ছাড়ছে কিংসক্রস থেকে। একদম লাগোয়া এই দুটো রেলস্টেশন। কেন্সিংটন থেকে আলির গাড়িতেই আসা, তবে আলি নিজে আসেননি আজ। আব্দুল নামের অন্য এক ছোকরাকে পাঠিয়েছেন আমাদের নিতে। আলির মতন মিশুকে নন আব্দুল, তবে কিংসক্রসে নামানোর আগে জরুরি কথাটা কিন্তু জানিয়ে দিতে ভুললেন না। এডিনব্র’তে আমাদের সঙ্গে থাকবেন অ্যানড্রু, আলির টিমেই আছেন এই অ্যানড্রু আর আব্দুলের থেকেই নিয়ে নেওয়া হল তার ফোননম্বর। জয়-মা বলে, কিংসক্রসে ঢুকে যাওয়ার পর বুকটা বেশ খালি-খালি লাগা শুরু হল। বাকীরাও দেখা গেল, বেশ বিষণ্ণ হয়ে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে। লন্ডন শহরের সাথে ওদের সখ্যতা বুঝি বেশ ভালই জমে উঠেছিল। নৈকট্য বেড়ে গিয়েছিল মাত্র চারপাঁচ দিনেই। আসলে, কোন স্থান ছেড়ে না এলে বুঝি সে স্থানের গরিমার নাগাল করা মুশকিল।

অসম্ভব পরিছন্ন কিংসক্রস। আর হাওড়া শিয়ালদার মতন ব্যস্তও তেমন নয়। স্টেশনটির প্রধান অংশে দাঁড়িয়ে মনে হবে, যেন এক হালফ্যাশানের শপিং-মলে ঢুকে পরা হয়েছে। ট্রেনের আওয়াজ, যাত্রীর ব্যস্ততা, রেলকোম্পানির মাইকে ঘোষণা বা অন্য কোন উঁচুপর্দার কোলাহল কিছুই কানে আসছেনা। যে কোন মাঝারি কোন বিমানবন্দরের সাথে অনায়াসে তুলনা করা যাবে কিংসক্রসের। সুদৃশ্য টিকিট কাউন্টারের পাশেই ওয়েটরোজ কোম্পানির সুপারমার্কেট, বিভিন্ন ক্যাফে, ফুডপ্লাজা, সব মিলিয়ে এক জমজমাট ব্যাপার। হাওড়া শিয়ালদা স্টেশনগুলিও এখন অনেক উন্নত আর আধুনিক হয়ে গিয়েছে। তবুও তাদের যেন কিংসক্রসের মানে পৌঁছতে গেলে আরও কাঠখড় পোড়াতে হবে।

রেলস্টেশন মানে সবকিছু কেমন সাময়িক গোছের হবে। শুধু বাঁধানো প্ল্যাটফর্মটাই যেন স্থায়ী, বাকী সবই যাওয়া আর আসা। যাত্রীরা যথাসময়ে আসছেন, সাময়িক অপেক্ষা করছেন আর তারপর নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলে যাচ্ছেন নিজ নিজ ট্রেনে চেপে। ট্রেনটাও প্ল্যাটফর্মে ঘ্যাঁস করে এসে দাঁড়াচ্ছে হুইসল বাজিয়ে আর আকস্মিক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে লোক সমাগম। ওই গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে থাকছে ক্রেতা, থাকছে বিক্রেতা, পাশেই বসছে হয়ত একটা সান্ধ্যবাজার। অদূরে একটা বেশ্যাপল্লী, রাতের দিকে হাতে কুপী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে স্ত্রীলোকেরা আর খুচরো দুটো ফড়ে। কিংসক্রসেও হয়ত প্রকৃতির নিয়মে এমনটাই চলেছে! কেবল সবই বুঝি তাদের উন্নত, আধুনিক আর সাহেবি আভিজাত্য মাখানো। ওই যেমন, কেউ জল ব্যবহার করে গাড়ুতে, প্রকাশ্যে মাঠে ঘাটে। কেউ আবার মগে। কেউ তো আরও উন্নত প্রযুক্তির হ্যান্ড শাওয়ারে। আর যে দেশে এসেছি, সেখানে তো জল ব্যবহারের কোন পন্থাই জানেন না এঁরা।

তবে আর কিছু হোক না হোক, গত চারদিনে বিলেত বেরিয়ে, এই পরিবারটির কিন্তু নিজেদের উপর আস্থা বেড়ে গিয়েছে হাজারগুন। এডিনব্র’র ট্রেন আসবে কোন প্ল্যাটফর্মে আর তা জানা যাবে কোন এনকোয়ারি কাউন্টার থেকে, দেখা গেলো পালকি সড়গড় করে ফেলেছে মিনিট কয়েকেই। সেই দুবাই বিমানবন্দরে বা গ্যাটউইকে যেমন একটা অনিশ্চিত ভাব ছিল পালকির মায়ের মুখে, সেই স্নায়ুচাপ এখন বুঝি একেবারেই ভ্যানিশ। এ যেন লুঙ্গি গেঞ্জি পরা গাঁয়ের ছেলের, শহরে পা রেখে ভোল পালটে গিয়েছে বিলকুল। এখন রীতিমতন প্যান্ট শার্ট পরে ট্যাক্সিতে চাপছে সে।

