হায়না তো চায়নায়ে মশাই ২১ লন্ডন তৃতীয় দিন (৪) · জুন ২০১৯

সারাদিনের ব্যাপক ছুটোছুটিতে খ্রিষ্টপূর্ব আর খ্রিস্টাব্দ গুলিয়ে গিয়েছে। আর বোঝা যাচ্ছে, গাইড লোকটিও একেবারে স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান গোছের জিনিষ। সকালের দিকের উইন্ডসর ক্যাসেলের ইতিহাসে ফাঁকফোকর তেমন না থাকলেও, বিকেলে বাথ ছাড়ার পর থেকে কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যায়ে প্রচুর অসঙ্গতি ধরা পরছে। পরিণামে কোচের একদম সামনের দিকে বসা এক দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ কিন্তু দু একটা বেশ ভালো কটাক্ষ করছেন গাইডকে। এবারে গন্তব্য স্টোনহেঞ্জ আর স্টোনহেঞ্জের কি একটা জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত অর্থ বৃদ্ধকে বোঝাতে না পেরে ভদ্রলোক একদম ঘেমেনেয়ে একশা। আর তাতেই দিনের প্রথমবারের জন্য মুচকি হাসতে দেখা গেল আমাদের পাশে বসা ফরাসি নারীটিকে। পুরুষটি ঘুমিয়ে কাদা আর মহিলা তাঁর খয়েরি গগলস খুলে চোখেমুখ সাফ করছেন টিস্যু পেপারে।

বাথ থেকে স্টোনহেঞ্জ লাগে একঘণ্টার মতন। বিকের চা কফি পান করার বিরতি দেওয়া হয়েছিল বাথেই আর শোনা গেলো, স্টোনহেঞ্জে খাবার দাবারের কোন সংস্থান নেই। সে জায়গার আশেপাশের দশ কিলোমিটারের মধ্যে নাকি কোন জনবসতি নেই। বাইরের দৃশ্যাবলী এখনও প্রায় একই, বড় গাছ প্রায় নেই বললেই চলে। বরং এদিকের আকাশ বোধহয় আরও বেশি ঘন নীল আর ঘাসের প্রান্তর আরও বেশি সবুজ। একইসাথে এমন ঘন নীল আর সবুজের কন্ট্রাস্ট দক্ষিণ ভারতীয় কাঞ্জিভরম শাড়ীতেই বুঝি দেখা যায়। মাঝে মাঝে পেরিয়ে যাওয়া হচ্ছে দু একখানা বর্ধিষ্ণু গ্রাম, গোটা দশেক লাল টালির ছাদ দেওয়া বাড়ি। বাড়িগুলোর প্রত্যেকটির উপরে টানানো একটা আদ্যিকালের টেলিভিশনের অ্যান্টেনা। সামনে একটা করে ছোটো বাগান, আর দু পাঁচটা মরশুমি ফুলের বাহারি গাছ। দু পা এগোলেই একটা গির্জা, একটা সরাইখানা ও একটা পোস্টঅফিস। এই কয়টি আবশ্যকীয় উপাদান থাকলেই, সেই দশটা বাড়ি মিলে তৈরি হবে একটা গ্রাম। দোকান বাজার ছাড়া কিভাবে একটা গ্রাম চলতে পারে? এ প্রশ্ন করে অবশ্য গাইড লোকটিকে ঝামেলায় ফেলার কোন মানে হয়না! তাছাড়া আমি যত ভাবছি, আগামীবার মাসাইমারা যাবো, গিন্নি দেখছি বাচ্চাদের বকাবকি করছেন। বাইরের দৃশ্য না দেখে মোবাইলে চোখ রাখার জন্য।

