হায়না তো চায়নায়ে মশাই ১৬ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (৫) · জুন ২০১৯

প্রথমে বিস্তর গাঁইগুই আর তার কিছুক্ষণ পরেই চার দুগুণে আটখানা পা সম্পূর্ণরূপে ধর্মঘটে চলে যাওয়াতে, প্রায় চল্লিশ মিনিটের কাছাকাছি একটা গোলাকার পার্কের বেঞ্চিতে বসে রয়েছি আমরা। জায়গাটার নাম ব্লুমসব্যারি স্কোয়ার গার্ডেন। অপরূপ সুন্দর সাজানো বা সমৃদ্ধ তেমন কিছু নয়, ছোটো বাহুল্যবর্জিত একটি স্থানীয় পার্ক। আসলে আয়তনে খুব বড় মাপের না হলে, পার্ক না’বলে কিন্তু বিলেতে বলা হয় গার্ডেন। তাছাড়া কেবলমাত্র বিলেতে কেন? পার্ক কথাটা থাকলেই কিন্তু বুঝে নেওয়া হয় যে স্থানটি একাধারে বড় এবং সর্বসাধারণের সম্পত্তি। অন্যদিকে গার্ডেন অর্থেই তার একটা বেসরকারী বা ব্যক্তিগত মালিকানা গোছের বৈশিষ্ট্য ছিল বা এখনও বুঝি আছে। লন্ডনের উদাহরণে যেমন হাইড পার্ক, রিজেন্ট পার্ক, গ্রিন পার্ক, এগুলি কিন্তু সবই পার্ক। আর প্রায় হাইড পার্কেরই পার্শ্ববর্তী কেন্সিংটন গার্ডেনটি কিন্তু হাইড পার্কের সদৃশ হলেও, তাকে বলা হবে গার্ডেন, যেহেতু সেটি রানিমাদের কেন্সিংটন প্যালেসের সঙ্গে লাগোয়া ও একসময়ে ব্যক্তিগতই ছিল।

চারিং-ক্রস থেকে হলবর্ন, আর ম্যাপ অনুযায়ী হলবর্ন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থেকে গ্রেট রাসেল স্ট্রীটের উপরে ব্রিটিশ মিউজিয়াম হেঁটে যেতে সময় লাগার কথা সাত থেকে দশ মিনিট। আর হাঁটাপথের মাঝেই পরছে ব্লুমসব্যারি গার্ডেনটি। অচঞ্চল সোমবারের দুপুর, আমাদের অদূরেই একটি বেঞ্চি জুড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছেন এক বৃদ্ধা নারী। তার পায়ের কাছেই রাখা অনেক ক’টি বাজারের থলে। হয়ত সব্জিবাজার করে বাড়ী ফেরার সময়ে, বিশ্রাম নিচ্ছেন সামান্য। অথবা এমনটা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়, এই বৃদ্ধাটি হয়ত বাড়ীতে বাড়ীতে জিনিসপত্র ডেলিভারির কাজ নিয়েছেন সম্প্রতি। আমাদের মতনই বাড়তি হাঁটাহাঁটি করে, ব্লুমসব্যারির বাগানে শুয়ে কর্মবিরতি নিয়ে নিচ্ছেন!

উল্টোপিঠেই তিনটি চোয়াড়ে মার্কা ছোকরা বসে বীয়ার পান করছে অবলীলায় আর অনবরত ধূমপান (বা অন্য কোন উৎকৃষ্ট ধোঁয়া) করে চলেছে। সঙ্গে চলছে তাদের সরব খোশগল্প! ব্যাটারা আমাদের অতীতদিনের মতন, ইশকুল কিমবা কোচিং ক্লাস ফাঁকি মেরে, আড্ডা সেরে বাড়ি গিয়ে মা’কে একরাশ মিথ্যেকথা বলবে। হয়ত এই ব্লুমসব্যারিটাই এই কিশোরদের ম্যাডক্স স্কোয়ার। প্ল্যান করা রয়েছে, মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেওয়া হবে একটু বেলা করেই, ব্রিটিশ মিউজিয়াম দেখে নেওয়ার পর। তারপরে সন্ধ্যের চা, হাইড পার্কের আশেপাশে কোথাও, আর পরিশেষে হোটেলে ফেরা। কিন্তু এই অক্ষম পায়ের ব্যাথাই ভোগাচ্ছে বেশ আর তার জন্যেই বুঝি হাইড পার্কের প্রাপ্য থেকে, অযথা নষ্ট হচ্ছে সময়।

