উবার ধরার কোনো চেষ্টাই আজ করা হয়নি। গতকালের মতন আজও, আটটার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে। একবার গ্লস্টার রোড বা কেন্সিংটন সাউথ থেকে টিউবের কথা যে মাথায় আসেনি তা নয়, কিন্তু চারজনে মিলে টিউবে, ট্যাক্সির চেয়ে বুঝি খরচ পড়বে বেশি। তাছাড়া গিন্নি গতকালের উবারের উটকো ঝামেলা আর শেষ মুহূর্তের দৌড়োদৌড়িটা ভুলতে পারেননি বুঝি। টিউবের কথা তুলতেই, অকরুণ চোখে তাকিয়ে, দুই মেয়েকে নিয়ে হাঁটা লাগিয়েছেন বড়রাস্তায়ে। তাছাড়া সাড়ে তিনদিন বিলেতে থেকে তাঁর সাহস বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই।
আজকে আর ডানদিক বাঁদিক বিবেচনা না করে, সটান ক্রোমওয়েল রোডের মোড়ে গিয়ে ধরা হয়েছে একটা ব্ল্যাকক্যাব। একটা অসম্ভব চকচকে কালো গাড়ি, মোমপালিশ মারা হয় বুঝি দিনে দু’বার, আর তার ততোধিক চকচকে এর চালক। এই চালককে বুঝি, লন্ডন ব্ল্যাকক্যাব ড্রাইভারদের ‘এম্বলেম’ হিসেবে অনায়াসে চালিয়ে দেওয়া যায়। বয়স্ক, রাশভারী, মাথাজোড়া টাক, চিবুকের নিচে গলকম্বল, ধূসর রঙের চেকচেক কোট, চোখে একটা আরশোলা রঙের ভারী চশমা, ডান হাতে স্টিয়ারিং হুইল আর বাঁ-হাতে একটা খবরের কাগজ।
আমাদের ওখানে, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ী চালাতে দেখেছি অসংখ্য ট্যাক্সিচালককে, তবে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে, খবরের কাগজে চোখ বোলানো, এটাই বুঝি দেখার বাকী ছিল বিলেতে। উবারের ব্যাপারটা সঠিক জানিনা, তবে লন্ডন ব্ল্যাকক্যাব লাইসেন্স পেতে হলে, নাকি বড়ছোটো মিলিয়ে শহরের বিশ হাজারের উপর রাস্তা, বিভিন্ন লেন বাইলেন আর তার তস্য গলিখুঁজির হদিশ আর সাড়ে তিনশো রুটের মুখস্থ ধরা দিতে হয় পরীক্ষার্থীর। কমসে কম, নাকি তিন থেকে চারবছর করে লাগে এক একটা চালকের সেই ট্যাক্সির পরীক্ষায়ে পাশ করতে। কিন্তু তাই বলে, এমনই অভিজ্ঞতা এঁর, এতোটাই নৈপুণ্য, যে শেষে কিনা খবরের কাগজ দেখতে দেখতেও অনায়াসে চালিয়ে নিচ্ছেন ট্যাক্সি?
তবে লোকটি আমাদের দেখেই হয়ত চট করে বুঝে নিয়েছেন, এঁরা দরিদ্র মানুষ। ভিক্টোরিয়ায়ে পৌঁছে, টিপ-ফিপ তো কিছু নিলেনই না, বরং মিটারে চোদ্দ পাউন্ড কুড়ি পেন্স ওঠাতে, একটা কুড়ি পাউন্ডের নোটে, পুরো ছয় পাউন্ড ফেরত দিলেন। তাঁর মুখের কাঠিন্য দেখে, সেখান থেকে যে একটা পাউন্ড বকসিস দিয়ে লোকটাকে বুঝিয়ে দেবো, যে আমরা ভয়ঙ্কর রকমের দরিদ্র কিছু নই, সে দুঃসাহস অবশ্য হলনা আমাদের।
কোচে চেপে দেখা গেলো আজকের গাইড ভদ্রলোকও বেশ বর্ষীয়ান। ইনিও পাক্কা ব্রিটিশ। বিরলকেশ, বেঁটে, এবং বয়েসের ভারেই হয়ত একটু ন্যুব্জ হয়ে পরেছেন। বললেন, আগে চাকরি করতেন বিবিসি’তে। অবসরের পরে, ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এখন কাজ নিয়েছেন গোল্ডেনের হয়ে। অসম্ভব মার্জিত তাঁর কণ্ঠস্বর, ধারালো ইংরিজি, হাতে পূর্ণদৈর্ঘ্যের একটা ছাতা আর মুখে একটা উচ্চাঙ্গের হাসি। এঁর নাম জানা গেলো ডেভিড।