সামনের বৃদ্ধের সাথে গাইড লোকটির কথা কাটাকাটি এখনও অব্যাহত রয়েছে, আর তারই মধ্যে আমরা হুট করে পৌঁছে গিয়েছি স্টোনহেঞ্জে। ইতিহাসের তথ্য নিয়ে লোকটা ভুলভাল বললেও, একটা বিষয় কিন্তু একদম সঠিক বলেছেন উনি। একটা অদ্ভুত জনমানবহীন তেপান্তরের মাঠের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের কোচ। স্টোনহেঞ্জ তো দূরের কথা, সামনে কেবল একটা দোতলা আধুনিক ওয়েলকাম সেন্টার ছাড়া আর চারধারে কিচ্ছুটি নেই। যতদূর দেখা যায়, ততদুরই কেবল ঢালাও মখমলের মতন সবুজ ঘাস। তাছাড়া দেখা গেলো, স্থানটি খুবই নির্জন, আমাদের দলটি ছাড়া আর কেউ কোথাও নেই। আচ্ছা এখানে এসে কারোর যদি খুব খিদে পায়? গিন্নি বললেন, এইটাই ভালো। এরকম একটা নিরিবিলি জায়গাতে, যদি একগাদা দোকান বাজার গজিয়ে যেত বা মুড়ি তেলেভাজা বিক্রি হত, তাহলে কি খুব ভালো লাগত? আহা, এমন একটা জায়গায়ে যদি একটা রুপোলী নদী থাকতো আর সে নদীর পাশে বসে পান করা যেত অল্প মহুয়া? কিমবা অকৃপণ চিৎকারে গাওয়া যেত একটা রবীন্দ্রনাথের গান?

স্টোনহেঞ্জ যাওয়ার সাটল বাস ছাড়ছে ওয়েলকাম সেন্টারের সামনে থেকে। দুটিই মাত্র বাস। গাঢ় ষ্টীল রঙের বাসদুটি আর পিছনে বাঁকা বাঁকা অক্ষরে লেখা “স্টোনহেঞ্জ – স্টেপ ইনটু ইংল্যান্ডস স্টোরি”। মাত্র দুই মাইল দূরেই আমাদের দ্রষ্টব্য আর সে কারণেই বাসে সীটের সংখ্যা কম। বাস ছাড়তেই, একটি রেকর্ডেড নারীকণ্ঠের মাধ্যমে পর্যটকদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্টোনহেঞ্জের ইতিহাস। আর সেই ভাষ্যর একলাইন শুনেই বোঝা গেলো, গাইড ভদ্রলোকটিকে বৃদ্ধটি কেন কটাক্ষ করছিলেন!

অনেককটি এবড়ো খেবড়ো পাথর। ইতিহাসের এক অদ্ভুত হিসাবনিকাশে সেই পাথরগুলি কেমন একে অন্যের সাথে সমান্তরাল আর সমকোণের সামঞ্জস্য রেখে খাড়া রয়ে আছে সেই ব্রোঞ্জযুগ থেকে। চারপাশে আর কিচ্ছুটি নেই, কেবল সবুজ আর সবুজ। সেই ঘাস হয়ত গজিয়েছে গতকালই, তবুও স্টোনহেঞ্জের সামনের সেই ঘাসকেই কেমন যেন অতীতকালের বলে মনে হচ্ছে। যারা ইচ্ছুক, তারা এখানে ওয়াকিং ট্যুর করতে পারেন। স্টোনহেঞ্জকে কেন্দ্রস্থল করে, সাড়ে চার কিলোমিটার টানা একটি ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে আসতে হবে। যারা সেটি করছেন তারা অবশ্য আমাদের দলের নন। সকালে এসেছেন, সারাদিন স্টোনহেঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক খুঁটিনাটি জেনে নিতে।

অদূরেই দেখা যাচ্ছে একটি ছোট্ট বনানী। যেমনটা দেখা গিয়েছিল আমার এক মাসীর বাড়ির কাছের শীতপুরের জঙ্গলে। গিন্নি দেখলাম স্টোনহেঞ্জ নিয়ে গবেষণায়ে মত্ত, পাথরের ফলকে লেখা ইতিহাস খুঁটিয়ে পড়ে নিচ্ছেন। আর আমি ভাবছি, ভাগ্যিস এমন প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাপারটা পাওয়া গিয়েছে বিলেতে। আমাদের দেশে হলে এতদিনে বোধহয় এক অনন্য শিবলিঙ্গ ভেবে, একটা মন্দির গড়ে নেওয়া হত!

চলবে…

Leave a comment