নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রীটের উপরে “জয়’স চাইনিজ” নামের একটা রেস্তরাঁয়ে অদ্ভুতরকম ভালো চীনে খাবার খেয়ে আমরা তখন টিউবে। আবার মিনিট কুড়ি উল্টোদিকে হেঁটে আসতে হয়েছে হলবর্ন স্টেশনে। পরে দেখা গেলো, দোকানটার কাছেই, রাসেল স্কোয়ার স্টেশন থেকেও আসা যেতো, আর তাতে হয়ত সময়ও লাগত খানিক কম। তবে, অফিসটাইম তখনও শুরু হয়নি আর সেইজন্যে ট্রেনে বসার জায়গাও পেয়ে গিয়েছে ওরা। এবারে লক্ষ্য হাইড পার্ক। যথারীতি বাড়তি খেয়ে, পেট সকলের যথেষ্ট ভরা। চীনে উদ্ভিদের স্টারফ্রাই, কুংপাও আর সুইট অ্যান্ড সাওয়ার মুরগী দিয়ে আজকের লাঞ্চ কিন্তু জমে গিয়েছিল ভালই। তবে ওই বাঙ্গালদের যা’হয় আরকি! অসংযমী খিদের চোটে অর্ডার দেওয়া হয়ে গিয়েছে অতিরিক্ত। বোকার মতন অর্ডার দেওয়াতেই নাকি, পয়সার নামে পয়সা যাচ্ছে, আর সে কারণেই গিন্নি বুঝি সামান্য নিরুদ্যম। তাছাড়া এতটা বেলা করে খাওয়া, এই বয়েসে কি আর পোষায়? ঘড়িতে ইতিমধ্যে চারটে বেজে গিয়েছে।
হাইড পার্ক পৌঁছতে হলে, নামতে হয় নাইটসব্রিজ স্টেশনে। হাইড পার্ক কর্নার স্টপেজে নামলেও হয়, তবে নাইটসব্রিজেই নাকি হাঁটা কম। পার্কে পৌঁছে কিন্তু বেজায় খটকা লাগল। এতসব বিস্ময়কর গল্প শুনেছি হাইড পার্কের! সে বাগান নাকি লোকজনের ভিড়ে ভিড়াক্কার। বিখ্যাত সব রাজনৈতিক ডেমনসট্রেসনস… তাছাড়া পিঙ্ক-ফ্লয়েড, কুইনের মতন সুপরিচিত রকগ্রুপও নাকি একটা সময়ে হাইড পার্কে নিয়মিত লাইভ অনুষ্ঠান করে গেছেন। এতো দেখছি মাইলের পর মাইল, সবুজ মখমলের মতন ঘাস, মস্ত বড়বড় বিদেশী গাছ দিয়ে ঘেরা একেবারে নিঃশব্দ, জনশূন্য একটা উদ্যান। দুরে নিভৃতে বসে আলাপচারিতায়ে ব্যস্ত কতিপয় নরনারী। তবে একদিক থেকে যেন ভালই হয়েছে। সারাটা দিন গিসগিসে লোকজনের সাথে হেঁটে বেরিয়ে, হাইড পার্কের এই আকস্মিক নির্জনতাই বুঝি ভাল।
বাঙালীদের বদভ্যাস বুঝি সর্বত্র গিয়ে গান শোনা। ওড়িশার বাংরিপোশি অরণ্যের মধ্যে চড়ুইভাতি করতে যাওয়া দুটি বাঙালী পরিবারকে আমি অনেককাল আগে ট্র্যানজিস্টর চালিয়ে শুনতে দেখেছি। পালকি আর তার বোনটিকেও দেখা গেলো, সে নিয়মই বজায় রেখেছে এখনও। তবে তারা একদিনেই বিলিতি আচরণে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াতে হেডফোন ব্যবহার করে। আমাদের অদূরেই একটি মুসলমান পরিবার শতরঞ্চি পেতে আরাম করছেন। আর সামনে খেলে বেড়াচ্ছে প্রায় সমবয়েসি পাঁচটি শিশু। আচ্ছা, সবকটি শিশুই কি এই দম্পতির নাকি লোকটির আরও দুটি স্ত্রী রয়েছে? হয়ত তিন বউয়ের মধ্যে সদ্ভাব নেই একেবারেই আর আজকে লোকটির এই স্ত্রীটিকে নিয়েই হাইড পার্ক বেড়াতে নিয়ে আসার কথা!
