হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২৪ লন্ডন চতুর্থ দিন (৩) · জুন ২০১৯

ভাবুক গোছের মানুষদের জীবনে বুঝি অনেক দুর্দশা পোয়াতে হয়। আর তার সাথে যদি আবার তলতলে আবেগ মেশানো থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। নইলে চীনেম্যানদের বিরামহীন কিচিরমিচিরের মাঝে, কোন বোকার হদ্দ অ্যাভন নদীর সাথে কপোতাক্ষের উপমা ভাঁজবে মনে? কালজয়ী সনেট তো রচনা করেছেন উভয়েই। উভয়েই তো নাট্যকার। আর মিল সেরকম খুঁজতে চাইলে, সে’তো হাজার মিল খুঁজে বের করা যায়। একজন সমাধিতে লিখে গেলেন, “গুড ফ্রেন্ড ফর জেসাস সেক ফরবেয়ার, টু ডিগ দি ডাস্ট এনক্লোসড হিয়ার”। আর অন্যজনে লিখলেন, “দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে…”। তবে আর দোষ কোথায়? ক্যাসেলের ইতিহাসকে পিছনে ছেড়ে, কোচ হেলেদুলে চলেছে শাল-সেগুনের বনানী পেরিয়ে। দুধারে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। এ বৃদ্ধ বয়েসেও কেমন মনে হয়, চালক যদি নামিয়ে দিতেন এমন এক রোমাঞ্চকর নীরবতার মাঝে, আলের উপর দিয়ে দেওয়া যেত একছুট। মাঠ ঘাট পেরিয়ে। ডেভিডের ভাষ্যে সম্বিত ফিরতে বোঝা গেলো কোচ পৌঁছে গিয়েছে স্ট্র্যাটফোর্ড। স্ট্র্যাটফোর্ড আপঅন অ্যাভন।

ডেভিড কিন্তু তাঁর ভাষ্যের কৌশলে, এই স্থানে পৌঁছনোটাকে আরও একটু নাটকীয় করে তুলতেই পারতেন। যেরকম বিস্ময়কর লেগেছিল কলেজ জীবনে প্রথমবার ¬কেঁদুলি মেলায় পৌঁছে। ইয়া বড় একটা বাস লাল মাটির ধুলো উড়িয়ে একটা প্রান্তরে ছেড়ে দিয়ে বলল, এটাই মেলা, ভিড় জমবে পরশু থেকে। আসার পথে গাছের ফাঁক দিয়ে, গোটাকয়েক বার দেখা গিয়েছে অ্যাভন নদীটি। সেবারে যেমন দেখা গিয়েছিলো অজয় নদ। তবে ক্যাসেলের পরিখার উপর দিয়ে অ্যাভনকে যতটুকু দেখা গিয়েছিলো, তাতে তো যথেষ্ট চঞ্চল মনে হয়েছিল নদীটিকে। স্ট্র্যাটফোর্ড পৌঁছে দেখা যাচ্ছে, নদীর দুপাশ নির্দয়রূপে পাথরে নিবদ্ধ। এ নদীটি তো বেশ শীর্ণকায়, খরস্রোতা নয় একেবারেই। তবু কেন অদরকারি শাসন করা হচ্ছে এমন শান্ত নদীটিকে?

মাঝারি শহর স্ট্র্যাটফোর্ড। আর সকলে তো ছোটো করে ওই নামেই ডাকছেন! তবে ‘আপঅন’ কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে কেন? কেবল পর্যটকদের কথা ভেবে? নাকি আরও একটা দুটো স্ট্র্যাটফোর্ড শহর রয়েছে ব্রিটেনে? মাথা নেড়ে ডেভিড জানালেন, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের স্ট্র্যাটফোর্ড একসময়ে বাণিজ্যের বিচারে ছিল এক জমজমাট শহর। অ্যাভনের উপরে ক্লপ্টন ব্রিজ নির্মাণের পর, স্ট্র্যাটফোর্ডের বাণিজ্যিক কদর বেড়ে গিয়েছিলো বহুগুণে। তাছাড়া বাঁয়ে নাক বরাবর গেলেই ব্রিস্টল, অদূরেই অক্সফোর্ড, উপরে ক্যামব্রিজ আর আরও একটু এগিয়ে গেলে বার্মিংহ্যাম, এই সব মিলিয়ে স্ট্র্যাটফোর্ড ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যময় একটি স্থান। ডেভিডের মুখে এইসব গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ চমক। বড়রাস্তার পাশেই। বাঁদিকের একটা খড়ের ছাউনি দেওয়া কুটির। আয়তনে বেশ বড়। আন্টোনিও কোচটিকে একটু মন্থর করতেই, ডেভিড বললেন, ওই দেখুন শেক্সপীয়ারের বাড়ি। বলে কি লোকটা? কোথায় সকাল থেকে ভেবে রাখা আছে রূপসী অ্যাভন, গাছে গাছে থোকা থোকা সাদা গন্ধরাজ ফুল, একটা পাহাড়ি ঝর্না, আর তার পাশে এক পর্নকুটির! এতো একেবারে কেঁদুলির চেয়েও বড় চমক দিলেন ডেভিড। এতো পাক্কা শহুরে বেমানান ব্যাপার! কোথায় কল্পনার কপোতাক্ষ আর কোথায় যশোর খুলনার সাগরদাঁড়ি গ্রাম? বাঁদিকে মোড় ঘুরেই কোচ দাঁড়িয়ে গেল, শেক্সপীয়ারের বাড়ির প্রাঙ্গণে এসে।

