হায়না তো চায়নায়ে মশাই ১৮ লন্ডন তৃতীয় দিন (১) · জুন ২০১৯

আল-মাদিদ আজ গ্রিনীচ চলেছেন, একটা কনফারেন্সে হাজিরা দিতে। সিগারেট ফুঁকছেন, তবে গতকালের মতন সহিংস ভাবে নয়। আজ বেশ আয়েস দেখা যাচ্ছে মাদিদের ধূমপানের মধ্যে। ভোরে পেটটা পরিষ্কার হয়ে গেলে যেমনটা হয় আরকি! এদিকে সকাল-সকাল যথেষ্ট ক্ষিপ্রতায়ে আমাদের তিন মহিলাও ব্রেকফাস্ট সেরে লবিতে এসে পরেছেন। চোখেমুখে প্রত্যয় আর পরিতোষ মিশ্রিত হাসি ঝোলানো, পালকি গুছিয়ে নিয়েছে আজকের বাসের টিকিট, কুপন আর বিভিন্ন ধরণের ভাউচার। প্রথমে উইন্ডসর ক্যাসেল দিয়ে শুরু করে, অপরাহ্নে রোম্যান বাথ আর শেষে স্টোনহেঞ্জ দিয়ে সারা হবে আজকের দিন। সকালের আলোয় বাপ যখন বাচ্চার ছবি নিতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়েই মাথাটা বিগড়ে দিলেন মাদিদ। মাত্র দুদিন সকালের বন্ধুত্বই হয়েছে কাল, নইলে কোন সাহসে তিনি তিনজনকে লাভলি সিস্টারস বলে ঠাওরালেন, সে কেবল মাদিদই জানেন। তবে মধ্যবয়েসী ভারতীয়রা, কাতারিদের চেয়ে অনেকটাই বেশি বিজ্ঞ। কেবল একটা প্রখর দৃষ্টি দিয়ে মাদিদকে মেপে, এগিয়ে যাওয়াই সমীচীন বলে মনে করলাম।

আমরা যারা উবের বলি, তাঁদের নিয়ে পালকিরা উপহাস করে। মার্কিনী উচ্চারণ নাকি উবের নয়, উবার। আর শেষের বয়-শূন্য ‘র’টা অনুচ্চারিত থাকলে উপযুক্ত হয় বেশি। আমাদের দেশের উবার অথবা বিদেশের উবার, ডেকে নেওয়ার পদ্ধতি কিন্তু একইরকমের। তবে আমাদের দেশে পাওয়া যায় অনায়াসে, আর খোদ কেন্সিংটনে দাঁড়িয়ে দেখা গেলো, পরপর তিনটি উবারই বাতিল করে দিলেন আমাদের আর্জি। তাদের মধ্যে শেষজনের নাম মহম্মদ, আর সর্বশেষে সেই মহম্মদ ভাইও ঝুলিয়ে দেওয়াতে চাপে পরে যাওয়া ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন গতিই ছিলনা। সকাল আটটা’র মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে। রাস্তা পেরোনোর সিগন্যাল লাল থাকা সত্ত্বেও, গিন্নি তখন দুই মেয়ের হাত ধরে, ক্রোমওয়েল রোডের উপরে দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করছেন। একাধারে ঘড়ি দেখা আর তারই সাথে পরিবারের বাকী তিন বিহ্বল সদস্যাকে সামলাতে আমার নিজেরও তখন বেশ নাজেহাল দশা।

এক একটা দিন বুঝি অন্যরকম। মানুষ সেদিন ভাবে একরকম আর হবে ঠিক তার উল্টোটাই। আগে থেকে ভাবা ছিল, লন্ডনের ব্ল্যাক-ক্যাবে ওদেরকে চড়াতে হবে একবার, আর সেই সুযোগ যে আজ সকালেই আচমকা এসে পড়বে, এ আগে থেকে পরিকল্পনায় ছিলনা। কে যেন একজন বলেছিলেন, ব্ল্যাক-ক্যাব নাকি ভয়ানক রকমের দামী। সেসব বিলিতি চালকদের ভাড়ার উপরে, বাড়তি পঁচিশ পারসেন্ট টিপস সংযোজন করে না দিলে, তাঁরা নাকি বেজায় বিরক্ত হন আর বেমানান কিছু তীক্ষ্ণ খোঁয়াড়ী করতেও পিছপা হননা। তাছাড়া থাইল্যান্ড ব্যতীত, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই আমার ট্যাক্সি চালকদের উপরে একটা অবিশ্বাস রয়েছে। আজ মঙ্গলবার, বাইরে লন্ডনের অফিসটাইম শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা চারজনেই ব্ল্যাক-ক্যাবে চেপে, কিছুতে মনঃসংযোগ করতে পারছিনা ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে না পৌঁছনো পর্যন্ত।

