আজকের কথা বলছিনা। পুনে ঢুকেই একসময়ে বোঝা যেত এটা কিন্তু বিশুদ্ধ মারাঠিদের শহর। মুম্বইয়ের মতন দোআঁশলা ব্যাপার নয়। অনেক আগে, যেমন বাঙালীয়ানা দেখা যেত পার্কসার্কাস বেকবাগান পেরিয়ে গড়িয়াহাট গোলপার্কে ঢুকলে। ওয়ারউইক শহরে ঢুকলে কিন্তু বোঝা যাবে, এই জায়গাটা পুরোদমে ব্রিটিশ। লন্ডনের মতন পাঁচমিশেলী নয়। শহরে ঢুকে একটা রেল স্টেশন, রেললাইনের নিচ দিয়ে সরু স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তা, ছোটো কয়টি দোকানপাট, একটা লাইব্রেরি, একটা পুরনো থিয়েটার হল আর একটা ব্যাঙ্ক, তার লাগোয়া একটা পোস্টঅফিস। দুরে দেখা যাচ্ছে একটা গির্জার চুড়া আর একটা ওয়াচ টাওয়ার। থমথমে শহর, তবু মনে হয়, হয়ত এখুনি কোথাও বেজে উঠতে পারে বিউগলের বাজনা। রাস্তায়ে যানবাহন কিছু থাকলেও, পথচারী দেখা যাচ্ছেনা কোনদিকে – পুরো ব্যাপারটাই কিরকম নির্ভেজাল ব্রিটিশ। আমাদের কোচটি বাঁক নিল ক্যাসেলের দিকে।
ক্যাসেলে ঢোকার জন্যে, কোচটা যেখানে এসে থেমেছে, সে এক খুব সঙ্কীর্ণ রাস্তা। এতোটাই সরু, যে ওই গোল্ডেন ট্যুরস এর বাসটা উলটোদিকে কাটানোর জায়গাটুকু পর্যন্ত পাওয়া যাবেনা। রাস্তাটার দুপাশে ঘন গাছপালা আর দুরে একটা পাথরের উঁচু পাঁচিল। এমন একটা নিস্তব্ধ জায়গার আশেপাশে যে একটা মস্ত রাজপ্রাসাদ রয়েছে, তা না বলে দিলে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যাবেনা। টিরটির শব্দে কয়েকটা পাখি কোরাস গেয়ে চলেছে কোন একটা গাছের ডালে। কোচ থেকে নামার পরেই, টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে বেড়াচ্ছে গোটাকয়েক প্রজাপতি আর পতঙ্গ। গত তিনদিনের অর্জন করা সাহসে, ছাতা সোয়েটার বা জ্যাকেট কিছুই বহন করা হয়নি আজ। তাই সামান্য একটু শীতও বোধহয় লাগছে তখন সকলের।
পাখিগুলো একটু চুপ করেছে। প্যালেসে ঢোকার আগে, একটু তফাতে আমেরিকানদের জটলাতে ডেভিড কি একটা বেশ হাত-পা নেড়ে, ছাতা উঁচিয়ে বোঝাচ্ছেন, আর ঠিক এমন সময়ে শোনা গেলো নদীর আওয়াজ। ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করাতে জানা গেলো, নদী আছে বৈকি একটা। তবে সে নদী ছোটো। আর এই নদীর নামই অ্যাভন। ডেভিড আরও জানালেন, প্যালেসে ঢুকে ডানদিকের পরিখার উপরে তাকালেই নিচের উপত্যকায়ে দেখা যাবে সে নদীটিকে। নদী শুনলেই আমার কেবল মনে হয়, জুতো খুলে একটু পা ভিজিয়ে আসি। একটু হয়ত মেয়েলী গোছের ইচ্ছেটা। কিন্তু টিপটিপ বৃষ্টিতে, হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে নদীর তটরেখায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে যে সুখানুভব পাওয়া যায়, তা বুঝি রাজপ্রাসাদ দর্শনে নেই!