শোনা গেছে বিপাসনা নামের একধরনের মেডিটেসন নাকি ভীষণ রকমের জনপ্রিয় হয়েছে আজকাল। যিনি সে ক্রিয়া করবেন, তাকে নাকি টানা দিন দশেক মৌন হয়ে থাকতে হয়। হঠাৎ খেয়াল হল, আমি তো প্রায় কুড়ি মিনিটের উপর কথাই বলিনি কারোর সাথে। আচ্ছা, আমরা কি একে ওপরের সাথে এখন একটু খোশগল্প করতে পারিনা? আড্ডা গল্প এইসবই কি একে ওপরের প্রতি কৌতূহল ফুরিয়ে গেলে লাঘব হয়ে যায় অনেকটাই? তবে এরকম চুপচাপ থাকার মধ্যে একটা মাতন আছে, অনেকটা নির্বাক সিনেমার মতন। পালকিরা কি একটা বিষয় নিয়ে যেন অনবরত হেসে চলেছে। হয়ত আমাদেরই মধ্যে কারোর ভুল ইংরিজি নিয়ে! তবে আমি কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা সেই আড্ডায়ে।
ধূমপায়ী বলে আজকাল লজ্জায়ে পরতে হয় সব জায়গাতেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক সেদিকে অনেক মানুষই বসে আছেন, কিন্তু অনেক ঠাহর করে দেখা গেল, ধূমপান কিন্তু কেউই করছেন না। এত লোক নিজেকে শুধরে নিলেও, আমি কেন পারছিনা? তবে ধূমপান ছাড়াও স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ে আজকাল সকলেই সচতন। আর সেই সচেতনতাতেই, পাঁচটা বাজতেই হাইড পার্ক কেমন আমূল বদলে গেল। হঠাৎ কোথা হতে যে পার্কের মধ্যের একমাত্র সড়কটি দিয়ে ঝাঁকেঝাঁকে বাইসাইকেল চলতে শুরু করেছে, তার খবর বুঝি আমাদের জানা ছিলনা আগে থেকে। এরা বলেন বাইকিং, আর বাইকিং নাকি নিয়মিত চালিয়ে গেলে, সুফল পাওয়া যাবে মর্নিং ওয়াক বা অন্য কোন ব্যায়ামের চেয়েও বেশি। যুক্তিহীন কৌতূহলে আর একটা স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের আশায়ে, দুইকন্যা আর তাঁদের মা তখন হাঁ করে দেখছেন সেই সাইকেল আরোহীদের। আর সেই মুহূর্তেই আমাদের গোটা পরিবার চায়ের সাথে বিস্কুট, পাউরুটির সাথে মাখন, রাতে খাবার পরের চকোলেট আর পাতে কাঁচা নুন খাওয়া বন্ধ করে দিল।
আশা ছিল হাইড পার্কে শুয়ে থাকব অনেকক্ষণ, যতক্ষণ না জ্যোৎস্নায়ে ঢেকে যাবে ঘাসগুলি। আঁধারে কালো হয়ে যাওয়া গাছের পাতাগুলিতে যখন আলাদা করা যাবেনা ওক আর পাইনে। কিন্তু এই তো খানিকক্ষণ আগেও বেশ নরম রোদ ছিল, হঠাতই, শনশন করে একটা কেমন ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। খুব কৌতূহল ছিল দেখে নেব, সরল মায়াময় এই বাগানে আম জাম কাঁঠালের গাছ রয়েছে কিনা? তা সে জিজ্ঞাসার নিরসন তো আর হলনা আমাদের! বাইরে বেরোনোর মুখটাতে একদল অফিস ফেরতা মানুষ ভিড় করেছেন রাস্তার ওপারে যাওয়ার জন্য, সাইকেল আরোহীদের ভিড়ে পেরোনোর সুযোগই হচ্ছেনা তাঁদের। একবার কি তাঁদেরই জিজ্ঞাসা করে দেখব, দাদা এখানে কি আমাদের পেহেলগাঁওের মতন তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায়? আমার যে হাইড পার্কের জ্যোৎস্না দেখার খুব সখ!
চলবে…
Leave a comment