এত তারতম্য, এত ফারাক থাকা সত্ত্বেও কেন যে খালি বারেবারে নিজের দেশের কথা মনে হয় আর পুরোটা সময় মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে অসম তুলনা। এই যেমন, এমন সারাদিনের বাস সফরে পিছনের সীটের যুবক যুবতীরা একটা সমবেত গলায় গান ধরতে পারেন। এমন উপভোগ্য পরিবেশে, হেঁই সামালো-র কোরাস বা ধিতাং-ধিতাং বোলে, কিন্তু জমে যেত বেশ। অজানা অপিরিচিত যাত্রীরা ছন্দে ছন্দে তালি দিয়ে তাল দেবেন। আর সে তালে গায়ক গেয়ে উঠবেন আরও উচ্চস্বরে। হঠাৎ কারোর কোন অনুমতি ছাড়াই, সামনের দিকের বর্ষীয়ান কেউ একটা পল্লীগান ধরবেন খোলা গলায়, পেছনের যুবকেরা ধুঁয়ো ধরবেন আর একটা অনুচ্চারিত মৈত্রী আরম্ভ হয়ে যাবে পর্যটকদের মধ্যে।
উইন্ডসরকে পিছনে ফেলে, আমরা চলেছি রোম্যান বাথের দিকে। মঙ্গলবারের মধ্যাহ্নে গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানির কোচ একেবারে নিস্তব্ধ। চারিপাশের দৃশ্যাবলী মোটামুটি একইরকমের, দুধারে সবুজের ঢেউ। মনে হয় কেউ কোনদিন সে সবুজে পা রাখেননি। কেবল সকালের তুলনায় রোদের তেজটা বুঝি একটু বেড়ে গিয়েছে। বম্বে – পুণা যাত্রার মতন, এরা কিন্তু সর্বক্ষণ বাসের এয়ার-কন্ডিশানিং মেশিন চালিয়ে রাখেননা। মিনিটদশেক চললে, বন্ধ করে রাখা হচ্ছে আধঘণ্টা। আর এই গুমোটে তো জানালা খোলার উপায়ও নেই।
তবে যে যাই বলুক, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য অসম্ভব মনোরম হলেও, আমাদের দেশের মতন শ্বাসরুদ্ধকর নয়। ওক আর পাইনের মধ্যে দিয়ে এই পথ, আর মাঝে মাঝে এক একটা ছবির মতন সাজানো গ্রাম। কুলকুল করে বয়ে যাওয়া একটা স্রোতহীন নদী আর ছোটো একটা গির্জা। এই দেখে বিভূতিভূষণ কিন্তু আর একটা আরণ্যক লিখে ফেলতে পারবেন না কিছুতেই। পথে চোখে পরছেনা একটাও মহীরুহ, একটাও পুষ্করিণী বা গা ছমছমে অরণ্য। উত্তরবঙ্গের রাস্তার মতন, দুম করে বাস থামিয়ে দেওয়া হচ্ছেনা, দুটি হাতি তাদের শাবক নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে বলে। বড় কোন বৃক্ষের নিচে ময়ূর দেখা যাচ্ছেনা একটাও রাজস্থানের মতন। আর বনস্পতির আন্দোলন ধরিয়ে শনশনিয়ে হাওয়াও বুঝি চলেনা এদেশে। মোটকথায়ে এই দৃশ্যপট অসাধারণ লাগলেও, আদিমতার কোন শিহরন নেই এখানে।
রোম্যান বাথকে ছোটো করে শুধু বাথ বলা হয়। রোম্যান কথাটা বুঝি কেবলমাত্র ইতিহাস আর গাইডবুকের জন্য। কোম্পানির গাইড ভদ্রলোকও দেখা গেল বলছেন দ্য সিটি অফ বাথ। রোম্যানদের কৃতিত্ব না দেওয়ার জন্য, নাকি এর পিছনে কোন বাণিজ্যিক বুদ্ধি রয়েছে, সেটা কিন্তু উপলব্ধি করতে পারা গেলনা। নগর না বলে বাথকে একটা ছোটো শহরতলী বললে বুঝি ঠিক হয়। তবে যেকয়টি বাড়িঘর দেখা গেল বাথে ঢোকার মুখের বাসস্ট্যান্ডে, সেগুলি