বাসস্টপে বসে আছেন একজন মাঝবয়েসী মানুষ। পরনে একটা খয়েরি রঙের হাতকাটা জ্যাকেট আর খুব বড় দাড়ি তার। অনেকটা কার্ল মার্ক্সের মতন। তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গুটিকতক যুবক। তবে যুবক না বলে এঁদের অবশ্য কিশোর বলা চলে। অনেকের পিঠে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে একটি দুটি ফাইল বা খাতাবই। তারা সমবেত হয়ে কি একটা বলছে আর মানুষটি মনোযোগ দিয়ে শুনছেন তাঁদের কথা। জামাকাপড়ের তেমন বাহার টাহার নেই কারোরই, সাধারণ প্যান্ট-জামা আর হালকা সোয়েটার জ্যাকেট পরিধান করেই আছেন সকলে। চশমা আছে কয়েকজনের আর তার পিছনেই একজোড়া করে উজ্জ্বল দীপ্ত চোখ। বোঝা গেল, ভোরবেলায় বেরোনোর আগে, ভেবেচিন্তে ঘন নীল রঙের টি-শার্ট’টা পরে আসলেও, আসল অক্সফোর্ড ব্লু কিন্তু আদপে এরাই। আর এঁদের বুদ্ধিদীপ্ত চোখই জানান দিচ্ছে সেই খবর ক্ষণেক্ষণে।
কয়েকহাত দূরে রাস্তাটা যেখানে দুভাগ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে ডেভিড গোল করে অক্সফোর্ডের কাহিনী বলা আরম্ভ করেছেন সবে। এখানে মোট ঘণ্টা দুয়েকের মতন সময় দেবেন সকলকে। নিজেই ঘুরিয়ে দেখাবেন শহরটা। ডেভিডের সাথে হাঁটার বদলে, যাত্রীদের কেউ যদি কোন নির্দিষ্ট কলেজ, বা মিউজিয়াম ইত্যাদি দেখে নিতে চান, বা চা পান করে নিতে চান, ডেভিডের আপত্তি নেই। তবে কোচ কিন্তু ছাড়বে সাড়ে পাঁচটায়ে। ফেরার মীটিং পয়েন্ট ঠিক করা হল এই বিউমন্ট স্ট্রীটের মোড়ে, ওই মস্ত অট্টালিকাটির সামনে! কয়েক ধাপ সিঁড়ি, আর তারপরেই অনেকটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের আদলে চারখানা বড়বড় থাম। আর এটাই হল প্রখ্যাত অ্যাশমৌলিয়ান মিউজিয়াম অফ আর্ট অ্যান্ড আর্কিওলজি।
আগ্রহী মন নিয়ে অনুসরণ করা শুরু হল ডেভিডকে। ঠিক এক-একটা ইটের মতন করে মাপ করে কাটা পাথরের বাঁধানো সড়ক। খুব সুপ্রাচীন সে পথ, তবে বহু শতাব্দী ধরে পড়ুয়া আর পর্যটকের হাঁটায়, সে পথ কিন্তু এখনও খারাপ হয়নি এতোটুকু। একটা দুটো ছাড়া যানবাহন কিছু চলছেনা তেমন, কেবল ঝাঁকে ঝাঁকে উৎসুক ভ্রমণকারীর দল সার বেঁধে যেন অক্সফোর্ড পরিক্রমায়ে বেরিয়েছেন। বিকেল হয়ে আসছে, শিক্ষার্থীরা বুঝি কলেজ থেকে যে যার বাসস্থানের অভিমুখে ফিরে যাচ্ছেন। দেখা গেল, এর মধ্যে অকারণে জ্যেষ্ঠ এবং কনিষ্ঠ, দুজনেই নিজেদের মধ্যে কোন এক অজানা বিষয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টায়ে মেতে উঠেছে। সারাটা দিন কিন্তু ওয়ারউইকে বা শেক্সপীয়ারের বাড়ীতে বেশ সজাগ হয়েই ছিল দুজনে। হয় ক্লান্ত, নয় বোধহয় অক্সফোর্ডের পড়ুয়াদের দেখেশুনে এক অজ্ঞাত হীনমন্যতায়ে ভুগতে শুরু করেছে দুজন? তাই বুঝি ইচ্ছে করেই নজর করছেনা অক্সফোর্ডের কলেজগুলিকে?