কয়েক মিটার হেঁটেই, একটা ইটবাঁধানো লাল পথ। দুপাশে সারি দেওয়া টুকিটাকির দোকান, একটা দুটো রেস্তোরাঁ। আর এখানেও ভিড় জমিয়ে গান গাইছেন দুটি ব্রিটিশ যুবক। স্কটল্যান্ডের লাল সবুজ চেক কাপড়ের মাফলার বিক্রি হচ্ছে আকাশছোঁয়া দামে আর শেক্সপীয়ার ওয়েলকাম সেন্টারের সামনে পর্যটকদের মস্ত এক সর্পিল লাইনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন ডেভিড। ওই ওয়েলকাম সেন্টার পেরিয়েই আমাদের ঢুকে যেতে হবে কবির বাড়ীতে। সিকিউরিটি চেকিং করে, প্রথমে পর্যটকদের দেখানো হচ্ছে দু মিনিটের একটি বাধ্যতামূলক ফিল্ম। শেক্সপীয়ারের জীবন আর তাঁর সাহিত্য সঙ্ক্রান্ত সমস্ত তথ্য নিয়ে। আচ্ছা শেলি, কীটস, লর্ড বায়রন, অ্যালফ্রেড লর্ড টেনিসন, বা উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ – এঁদের জন্মভিটেতেও কি এমনটাই এলাহি কাণ্ড হয়? এ যেন বিলেতের এক জোড়াসাঁকোয় এসে পরলাম আমরা! হাতের কাছে জোড়াসাঁকো থাকতে, কপোতাক্ষ নদের তীরে আর কজনাই বা যাবেন?

নাটকের চেয়ে কাব্য বেশি রচনা করলেও, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার সাহেব জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন নাটক রচনা করেই। আর তাঁর জন্মভিটেতে যেন নাটকের ছাপ সুস্পষ্ট। বাইরে থেকে মস্ত বড় লাগলেও, ভিতরের পরিসরে কুটিরটি বেশ ছোটো। দোতলা কাঠের বাড়ী, উভয় তলায়ে অপ্রশস্ত গোটাচারেক করে ঘর। বাড়ির পিছনের উঠোনে, শেক্সপীয়ারের রচনা করা নাটকের অংশ মাতিয়ে অভিনয় করছেন কয়েকটি যুবক যুবতী। একটা দেখালেন রোমীয় জুলিয়েটের অংশ আর অন্য আরেকটি একটা হালকা কমেডি। বেশ ভালো অভিনয় তাঁদের, তবে একটু যেন চড়া মনে হল। চারপাশের কয়েকটি কাঠের বেঞ্চিতে বসে রয়েছেন উৎসাহী দর্শকবৃন্দ। তরুণ শিল্পীরা একটা করে সর্গ শেষ করছেন আর দর্শকদের করতালিতে ফেটে পরছে সেই প্রাঙ্গণ। দেখা গেলো, বেশ হৈহল্লা আর আড্ডার মধ্যেই সাহেবরা কেমন ঐতিহ্য আর বাণিজ্যকে সার্থক ভাবে চালিয়ে নিয়ে চলেছেন।

পাক্কা আধঘণ্টার মতন সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ীতে কাটিয়ে, গিন্নি আর মেয়েরা যখন উচ্ছল ইংরিজি সাহিত্যের নাগাল প্রায় পেয়ে গিয়েছেন, বৃষ্টি শুরু হল আবার। ডেভিড ডাক দিয়েছেন, এরপরে অন্য গন্তব্য, আপাতত আমাদের এই ইংরিজি সাহিত্যের নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ হল…

চলবে…

Leave a comment