এডিনব্র পৌঁছতে লন্ডন নর্থইস্টার্ন রেলের এই ট্রেনটা নেবে সাড়ে চারঘণ্টার মতন সময়। অর্থাৎ পৌঁছতে পৌঁছতে সেই বেলা তিনটে বাজিয়ে দেবে। তাই, দুপুরে কি খাওয়া হবে সেই নিয়ে একটু চাপা উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেল। আর যাই হোক, এখানে কি আর শসা বা চীনেবাদাম ফিরি করবেন সাহেবরা? সেই দুশ্চিন্তায়ে, ওয়েটরোজের স্টোরটির থেকে তুলে নেওয়া হল একপ্যাকেট স্কোনস, চারটে স্যান্ডুইচ, আলুর চিপস, জলের বোতল আর কোক। আমাদের বিলিতি স্কোনস খাওয়ার ঔৎসুক্য দেখে, স্টোরের সুপারভাইজার মহিলাটি তিনটে ছোটো শিশিতে ক্লটেড ক্রিমও ফ্রি দিলেন তার সাথে। আর এই সময়েই পালকি এসে ঘোষণা করল, ট্রেন নাকি দিয়ে দিয়েছে। বাইশ নম্বরে।

ট্রেনে উঠলে যে কোন বাইরের দৃশ্য কেমন রহস্যময় হয়ে ওঠে। দিক গুলিয়ে যায় আর কোন যুক্তিবোধ আমার কাজ করেনা। আর সেই কারণেই বুঝি ট্রেনে খাওয়া ছাড়া আর কিছুই মাথায়ে আসেনা। তবে এই বিলিতি ট্রেনে ওঠার পর, মালপত্তর সুবিন্যস্ত করতে যা অনর্থক ঝামেলায় পরা গেল আর তার জন্যে কামরার মধ্যে যে পরিমাণ লজ্জাদায়ক বিশৃঙ্খলা, তাতে খিদে উবে, ছোট্ট একটা হার্ট অ্যাটাক হলেও কিছু করার ছিলনা। নেহাত পরিবারটির এখন নিজেদের ওপর অগাধ আস্থা, তাই বুঝি মিনিট পাঁচেকেই কাটিয়ে নেওয়া গেল থতমত ব্যাপারটা। তবে যাত্রীর সংখ্যা একদম হাতে গোণা, সেটাই একদিক থেকে বাঁচোয়া। ফার্স্ট ক্লাস চেয়ার কার কামরা, পেল্লায় বড় বড় সব নীল রঙের গদিআঁটা সীট। তবুও যেন হতভম্ব হয়ে যাওয়ার মতন তেমন কিছু নয়। বাঁপাশে মুখোমুখি এক বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা। দুজনেই নাকের ডগায় রিডিং গ্লাস দিয়ে খবরের কাগজ দেখছেন। আর চোখের ফাঁক দিয়ে একটা উদ্ধত ভঙ্গীতে আমাদের নজর করছেন। হয়ত ভাবছেন, কি বিপদেই না পরা গেল বাপু, এই এখন চার চারটে ঘণ্টা এই গেঁয়ো এশিয়ানগুলোর বকবকানি সহ্য করতে হবে!

প্রাথমিক ব্যাপারগুলো সামলে নিয়ে এবারে যখন স্কোনসের দিকে নজর দেওয়ার কথা আর দুপাশের দৃশ্য রমণীয় হয়ে উঠছে মিনিটে মিনিটে, সেই সময়েই দেখা গেল, লন্ডন নর্থইস্টার্ন রেলওয়ে ফার্স্ট ক্লাসে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও অঢেল পানীয় সরবরাহ করেন। বিমানের মতন। বলতে না বলতেই একজোড়া মেয়ে নিয়ে এসেছেন তাঁদের পানীয়ের সম্ভার! আর পিছনে আসছে খাবারের ট্রলি। আর কি নেই তাতে!

ঘ্যাটাং ঘ্যাটাং আওয়াজে ট্রেনটা একটা নদী পেরোচ্ছে। টেমসই হবে বোধহয়, লন্ডনের আশেপাশে টেমস ছাড়া আর তো তেমন কোনো নদী আছে বলে জানা নেই! আচ্ছা টেমস তো এঁদের প্রাণ, লন্ডনের হৃদস্পন্দন! এঁরা শ্রদ্ধাবনত হয়ে পয়সা ফেলেন না টেমসে? যেমন মোগলসরাই ছেড়ে ট্রেন কাশীতে ঢোকার সময়ে ফেলা হত?

চলবে…

Leave a comment