হায়না তো চায়নায়ে মশাই ১৯ লন্ডন তৃতীয় দিন (২) · জুন ২০১৯

দিনটি সুন্দর আর শহুরে গণ্ডীর বাইরে বেরিয়ে চারিধার যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠছে। ঘন সবুজ অপরূপ প্রান্তরের মধ্যে এক প্রশস্ত হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলেছে গোল্ডেন ট্যুরসের কোচ। দুপাশের বাড়িঘরের মাপ ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে। শৈশবের ড্রয়িংক্লাসে ঠিক এমনটাই কোনো ছবি আঁকতে চাইবে যে কোনো শিশু। সাদা পাতার অর্ধেকটা জুড়ে খয়েরিরঙের একটি খাটো বাড়ি, তার মাথায় চিমনি, বাড়ির দুপাশে ঠিক হাতেগুনে দুটি ঝাঁকড়া বড় গাছ আর সবুজ ঝোপঝাড় দেওয়া ঢালাও মাঠ। আর বাকী অর্ধেকে একটা গাঢ় নীল আকাশ আর আকাশে একটা নিটোল কোমল সূর্য। রোদ নেই তাতে একদম। অতি আগ্রহী মন নিয়ে কোচের সকলের চোখই জানালার বাইরে। তবে দুঃখের বিষয়, উইন্ডসর ক্যাসেল লন্ডন থেকে মাত্র মাইল পঁচিশেকই দুরে, সময় লাগবে একঘণ্টার মতন। সুতরাং বেশিক্ষণ বুঝি এই মনোরম প্রকৃতির বিরল আস্বাদ নেওয়া যাবেনা।

কোচে আমাদের বাম পাশে যে নারী পুরুষটি সফর করছেন, তারা ফরাসি। আমাদের মতন গরমের ছুটিতে লন্ডন বেড়াতে এসেছেন দুজনে। এঁদের বাসস্থান ফ্রান্সের কলম্বাস নামের একটি শহরে। তবে দেখে কিন্তু আমাদের দেশের মতন সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়না, এরা সম্পর্কে স্বামী – স্ত্রী কিনা! তাছাড়া সরাসরি জিজ্ঞাসা করাটা এ দেশের রুচি অনুপাতে, একটা মূর্খতা। লোকটি মিশুকে নন, তবে একদুই কথায় যেটা জানা গেলো, এনারা বেশ ঘরকুনো, আমাদের মতনই। উঠলো বাই তো কটক যাই গোছের, খুব একটা এদিক সেদিক বেরিয়ে পরাটা এঁদের ধাতে নেই।

কোচে না চেপে, অনেক পর্যটক কিন্তু উইন্ডসর আসেন ট্রেনে। কোচে ঘণ্টাখানেক সময় লাগলেও, ট্রেনে এই দূরত্ব আসতে সময় লাগবে আধঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট। এখন পৌনে দশটা, আমাদের কোচটি এসে দাঁড়িয়েছে উইন্ডসরের ছোট্ট রেলস্টেশনের ধার ঘেঁষে আর সেই প্লাটফর্মে একটা সবুজ রঙের ফাঁকা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনটিতে একটা ইঞ্জিন আর দুটিমাত্র ক্ষুদ্রাকার কামরা। অনেকটা দার্জিলিঙের টয়ট্রেনের সাথে মিল পাওয়া যায়। অদুরে রেললাইনের উপরে একটা ওভারব্রিজ পেরিয়ে উইন্ডসর অঞ্চল আর তার সন্নিকটে উইন্ডসরের সুবিখ্যাত ক্যাসেল। আমাদের কোচ ছাড়াও ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে আরও গোটা পনেরো কুড়ি বাস আর দলেদলে পর্যটক হেঁটে চলেছেন ক্যাসেল দর্শন করতে। রাস্তার দু-পাশে বর্নময় পিটুনিয়া ফুলের বাগান আর সারি দিয়ে ছোটছোট দোকানঘর। আইসক্রিম আর কফি ছাড়াও, স্মারক গোছের সামগ্রীও বিক্রি হচ্ছে সেখানে। ক্যাসেলে পৌঁছনোর ওই পাথর বাঁধানো হাঁটা পথটুকু এত নয়নাভিরাম, যে ক্যামেরায় ছবি নিয়ে রাখছেন প্রায় সকলেই।

পৃথিবীর কাছে ইউনাইটেড কিংডমের জাতীয় পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক হলেও, রানির নিজস্ব ধ্বজা কিন্তু আলাদা। এটির নাম রয়্যাল স্ট্যান্ডার্ড আর এই ধ্বজায় মূলত লাল আর হলুদ রঙের চারটি চৌখুপিতে, চার রকমের ভিন্ন প্রতীক আঁকা থাকে। রানিমা যখন যে স্থানে অবস্থান করেন, এই নিশানটি সেই স্থানে উড়তে দেখা যাবে সর্বক্ষন। রানি নিজে উপস্থিত না থাকলে, নিয়মানুসারে, সব জায়গাতে ইউনিয়ন জ্যাক ওড়ানোর ব্যাবস্থাই থাকবে। আজ ক্যাসেলে ঢোকার লাইন পরেছে লম্বা। গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানির গাইড ভদ্রলোকটি জানালেন, এমনটা নাকি সচরাচর হয়না।