সকাল থেকে ন্যাচারাল হিস্ট্রি আর ন্যাশনাল গ্যালারীর মতন রসহীন জায়গা দেখে, আবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নামেই গায়ে জ্বর আসছিল। আচ্ছা, কোনরকমেই কি বাদ দিয়ে দেওয়া যায়না ব্রিটিশ মিউজিয়ামটা? কিন্তু সেই প্রস্তাবের আগেই তর্ক শুরু হয়ে গেলো, তারপরে তর্জন গর্জন আর তারপর কথা বন্ধের প্রতিজ্ঞা। কোথায় লাগে তখন ব্রিটিশ ভদ্রতা? আরও দিন আটেক বাকী রয়েছে ছুটির, এরপরে লন্ডনের কান্ট্রিসাইড, রয়েছে স্কটল্যান্ড, ইনভারনেস, আইল অফ স্কাই, আরও কত কি! সেসব বিবেচনা করেই, ব্লুমসব্যারির ঝিমনো দুপুর ছেড়ে, পা-বাড়ানো হল মিউজিয়ামটির দিকে।

লন্ডনের গ্রেট রাসেল স্ট্রীটটি আমাদের লিটল রাসেল স্ট্রীটের থেকেও সঙ্কীর্ণ। জাদুঘরের সামনেই ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন স্মারক, চিনি মাখানো বাদামভাজা, আর দেখা গেল আগত পর্যটকদের মধ্যে অধিকাংশই প্রবীণ লোক। কিন্তু তাঁদের হাঁটার শীঘ্রতা আমাদের চার বাঙালীর চেয়ে দ্বিগুণ। বাইরেই গোটগোট অক্ষরে লেখা রয়েছে মোবাইল ফোনে ছবি তলার নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে। কিন্তু কেউই দেখলাম তা মান্য করছেন না। রোমান স্থাপত্যেই তৈরি এই জাদুঘরটিও। উঁচু হয়ে ওঠা থামগুলি দেখলে, অনেকটা আমাদের টাউনহলের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে ওঠা আর তারপরেই বোঝা গেল, স্থান নির্বাচনটা জুতসই না হলেও, লন্ডন শহরের আর সব দ্রষ্টব্যের মতন, ব্রিটিশ মিউজিয়ামটিও কিন্তু কোনরকম কার্পণ্য না করেই বানিয়েছেন সাহেবরা। এখানেও যথারীতি কিউরেটরদের দাদাগিরি চলছে। তাঁদের বেশির ভাগ শ্বেতাঙ্গ হলেও, কালোও রয়েছে দেখা গেলো দু চারজন। নারী পুরুষ নির্বিশেষে, প্রত্যেকের পরনে সাদাজামা, গলায় ঝোলানো একাধিক আইডেন্টিটি কার্ড, কালো ট্রাউজারের উপরে চওড়া বেল্ট আর সকলেরই কোমরে ঝুলছে ঢাউস টর্চ আর গোটা বিশেক করে পেল্লায় চাবি। সেই চাবির ঝনঝনানিতেই, যথেষ্ট ভিড় থাকা সত্ত্বেও, এলাকা কিন্তু একদম তাঁদেরই নিয়মাধীন।

গোড়ালীটা ভোগাচ্ছে খুব, আর সে ব্যাথাটা উৎসাহ পেয়ে, ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে কোমরে। কোনোমতে একটা বেঞ্চিতে, একচিলতে জায়গা পেয়ে গিয়ে, আর এগোনো হয়নি মিউজিয়ামের ভিতরে। গিন্নি আর মেয়েরা তখন নতুন সক্রিয়তায়, আপনজনকে ফেলেই, জাদুঘর ঘুরে দেখতে ব্যস্ত। খানিকটা সময় সেখানে কাটিয়ে, কফি ও ধূমপানের আশায়ে অপেক্ষা শুরু বাইরের এক কফিশপে। বেশ খিদে পেয়ে গিয়েছে তখন… বাইরে টুকিটাকি জিনিসপত্রের কয়েকটি দোকান আর তার পাশেই একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। আহা! এখানে যদি একটু ভাত ডাল তরকারি পাওয়া যেত, বৌদির দোকানের মতন!

চলবে…

Leave a comment