ডেভিড নিজেই পড়তেন অক্সফোর্ডে। গতকালের গাইড এটা বললে, হালকা বুকনি ভেবে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু সকাল থেকে বোঝা গিয়েছে, ডেভিড কিন্তু তুচ্ছ জিনিষ নন। বিদ্যাবত্তা ও সারবত্তা তাঁর যথেষ্ট রয়েছে। কেবলমাত্র অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা বা পরিচিতি দিয়ে কিন্তু ভদ্রলোক বৃত্তি চালাচ্ছেননা। বারকয়েক আমেরিকার বোস্টন – ক্যামব্রিজ শহরে যাত্রার সুবাদে, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি বা ম্যাসাচুসেটস ইন্সিটিউট অফ টেকনোলজি দেখা হয়ে গিয়েছে, দুহাজার দশে স্ট্যানফোর্ডও দেখা হয়ে গিয়েছিল বাইরে থেকে। সবকটিতেই এক বিস্ময়কর রকমের স্থাপত্যকলার নিদর্শন থাকলেও, অক্সফোর্ড কিন্তু একদম অন্য ধাঁচের। ডেভিড এক এক করে প্রতিষ্ঠানগুলি দেখাচ্ছেন আর প্রত্যেকটি দেখে মনে প্রথমেই আসছে ভক্তি। শিক্ষার পীঠস্থান বুঝি দেখতে এমনই হবে! আমেরিকার মতন সাঙ্ঘাতিক রকম বিস্তীর্ণ কোনোটিই নয়, তবুও মনে হবে, এক একটি যেন মন্দির বা সৌধ দর্শন করে নেওয়ার সুযোগ এসেছে আজ।
চীনেরা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। আর খুব মধুর স্বভাব তাঁদের দোভাষীটির। কি করে যে সব চীনেদের তুষ্ট করে রাখবেন, এই নিয়ে তিনি সর্বদা ব্যস্ত। সারাদিন একসাথে ঘোরাঘুরি করলে, বুঝি মানুষে মানুষে দূরত্ব কমে যায়। ডেভিডের অফুরন্ত গল্পের স্টক দেখেই, তাঁদের মধ্যে ইংরিজি বোঝা দু-তিনজন কিন্তু এসে ভিড়েছেন আমাদের দলে। বিধিবৎ শিক্ষার সাথে লিখতে জানার একটা ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। সে মুখে বলে বা অনুকরণ করিয়ে যতই ঘরোয়া শিক্ষা দেওয়া যাক না কেন, না লিখলে বুঝি শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়না। হিয়েরোগ্রিফিলিক্স বা ওইরকম কিছু লিখিত লিপি প্রথম প্রচলন করেছিলেন মিশরীয়রা, তারপরে উত্তরে রোম গ্রিস এথেন্স, পূর্বে মেসোপটেমিয়া পেরিয়ে, লিপির প্রচলন আসে চীনদেশে। ইতিহাস বলে, তখনও বৈদিক যুগ শুরু হয়নি ভারতবর্ষে। তবে ততদিনে হিন্দুধর্ম নিজেদের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছে জাতপাতের ব্যাপারটা। কোন এক অন্ধ ফরমুলায়ে বৃত্তি, বর্ন, বংশগতির নিরিখে চার ভাগে শ্রেণিভুক্ত করে নিয়েছে নিজেদের। সেই ফরমুলার বিরুদ্ধে সেদিন কোন শক্তিধর কেউ রুখে দাঁড়ালে হয়ত অন্যরকম হত আজকের ভারত?
ডেভিড নিজে একজন অক্সফোর্ডের প্রাক্তন। পেমব্রোক কলেজের ছাত্র ছিলেন। পাশ করেছেন সেই উনষাট সনে, তাঁদের আমলে, এথলেটিক্স নিয়ে কলেজে কলেজে রেষারেষির গল্প শোনাচ্ছিলেন ডেভিড। মোট তিরিশটি কলেজ ছিল তাঁর সময়ে, যা কিনা আজ উনচল্লিশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সাথেই জানাচ্ছিলেন, ইউনিভার্সিটির নানাবিধ পরিচালন প্রথা, বিভিন্ন আইন, এইসব নিয়ে একের পর এক সংবাদ। বলছিলেন বাকী খ্যাতনামা প্রাক্তনদের কথা। ডিউক ডাচেসরা তো আছেনই, তার সাথে এই অক্সফোর্ডই দিয়েছে, একগাদা প্রাইম মিনিস্টার আর প্রেসিডেন্ট। তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার, টেরিজা মে বা ডেভিড ক্যামেরন প্রভৃতিরা, তেমনি মনমোহন সিং, ইমরান খান বা বিল ক্লিনটন আর অস্ট্রেলিয়ার টোনি অ্যাবটও কিন্তু অক্সফোর্ডের উৎপাদন। আরও অনেক নোবেল লরিয়েট, কবি, ব্যবসায়ী, সাহিত্যিক, বিভিন্ন সফল মানুষের বিবরণ দিচ্ছিলেন ডেভিড, সবদিকে অতটা নজর না করলেও, নিজের স্বতঃস্ফূর্ততায়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া হল, খ্রাইস্ট কলেজের সামনে। অকারণেই একটা ছবি নিয়ে নেওয়া হল এর সামনে। অ্যালবার্ট আইস্টাইনের স্মরণে।
হুস করে এক একটা দিন কেমন কেটে যায়, বেড়াতে এলে। ডেভিড আমাদের মতনই ক্লান্ত, দেখা গেল। কোচে ওঠার আগে, তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা… কবি টি এস এলিয়ট’ও তো অক্সফোর্ডের? ওঁর সাথে আমাদের কবি বিষ্ণু দে’র সখ্যতা ছিল! আপনি কি এ ব্যাপারে কিছু জানেন?
চলবে…
Leave a comment