ক্যাসেলে অগ্রসর হওয়ার রাস্তাটা বেশ সরু আর সে পথেরই দুপাশে অনেককটি সুবিশাল বটগাছ। ওই রাস্তার দুধারে ছোটছোট বাসায় থাকতে দেওয়া হয়েছে প্যালেসের কর্মচারীদের। আর তার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলেছে আমাদের লাইনটা। সকালের দিকে সামান্য শীতভাব থাকলেও, এখন বেলা এগারোটায়ে বেশ ঝাঁঝালো রোদ আর সেই তাপে ঘাম হচ্ছে বেশ। আমাদের দেশে এমন লাইন দিতে হলে, মানুষ কতরকমের কার্যকলাপ শুরু করে দেন। কেউ বাবু হয়ে বসে পড়বেন রাস্তায়, কেউ অযথাই রাগ দেখাবেন, বা কেউকেউ ঠাট্টাতামাশা শুরু করে দেবেন অচেনা মানুষের সাথে। গুমোট আবহাওয়ায়ে ঘামটাম হলে, কেউ আবার ঘনঘন জলের ঝাঁপটা মারবেন চোখেমুখে। তবে এ’লাইনে সকলে কেমন নিশ্চল রোবটের মতন স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক সরলরেখায়ে। এই অদরকারি ডিসিপ্লিন দেখে আমরা বেশ হতবাক হয়ে গেলাম।

দ্রষ্টব্য জায়াগায়ে ঢুকতে এত সময় লেগে গেলে, আসল মজাই বুঝি ফুরিয়ে যায় তার আগে। আর সেখানে পৌঁছে প্রথমেই ছুটোছুটি লেগে যায় বাথরুম খুঁজে বের করতে। তবে ক্যাসেলের সিংহদরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমে যা বোঝা গেল, এটি আসলে সুবিশাল একটি দুর্গ। বা দুর্গের আদলে তৈরি একটি অতিকায় রাজপ্রাসাদ। বিঘা বা একরের হিসেব আমরা কেউ বুঝিনা, তবে আকারে আয়তনে প্রাসাদটির নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট আর আপার আর মিডল টীয়ার মিলিয়ে, যে কোন দিন, দিল্লীর লালকেল্লা বা যোধপুরের মেহরনগড়ের দুর্গকে লজ্জায় ফেলে দেবে উইন্ডসর। তাছাড়া দুর্গের চারিপাশে আদিগন্ত তৃণাবৃত মসৃণ উন্মুক্ত জমি আর তার পাশেই বয়ে চলা টেমসের দেখা গেলো সম্পূর্ণ অন্য একটি রূপ। লন্ডনের ব্যস্ততা ছেড়ে, রানিমা কেন উইন্ডসরের স্বপ্নপুরীতে চলে আসেন সপ্তাহান্তে, গাইড ভদ্রলোকের তা আর বিশদে বুঝিয়ে বলে দেওয়ার প্রয়োজন হলনা।

বাইরে থেকেই ক্যাসেলটার গোটা দশেক ছবি তুলে, দুইকন্যা সমেত ততক্ষণে ঝাঁপিয়ে পরা হয়েছে ক্যাসেলের মধ্যে একটি বিশেষ আইসক্রিমের দোকানে। সেই আইসক্রিম নাকি বানানো হয়, রয়্যাল ফ্যামিলির রয়্যাল গরুর দুধে। দোকানটিতে লাইন পরেছে, দেখা গেলো এখানেও সবচেয়ে সস্তা কিন্তু ভ্যানিলা, মাত্র পাঁচ পাউন্ড। মেয়েরা ব্লুবেরি ক্রিমেরটা বেছে নিলে, আমাদের কর্তা গিন্নি একটাই ভ্যানিলা ভাগ করে চালিয়ে নেওয়া হল। আমার সন্তুষ্টি রয়্যাল গরুতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, গিন্নি কিন্তু সর্বাংশে ঘুরে দেখেছেন উইন্ডসরের অভন্ত্যর। ফেরার পথে তাঁর গল্পেই শোনা গেলো, ক্যাসেলের ভিতরে সব নাকি সোনার। সোনার দেওয়াল, সোনার খাট, সোনার সিলিং, সোনার ডাইনিং টেবিল, সোনার বাতি, মায় সিঁড়ির রেলিঙও নাকি সোনালী। একেবার ঠাকুমার ঝুলির বিবরণের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে উইন্ডসর ক্যাসেল। তবে বুঝলাম এদেশে দুয়োরাণী বলে কিছু নেই, বিলেতে সবই বুঝি সুয়োরানীর বৈভব। কোচে হেঁটে ফেরার সময় মনে হল, প্রাসাদে সব যদি একঘেয়ে সোনালী হয়, পার্থক্য বোঝাতে রাস্তার রঙীন পিটুনিয়াগুলো তো আছে।

গোল্ডেন ট্যুরসের লাঞ্চ প্যাকেট সংগ্রহ করে কোচে উঠে দেখা গেল, ফরাসি নারী পুরুষটি ফিরে এসেছেন আমাদের আগেই। আর তাঁদের অবারিত খুনসুটি দেখে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা স্বামী স্ত্রী নন।

চলবে…

Leave a comment