লন্ডনের মতন সাবেক স্থাপত্যের নয়, বরং একেবারে সুপ্রাচীন পৌরাণিক যুগের। কালচে হলুদ রঙের সুবৃহৎ বেশ কয়েকটি অট্টালিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যেন কোনো এক অদ্বিতীয় সম্রাটের খেয়ালে। প্রতিকটি বাড়ি যেন ওয়েস্টমিন্সটার অ্যাবি’র এক একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। ওইসব বাড়িগুলিরই মধ্যে দিয়ে একটি সঙ্কীর্ণ রাস্তা চলে গিয়েছে। আর সেই রাস্তা ধরে পর্যটকেরা লাইন করে দেখতে চলেছেন রোম্যান বাথ।
কোচ নির্দিষ্ট স্থানে ছেড়ে দেওয়ার পর আসল দ্রষ্টব্যে গিয়ে পৌঁছতে সময় লাগবে হেঁটে মিনিট পাঁচেক। রাস্তার দুপাশে অনেক কয়টি দোকান। তবে একটি দুটি ছাড়া কিন্তু সবকটিরই দুপুরে ঝাঁপ বন্ধ রাখা রয়েছে। একদম আদর্শ ব্রিটিশ ব্যাপার, যেটা কিনা দেখা যেত কলকাতায়। খানিকটা পেরিয়েই একটা আয়ত চাতাল, আর তার চার চৌহদ্দি জুড়ে রাখা রয়েছে অনেককটি কাঠের বেঞ্চি। সবকটিতেই বসে রয়েছেন পর্যটকেরা আর মাঝে একঝাঁক যুবক গীটার বাজিয়ে গান গেয়ে চলেছেন। কোন অকারণ হইচই নেই চারিপাশে, বেশ ঠাণ্ডা নিরুপদ্রব একটি পরিবেশ। তবে ওই গানের মাঝে কেবল ভেসে আসছে বাড়িগুলোর কার্নিশে বসা কয়েকটি পাখির উগ্র কর্কশ আওয়াজ। আকারে বেশ বড়সড় সাদা রঙের পাখিগুলো। ছাই রঙের তাদের ডানা আর দেখতে যেন পায়রা আর হাঁসের মিশ্রণ। সুকুমার রায় এই জীব দেখেই বুঝি তাঁর খিচুরি পদ্যটি লিখেছিলেন!
ছোটো একটি উষ্ণ জলাশয়। জলাশয় না বলে, চৌবাচ্চা বললে বরং ভাল হয়, বড়জোর তিরিশ ফুট বাই ষাট ফুটের একটি আয়তক্ষেত্র। তাতে টুপটুপে নীল ঘোলাটে জল আর সে জল যে গরম ও ছোঁয়া নিষেধ বুঝতে গেলে, কয়েকটি জায়গায়ে ওঠা বুড়বুড়ি আর চারধারের নানাবিধ বিজ্ঞপ্তিই একমাত্র উপায়। আর তার সাথে সন্নিহিত বিশাল বিশাল থামগুলির উপরে একটি ঝুলন্ত প্রাঙ্গণ। প্রতিকটি থামের উপরে একটি করে রোম্যান পুরুষের মূর্তি, সকলেই রাজা। আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক যে মূর্তিটি, সেটি স্বয়ং সম্রাট জুলিয়াস সিজারের। বাকী রোমক পুরুষেরা বেশ এলিয়ে বসে থাকলেও, সিজার কিন্তু বসে রয়েছেন শিরদাঁড়া টানটান করে।
এখানেও দেখা গেল, কিউরেটরদের কড়া রক্ষণাবেক্ষণ। বিদেশিনী দুই পর্যটক হতবুদ্ধি হয়ে এক তত্ত্বাবধায়ক ভদ্রলোককে বেশ চেপে ধরেছেন, আর গিন্নি দেখলাম তাদের সাথেই শুনে চলেছেন বাথের ইতিহাস। কিভাবে এই বাথের উষ্ণ জলে স্নান করে সারিয়ে নেওয়া হত বাতব্যাধি, গাঁটের ব্যাথা আর কুষ্ঠ। সেই শুনে, দেখা গেলো মেয়েদুটিও তখন খুঁজে বেড়াচ্ছে সালফারের উৎসস্থল। নাহ! এবারে এঁদের একবার বক্রেশ্বর বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে।
চলবে…
Leave a comment