উইন্ডসরের তুলনায় ওয়ারউইক ক্যাসেল একবারে শিশু। আর ক্যাসেলে ঢুকে দেখা গেলো, এ অনেকটা লন্ডনের মাদাম তুসো মিউজিয়ামের মতনই। প্যালেসের ঘরগুলো বিশাল কিছু নয়, তবে চারিধারে ছড়ানো ছিটনো রয়েছে মোমের সব অতিকায় মুর্তি। বৈঠকখানা ঘরে নিভু নিভু ফায়ারপ্লেসের সামনে প্রকাণ্ড কাউচে বসে আলাপচারিতায়ে ব্যস্ত মোমের সাহেব মেমরা। পাশেই শোবার ঘর, এক এলোকেশী মেম রাজকন্যা শুয়ে রয়েছেন পালঙ্কে আর পায়ের কাছে এক লালমুখো রাজপুরুষ কি একটা বলতে চাইছেন রাজকুমারীকে। হয়ত বিয়ের প্রস্তাব দিতে এসেছেন, কিন্তু কোমরে তার গোঁজা মস্ত ছুরি। না বললেই যেন ঘ্যাঁচ করে এখুনি ঢুকিয়ে দেবে রাজকুমারীরই পিঠে। অন্যদিকে প্যালেসের একটা খাবার ঘর। সুদীর্ঘ লম্বা ডাইনিং টেবিল, থরেথরে সাজানো সোনালি থালা বাটি, সোনার কাঁটাচামচ, রুপোর গেলাসে পানীয়। গিলটি করা পেল্লায় এক একটা ফ্রেমে বিভিন্ন রাজারানীদের পোট্রেট। চীনেরা ছবি তুলে নিচ্ছেন সেসব দৃশ্যের।
ডেভিডের দেওয়া ইতিহাস অত বোধগম্য হলনা, তবে তার ভাষ্য থেকে এটুকু বোঝা গেলো, ওয়ারউইক ক্যাসেল আসলে ছিল দুর্গ। অ্যাভন নদীর তীরে ইংল্যান্ডের নরম্যান সম্রাট উইলিয়াম বানিয়েছিলেন। এই নরম্যানরা আসলে নাকি ছিলেন ফ্র্যান্সের লোক। ইতিহাসের একটা সময়ে, ইউরোপের উত্তরে ডেনমার্ক নরওয়ে আইসল্যান্ড থেকে নিয়ে গোটা পশ্চিম ইউরোপ দখল করে নিয়েছিলেন এই অত্যাচারী নরম্যানরা। উইলিয়ামের পরের যে গল্প, তাতে অনেক নাম রয়েছে। উইলিয়াম, হেনরি, এডওয়ার্ড, থমাস, জন, আরও কত। কত শত হাত বদল হয়ে বছর চল্লিশেক আগে মাদাম তুসোদের কোম্পানি কিনে নিয়েছে ওয়ারউইক ক্যাসেল। তবে তার আগে, এই উইলিয়াম আর হেনরিদের মধ্যে, এই ক্যাসেলের দখল আর মালিকানা নিয়ে দিনের পর দিন হয়ে গেছে কেবল যুদ্ধ আর যুদ্ধ। নরম্যান বনাম নরম্যান, অ্যাংলো স্যাক্সন বনাম নরম্যান। ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ, বাপ ছেলেতে যুদ্ধ, শালা ভগ্নীপতির যুদ্ধ, শ্বশুর জামাইয়ে যুদ্ধ, দুই ভায়রা ভাইয়ে যুদ্ধ, কাকা ভাইপোতে যুদ্ধ, দুই বন্ধুতে যুদ্ধ, এই কোন্দলের কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন শ্রান্ত হয়ে পরছিলেন সকলেই! আচ্ছা বয়স হলে সকলকেই কি একটা করে বাড়ি বা জমি কিনে নিতে হয়? আর না কিনলে ছিনিয়ে নিতে হয় অন্য কারোর থেকে? মানুষের জীবনের মুখ্য লক্ষ্যই কি স্থাবর আর অস্থাবর সম্পত্তি?
ডেভিড গড়গড় করে ক্যাসেলের ইতিহাস বলছেন, দোভাষী সেটারই তাৎক্ষনিক তর্জমা করে দিচ্ছেন আর চীনে পর্যটকেরা হাঁ করে গিলছেন সেসব কাহিনী। ক্যাসেল তো এদেশে সব জায়গায়ে ছড়ানো। সাসেক্স, নরফোক, ম্যানচেস্টার, ইয়র্ক বা ডার্বিশায়ার, সবই তো ক্যসেলের জন্য প্রসিদ্ধ। তার মানে, সব ক্যাসেলেই কি আছে এমন নিষ্ঠুর রক্তাক্ত ইতিহাস? শয়ে শয়ে মানুষ খুনের কাহিনী। ডেভিড যদি এত ভালো ইতিহাস জানেন, এই সকল উৎসুক চীনেদের কি শোনাতে পারছেন না হিউয়েন সাং’এর ভারত পরিব্রজনের গল্প? চীনদেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে মানসিক ভাবে বিষণ্ণ কিশোর, জীবনের কি চরম আস্বাদই না পেয়েছিলেন নালন্দায়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে? আচ্ছা, এঁদের জিজ্ঞাসা করলে হয়না, চীনে কি বৌদ্ধ পরিব্রাজকরা এখনও আছেন? ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং’এর মতন?
নাহ, এই ধরাবাঁধার ইতিহাস মনোযোগ না দিয়ে বরং অ্যাভন নদীটা ওই পরিখার উপর দিয়েই দেখে আসা ভালো। হয়ত বা দেখা যেতে পারে, অ্যাভনের তীর ধরে হেঁটে আসছেন কোন এক আনমনা পরিব্রাজক, পৃথিবীটাকে আরও কমনীয় করে তুলতে!
চলবে…
Leave a comment