ডেভিডের সাথে আলাপ হয়ে মন খুশ হয়ে গেলেও, আজকের সমস্যা কিন্তু অন্য। গোল্ডেন ট্যুরসের কোচ আজ পুরোপুরি ভর্তি চীনেম্যানে। ঝাঁকে ঝাঁকে চীনেম্যান চলেছেন ওয়ারউইক ক্যাসেল, উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বাড়ি আর অক্সফোর্ড বেড়াতে। কোচের ভিতর, সামনে পিছনে ডানদিকে বাঁদিকে উপরে নিচে, যেদিকে দুচোখ যাচ্ছে, সেদিকেই উপবিষ্ট রয়েছেন চীনে নারী পুরুষেরা। কোচের একদম সামনের দিকের তিনটে সীটে ডজনখানেক আমেরিকান রয়েছেন, মাঝামাঝি আমরা চারটি বাঙালী আর একটু এগিয়ে দুটি মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষ। আর কোচের বুঝি বাকী সকলেই এসেছেন চীনদেশ থেকে। চাই চুং ফুং ফাং ভাষায়ে অবিচ্ছিন গালগল্প করে চলেছেন নিজেদের মধ্যে। চীনেরা এতো গল্পপ্রিয় হয়, জানা ছিলোনা আগে।
এই দলটির সাথে দোভাষী রয়েছেন বটে একজন, তবে কোচে চীনেদের সংখ্যাধিক্যয়ে, ডেভিড বেচারা কিন্তু পরে গিয়েছেন মহা ফাঁপরে। চীনের দলটি একবর্ণও ইংরিজি বোঝেন না। এদিকে তাদের গাইডটি কথা বললে, ডেভিডের ভাষ্য প্রায় কিছুই শোনা যাচ্ছেনা। আর মজার বিষয় তাদের গাইডটিও ভয়ানক বাচাল। একবার কথা শুরু করলে, সে ব্যাটা কিছুতেই থামতেই জানেনা। ডেভিড দুলাইন কথা বললে, তর্জমা করতে লাগছে তাঁর পাঁচ মিনিট।
তবে সমস্যার সমাধান করলেন কোচের নবীন চালক আন্টোনিও। পর্তুগীজ যুবকটি ডেভিডের কণ্ঠস্বর প্রযুক্তির কোনো এক উদ্ভাবনী উপায়ে বিভক্ত করে দিলেন দোভাষীর কণ্ঠ থেকে। ডেভিড কথা বলা শুরু করলেন একটি ভিন্ন মাইক্রোফোনে, আর সেই ধারাভাষ্য আমাদের কানে আসা শুরু হল ইয়ারফোনের মাধ্যমে। আর চীনে লোকটি তখন অন্য মাইকে। সামান্য অসুবিধা থেকে গেলেও, সেটা বরদাস্ত করে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখা গেলনা। এদিকে খুব বোঝা যাচ্ছে, বেশ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেও, আমেরিকানরা বা ডেভিডও কোনপ্রকার বিরক্তি প্রকাশ করলেননা।
ডেভিডের রসবোধ অত্যন্ত উঁচুমাপের। ধারাভাষ্যে তাঁর শানিত ভাষা ব্যবহার করছেন অনেক মেপে, আর সব কথায় সযত্নে বিবেচিত, পরিমিত কৌতুকে, আমরা ততক্ষণে তাঁর ফ্যান হয়ে গিয়েছি। রবি ঘোষকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে, কৌতুক সম্বন্ধে স্বয়ং সত্যজিৎ রায় একবার বলছিলেন, কেবল ভালো স্ক্রিপ্ট বা কন্টেন্ট থাকলেই হয়না, কমেডির মুখ্য উপদান কিন্তু টাইমিং আর কণ্ঠস্বরের বিস্তার। দেখা গেলো, দুটোতেই ডেভিডের পটুতা রয়েছে।
তবে ডেভিড কিন্তু কমেডিয়ান নন। বিলিতি গল্পের অফুরন্ত ভাণ্ডার আর তার সাথে একজন সুদক্ষ গাইড মাত্র। গল্পের মাঝেই খুব চতুর ভাবে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন তামাশা আর সে তামাশা জুড়ে কেবল ইংরেজদের অকৃতিত্বের গল্প। আমেরিকা বা ইউরোপের অন্যদেশের তুলনায়, মায় ভারতীয়দের তুলনায়, তাঁদের জাতিটা কত অকর্মণ্য, তার গল্পই যেন আজ ফেঁদে বসেছেন ডেভিড। মার্কিনী পুরুষ নারীরা খুব মজা পাচ্ছেন, কয়েকজকে তো হেসে লুটিয়ে পরতে দেখা গেল। কিন্তু এটা কি জানেন ডেভিড, ওই সাহেবি ব্যাঙ্গ, ওই প্রহসনের মাঝেই যে লুকিয়ে আছে প্রচ্ছন্ন দম্ভ, অস্ফুট আত্মাভিমান, সেটা বোঝার মতনও একজন যাত্রী রয়েছেন তারই কোচে?
চলবে…
Leave a comment