আমাদের কনিষ্ঠাটি বেশ কিপটে। এ রাস্তা ও রাস্তা পেরিয়ে ট্যাক্সিটি এগোচ্ছে লন্ডনের ট্রাফিক ঠেলে, আর সে কিনা বেশ সরবেই মিটারে কত উঠল, তা ঘোষণা করে চলেছে অবিরত। সে তো একরকমের পরশু রাতের ব্যয়বহুল ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁটার মতনই ব্যাপার হল। মেনুকার্ডের বাঁদিক থেকে ডানদিকে না পড়ে, উর্দুর মতন ডান থেকে বাঁয়ে পড়াতে বাংলাদেশী ওয়েটার মাহরুফ একটু বাঁকা হেসে চলে গিয়েছিলেন অন্য টেবিলে। তবে এরই মধ্যে ছোটোটিরই পর্যবেক্ষণের প্রশংসা না করে পারা গেলনা। একটু ঘাড় বেঁকিয়ে বাইরে দেখছে সে। জিজ্ঞাসা করাতে জবাব এলো, গাড়ীটা কিন্তু খুব কালো নয়, বাবু। একটু স্লাইট স্লাইট ব্রাউনও আছে।

এদেশে ‘বাস’ মানে কেবলমাত্র শহরের সীমার মধ্যেই চলাচলের যান। সে যানগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে লালরঙের ও দোতলা। লন্ডনের পরিসীমার বাইরে গেলেই, সে বাস হয়ে যাবে একতলা আর তার নাম বদলে হয়ে যাবে কোচ। ভিক্টোরিয়ার কাছাকারি পৌঁছে দেখা গেল, সে এক ভারী ক্রিয়াশীল জায়গা। প্রচুর ব্যস্তসমস্ত পর্যটকের জমায়েত, বাসে ট্যাক্সিতে ট্রেনে মিলে এক ভজঘট ব্যাপার। অনেকটা যেন আমাদের হাওড়া স্টেশনের মতন, তবে অত্যন্ত শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে সব কিছুতেই।

ব্ল্যাক-ক্যাবের ড্রাইভারটি একটু উদাস রকমের, কোচ স্টেশনের নামে, তিনি যেখানে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন, সেখানে দূর থেকে দেখা যাচ্ছে লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া রেল স্টেশন। আর ঘড়িতে আটটা পঁয়ত্রিশ। খানিক চুপ করে জরিপ করে নিতে হল জায়গাটা আর তারপরে ম্যাপ আর বিভিন্ন সাইনবোর্ড দেখে দেখে পৌঁছে যাওয়া হল এক মস্ত বিষম খটমট বাড়ির সামনে। সুবিশাল দরজার বাইরে কয়েকটি মানুষ প্যাম্ফলেট বিলোচ্ছেন গোল্ডেন ট্যুরস কোম্পানীর। আর তাঁদের কাছেই জেনে নেওয়া গেল, আমাদের বাস ছাড়বে ছয়-নম্বর লেন থেকে।

যাক, ছেড়ে যায়নি তাহলে! লেট তাহলে আমাদের একার হয়নি। প্রকাণ্ডকায় গোটা দশেক ঘন নীল-রঙের বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে এদিক ওদিক, অনেকটা আমাদের বম্বে-পুণে লাক্সারি বাগগুলির মতন। ছয় নম্বরে গিয়ে উইন্ডসর ক্যাসেলের বাসের লাইনে দাঁড়াতেই, ট্যুর কোম্পানির লোকেরা সবুজ রঙের একটা করে টিকিট যখন কব্জিতে পরিয়ে দিয়েছে রাখীর মতন, তখনই আমাদের ছোটোটি মনে করিয়ে দিল, বাবু এটা কিন্তু বাস নয়, এটা একটা কোচ।

চলবে…

Leave a comment